বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বিমূর্ত মনে হতে পারে। কিন্তু এর অবক্ষয় দৃশ্যমান হয় যুদ্ধে, সামরিক অভ্যুত্থানে, বিতর্কিত নির্বাচনে এবং বিশ্বজুড়ে নাগরিক স্বাধীনতায় কাটছাঁটে। দ্য ইকোনমিস্টের সহযোগী সংস্থা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা ইআইইউ ২০০৬ সাল থেকে সেই পতন পর্যবেক্ষণ করে আসছে। কিন্তু তাদের সর্বশেষ গণতন্ত্র সূচক একটি সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত এক বছরে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দেশের স্কোর অপরিবর্তিত থেকেছে বা উন্নত হয়েছে এবং বৈশ্বিক সূচক ০.০২ পয়েন্ট বেড়েছে– যা ২০১২ সালের পর সবচেয়ে বড় বৃদ্ধিগুলির একটি।
সূচকের পদ্ধতি ও চার শ্রেণি বিভাজন
ছবি: সংগৃহীতইআইইউ ১৬৭টি দেশকে দশ পয়েন্টে মূল্যায়ন করে এবং চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে– পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা। এই মাপকাঠিতে নরওয়ে বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ, যে অবস্থান দেশটি টানা ১৬ বছর ধরে রেখেছে। দ্বিতীয় স্থানে নিউজিল্যান্ড এবং পরবর্তী চারটি স্থান পূরণ করেছে অন্য নর্ডিক দেশগুলো। এ বছরের বেশির ভাগ উন্নতি এসেছে সারণির মাঝামাঝি অবস্থানের দেশগুলোতে।
লাতিন আমেরিকা ও তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি উন্নতি দেখা গেছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। নয় বছরের পতনের পর এই অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি দেশের স্কোর বেড়েছে, যেখানে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি মূল ভূমিকা রেখেছে। এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকাতেও একই প্রবণতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এই অঞ্চলগুলির তরুণ জনগোষ্ঠী এবং নেপাল, কেনিয়া ও মাদাগাস্কারে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বিপুল মানুষ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন।
ট্রাম্প-বিরোধী ঢেউ: কানাডা, রোমানিয়া, ডেনমার্কের উত্থান
কিছু দেশে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধির পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি পরোক্ষ ভূমিকা থাকতে পারে বলে ইআইইউ মনে করছে। কানাডা থেকে রোমানিয়া পর্যন্ত নির্বাচনে গত বছর অস্বাভাবিক সংখ্যক মানুষ ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। কানাডা গত বছর ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির পর পাঁচ ধাপ উঠে নবম স্থানে এসেছে। মার্ক কার্নির জয়কে ব্যাপকভাবে মাগা-ধাঁচের রাজনীতির বিরুদ্ধে নিন্দা জ্ঞাপন হিসেবে দেখা হয়েছে। রোমানিয়া হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা থেকে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রে উন্নীত হয়েছে– শক্তিশালী ভোটার উপস্থিতি ট্রাম্পের মিত্রদের পছন্দের জাতীয়তাবাদী প্রার্থীর পরাজয়ে সহায়ক হয়েছে। ডেনমার্ক চার ধাপ উঠে তৃতীয় স্থানে এসেছে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি মোকাবেলায় সরকারের কার্যকরী ভূমিকা এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
আমেরিকায় গণতন্ত্রের অবনতি: ট্রাম্পের প্রভাব ঘরে বিপরীত
তবে ট্রাম্পের প্রভাব তার নিজের দেশে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টা, বিক্ষোভ দমনে সামরিক বাহিনীর ব্যবহার এবং অব্যাহত রাজনৈতিক মেরুকরণ আমেরিকার স্কোর কমিয়ে দিয়েছে। গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি বিভাগ সরকারের কার্যকরী প্রক্রিয়া বিঘ্নিত করেছে এবং গণমাধ্যমকে নীরব করার প্রচেষ্টা নাগরিক স্বাধীনতায় আঘাত করেছে। আমেরিকা গত বছরের তুলনায় ০.২ পয়েন্ট হারিয়েছে এবং ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের মর্যাদায় রয়ে গেছে।
এই তথ্য একটি গভীর বৈপরীত্য তুলে ধরে। বিশ্বের অনেক দেশ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধাঁচের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছে– ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ওই রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। অথচ যে দেশ থেকে এই প্রবণতার উৎস, সেখানে গণতান্ত্রিক সূচক নিম্নমুখী।
সতর্ক আশাবাদের কারণ আছে, কিন্তু সংকট শেষ নয়
ইআইইউ-র এই সূচক বৈশ্বিক গণতন্ত্রের দীর্ঘ পতনের ধারা সামান্য হলেও শিথিল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নরওয়ে থেকে শুরু করে কানাডা ও রোমানিয়া পর্যন্ত যে সংকেতগুলো আসছে তা আশাবাদী হওয়ার কারণ দেয়। কিন্তু আমেরিকার চলমান অবক্ষয় একটি গুরুতর সতর্কবার্তা– বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণতন্ত্রে এই পরিবর্তন বৈশ্বিক প্রবণতায় কী প্রভাব ফেলবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বৈশ্বিক গণতন্ত্রের মন্দা হয়তো কিছুটা কমছে, কিন্তু আমেরিকায় তা কমছে না।