ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণ

কতটুকু সংস্কার করতে পারল অন্তর্বর্তী সরকার?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কতটুকু সংস্কার করতে পারল অন্তর্বর্তী সরকার?
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ফাইল ছবি

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণের জীবনে প্রথমবারের মতো একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ এটি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন এই নির্বাচন নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

কিনের দীর্ঘ লেখাটির দ্বিতীয় অংশে আলোচিত হয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও এর নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের বিষয়টি। বিশ্লেষণটির হুবহু অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:  

সংস্কারের প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বীই। সরকারের জনপ্রিয়তাও ছিল যথেষ্টই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ঔজ্জ্বল্য কিছুটা ম্লান হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সহযোগীরা বড় ধরনের কিছু সাফল্য অর্জন করেছেন। যার মধ্যে আছে হাসিনার আমলে টালমাটাল হয়ে পড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। এছাড়াও সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে উত্তরণকালীন পথরেখা নিয়ে একটি ঐকমত্য ধরে রাখা। যদিও সেই ঐকমত্য খুব টেকসই নয়, তবুও।

সংস্কারের ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো ‘জুলাই সনদ’ খসড়া প্রণয়ন তদারকি করা। দেশের সব রাজনৈতিক দল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হলেও, ঠিক কোন পদক্ষেপে সেটি হবে, কোনটির পর কোনটি আসবে—সে বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ ছিল। তার পরেও, নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া সব দলের সমর্থন আদায় করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল; কারণ এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার উপদেষ্টা পরিষদ এক্ষেত্রে সফল হলেও কিছু ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা থেকেই গেছে।

জুলাই সনদ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, ইউনূস সরকারের সংস্কার কমিশন গঠন করেন। কয়েক মাস পর কমিশনগুলো তাদের সুপারিশ জমা দেয়। সেই সুপারিশগুলো থেকে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হয়।  একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করা হয়। সেই কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কোন নীতিগুলো গ্রহণ করা হবে তা নির্ধারণ করবে বলে ঠিক হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আশা করেছিল রাজনৈতিক দলগুলো ২০২৫ সালের আগস্টের শুরুতে, হাসিনা সরকারের পতনের বর্ষপূর্তিতে এই সনদে সই করবে। কিন্তু বিষয়বস্তু ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের কারণে সেই অনুষ্ঠান পিছিয়ে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৫টি দল এতে সই করে।

চূড়ান্ত ‘জুলাই সনদে’ মোট ৮৪টি প্রস্তাব আছে। যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংক্রান্ত। যারা এই প্রস্তাবগুলো তৈরি করেছেন, তাদের যুক্তি হলো, এই প্রস্তাবগুলো প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনকে সঠিক পথে রাখতে এবং অন্তর্বর্তী সময়ে গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, সংসদে বিরোধী দলের তদারকি ভূমিকা শক্তিশালী করা, সংবিধানে কোনো একটি দলের সংশোধনী আনার বিষয়টি কঠিন করে তোলা (সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যতই হোক না কেন) এবং বিচারক নিয়োগে দলীয় প্রভাব কমানো। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) প্রায় পাঁচটি দল জুলাই সনদে সই করতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে এনসিপি-র আপত্তি সনদের বিষয়বস্তু নিয়ে নয় বরং এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে; পরবর্তীকালে অবশ্য দলটি জানিয়েছে যে তারা এই সংস্কারগুলোকে সমর্থন করবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সনদে সই করা কিছু দল—বিশেষ করে বিএনপি—সনদের কিছু পয়েন্টে ‘ভিন্নমত’ বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। ফলে তারা নির্বাচিত হলে ওই নির্দিষ্ট সংস্কারগুলো এগোবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিএনপি অন্তত নয়টি ধারায় আপত্তি জানিয়েছে, যার মধ্যে সংসদের নতুন উচ্চকক্ষে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’বা প্রোপরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন’ পদ্ধতি চালুর বিষয়টিও রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস

অন্তর্বর্তী সরকার এক্ষেত্রে এক ধরনের বিকল্প পথ খুঁজে নিয়েছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তারা একটি ‘বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে, যেখানে পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদের ওপর একটি গণভোট আয়োজন করা। এই আদেশটি বিএনপি (ও তাদের কিছু মিত্র) এবং সনদে সই করা অন্যান্য দলের দাবির মধ্যে একটি মাঝামাঝি অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো গণভোটের প্রশ্নটি এমনভাবে সাজানো যাতে এটি জয়ী হলে বিএনপির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও নতুন উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়। এর ফলে যে দলই নিম্নকক্ষ নিয়ন্ত্রণ করুক না কেন, উচ্চকক্ষে কোনো সংশোধনী পাস করতে তাদের অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। পুরো বিষয়টিই শেখ হাসিনার কর্মপদ্ধতির ঠিক উল্টো। হাসিনা ২০০৮ সালের ভূমিধস জয়ের পর কোনো আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো করেছিলেন।

সংস্কারের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাবে বাধ্য হয়ে শামিল হতে হয়েছে বিএনপিকে। তাই দলটি কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেও তারা জানিয়েছে যে, গণভোটে তাদের অবস্থান ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেই। বিএনপি কোনোভাবেই নিজেদের ‘সংস্কার-বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত হতে দিতে চায় না। একই সঙ্গে ড. ইউনূস এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। এমনকি এই গণভোট যদি ব্যর্থও হয়, তবুও বিজয়ী রাজনৈতিক দলটির ওপর ‘জুলাই সনদ’-এর যতটুকু তারা সমর্থন করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের চাপ থাকবে। রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে বিএনপির নিজস্ব একটি ৩১-দফা পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে জুলাই সনদের বেশ কিছু মূল বিষয় আছে; ফলে যে অবস্থাই হোক না কেন, সংবিধানে কিছুটা পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা প্রবল। তবে অনেক পর্যবেক্ষকই সন্দিহান যে, এই সংস্কারগুলো শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা গুণগত পরিবর্তন আনবে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা সব সময়ই সংস্কার বা পরিবর্তনের উদ্যোগ থেকে সরে আসে।

অন্তর্বর্তী সরকার নিজেও কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, যদিও তার ফলাফল মিশ্র। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় ব্যাংকিং খাতে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে, যা ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারা লুটপাটের শিকার হয়েছিল। এছাড়া কয়েকটি বন্দরের পরিচালনা চুক্তি বড় বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দেওয়া হয়েছে, যা লজিস্টিক বা পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার বাধা দূর করতে সহায়ক হতে পারে। পরবর্তী সরকারকে স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা, পোশাক শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা (যা মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ) কমিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা টেকসই ও নিশ্চিত করতে বিচারক নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের মতো কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসন।

দায়িত্ব পালন করছেন র‍্যাব সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত
দায়িত্ব পালন করছেন র‍্যাব সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

তবে অনেক জায়গাতেই সংস্কারের অগ্রগতির চিত্রটা আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষ গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার এখনো হয়নি। হাসিনা সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতায় লিপ্ত পুলিশ বাহিনী এখনো জনগণের আস্থা ফিরে পায়নি। পুলিশের এই দুর্বল নৈতিক অবস্থানের সুযোগে দেশজুড়ে মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে, যেখানে সেখানে সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে; অথচ এসব ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি দেওয়া বা জবাবদিহির বিষয়টি তেমন দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-এর মতো যেসব নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে হাসিনা আমলে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল, সেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে কর্মকর্তাদের বিচারের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে।

কিছু সংস্কার উদ্যোগ আবার পুরোপুরি থমকে গেছে। রক্ষণশীল ইসলামপন্থী দলগুলোর সমালোচনার মুখে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের খুব কম সুপারিশই গৃহীত হয়েছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধানও অভিযোগ করেছেন যে, তাদের দেওয়া ১০০টিরও বেশি সুপারিশের একটিও সরকার কার্যকর করেনি। এই ব্যর্থতা কি একই সময়ে অসংখ্য ইস্যু সামলানোর সীমাবদ্ধতা থেকে নাকি জনরোষ বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধা কাটিয়ে ওঠার সাহসের অভাব সেটিও স্পষ্ট নয়। তবে এখন  বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এমন ধারণা জোরালো যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের অনেক লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতিই পূরণে ব্যর্থ হয়েছে পুরোপুরি।

সম্পর্কিত