ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সম্প্রতি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রায় তিন বছরের যুদ্ধের পর গাজা উপত্যকার অবশিষ্ট অংশে নতুন ইহুদি বসতি স্থাপনের বিষয়টি তারা বিবেচনা করছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
গত সোমবার স্মোট্রিচ সাংবাদিকদের জানান, তার মন্ত্রণালয় উত্তর গাজায় তিনটি নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। এখন শুধু প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অনুমোদনের অপেক্ষা।
পরদিন নেতানিয়াহু ডানপন্থী এক টেলিভিশন চ্যানেলে (চ্যানেল ১৪) এক সাক্ষাৎকারে গাজায় নতুন বসতি স্থাপনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান।
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রশ্ন হলো, আপনি কাজ করতে চান, নাকি শুধু কথা বলতে চান। আমি এ বিষয়ে মন্তব্য না করতেই পছন্দ করছি।”
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বসতির বৈধতা
বর্তমানে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের যে বসতিগুলো রয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ।
গাজায় ভবিষ্যতে বসতি স্থাপনের সম্ভাবনার পাশাপাশি নেতানিয়াহু সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় স্থানান্তরের’ কথাও বলেছেন। তবে আন্তর্জাতিক আইনের বহু বিশেষজ্ঞ এই ধারণাকে জাতিগত নির্মূল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এদিকে গাজার যুদ্ধে ইসরায়েল ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ-সমর্থিত বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন, গাজায় বেঁচে থাকা মানুষের ওপর পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েল বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে বা তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরিকল্পনা কতদূর এগিয়েছে?
বাস্তবে গাজায় নতুন বসতি স্থাপনের প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা ও ২১টি বসতি প্রত্যাহার করে। এরপর থেকে সেখানে আর কোনো ইসরায়েলি বসতি নেই।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা। ছবি: রয়টার্সবর্তমানে উত্তর গাজার বিশাল এলাকা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু আবাসিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় বসতি-সমর্থকেরা এই এলাকাকে ভবিষ্যৎ বসতি স্থাপনের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করছেন।
নির্বাচনের রাজনীতি
ইসরায়েলে নির্বাচন সামনে থাকায় স্মোট্রিচ ও নেতানিয়াহুর মতো রাজনীতিকদের জন্য গাজায় বসতি স্থাপনের ইঙ্গিত রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নেভে গর্ডন বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলের জনপরিসরে চরমপন্থী বক্তব্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তার ভাষায়, ইসরায়েলের অনেক মানুষ গাজায় প্রকৃত ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক সংকট সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পান না।
তিনি বলেন, “স্মোট্রিচের বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। গাজায় পুনরায় বসতি স্থাপনের পক্ষে ইসরায়েলের রাজনীতির একটি বড় অংশে ধারাবাহিক চাপ রয়েছে।”
দীর্ঘদিনের লক্ষ্য
২০০৫ সালে গাজা থেকে প্রত্যাহারের পর থেকেই কট্টরপন্থী ধর্মীয় ইসরায়েলিরা সেখানে পুনরায় বসতি স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
চরমপন্থী বসতি-সমর্থক সংগঠন নাহালা যুদ্ধ চলাকালেই ‘বসতি নিরাপত্তা ও বিজয় নিশ্চিত করে’ শীর্ষক সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে স্মোট্রিচসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী অংশ নেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও স্মোট্রিচের দল রিলিজিয়াস জায়োনিজম জনমত জরিপে প্রত্যাশিত সমর্থন পাচ্ছে না। ফলে গাজা ইস্যু সামনে এনে তিনি ডানপন্থী ভোট আরও সংহত করার চেষ্টা করতে পারেন।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাব
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানও জটিল।
তিনি বর্তমানে একাধিক দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি। একই সঙ্গে ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত না করার কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্সরাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গের মতে, নির্বাচনের আগে নিজেকে আরও দৃঢ় ডানপন্থী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে নেতানিয়াহু গাজায় বসতি স্থাপনের ইঙ্গিত ব্যবহার করতে পারেন।
তার মতে, বর্তমানে ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতিতে গাজায় নতুন বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিরোধিতা খুবই সীমিত।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কি যথেষ্ট হবে?
গাজায় বসতি স্থাপন করলে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কী হবে—সেটিও বড় প্রশ্ন।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইসরায়েলকে অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার সুযোগ দেয়।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (ইসিএফআর) গবেষক হিউ লাভাট বলেন, ২০২৩ সালের পর পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যদিও এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা হয়েছে, বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপ ছিল খুবই সীমিত।
তার মতে, গাজায় একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে তিনি মনে করেন, গাজায় নতুন বসতি স্থাপনের চেষ্টা হলে ইউরোপীয় দেশগুলো আগের তুলনায় আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
গাজায় নতুন ইহুদি বসতি স্থাপনের বিষয়ে ইসরায়েল সরকারের কিছু নেতার প্রকাশ্য বক্তব্য এ ধরনের পরিকল্পনার রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
এ কারণে বিষয়টি এখনো মূলত রাজনৈতিক আলোচনা ও সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে। এটি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক চাপের ওপর।