বাংলাদেশের নারী নির্যাতনের কেন্দ্রে কি ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স?

বাংলাদেশের নারী নির্যাতনের কেন্দ্রে কি ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স?
ছবিটি প্রতীকী। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম পুরুষের ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স কীভাবে নারীকে ওয়াইফ ম্যাটেরিয়াল- সাইড চিক বা দেবতুল্য-উচ্ছৃঙ্খল পতিতা–এই দুই শ্রেণিতে দেখে থাকে।

নারীবাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্সের মূলে রয়েছে প্রবল নারীবিদ্বেষ বা মিসোজিনি। এটি মূলত পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণাকেই জোরালো করে এবং নারীদের শরীর ও তাদের যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। আর এ থেকেই শুরু হয় স্লাটশেমিং। কোনো নারী একক হয়ে উঠলে বা ক্ষমতা ও সম্ভাবনায় বিশেষ হয়ে উঠলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে অনেককেই নোংরামো করতে দেখা যায়।

আমরা আগেই বলেছিলাম, মিসোজিনি একজন নারীর ওপর সামগ্রিকভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলে। লিঙ্গবৈষম্য ও নারীবিদ্বেষের কারণে নারীরা শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়া, একই কাজে পুরুষের চেয়ে কম বেতন পাওয়া, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার উচ্চ ঝুঁকি, পারিবারিক নির্যাতন ও সঙ্গীর সহিংসতা, যৌন সহিংসতার শিকার হওয়াসহ পুরুষদের তুলনায় সন্তান লালন-পালনের অতিরিক্ত চাপের কারণে বাড়তি মানসিক চাপে আক্রান্ত হয়।

আমরা যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব স্লাটশেমিং এবং নারীর প্রতি সকল সহিংসতা এখানে কতটা প্রকট।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক নারী নির্যাতনের ডেটা অনুযায়ী গত জানুয়ারিতেই নারীর প্রতি সহিংসতার ৩১টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি ঘটে হত্যার ঘটনা। রয়েছে ১১টি আত্মহত্যার ঘটনাও। আর এসব মিলিয়ে মামলার সংখ্যা মাত্র ১৪।

এই মামলার সংখ্যা জানান দেয়, নারীর প্রতি সহিংসতা এ দেশে কতটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় আমাদের আইন-আদালত ঠিক কতটা ভরসার জায়গা।

এ ক্ষেত্রে একটা উদাহরণ টানা যেতে পারে। গত নারী দিবসে একজন আইনজীবী ধর্ষণের শিকার এক নারীর পক্ষে মামলা লড়বেন জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। সেখানে তিনি তার ক্লায়েন্ট ভিকটিম নারীটির প্রতি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা অন্তত এতটুকু পরিষ্কার করে যে, আজও ধর্ষণের শিকার নারীকেই তার অবস্থান, পোশাক এবং কোনো আচরণ বা নিয়ম ভাঙাকেই ধর্ষণের মূল কারণ বলে মনে করা হয়। মোদ্দাকথা হলো, যে নারী ধর্ষিত হন, তার ধর্ষণের দায় তার। আর যিনি ধর্ষক, তাকে দেওয়া হয় দায়মুক্তি। মনে হয়, ধর্ষক যেন নিতান্তই বাধ্য হয় ধর্ষণ করে বা সুযোগ পেয়ে ধর্ষণ করাই যেন তার জন্য অতি স্বাভাবিক। তাই, নারী ও নারী স্বাধীনতাকেই ধর্ষণের দায় দিয়ে কাঠগড়ায় তুলতে হয় আমাদের দেশের সমাজের এবং আইন ব্যবসায়ীদেরও।

slutshaming
slutshaming

কিছুদিন আগে টিএসসিতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা এখানে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। সেখানে সেহরি করতে বেরিয়ে এক নারী নীপিড়িত হন। ওই ঘটনায়ও সমাজ সেই নারীর দিকেই আঙুল তুলেছিল। কারণ হিসেবে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়িত্বশীল নেটিজেনদের কমেন্টে দেখি ‘ভালো মেয়েরা এত রাতে বাইরে থাকে না’। সুতরাং এত রাতে বাইরে গেলেই নারী খরাপ, মতান্তরে ‘পতিতা’ বলে সাব্যস্ত হয় এই সমাজে এবং তাকে নিপীড়ন করাটা তখন দায়িত্ব বলেই মনে করে পুরুষেরা।

এই মনোভাব যে দিন দিন বাড়ছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ২০২৫ সালে ঘটেছে ৫৬০টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫২৩। ধর্ষণের ঘটনা ২০২৪ সালে ছিল ৪০১, ২০২৫ সালে হয়েছে ৭৪৯। আর নারীর প্রতি যৌন হেনস্তার ঘটনা ২০২৪ সালে ছিল ১৬৬, ২০২৫ সালে হয়েছে ১৯৩টি।

আবার মহিলা পরিষদ বলছে, সারা দেশে গত জানুয়ারি মাসে ১৮৩ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে আট কন্যাশিশুসহ ২০ নারীকে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ, নারীর প্রতি নির্যাতনের সব ক্ষেত্রেই শুধুই এগিয়ে যাওয়া! সেই সাথে তীব্র হচ্ছে নারীবিদ্বেষী মনোভাবের চাষাবাদও।

abuse
abuse

এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী সানজিদা শাহরিয়া বলেন, “এই মানসিকতা আসলে জেনারেশনাল ট্রমার মতো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের পুরুষেরা। আর এ থেকে তৈরি হচ্ছে নারীদের অনিরাপত্তাবোধ। এই অনিরাপত্তাবোধও চলে আসছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে।”

সানজিদা বলেন, “ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স আর বাংলাদেশে নারী নিপীড়নের সম্পর্কটা হলো একটি অদৃশ্য নীলনকশার মতো। এই কমপ্লেক্স সমাজকে একটি সহজ হাতিয়ার দেয়: নারীকে দুভাগে ভাগ করো, এক ভাগকে পূজা করো, আরেক ভাগকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করো। আর এই ভাগ করাটা নির্ভর করে নারীর পোশাক, তার কথা বলা, তার পেশা, তার রাজনৈতিক মতের ওপর। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার পেছনে এই মানসিকতাই দায়ী, যা নারীকে ‘আমাদের’ আর ‘তাদের’–এই দুই কাতারে ভাগ করে নিপীড়নের পথ সুগম করে দিচ্ছে। এই ভাগ করতে শেখানো মানসিকতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে, নারীর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা হয়তো শুধুই স্বপ্ন হয়ে থাকবে।”

এবার আবার তাকানো যাক ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্সের দিকে। খ্রিষ্টান সমাজে ম্যাডোনা এক পবিত্রতার প্রতীক। আর এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যুগে যুগে শিল্পীরা ম্যাডোনাকে এঁকেছেন। তারা সেখানে ম্যাডোনাকে দেখেছেন এক তরুণী কুমারী মা হিসেবে, যিনি নিতান্তই দেবতুল্য। পুরুষের মানসপটে তাদের মা এ রকমই দেবতুল্য জায়গায় অধিষ্ঠিত, যেখানে সানজিদা শাহরিয়ার ভাষায়, তারা তাদের মাকে দেবীজ্ঞানে পূজা করে, সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখে না।

Francesco_Albani_-_Madonna_with_the_Child_and_angels_-_Google_Art_Project
Francesco_Albani_-_Madonna_with_the_Child_and_angels_-_Google_Art_Project

আর এতেই বাধে বিপত্তি। কারণ, এই দেবতুল্য মায়ের মতো নয়–এমন সকল নারীকেই পুরুষ অবচেতনভাবে ভোগ্যপণ্য বা পতিতা হিসেবে দেখে। এই দেখা ভঙ্গিটির কারণেই বাংলাদেশে নারী নির্যাতন-স্লাটশেমিংয়ের সাথে ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স ‘ভীষণভাবে কানেক্টেড’বলে মনে করেন ডা. সানজিদা।

এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, “মা তো ছেলেদের কাছে প্রথম ভালোবাসা, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু যদি মায়ের প্রতি শৈশবে কোনো ঘৃণা তৈরি হয়, তাহলে সেটা অবচেতন মনে থেকে যায়। মনের গভীরে আনডিজলভড ইস্যু হিসেবে থেকে যায়। বড় হয়ে সে এই ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় অন্য নারীকে অবদমন করে, আক্রান্ত করে।”

এই আলোচনায়, ডা. শাহরিয়া কলকাতার বাবু কালচারের কথা বলেন। যেখানে এলিট শিক্ষিত বাবুটি সারাদিন তার স্ত্রীকে স্নেহ, ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে দেখেন, কিন্তু রাত হলে তিনি চলে যান সোনাগাছিতে, যেখানে আছে নৃত্য, সংগীত ও নানান কলায় পারদর্শী বারবণিতা। বিষয়টি অন্যান্য জায়গার তুলনায় এশিয়ার সংস্কৃতিতে অনেকটা বেশি বলে মনে করেন ডা. শাহরিয়া।

সানজিদা শাহরিয়ার মতে, এ ক্ষেত্রে পুরুষের প্রতিও সমাজের দায় আছে। আর তাই তিনি চারটি ধাপে এর সম্ভাব্য সমাধান প্রস্তাব করেন–

অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম: এ সম্পর্কিত সচেতনতা বাড়াতে নারী-পুরুষ–উভয়কে একইসঙ্গে অংশ নিতে হবে এবং এতে পারস্পরিক সংবেদনশীলতা তৈরি হবে।

প্রশিক্ষণ: বিভিন্ন সংগঠন এর দায়িত্ব নিতে পারে। এতে কিছু কার্যকর প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে এই বিষয়গুলো তুলে আনা যেতে পারে।

ভিজিবল সার্ভিস ডেলিভরি: এ ধরনের ভুক্তভোগীদের সহায়তার উদ্দেশে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মতো একটি সেবা চালু করা যেতে পারে। এই নম্বরের মধ্য দিয়ে ভুক্তভোগীদের জন্য সেবা ও সহায়তা দেওয়ার একটা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

জাতীয় নীতিমালা: এ সম্পর্কিত একটি জাতীয় নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে। এ নীতিমালার আওতায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যা লিঙ্গ বৈষম্য এবং এ থেকে উদ্ভুত সকল সংকটকে অন্তর্ভুক্ত করে কাজ করবে।

সম্পর্কিত