চরচা ডেস্ক

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে যে বিকল্পগুলো রয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই তাকে দ্রুত ও নিষ্পত্তিমূলক বিজয় এনে দেবে না। এমনটাই লিখেছেন সিএনএনের বিশ্লেষক স্টিফেন কলিনসন। তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদের ম্যারাথন আলোচনা থেকে উভয় পক্ষই একে অপরকে ‘অনমনীয়’ বলে অভিযুক্ত করে চলে গেছে। এই অচলাবস্থা ট্রাম্পের একটি মূল বিশ্বাসকেই চ্যালেঞ্জ করছে, যে বিশ্বাস হলো–মার্কিন সামরিক শক্তি যেকোনো প্রতিপক্ষকে নতি স্বীকার করাতে পারবে। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তার কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে রাজি নয় এবং যুদ্ধে নিজের পরাজয়ের মার্কিন দাবিও মানছে না।
হোয়াইট হাউস রোববার মার্কিন দাবির তালিকা প্রকাশ করেছে, যা ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং গত বছর মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে দেওয়া। পারমাণবিক কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন রোধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা ৪০০ কেজিরও বেশি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার নিশ্চিত করতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। এ ছাড়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানকে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতিদের অর্থায়ন বন্ধ এবং টোলমুক্ত নৌচলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কলিনসনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো যুক্তিসংগত কৌশলগত দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ এই দাবিগুলো পূরণে ট্রাম্পের সক্ষমতা আসলে কতটা বাড়িয়েছে।
হরমুজ অবরোধের ঘোষণা ও তার যুক্তি
রোববার সন্ধ্যায় ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। লক্ষ্য দুটি–ইরানের তেল রাজস্বের শ্বাসরুদ্ধ করা এবং ইরানের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি তেল ট্যাংকারগুলোর নিরাপদ যাত্রার জন্য শুল্ক আদায় করে রাজস্ব বাড়ানোর তেহরানের পরিকল্পনাও নস্যাৎ করা। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই অবরোধকে বর্ণনা করেছেন–সব ভেতরে, সব বাইরে। পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া শত শত তেল ট্যাংকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা মিত্র দেশের ক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম নয়– সব অথবা কিছুই নয়। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি বন্দরে প্রবেশ ও বাহির হওয়া সব যানবাহনের ক্ষেত্রে এই অবরোধ প্রযোজ্য হবে। তবে ইরানি বন্দরে যায় না এমন জাহাজের চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না।
তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও মার্কিন অর্থনীতিতে চাপ
কলিনসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অবরোধের ঘোষণার সাথে সাথে তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮ শতাংশ বেড়ে ১০৪ ডলারে পৌঁছেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্পের সংকল্পের পরীক্ষা নেবে। আমেরিকানরা ইতিমধ্যে খাদ্য ও আবাসনের উচ্চমূল্যে বিরক্ত এবং এখন গ্যালনপ্রতি গড়ে ৪ ডলারের বেশি দিয়ে পেট্রল কিনছেন। তেলের মূল্যবৃদ্ধি মার্চে মূল্যস্ফীতি ফেব্রুয়ারির ২.৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৩ শতাংশে নিয়ে গেছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় পেট্রলের দাম একই থাকতে পারে বা সামান্য বাড়তে পারে।
অবরোধের ঝুঁকি ও কূটনৈতিক জটিলতা
কলিনসন তার বিশ্লেষণে অবরোধের একাধিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ইরান যদি টোল দিতে রাজি হয়–এমন জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে মার্কিন বাহিনী সচেষ্ট হয়, তাহলে চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সাথে কূটনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হবে। আগামী মাসে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে শীর্ষ বৈঠক করার কথা। যা ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের কারণে একবার পিছিয়ে গেছে। সেই বৈঠকে ট্রাম্প উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। দ্বিতীয়ত, ইরানের শর্তে চলাচলকারী সব জাহাজ অবরোধ করা হলে জাপান ও ইউরোপের মতো মিত্রদেশগুলো, যারা উপসাগরীয় তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং যাদের ট্রাম্প এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিমুখ করেছেন– ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তৃতীয়ত, এই অবরোধ মার্কিন জাহাজগুলোকে ইরানি হামলার সামনে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার সিএনএনের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে কীভাবে ইরানকে সেটি খুলতে বাধ্য করা যাবে–তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন, ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি খোলার চেষ্টা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তার যুক্তি হলো, যদি কিছুই না করা হয়, তাহলে ইরানের কাছে আরও বেশি অর্থ আসবে যা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও পারমাণবিক উৎপাদনে ঢালা হবে।

ট্রাম্পের সামনে থাকা বিকল্পগুলো এবং তাদের সীমাবদ্ধতা
কলিনসনের বিশ্লেষণে ট্রাম্পের সামনে থাকা বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রথম বিকল্প হলো, মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলা পুনরায় জোরদার করা। কিন্তু ইতিমধ্যে ইরানের সামরিক ও শিল্প কমপ্লেক্স ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এরপরও আরও হামলা ইরানের নেতাদের নতি স্বীকার করাতে পারবে কি না–তা অনিশ্চিত। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংসের হুমকি কার্যকর করলে সাধারণ নাগরিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং মার্কিন মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি বাড়বে। দ্বিতীয় বিকল্প হলো, সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে ঘোষণা করে আঞ্চলিক প্রত্যাহার। কিন্তু এই বিকল্প দুটি কারণে অকার্যকর– হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কব্জা বহাল থাকবে এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতও অক্ষত থাকবে।
এই বাস্তবতায় হরমুজ অবরোধকে কলিনসন দেখছেন উপকূলীয় মিসাইল স্থাপনায় স্থল সেনা নামানোর উচ্চঝুঁকির পদক্ষেপ ছাড়াই ইরানের নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করার একটি উপায় হিসেবে। তবে এই পদক্ষেপও মার্কিন জাহাজকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
যুদ্ধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ইরানের অবস্থান
কলিনসন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্প যে দ্রুত ও নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধের আশা করেছিলেন–তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং শেষের কোনো আলামত নেই। অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশাল ও ক্রমবর্ধমান–যা ট্রাম্পের ক্ষয়িষ্ণু অনুমোদন রেটিংয়ের জন্য দুঃসংবাদ। ইউরোপীয় মিত্ররা আগাম না জেনে ও না চাওয়া এই যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকার করায় ন্যাটোতে নতুন ফাটল দেখা দিয়েছে। ইরানের রাজনীতিতে এই যুদ্ধ কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সময় এখনো আসেনি।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও আলোচক মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেছেন, এখন আমেরিকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা– তারা ইরানের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, যুদ্ধ একটি নিঃশর্ত সাফল্য এবং হাজার হাজার মিসাইল ও বিমান হামলায় ইরানের নৌ ও বিমান প্রতিরক্ষা ধ্বংস হয়েছে, সামরিক বাহিনী চরম মূল্য দিয়েছে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের একাধিক স্তর নির্মূল হয়েছে। কিন্তু ইরানের ক্রমাগত প্রতিরোধ এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
সহজ শুরু, কঠিন শেষ
স্টিফেন কলিনসনের বিশ্লেষণ একটি পরিচিত প্রবাদকে সামনে আনে–বিদেশে যুদ্ধ শুরু করা প্রেসিডেন্টদের জন্য সহজ, থামানো কঠিন। হরমুজ অবরোধ সেই প্রবাদটিকে মিথ্যা প্রমাণ করার ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রচেষ্টা। কিন্তু এই পদক্ষেপ সফল হলেও তার মূল্য ভারিই হবে। আর মার্কিন অনুমোদিত যুদ্ধের দীর্ঘায়িত চরিত্র, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মিত্রজোটে ফাটল এবং ইরানের হরমুজ কর্তৃত্বের বাস্তবতা–এই সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে: এই যুদ্ধের পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আর কত মূল্য দিতে হবে?

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে যে বিকল্পগুলো রয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই তাকে দ্রুত ও নিষ্পত্তিমূলক বিজয় এনে দেবে না। এমনটাই লিখেছেন সিএনএনের বিশ্লেষক স্টিফেন কলিনসন। তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদের ম্যারাথন আলোচনা থেকে উভয় পক্ষই একে অপরকে ‘অনমনীয়’ বলে অভিযুক্ত করে চলে গেছে। এই অচলাবস্থা ট্রাম্পের একটি মূল বিশ্বাসকেই চ্যালেঞ্জ করছে, যে বিশ্বাস হলো–মার্কিন সামরিক শক্তি যেকোনো প্রতিপক্ষকে নতি স্বীকার করাতে পারবে। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তার কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে রাজি নয় এবং যুদ্ধে নিজের পরাজয়ের মার্কিন দাবিও মানছে না।
হোয়াইট হাউস রোববার মার্কিন দাবির তালিকা প্রকাশ করেছে, যা ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং গত বছর মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে দেওয়া। পারমাণবিক কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন রোধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা ৪০০ কেজিরও বেশি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার নিশ্চিত করতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। এ ছাড়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানকে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতিদের অর্থায়ন বন্ধ এবং টোলমুক্ত নৌচলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কলিনসনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো যুক্তিসংগত কৌশলগত দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ এই দাবিগুলো পূরণে ট্রাম্পের সক্ষমতা আসলে কতটা বাড়িয়েছে।
হরমুজ অবরোধের ঘোষণা ও তার যুক্তি
রোববার সন্ধ্যায় ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। লক্ষ্য দুটি–ইরানের তেল রাজস্বের শ্বাসরুদ্ধ করা এবং ইরানের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি তেল ট্যাংকারগুলোর নিরাপদ যাত্রার জন্য শুল্ক আদায় করে রাজস্ব বাড়ানোর তেহরানের পরিকল্পনাও নস্যাৎ করা। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই অবরোধকে বর্ণনা করেছেন–সব ভেতরে, সব বাইরে। পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া শত শত তেল ট্যাংকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা মিত্র দেশের ক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম নয়– সব অথবা কিছুই নয়। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি বন্দরে প্রবেশ ও বাহির হওয়া সব যানবাহনের ক্ষেত্রে এই অবরোধ প্রযোজ্য হবে। তবে ইরানি বন্দরে যায় না এমন জাহাজের চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না।
তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও মার্কিন অর্থনীতিতে চাপ
কলিনসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অবরোধের ঘোষণার সাথে সাথে তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮ শতাংশ বেড়ে ১০৪ ডলারে পৌঁছেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্পের সংকল্পের পরীক্ষা নেবে। আমেরিকানরা ইতিমধ্যে খাদ্য ও আবাসনের উচ্চমূল্যে বিরক্ত এবং এখন গ্যালনপ্রতি গড়ে ৪ ডলারের বেশি দিয়ে পেট্রল কিনছেন। তেলের মূল্যবৃদ্ধি মার্চে মূল্যস্ফীতি ফেব্রুয়ারির ২.৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৩ শতাংশে নিয়ে গেছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় পেট্রলের দাম একই থাকতে পারে বা সামান্য বাড়তে পারে।
অবরোধের ঝুঁকি ও কূটনৈতিক জটিলতা
কলিনসন তার বিশ্লেষণে অবরোধের একাধিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ইরান যদি টোল দিতে রাজি হয়–এমন জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে মার্কিন বাহিনী সচেষ্ট হয়, তাহলে চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সাথে কূটনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হবে। আগামী মাসে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে শীর্ষ বৈঠক করার কথা। যা ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের কারণে একবার পিছিয়ে গেছে। সেই বৈঠকে ট্রাম্প উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। দ্বিতীয়ত, ইরানের শর্তে চলাচলকারী সব জাহাজ অবরোধ করা হলে জাপান ও ইউরোপের মতো মিত্রদেশগুলো, যারা উপসাগরীয় তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং যাদের ট্রাম্প এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিমুখ করেছেন– ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তৃতীয়ত, এই অবরোধ মার্কিন জাহাজগুলোকে ইরানি হামলার সামনে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার সিএনএনের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে কীভাবে ইরানকে সেটি খুলতে বাধ্য করা যাবে–তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন, ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি খোলার চেষ্টা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তার যুক্তি হলো, যদি কিছুই না করা হয়, তাহলে ইরানের কাছে আরও বেশি অর্থ আসবে যা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও পারমাণবিক উৎপাদনে ঢালা হবে।

ট্রাম্পের সামনে থাকা বিকল্পগুলো এবং তাদের সীমাবদ্ধতা
কলিনসনের বিশ্লেষণে ট্রাম্পের সামনে থাকা বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রথম বিকল্প হলো, মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলা পুনরায় জোরদার করা। কিন্তু ইতিমধ্যে ইরানের সামরিক ও শিল্প কমপ্লেক্স ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এরপরও আরও হামলা ইরানের নেতাদের নতি স্বীকার করাতে পারবে কি না–তা অনিশ্চিত। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংসের হুমকি কার্যকর করলে সাধারণ নাগরিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং মার্কিন মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি বাড়বে। দ্বিতীয় বিকল্প হলো, সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে ঘোষণা করে আঞ্চলিক প্রত্যাহার। কিন্তু এই বিকল্প দুটি কারণে অকার্যকর– হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কব্জা বহাল থাকবে এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতও অক্ষত থাকবে।
এই বাস্তবতায় হরমুজ অবরোধকে কলিনসন দেখছেন উপকূলীয় মিসাইল স্থাপনায় স্থল সেনা নামানোর উচ্চঝুঁকির পদক্ষেপ ছাড়াই ইরানের নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করার একটি উপায় হিসেবে। তবে এই পদক্ষেপও মার্কিন জাহাজকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
যুদ্ধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ইরানের অবস্থান
কলিনসন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্প যে দ্রুত ও নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধের আশা করেছিলেন–তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং শেষের কোনো আলামত নেই। অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশাল ও ক্রমবর্ধমান–যা ট্রাম্পের ক্ষয়িষ্ণু অনুমোদন রেটিংয়ের জন্য দুঃসংবাদ। ইউরোপীয় মিত্ররা আগাম না জেনে ও না চাওয়া এই যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকার করায় ন্যাটোতে নতুন ফাটল দেখা দিয়েছে। ইরানের রাজনীতিতে এই যুদ্ধ কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সময় এখনো আসেনি।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও আলোচক মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেছেন, এখন আমেরিকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা– তারা ইরানের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, যুদ্ধ একটি নিঃশর্ত সাফল্য এবং হাজার হাজার মিসাইল ও বিমান হামলায় ইরানের নৌ ও বিমান প্রতিরক্ষা ধ্বংস হয়েছে, সামরিক বাহিনী চরম মূল্য দিয়েছে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের একাধিক স্তর নির্মূল হয়েছে। কিন্তু ইরানের ক্রমাগত প্রতিরোধ এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
সহজ শুরু, কঠিন শেষ
স্টিফেন কলিনসনের বিশ্লেষণ একটি পরিচিত প্রবাদকে সামনে আনে–বিদেশে যুদ্ধ শুরু করা প্রেসিডেন্টদের জন্য সহজ, থামানো কঠিন। হরমুজ অবরোধ সেই প্রবাদটিকে মিথ্যা প্রমাণ করার ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রচেষ্টা। কিন্তু এই পদক্ষেপ সফল হলেও তার মূল্য ভারিই হবে। আর মার্কিন অনুমোদিত যুদ্ধের দীর্ঘায়িত চরিত্র, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মিত্রজোটে ফাটল এবং ইরানের হরমুজ কর্তৃত্বের বাস্তবতা–এই সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে: এই যুদ্ধের পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আর কত মূল্য দিতে হবে?

কলিনসন তার বিশ্লেষণে অবরোধের একাধিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ইরান যদি টোল দিতে রাজি হয়–এমন জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে মার্কিন বাহিনী সচেষ্ট হয়, তাহলে চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সাথে কূটনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হবে। আগামী মাসে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে শীর্ষ বৈঠক করার কথা। যা ইতিমধ্

হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের দূরদর্শিতার অভাব ভয়াবহ অদক্ষতার প্রমাণ। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি পূর্বের অবস্থা ফেরায়নি। কারণ ইরান এখনও চলাচল সীমিত রেখেছে এবং চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে কর আরোপের হুমকি দিয়েছে। এই যুদ্ধ ইরানের নেতাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে, জলপথ নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে সম্ভব।