এস আলম ফিরতে পারে- এমন খবরে গরম হাওয়া বইছে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে। গতকাল রোববার ব্যাংকপাড়া আর গণমাধ্যমে আলোচনায় উঠে আসে চট্টগ্রামভিত্তিক বহুল আলোচিত-সমালোচিত শিল্পগোষ্ঠীটির নাম।
সংসদে ব্যাংক রেজোল্যুশন বিল পাস এবং পরে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) হঠাৎ ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের খবর এস আলম নিয়ে আলোচনায় পালে নতুন করে হাওয়া দেয়।
সংসদে পাস হওয়া বিলে আগের শেয়ারধারীদের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই বিষয়টি সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এস আলম গ্রুপকে কি আবার ব্যাংক খাতে ফিরছে?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ দিয়েই খেলাপি ঋণ ও অনিয়মে দুর্দশাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সরকারি মালিকানার ব্যাংক করা হয়। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।
এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। অন্য চারটির নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম ও তার পরিবারের হাতে।
অভিযোগ আছে, ইসলামী ব্যাংক এক সময় ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ।
এদিকে সোমবার জামায়াত আমির বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সরকারের প্রতি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছেন, “সবকিছু কুক্ষিগত করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে অভ্যুত্থান করার পরে এখন দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংকে নতুন করে অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশটি বিল আকারে হুবহু পাস না করে এতে ১৮ক ধারা যোগ করা হয়। সেটি নিয়েই তৈরি হয় বির্তক।
নতুন ১৮ক ধারার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রেজল্যুশনের অধীন চলে যাওয়া কোনো ব্যাংকে পুরনো শেয়ারধারী বা নতুন আগ্রহী পক্ষকে শর্তসপেক্ষে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ফিরতে হলে, আবেদনকারীকে আলাদা অঙ্গীকারনামায় বলতে হবে, তারা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব অর্থ পরিশোধ করবে, নতুন মূলধন দেবে, বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করবে, আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবে, সরকারের কর ও রাজস্ব দেবে, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবে।
এছাড়া আবেদন মঞ্জুরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। সিদ্ধান্ত হলে তিন মাসের মধ্যে আগের জমা দেওয়া অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের পে-অর্ডার দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
অনুমতি দেওয়ার পর দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকের কার্যক্রম তদারক করবে। এরপর বিশেষ কমিটি গঠন করে শর্ত পালনের বিষয় তদন্ত করা হবে। ব্যর্থতা পাওয়া গেলে অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা যাবে।
ইসলামী ব্যাংকের এমডিকে ছুটিতে পাঠানো, পাস হওয়া বিলের নতুন ধারা- এই দুটো সব মিলিয়ে সন্দেহটা যেন বাড়ছে।
সোমবার দেশের মানি মার্কেটে লেনদেনভিত্তিক নতুন রেফারেন্স রেট চালুর উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা। ইসলামী ব্যাংকের এমডিকে ছুটিতে পাঠানো, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং এর পেছনে কোনো চাপ বা বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে কি না- জানতে চাওয়া হয়।
জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত আইন ও বিদ্যমান রেগুলেশন অনুযায়ী নেওয়া হচ্ছে। ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক ইস্তেকমাল হোসেন বলেন, “এই পদক্ষেপ মূলত সুশাসন নিশ্চিত করার জন্যই নেওয়া হয়েছে।”
সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকি যোগ করেন, গ্রাহকদের আস্থা অটুট রাখা এবং ব্যাংকের প্রতি মানুষের ভরসা বজায় রাখাই এসব সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য।
তবে সাংবাদিকদের মূল প্রশ্ন-এস আলম গ্রুপকে ফেরানোর কোনো প্রক্রিয়া চলছে কি না। এর সরাসরি উত্তর মেলেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে স্পষ্ট করে ‘না’ বলেননি। বরং তারা উল্লেখ করেন, ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের সংশোধনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের মতামত বিবেচনা করা হয়েছে এবং বিষয়টি এখনো পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনের নতুন বিধান বাস্তবে আগের মালিকদের জন্য একটি সহজ পথ তৈরি করে দেয়। বড় অঙ্কের দায় থাকা সত্ত্বেও সীমিত অর্থ দিয়ে পুনরায় নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ-এটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে, বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্ন আরও তীব্র। কারণ, ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনায় অতীতে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার প্রেক্ষাপট রয়েছে। ফলে নতুন আইনের এই ধারা এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ—দুটিকে একসঙ্গে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুশাসন নিশ্চিত করার’ কথা বললেও, একই সময়ে পুরনো মালিকদের ফিরে আসার আইনি সুযোগ তৈরি হওয়ায় দ্বৈত বার্তা যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ সুশাসনের অংশ হতে পারে। কিন্তু মালিকানা প্রশ্নে যদি একই কঠোরতা না থাকে, তাহলে সেই সুশাসন কতটা কার্যকর হবে, সেটাই প্রশ্ন।”
একটি ব্যাংকের এমডিকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত এসেছে ঠিক তখন, যখন নতুন আইন কার্যকর হয়েছে। এটি কেবল কাকতালীয়, নাকি বড় কোনো পরিবর্তনের পূর্বাভাস—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বলছে, যা কিছু করা হচ্ছে, তা দেশ ও ব্যাংক খাতের বৃহত্তর স্বার্থে। কিন্তু বাজারে বার্তা পৌঁছাতে শুধু উদ্দেশ্য নয়, স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন একটি আইনের মাধ্যমে আগের মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়, তখন সংশ্লিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না থাকলে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
তাহলে এস আলম কি ফিরছে? কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো ‘হ্যাঁ’ বলেনি। জোর দিয়ে ‘না’–ও বলতে শোনা গেল না। এদিকে নতুন আইনের ১৮এ ধারা বলছে, ফিরে আসাতে দৃশ্যত কোনো বাধা নেই।