ads

চীনের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হলে বাংলাদেশের ঝুঁকি কী?

তারেক রহমানের চীন সফরের পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে। একসময় দ্রুত এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন চাপে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি শক্তিশালী করতে চীনের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
চীনের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হলে বাংলাদেশের ঝুঁকি কী?
ছবি: পিএমও থেকে নেওয়া

সম্প্রতি চীন সফরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঝলমলে রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা, গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ধারাবাহিক বৈঠক, ১৭টি সমঝোতা স্মারক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিস্তৃত ঘোষণা নিয়ে দেশে ফিরেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এটিই ছিল তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। চীনের আগে তিনি অবশ্য মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশি ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত চীনে তারেক রহমানের সফর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর মাইকেল কুগেলম্যান মার্কিন জার্নাল ফরেন অ্যাফেয়ার্সের এক নিবন্ধে লিখেছেন, প্রথম দেখায় এই সফরকে সাধারণ কূটনৈতিক সফর বলে মনে হতে পারে। কারণ চীন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারী। তবে এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক সফর নয়। এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে বলে মনে করেন তিনি। কারণ ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর চীন ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীন তাদের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তবে এবার তারেক রহমানের সফরে দুই দেশ জানিয়েছে, তারা এই সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গড়ে তুলতে চায়।

তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে সি চিনপিং বলেছেন, “চীন সবসময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং ভালো অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।”

চীনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, “বৈশ্বিক পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সামগ্রিক দিকনির্দেশনার প্রতি চীন তার অঙ্গীকার থেকে কখনোই বিচ্যুত হবে না।”

সফরে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং চীনের কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের বিষয়ে সহযোগিতা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের দুর্বল বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালুরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সাধারণত খুব ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যেই এমন ব্যবস্থা থাকে বলে উল্লেখ করেছেন কুগেলম্যান। আরেকটি সমঝোতায় বাংলাদেশের স্কুলে চীনা ভাষা মান্দারিন শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে চীন বাংলাদেশে নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রভাবও বাড়াতে চায় বলে মনে করেন তিনি।

চীন আরও জানিয়েছে, তারা ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (এসসিও) বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার প্রচেষ্টায় সমর্থন দেবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

অন্যদিকে, চীনকে বাংলাদেশের এক মূল্যবান ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের শক্তিশালী নেতৃত্বে চীন উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন অর্জন করেছে এবং চীনের আধুনিকায়ন থেকে বাংলাদেশের শেখার রয়েছে।

তারেক রহমান ‘এক চীন নীতি’-এর প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন।

কুগেলম্যান বলেন, এই অগ্রগতি অনেকের কাছে বিস্ময়কর। কারণ ধারণা করা হচ্ছিল, নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। বিএনপির অনেক নেতাও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। এতে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সীমান্ত নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কাজ করা সহজ হতো।

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের চীন সফরের পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে। একসময় দ্রুত এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন চাপে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি শক্তিশালী করতে চীনের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বের বড় শক্তি হিসেবে চীন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এত দ্রুত তারেক রহমানের চীন সফর প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।

কুগেলম্যান বলেন, দেশের জনগণের মধ্যেও চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব এবং ভারতের প্রতি অসন্তোষ তুলনামূলক বেশি। তাই সরকার গঠনের পরপরই চীন সফর রাজনৈতিকভাবেও তারেক রহমানের জন্য লাভজনক হয়েছে। এই সময়ে ভারত সফর করলে রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারত।

তার মতে, এই সফর ভারতের জন্য কিছুটা হতাশার। কারণ দিল্লি মনে করেছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা সহজ হবে। ভারতের কাছে জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় বিএনপি বেশি গ্রহণযোগ্য। ভারতও নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু চীন সফর দেখিয়ে দিল, বিষয়টি এত সহজ হবে না।

ফরেন অ্যাফেয়ার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সফর বাংলাদেশের জন্যও কিছু ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নতুন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেছে। এর অর্থ হলো কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে শুধু বাংলাদেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা। কিন্তু বাংলাদেশ যদি চীনের খুব কাছাকাছি চলে যাচ্ছে বলে ধারণা তৈরি হয়, তাহলে সেই নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

কুগেলম্যান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে আসছে। যদিও শেখ হাসিনার সময় ভারতমুখী অবস্থান ছিল স্পষ্ট। এখন নতুন সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে সেই জোটনিরপেক্ষ নীতিকে আবারও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার।

সম্পর্কিত