বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের শুষ্ক বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, তারা গ্রামীণ জীবনের মূল ভিত্তি চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখছেন। কয়েক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানি বাংলাদেশের অন্যতম শুষ্ক এই বরেন্দ্র অঞ্চলকে একটি উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চলে পরিণত করেছিল। গভীর নলকূপের কল্যাণে কৃষকেরা একসময়ের খরাপ্রবণ এই জমিতে বছরজুড়ে ধান, গম, ভুট্টা এবং শাকসবজি চাষ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিন্তু এখন, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং কয়েক দশক ধরে অতিরিক্ত পানি তোলার সম্মিলিত চাপে সেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভেঙে পড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলের ৮২ শতাংশেরও বেশি এলাকা ইতিমধ্যে মারাত্মক পানি সংকটের মধ্যে রয়েছে।
৪৮ বছর বয়সী কৃষক আতাউর রহমান বলেন, “আমাদের এখন আগের চেয়ে আরও গভীরে পাইপ বসাতে হচ্ছে। এত গভীরে যাওয়ার পরও আমরা আগের মতো পানি পাচ্ছি না।”
পুরো বরেন্দ্র অঞ্চল জুড়ে এখন এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, কারণ সেচ ব্যবস্থা এখন দিন দিন আরও ব্যয়বহুল, অনিশ্চিত এবং বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিছু কিছু গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে নলকূপগুলো থেকে খাওয়ার পানিটুকুও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম তিলিবাড়ী। সেখানকার ৪০ বছর বয়সী নারী কৃষক শ্রীমতী শব্দরানী বলেন, “মাঝে মাঝে আমরা মোটর চালাই কিন্তু কোনো পানি আসে না। আমরা ভাবি হয়তো মোটরটা নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে ভূগর্ভস্থ পানিই নিচে নেমে গেছে।”
ছবি: সংগৃহীতএই সংকট গত বছর একটি চূড়ান্ত মোড় নেয় যখন বাংলাদেশ সরকার রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নাটোর জেলার প্রায় ৫ হাজার গ্রামে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়। আগামী এক দশকের জন্য সেগুলোকে পানি-সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এই সরকারি আদেশ অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ পানি কেবল খাওয়ার জন্য ব্যবহার করা যাবে; সেচ এবং শিল্পের জন্য পানি তোলা নিষিদ্ধ।
অধিকাংশ কৃষকের কাছে এই ঘোষণাটি ছিল বিপর্যয়কর। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই অনেকে বীজ, সার এবং জমি প্রস্তুতের জন্য ঋণ নিয়ে ফেলেছিলেন। গত জানুয়ারি মাসে সরকার নীরবে এই নিষেধাজ্ঞা দুই বছরের জন্য স্থগিত করেছে। তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, এই সাময়িক স্বস্তি সংকটের তুলনায় অত্যন্ত কম।
বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানি সংকট নিয়ে গবেষণা করছে ইউনিলভার্সিটি কলেজ লন্ডনের পানি সংকট ও ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, “কৃষকদের জন্য কোনো স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ নেই। কোনো টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা না করে এভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে গ্রামীণ জনপদে মারাত্মক মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসার ঝুঁকি থাকে।”
উঁচু সমতল ভূমির ওপর বিস্তৃত বরেন্দ্র অঞ্চল সব সময়ই চাষাবাদের জন্য একটি কঠিন এলাকা। এখানকার বৃষ্টিপাত সামান্য এবং অনিয়মিত, আর এই অঞ্চলের ঘন এঁটেল মাটি তাপ ধরে রাখে কিন্তু আর্দ্রতা প্রতিরোধ করে।
১৯৮০-এর দশক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) রাজশাহী ও রংপুর বিভাগজুড়ে প্রায় ১৮ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করে, যা সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কৃষি উৎপাদনে আমূল পরিবর্তন আনতে সাহায্য করেছিল।
এই ব্যবস্থা ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং কৃষকদের বছরজুড়ে চাষাবাদের সুযোগ করে দেয়। তবে এটি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতাও চরমভাবে বাড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে ‘বোরো’ ধান চাষের ক্ষেত্রে। এটি বাংলাদেশজুড়ে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত একটি উচ্চ ফলনশীল শীতকালীন ধান।
আতাউর রহমানের মতো কৃষকদের কাছে এই বৈপরীত্য থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। সেচ ছাড়া ফসল নষ্ট হয়ে যায়—আবার ক্রমাগত পানি তুলতে থাকলে কৃষির ভবিষ্যৎই হুমকির মুখে পড়ে। তিনি বলেন, “এভাবে পানি তুলতে আমাদেরও খারাপ লাগে। কিন্তু আমাদের আর কী উপায় আছে? সেচ ছাড়া আমরা চাষ করতে পারব না, আর চাষ না করলে আমরা বাঁচব না।”
আতাউর আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো আর কৃষির ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকতে পারবে না। তার কিশোর ছেলেটি সম্প্রতি মাধ্যমিক পাস করেছে। আতাউর মনে-প্রাণে চান তার ছেলে যেন এই মাটির সাথেই যুক্ত থাকুক, তবুও তিনি ছেলেকে কম্পিউটারের দক্ষতা বাড়াতে এবং কৃষির বাইরে অন্য পেশা খোঁজার জন্য উৎসাহিত করছেন।
বরেন্দ্র অঞ্চলের নারীদের জন্য এই পানি সংকট শ্রমের ক্লান্তিকর বোঝাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শব্দরানীর দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার আগে আর শেষ হয় গভীর রাতে। মাঠ ও ঘরের কাজের মধ্যে তাকে প্রতিনিয়ত ছুটতে হয়। তার কাজের মধ্যে রয়েছে ধানের চারা রোপণ করা, মাটি বহন করা, গবাদি পশুর যত্ন নেওয়া, সেই সাথে রান্না করা এবং সন্তানদের দেখভাল করা।
তার পরিবার নিজেদের এবং বর্গা নেওয়া জমিতে ধান, ভুট্টা, ডাল, সরিষা ও শাকসবজি চাষ করে এবং বাড়তি আয়ের জন্য হাঁস, মুরগি ও গরু পালন করে। কিন্তু তিনি জানান, সেচের খরচ বৃদ্ধি এবং ফলন কমে যাওয়ায় চাষাবাদ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
শব্দরানী বলেন, “আগে এক ঘণ্টা সেচের পানির দাম ছিল ৯০ টাকা। এখন সেটা হয়েছে ১২০ টাকা। সারের দাম বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। কিন্তু ফসলের উৎপাদন কমে গেছে।”
পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষকেরা এখন কম পানি লাগে এমন ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু তারপরেও সেচ ব্যবস্থা এখনো অনিশ্চিত। কৃষকেরা প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে ঘণ্টার হিসাবে গভীর নলকূপ থেকে পানি কেনেন, কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমে যাওয়ায় তারা আগের চেয়ে অনেক কম পানি পাচ্ছেন। ২৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আসিফ বলেন, “এখন বেশি টাকা দেওয়ার পরও কম পানি বের হয়।”
পাশের গ্রামগুলোর অনেক যুবক ইতিমধ্যেই কাজের খোঁজে ঢাকা বা অন্যান্য শহরে চলে গেছেন। আসিফের সবচেয়ে বড় ভয় তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই যুবক বলেন, “আমার ছেলের বয়স যখন ২০ বছর হবে, ততদিনে এই জমি মারাত্মকভাবে বদলে যাবে। মাঝে মাঝে আমার ভয় হয়, পানির জন্য সংগ্রাম এতটাই নির্মম রূপ নেবে যে মানুষ হয়ত এটা নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।”
এই ভয় এবং হতাশার কারণেই গবেষক ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো এই অঞ্চলে তাদের তৎপরতা বাড়াচ্ছে। উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক, গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপ্টেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট-এর যৌথ পরিচালনায় একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, হ্রাসমান বৃষ্টিপাত এবং বোরো ধানের অতিরিক্ত চাষ এই অঞ্চলকে আগামী দুই দশকের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির চরম শূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীতএর প্রতিক্রিয়ায়, ব্র্যাক দুই হাজার ৪০০-এর বেশি কৃষককে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং পানি-সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এই পদ্ধতিতে ধানের জমি সবসময় পানিতে ডুবিয়ে না রেখে কয়েক দিন শুকানো হয় এবং তারপর আবার পানি দেওয়া হয়, যা ফসলের ক্ষতি না করেই পানি সাশ্রয় করে।
সিন্ধুকাই গ্রামের একটি ছোট উঠানে এক রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে প্রায় ২০ জন কৃষক গাছের নিচে গোল হয়ে বসে ব্র্যাক কর্মীদের তথ্যমূলক আলোচনা শুনছিলেন।
ব্র্যাকের পানি, স্যানিটেশন এবং হাইজিন কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ আলী সেই দলকে বলেন, “জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে টিকে থাকতে হলে শুধু পানির ব্যবস্থা করলেই চলবে না। এর জন্য আমাদের এমন চাষাবাদ করতে হবে যাতে পানি কম লাগে, এমন ফসল বুনতে হবে যা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও নষ্ট হয় না এবং এলাকার মানুষ যাতে মিলেমিশে পানি ব্যবহার ও ধরে রাখতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”
মোহাম্মদ আলী আরও বলেন, “যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নারীদের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রাখতে হবে, কারণ পানির সংকটের সবচেয়ে ভারী বোঝা তারাই বহন করেন। লিঙ্গ-সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করা অপরিহার্য যাতে সমান অধিকার নিশ্চিত করা যায় এবং সবার অংশগ্রহণে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।”
অনেক কৃষকের কাছে এই সংকটের সমাধান মাটির নিচে নয়, বরং মাটির ওপরেই রয়েছে যেমন-বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, জলাভূমি পুনরুদ্ধার করা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখার জন্য পুকুর খনন করা। শব্দরানী বলেন, “পুকুরগুলো যদি আরও গভীর করে খনন করা হতো, তবে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য বৃষ্টির পানি জমা রাখা যেত। কিন্তু পানি সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ আমি দেখছি না।”
সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য ভূগর্ভস্থ পানির এই সংকটের তীব্রতা স্বীকার করেছেন এবং চাষাবাদ অব্যাহত রাখতে বিকল্প সেচ ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছেন বলে জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই সংকটের কারণে ২৫ লাখ হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি অনাবাদী থেকে যেতে পারে, যা শস্য উৎপাদন ২৭ লাখ টন কমিয়ে দিতে পারে। যে পরিবারগুলো ইতিমধ্যেই জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং বারবার জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় বিপর্যস্ত, তাদের জন্য এই অবস্থা ঋণ বাৎ ঋণগ্রস্ততা বাড়াবে, স্থানান্তর বা অভিবাসনকে তরান্বিত করবে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে আরও তীব্র করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ কেবল ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ করা নয়; বরং সেই কৃষক সমাজকে বাঁচিয়ে রেখে এটি করা, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মাটিতে ফসল ফলাচ্ছেন এবং যাদের বেঁচে থাকা সম্পূর্ণভাবে এর ওপরই নির্ভরশীল।