ভেনেজুয়েলার তেল খাত চালাতে টাকা দেবে কে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার তেল খাত চালাতে টাকা দেবে কে?
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের কী হবে? এত বড় খাত পরিচালনার অর্থ আসবে কোথা থেকে?

নিজের দেশের তেল কোম্পানিগুলোর জন্য খাতটি উন্মুক্ত করার ইচ্ছা থেকেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পতন ঘটাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। ভেনেজুয়েলাকে পরিচালনার বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা নির্ভর করছে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে কতটুকু সম্পৃক্ত হবে–তার ওপর।

মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যে শেভরনই একমাত্র বড় তেল কোম্পানি, ভেনেজুয়েলায় যার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আছে। তবে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান এখন সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টকে ভেনেজুয়েলার তেলখাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী কোম্পানিদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “নিঃসন্দেহে এই তালিকায় শেভরন সবার সামনের সারিতে থাকবে।”

শেভরন এগিয়ে আছে, কারণ সমাজতান্ত্রিক সরকারের জবরদখল ও মার্কিন প্রশাসনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা ভেনেজুয়েলায় থেকে গিয়েছিল। এক্সনমোবিল ও কোনোকোফিলিপসের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিরা তা পারেনি। শেভরনের প্রধান মাইক উইর্থ মাসের পর মাস বেসেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন, যাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা কাজ চালাতে পারেন।

শেভরনের এই কৌশল কাজে দিয়েছে। মার্কিন অবরোধ আংশিক শিথিল হওয়ার পর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শেভরন প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করেছে, ২০২৫ সালের মে মাসের পর যা সর্বোচ্চ। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা থেকে যে প্রায় ৫ কোটি ব্যারেল মজুত তেল জব্দ করতে যাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে (যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার)। সেখান থেকেও তারা লাভবান হবে।

ভেনেজুয়েলার বিশাল মজুতে শুধু স্থলভাগের তেলই নয়। গায়ানায় তাদের একটি উপকূলীয় তেলক্ষেত্রও আছে, যেখানে এক্সনমোবিলসহ আরও অনেক কোম্পানি ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে।

ট্রাম্প প্রশাসন তেল-সংক্রান্ত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর থেকে শেভরনের বাইরে আরও নানা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। সুইস ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ভিটল ও ট্রাফিগুরা ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির লাইসেন্স পেয়েছে এবং শেভরনের সঙ্গে মিলে তারা বিদ্যমান মজুত বাজারজাত করবে। যেসব মার্কিন ধনকুবের বা তেল কোম্পানিগুলোর পিছনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আছে, তাদের লাভের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। যদিও সবার উৎসাহ সমান নাও হতে পারে।

সবচেয়ে সতর্ক অবস্থানে থাকবে বড় তেল কোম্পানিগুলো। শেভরন যেহেতু আগে থেকে এই অঞ্চলে উপস্থিত ছিল, তারা থাকবে এবং লাভবানও হবে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দুই বছরের মধ্যে তারা পিডিভিএসএর সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদিত দৈনিক ২ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল উৎপাদন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারবে। কিন্তু অন্য তেল কোম্পানিগুলো যে লাভবান হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাড়াহুড়ো করে করা যেকোনো চুক্তিই ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফটের মতে, ২০২৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল খাত তদারকিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে কি না–সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভবিষ্যতে যদি ডেমোক্র্যাট দল থেকে কেউ ক্ষমতায় আসে, তখন এই সময়ের জ্বালানি চুক্তিগুলো বাতিল হতে পারে।

অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে অনেক তেল কোম্পানি বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করতে পারে। হুগো শাভেজের আমলে রাষ্ট্রীয় জবরদখলের কারণে এক্সন ও কোনোকোফিলিপস বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছিল। অতীতে জব্দ হওয়া সম্পদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিনা- এক্সন ও কোনোকোর দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প অবজ্ঞাভরে বলেন, “দোষ তাদেরই ছিল।”

এই বিষয়ের কোনো মীমাংসা না হলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নতুন পুঁজি আসবে না বলে সতর্ক করছেন এক বিশেষজ্ঞ। আর ভেনেজুয়েলা ঋণের জাল থেকে মুক্ত হতে না পারলে সেই মীমাংসাও একপ্রকার অসম্ভব। তাই এক্সনের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস স্পষ্ট করেই বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা ‘বিনিয়োগযোগ্য’ নয়। তার এই মন্তব্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

তবু অনেক প্রতিষ্ঠান যেমন: হ্যালিবার্টন, এসএলবি ও বেকার হিউজের মতো তেল-সেবা কোম্পানিগুলো- যারা নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বৈরী অঞ্চলে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখে, তারা দুঃসাহস দেখাতে পারে। ছোট ছোট অনেক তেল কোম্পানিও তৎপর আছে। আমেরিকার শেল অঞ্চলের মতোই, ভেনেজুয়েলার অরিনোকোর বিটুমেন বেল্টে অসংখ্য ছোট ক্ষেত্র আছে, যেগুলো তুলনামূলক কম বিনিয়োগে কাজে লাগানো যায়। জনৈক বিশেষজ্ঞের মতে, “এগুলোর জন্য এক্সনের মতো বিশাল ব্যালান্স শিটের দরকার নেই।”

‘গ্রেইট আমেরিকা’ ঘরানার ধনকুবেররাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে অতি ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হ্যারি সার্জেন্ট- তেল ব্যবসার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, ভেনেজুয়েলায় কোন কোন প্রতিষ্ঠান যাবে, সে বিষয়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে পরামর্শ দিচ্ছেন। ওকলাহোমার শেল শিল্পের পথিকৃৎ হ্যারল্ড হ্যাম, যিনি আর্জেন্টিনায় তার ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন। তিনি বলেছেন “ভবিষ্যতে ভেনেজুলেয়ায় বিনিয়োগের বিষয়টি তিনি বিবেচনা করবেন।”

ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগকারীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে লাভবান হতে পারেন। ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা পল সিঙ্গার পরিচালিত এলিয়ট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট নভেম্বরে আদালতের নির্দেশে হওয়া নিলামে সিটগোর মালিকানা পায়। সিটগো হলো ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএস-এর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রিফাইনিং সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে সিটগোর মূল্য হু হু করে বাড়বে।

অন্য বিনিয়োগকারীরাও ভেনেজুয়েলার তেল খাত পুনরুদ্ধার হলে পরোক্ষ লাভের আশায় থাকতে পারেন। উৎপাদন যদি কখনও ঘুরে দাঁড়ায়, ভবিষ্যতে সরকার হয়তো পুরোনো দেনা মেটাতে আগ্রহী হবে। যেখানে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা, ওয়াল স্ট্রিটের দুঃসাহসী বিনিয়োগকারীরা সেখান থেকে খুব দূরে থাকে না।

(দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করে প্রকাশিত)

সম্পর্কিত