সিএনএনের বিশ্লেষণ

তরুণদের ‘বিপ্লব’ বনাম পুরনো রাজনীতির ‘আধিপত্য’

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
তরুণদের ‘বিপ্লব’ বনাম পুরনো রাজনীতির ‘আধিপত্য’
জুলাই ছাত্র আন্দোলন। ছবি: রয়টার্স

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার ‘স্বৈরাচারী সরকারের’ পতনের পর এটাই প্রথম নির্বাচন। জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে এক গণঅভ্যুত্থানের ফলে সম্ভব হয়েছিল এই পতন। লাখো তরুণের স্বপ্ন ছিল, এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের এক নতুন যাত্রা শুরু হবে।

২০২৪ সালের আগস্টে বিক্ষোভকারীরা গণভবনে ঢুকে পড়ার ঠিক আগ মুহুর্তে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এই দৃশ্য তখন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আর এই ঘটনা নেপাল ও মাদাগাস্কারে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে সরকার পতনের আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে।

হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান হওয়ায় অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তার এই দীর্ঘ শাসনামলের বিরুদ্ধে রয়েছে নির্বাচন জালিয়াতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট অভিযোগ ও ভিন্নমত দমনের অভিযোগ।

শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী মির্জা শাকিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, “এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে, জেন জি চাইলে কী অর্জন করতে পারে।”

তবে, হাসিনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দুই প্রার্থীর কেউই সেসব তরুণদের মধ্যে থেকে কেউ নয়, যারা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিল।

তাদের মধ্যে একজন এক রাজনৈতিক পরিবারের ৬০ বছর বয়সী উত্তরসূরি, যারা কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। অন্যজন ৬৭ বছর বয়সী একজন ইসলামপন্থী নেতা, যার দল এবারের নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরেকজন সাবেক আন্দোলনকারী সাদমান মুজতবা রাফিদ বলেন, “আমরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে লিঙ্গ, জাতি বা ধর্ম নির্বিশেষে সবার সমান সুযোগ থাকবে। আমরা নীতিগত পরিবর্তন ও সংস্কারের আশা করেছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে।”

এবারের নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ যে কারণে

সিএনএন বলছে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার পতনের সূচনা। এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় তার সরকার যে ‘নির্মম ও রক্তাক্ত দমন-পীড়ন’ চালায়, তা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে এবং এক পর্যায়ে মানুষ রাজপথে নেমে আসে।

দ্রুতই এই বিক্ষোভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী যখন জানায়, তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাবে না, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, হাসিনার শাসনের অবসান ঘটেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ে, দেয়াল ভেঙে ফেলে এবং ভেতরের আসবাবপত্র লুট করে। এর ফলে তিনি ভারতে গিয়ে নির্বাসনে থাকতে বাধ্য হন।

গত নভেম্বরে ঢাকার একটি আদালত শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এই আন্দোলনে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে এখন বাংলাদেশ ও ভারত–এই দুই দেশের মধ্যে চলছে টানাপোড়েন। বাংলাদেশ তার বিরুদ্ধে করা অপরাধের বিচারের জন্য তাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে তিনি দাবি করছেন, এসব অপরাধ করেননি। মানবতাবিরোধি অপরাধের দায়ে আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে তার দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা এবং তার দলের অনুপস্থিতি তাদের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্য সুফল বয়ে এনেছে। দলটির নেতা তারেক রহমান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রয়াত খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে বাংলাদেশে ফিরেছেন এবং নির্বাচনে জয়ের পথে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বলে মনে হচ্ছে।

পুরনো ধারার দলগুলোর মধ্যে আরেকটি দল জামায়াতে ইসলামীও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর কোণঠাসা থাকার পর দেশের বৃহত্তম এই ইসলামপন্থী দলটি পুনরায় চাঙ্গা হয়ে উঠছে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক

এদিকে, অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দ্বারা গঠিত রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ (এনসিপি) বাংলাদেশের ভঙ্গুর ও সহিংস রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষদিকে তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের ঘোষণা দিয়ে অনেককে চমকে দিয়েছে।

তবে এনসিপি এই জোট মূলত নিজেদের সুরক্ষার তাগিদেই করেছে বলে মনে করেন লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক নাওমি হোসেন। তিনি সিএনএনকে বলেন, এনসিপির অনেকেই আছেন জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে যাদের সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যাবে।

নাওমি হোসেনের মতে বাংলাদেশের ‘সহিংস রাজনৈতিক পটভূমিতে’পার্লামেন্টে অবস্থান বা সদস্যপদ একটি সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে। এই সদস্যপদ না থাকলে, নেতারা তাদের প্রতিদ্বন্দীদের সামনে ‘অত্যন্ত অরক্ষিত’ হয়ে পড়তে পারেন।

প্রার্থী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর একের পর এক সহিংস হামলায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় সমালোচনার মুখে পড়েছে।

আর এই অস্থিরতা অভ্যুথানের ছাত্র-জনতার প্রাথমিক আশা-আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী নাজিফা জান্নাত বলেন, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) “সংস্কার, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও আরও অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।” কিন্তু যে দল (জামায়াত) একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি, তাদের সঙ্গে জোট করাটা এক ধরণের বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক

তিনি একে একটি ‘লজ্জাজনক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “আমরা তাদেরকে জানিয়েছি, এটি আমাদের জন্য কতটা অপমানজনক।”

তা সত্ত্বেও, অনেকেই ১২ ফেব্রুয়ারিরর এই ভোটকে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলে অভিহিত করছেন। আর ঢাকার রাস্তায় মানুষের মধ্যে এক ধরণের প্রবল প্রতীক্ষা ও উত্তেজনা কাজ করছে।

সাবেক বিক্ষোভকারী শাকিল সিএনএনকে বলেন, “এই নির্বাচন নতুন কিছু বয়ে আনতে পারে। তাই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আমরা খুবই আগ্রহী”

সম্পর্কিত