অন্যরা যখন পুরোনো লড়াই লড়ছে, তখন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নির্মাণে ব্যস্ত। ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিভেন এ. কুক ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, গত এক দশকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও কাতার– এই তিনটি উপসাগরীয় দেশ একটি অভূতপূর্ব উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছিল। দুবাই, আবুধাবি, দোহা ও রিয়াদের মতো শহরগুলোকে কেন্দ্র করে তারা বিশ্বমানের প্রযুক্তি কেন্দ্র, লজিস্টিক হাব, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন ও বিনোদন শিল্প গড়ে তুলেছিল। লক্ষ্য ছিল একটাই– তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বহুমুখী আর্থিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা।
কুকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উন্নয়ন মডেলের মূল ভিত্তি ছিল দুটি বিষয়– রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি– এই তিন শাসক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার অধিকারী। আর নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। এই দুটি মূল স্তম্ভের উপর ভর করেই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের বিশাল সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে কৌশলগত বিনিয়োগ পরিচালনা করছিল।
গাজা যুদ্ধের মধ্যেও দুটি মধ্যপ্রাচ্যের অস্তিত্ব
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আক্রমণ এবং পরবর্তীতে গাজা যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যেন দুটি আলাদা জগৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একদিকে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, হুতি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলিরা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছে, হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা হচ্ছে– আর অন্যদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের উন্নয়নযজ্ঞে মত্ত।
ফরেন পলিসিতে কুক লিখেছেন, এই সংঘাত যখন পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করছে, তখনও উপসাগরীয় দেশগুলো গিগাপ্রজেক্টে অর্থ ঢালছে, বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করছে।
মোহাম্মদ বিন সালমান, মোহাম্মদ বিন জায়েদ ও আমির তামিমের কাছে অন্য দেশের সংঘাত তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না– এটাই ছিল সেই সময়ের বার্তা। অন্যরা যখন পুরোনো লড়াই লড়ছে, তখন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নির্মাণে ব্যস্ত। এই মানসিকতাই ছিল উপসাগরীয় মডেলের প্রাণশক্তি।
২০২৫ সালের যুদ্ধ এবং সীমিত ক্ষয়ক্ষতি
২০২৫ সালের জুন মাসে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করে, সেই ১২ দিনের যুদ্ধে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। ইরান দোহা থেকে মাত্র ২৫ মাইল দূরে কাতারের আল উদেইদ মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালায়, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি ছিল সামান্য।
কুকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এই পর্যায়ে সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার ইরানের সামর্থ্য ও উদ্দেশ্য ট্রাম্পের চেয়ে অনেক ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল। গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) নেতারা ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, আমেরিকা ও ইসরায়েল যা করছে তাতে তারা অংশীদার নয়।
ইরানের কৌশল: প্রতিবেশীদের শায়েস্তা করা
কিন্তু এই কৌশলগত দূরত্ব শেষ পর্যন্ত উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করতে পারেনি। ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধ এবং পরবর্তী অপারেশন এপিক ফিউরি ও রোয়ারিং লায়নের মধ্যবর্তী মাসগুলোতে ইরান একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করে। সে অনুযায়ী তারা প্রতিবেশীদের আঘাত করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলে। ফরেন পলিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত পাঁচ সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলে সরাসরি যুদ্ধ এসে গেছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে একাধিক দেশ। ইসরায়েলের চেয়েও বেশি বার সংযুক্ত আরব আমিরাতে আঘাত করা হয়েছে– বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে। বাহরাইনের জ্বালানি ও ডেটা সেন্টারগুলোতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নির্মম আঘাত হেনেছে। কুয়েতের তেল স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রগুলির একটি হলো কাতারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্স, সেটি ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। আর সৌদি আরবের পাইপলাইন ও শোধনাগার ইরানের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ইরান জিসিসি রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
হরমুজ প্রণালী ও ইরানের বাড়তি কর্তৃত্ব
কুক তার বিশ্লেষণে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন তা হলো, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কর্তৃত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি। কূটনৈতিক তৎপরতার প্রাথমিক ইঙ্গিত থেকে মনে হচ্ছে, ইরান এই যুদ্ধ থেকে হরমুজ প্রণালিতে আগের চেয়ে বেশি প্রভাব নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য মানে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জ্বালানি রপ্তানির উপর একটি স্থায়ী খড়গ ঝুলে থাকা।
তাছাড়া, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে তার প্রতিবেশীদের আঘাত করার সক্ষমতা বজায় রাখবে বলে মনে করছেন কুক। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হলেও হুমকি কমবে না। বরং ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থান থেকে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
উপসাগরীয় উন্নয়ন মডেলের সংকট
এই প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় উন্নয়ন মডেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে। ওই মডেলের মূল ভিত্তি ছিল দুটি বিষয়– রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো বজায় আছে। কিন্তু আঞ্চলিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বিনিয়োগকারী ও পেশাদার শ্রেণীকে আকৃষ্ট করার জন্য যে নিরাপদ পরিবেশের কথা বলা হতো, তা আর নিশ্চিত নয়।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লাগার ঘটনা এই মডেলের দুর্বলতাকে প্রকট করে তুলেছে। ওই ঘটনায় বৈশ্বিক বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। দোহার কাছে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা, রাস লাফানের ক্ষতি, আবুধাবির প্রযুক্তি খাতে আঘাত– এগুলো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক বিবর্তনের কেন্দ্রস্থলে সরাসরি আঘাত।
যে বহুজাতিক কোম্পানি ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা উপসাগরীয় শহরগুলোকে তাদের আঞ্চলিক সদর দফতর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, তারা এখন পুনর্মূল্যায়ন করছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্বিশেষে বীমার ব্যয় বৃদ্ধি, সাপ্লাই চেইনে অনিশ্চয়তা এবং কর্মীদের নিরাপত্তার উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের অনীহার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব
কুকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে ইরানের কৌশলের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলা। এই লক্ষ্য অর্জনে ইরান আংশিকভাবে সফল হয়েছে। কাতারের রাস লাফান থেকে এলএনজি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মানে ইউরোপ ও এশিয়ার গ্যাস বাজারে সরাসরি প্রভাব। সৌদি তেল অবকাঠামোতে বারবার আঘাত মানে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি সরাসরি প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত। এই অঞ্চলে অস্থিরতা মানে রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা। তদুপরি, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলবে।
সম্ভাব্য পথ: পুনর্গঠন না বিচ্যুতি?
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। সৌদি আরব ইতিমধ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়ত, ইরানের সাথে সরাসরি কূটনৈতিক সংলাপের পথ খোঁজা যেতে পারে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা সেই সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনে আরব রাষ্ট্রগুলো আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
তবে কুকের বিশ্লেষণের আলোকে মনে হচ্ছে, যুদ্ধের পরিণতি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তারা ইরানকে তাদের শত্রু বলে মনে না করলেও ইরান তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এই বাস্তবতায় উন্নয়ন মডেলের সাথে নিরাপত্তা কৌশলের পুনর্সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
একটি মডেলের পরীক্ষার মুহূর্ত
ফরেন পলিসি-তে স্টিভেন কুকের বিশ্লেষণ উপসাগরীয় উন্নয়ন মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুহূর্ত চিহ্নিত করেছে। গত এক দশকে সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার তেলের বাইরে যে একটি বহুমুখী আধুনিক অর্থনীতি যে স্বপ্ন বুনেছিল–তা এখন প্রবল চাপের মুখে। হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুধু অবকাঠামো নয়, এই মডেলের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও আঘাত করেছে।
উপসাগরীয় নেতারা কি এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ উন্নয়ন মডেল গড়তে পারবেন? নাকি ইরানের সাথে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা তাদের স্বপ্নের নগরগুলিকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীশূন্য করে দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না– বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বহু দেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতির উপরেও গভীর প্রভাব ফেলবে।
অন্যরা যখন পুরোনো লড়াই লড়ছে, তখন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নির্মাণে ব্যস্ত। ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিভেন এ. কুক ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, গত এক দশকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও কাতার– এই তিনটি উপসাগরীয় দেশ একটি অভূতপূর্ব উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছিল। দুবাই, আবুধাবি, দোহা ও রিয়াদের মতো শহরগুলোকে কেন্দ্র করে তারা বিশ্বমানের প্রযুক্তি কেন্দ্র, লজিস্টিক হাব, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন ও বিনোদন শিল্প গড়ে তুলেছিল। লক্ষ্য ছিল একটাই– তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বহুমুখী আর্থিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা।
কুকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উন্নয়ন মডেলের মূল ভিত্তি ছিল দুটি বিষয়– রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি– এই তিন শাসক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার অধিকারী। আর নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। এই দুটি মূল স্তম্ভের উপর ভর করেই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের বিশাল সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে কৌশলগত বিনিয়োগ পরিচালনা করছিল।
গাজা যুদ্ধের মধ্যেও দুটি মধ্যপ্রাচ্যের অস্তিত্ব
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আক্রমণ এবং পরবর্তীতে গাজা যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যেন দুটি আলাদা জগৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একদিকে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, হুতি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলিরা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছে, হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা হচ্ছে– আর অন্যদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের উন্নয়নযজ্ঞে মত্ত।
ফরেন পলিসিতে কুক লিখেছেন, এই সংঘাত যখন পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করছে, তখনও উপসাগরীয় দেশগুলো গিগাপ্রজেক্টে অর্থ ঢালছে, বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করছে।
মোহাম্মদ বিন সালমান, মোহাম্মদ বিন জায়েদ ও আমির তামিমের কাছে অন্য দেশের সংঘাত তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না– এটাই ছিল সেই সময়ের বার্তা। অন্যরা যখন পুরোনো লড়াই লড়ছে, তখন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নির্মাণে ব্যস্ত। এই মানসিকতাই ছিল উপসাগরীয় মডেলের প্রাণশক্তি।
২০২৫ সালের যুদ্ধ এবং সীমিত ক্ষয়ক্ষতি
২০২৫ সালের জুন মাসে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করে, সেই ১২ দিনের যুদ্ধে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। ইরান দোহা থেকে মাত্র ২৫ মাইল দূরে কাতারের আল উদেইদ মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালায়, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি ছিল সামান্য।
কুকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এই পর্যায়ে সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার ইরানের সামর্থ্য ও উদ্দেশ্য ট্রাম্পের চেয়ে অনেক ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল। গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) নেতারা ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, আমেরিকা ও ইসরায়েল যা করছে তাতে তারা অংশীদার নয়।
ইরানের কৌশল: প্রতিবেশীদের শায়েস্তা করা
কিন্তু এই কৌশলগত দূরত্ব শেষ পর্যন্ত উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করতে পারেনি। ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধ এবং পরবর্তী অপারেশন এপিক ফিউরি ও রোয়ারিং লায়নের মধ্যবর্তী মাসগুলোতে ইরান একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করে। সে অনুযায়ী তারা প্রতিবেশীদের আঘাত করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলে। ফরেন পলিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত পাঁচ সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলে সরাসরি যুদ্ধ এসে গেছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে একাধিক দেশ। ইসরায়েলের চেয়েও বেশি বার সংযুক্ত আরব আমিরাতে আঘাত করা হয়েছে– বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে। বাহরাইনের জ্বালানি ও ডেটা সেন্টারগুলোতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নির্মম আঘাত হেনেছে। কুয়েতের তেল স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রগুলির একটি হলো কাতারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্স, সেটি ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। আর সৌদি আরবের পাইপলাইন ও শোধনাগার ইরানের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ইরান জিসিসি রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
হরমুজ প্রণালী ও ইরানের বাড়তি কর্তৃত্ব
কুক তার বিশ্লেষণে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন তা হলো, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কর্তৃত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি। কূটনৈতিক তৎপরতার প্রাথমিক ইঙ্গিত থেকে মনে হচ্ছে, ইরান এই যুদ্ধ থেকে হরমুজ প্রণালিতে আগের চেয়ে বেশি প্রভাব নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য মানে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জ্বালানি রপ্তানির উপর একটি স্থায়ী খড়গ ঝুলে থাকা।
তাছাড়া, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে তার প্রতিবেশীদের আঘাত করার সক্ষমতা বজায় রাখবে বলে মনে করছেন কুক। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হলেও হুমকি কমবে না। বরং ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থান থেকে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
উপসাগরীয় উন্নয়ন মডেলের সংকট
এই প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় উন্নয়ন মডেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে। ওই মডেলের মূল ভিত্তি ছিল দুটি বিষয়– রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো বজায় আছে। কিন্তু আঞ্চলিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বিনিয়োগকারী ও পেশাদার শ্রেণীকে আকৃষ্ট করার জন্য যে নিরাপদ পরিবেশের কথা বলা হতো, তা আর নিশ্চিত নয়।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লাগার ঘটনা এই মডেলের দুর্বলতাকে প্রকট করে তুলেছে। ওই ঘটনায় বৈশ্বিক বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। দোহার কাছে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা, রাস লাফানের ক্ষতি, আবুধাবির প্রযুক্তি খাতে আঘাত– এগুলো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক বিবর্তনের কেন্দ্রস্থলে সরাসরি আঘাত।
যে বহুজাতিক কোম্পানি ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা উপসাগরীয় শহরগুলোকে তাদের আঞ্চলিক সদর দফতর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, তারা এখন পুনর্মূল্যায়ন করছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্বিশেষে বীমার ব্যয় বৃদ্ধি, সাপ্লাই চেইনে অনিশ্চয়তা এবং কর্মীদের নিরাপত্তার উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের অনীহার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব
কুকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে ইরানের কৌশলের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলা। এই লক্ষ্য অর্জনে ইরান আংশিকভাবে সফল হয়েছে। কাতারের রাস লাফান থেকে এলএনজি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মানে ইউরোপ ও এশিয়ার গ্যাস বাজারে সরাসরি প্রভাব। সৌদি তেল অবকাঠামোতে বারবার আঘাত মানে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি সরাসরি প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত। এই অঞ্চলে অস্থিরতা মানে রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা। তদুপরি, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলবে।
সম্ভাব্য পথ: পুনর্গঠন না বিচ্যুতি?
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। সৌদি আরব ইতিমধ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়ত, ইরানের সাথে সরাসরি কূটনৈতিক সংলাপের পথ খোঁজা যেতে পারে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা সেই সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনে আরব রাষ্ট্রগুলো আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
তবে কুকের বিশ্লেষণের আলোকে মনে হচ্ছে, যুদ্ধের পরিণতি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তারা ইরানকে তাদের শত্রু বলে মনে না করলেও ইরান তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এই বাস্তবতায় উন্নয়ন মডেলের সাথে নিরাপত্তা কৌশলের পুনর্সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
একটি মডেলের পরীক্ষার মুহূর্ত
ফরেন পলিসি-তে স্টিভেন কুকের বিশ্লেষণ উপসাগরীয় উন্নয়ন মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুহূর্ত চিহ্নিত করেছে। গত এক দশকে সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার তেলের বাইরে যে একটি বহুমুখী আধুনিক অর্থনীতি যে স্বপ্ন বুনেছিল–তা এখন প্রবল চাপের মুখে। হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুধু অবকাঠামো নয়, এই মডেলের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও আঘাত করেছে।
উপসাগরীয় নেতারা কি এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ উন্নয়ন মডেল গড়তে পারবেন? নাকি ইরানের সাথে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা তাদের স্বপ্নের নগরগুলিকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীশূন্য করে দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না– বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বহু দেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতির উপরেও গভীর প্রভাব ফেলবে।