এআইয়ের বাজারে কে বেশি গণতান্ত্রিক, চীন নাকি আমেরিকা?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
এআইয়ের বাজারে কে বেশি গণতান্ত্রিক, চীন নাকি আমেরিকা?
প্রতীকী ছবি

প্রতি মাসে কোটি কোটি ব্যবহারকারী পিন্টারেস্টে নতুন স্টাইল বা ফ্যাশনের খোঁজে ভিড় করেন। ‘দ্য মোস্ট রিডিকুলাস থিং’ (সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিস) শিরোনামের একটি পেজে সৃজনশীলদের অনুপ্রাণিত করার মতো অসংখ্য আজব আইডিয়া রয়েছে—যেমন ক্রোকস জুতা দিয়ে ফুলের টব, চিজবার্গার আকৃতির আইশ্যাডো কিংবা সবজি দিয়ে তৈরি জিঞ্জারব্রেড হাউস।

তবে ব্যবহারকারীরা যা হয়তো জানেন না তা হলো, এই ফিচারের নেপথ্যের প্রযুক্তিটি পুরোপুরি আমেরিকার তৈরি নয়। পিন্টারেস্ট তাদের ‘রিকমেন্ডেশন ইঞ্জিন’ বা পরামর্শ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিল রেডি বিবিসিকে বলেছেন, “আমরা কার্যত পিন্টারেস্টকে একটি এআই-চালিত শপিং অ্যাসিস্ট্যান্টে পরিণত করেছি।”

আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি চাইলে পর্দার আড়ালের কাজের জন্য যেকোনো আমেরিকান এআই ল্যাব ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চীনের ‘ডিপসিক আর-১’ মডেলটি বাজারে আসার পর থেকে পিন্টারেস্টে চীনা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েই চলেছে।

বিল রেডি এটিকে একটি ‘যুগান্তকারী পরিবর্তন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘চীন এটি ওপেন সোর্স (সবার জন্য উন্মুক্ত) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি ওপেন সোর্স মডেলের একটি নতুন জোয়ার তৈরি করেছে।”

এই দৌড়ে চীনা প্রতিযোগীদের মধ্যে আলিবাবার কুয়েন এবং মুনশট-এর কিমি রয়েছে। পাশাপাশি টিকটকের মালিকানাধীন বাইটড্যান্সও একই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।

পিন্টারেস্টের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ম্যাট মাদিগাল বলেন, এই মডেলগুলোর মূল শক্তি হলো এগুলি ফ্রিতে ডাউনলোড করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা সম্ভব।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই-এর মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষেত্রে যা সচরাচর ঘটে না। মাদিগাল বলেন, “নিজেদের অভ্যন্তরীণ মডেল প্রশিক্ষণে আমরা যে ওপেন সোর্স প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তা বাজারের প্রচলিত মডেলগুলোর চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি নির্ভুল।”

এছাড়া এই উন্নত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম খরচে। কখনো কখনো আমেরিকান ডেভেলপারদের স্বত্বাধিকার করা মডেল ব্যবহারের তুলনায় ৯০ শতাংশ কম খরচে।

পিন্টারেস্ট একমাত্র মার্কিন প্রতিষ্ঠান নয় যারা চীনা এআই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ফরচুন ৫০০ ভুক্ত অনেক বড় বড় কোম্পানিতেও এই মডেলগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে। ফরচুন ৫০০ হলো ফরচুন ম্যাগাজিন কর্তৃক প্রকাশিত একটি বার্ষিক তালিকা, যা আমেরিকার বৃহত্তম ৫০০টি কোম্পানিকে তাদের মোট রাজস্বের ভিত্তিতে র‍্যাঙ্ক করে।

এয়ারবিএনবি প্রধান ব্রায়ান চেস্কি গত অক্টোবরে ব্লুমবার্গকে বলেছিলেন যে, তার কোম্পানির এআই কাস্টমার সার্ভিস এজেন্ট পরিচালনায় তারা আলিবাবার কুয়েনের ওপর প্রচুর নির্ভর করেন। এর পেছনে তিনি তিনটি সহজ কারণ দেখিয়েছেন—এটি খুব ভালো, দ্রুত এবং সস্তা।

এআই মডেল ডাউনলোডের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘হাগিং ফেস’-এও এর প্রমাণ মেলে। প্ল্যাটফর্মটির পণ্য নির্মাতা জেফ বুডিয়ার জানান, খরচের কারণেই নতুন স্টার্টআপগুলো মার্কিন মডেলের চেয়ে চীনা মডেলের দিকে বেশি ঝুঁকছে। তিনি বলেন, “হাগিং ফেস-এ ট্রেন্ডিং বা জনপ্রিয় মডেলগুলোর তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, শীর্ষ ১০টির মধ্যে অনেকগুলোই চীনা ল্যাব থেকে আসা। এমন সপ্তাহও যায় যখন শীর্ষ পাঁচটি মডেলের মধ্যে চারটিই থাকে চীনের।”

গত সেপ্টেম্বরে মেটার ‘লামা’ মডেলকে ছাড়িয়ে আলিবাবার ‘কুয়েন’ সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলে পরিণত হয়।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

২০২৫ সালের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, আমেরিকার টেক জায়ান্টরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করলেও চীনা কোম্পানিগুলো তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম করছে। তবে বুডিয়ার মনে করেন, এখনকার গল্পটা ভিন্ন। এখন সেরার লড়াইয়ে এগিয়ে আছে ওপেন সোর্স মডেল।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চীনা এআই মডেলগুলো সক্ষমতা এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা—উভয় দিক থেকেই বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গেছে।

ব্রিটিশ সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী স্যার নিক ক্লেগ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এআই তৈরির পেছনে অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে যা একদিন মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে। মেটা’র সাবেক এই কর্মকর্তা মনে করেন, মার্ক জাকারবার্গের মতো নেতারা যখন সুপারইন্টেলিজেন্স বা অতি-বুদ্ধিমত্তার পেছনে বিলিয়ন ডলার ঢালছেন, তখন চীন ওপেন সোর্স এআই জগতে আধিপত্য দেখানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।

ক্লেগ বলেন, ‘‘হাস্যকর বিষয় হলো, বিশ্বের বৃহত্তম স্বৈরতন্ত্র (চীন) এবং গণতন্ত্রের (আমেরিকা) মধ্যকার এই লড়াইয়ে চীনই প্রযুক্তিকে আরও বেশি ‘গণতান্ত্রিক’ বা সবার জন্য উন্মুক্ত করে তুলছে।”

অন্যদিকে, ওপেনএআই-এর মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো মুনাফা আনার জন্য প্রচণ্ড চাপে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্যাম অল্টম্যান জানিয়েছেন, তারা মডেল প্রশিক্ষণে প্রচুর বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবেন, তবে তা মূলত তাদের নিজস্ব স্বত্বাধিকার করা মডেলের মাধ্যমেই আয়ের পথ খুঁজবে।

সম্পর্কিত