Advertisement Banner

বিধানসভা নির্বাচন

যেভাবে আসাম-পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশিদের নিয়ে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে বিজেপি

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যেভাবে আসাম-পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশিদের নিয়ে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে বিজেপি
ছবি: সংগৃহীত

আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও বিদ্বেষমূলক প্রচারের অভিযোগ উঠেছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সংস্থা বেলিংক্যাটের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দলটির একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে মুসলিম ও বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেতিবাচক বার্তা ছড়ানো হয়েছে।

বেলিংক্যাট জানায়, আসামে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈকে নিয়েও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে গুলি করছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, যেখানে ব্যবহৃত ছবিটি সম্পাদিত। গগৈ জানিয়েছেন, তিনি হিন্দু হলেও বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে যান এবং তাদের নিয়ম মেনে চলেন। তবে ভাইরাল হওয়া ছবিতে তাকে মুসলিম টুপি, দাড়ি ও কোরআনসহ দেখানো হয়, যা প্রকৃত নয়।

বেলিংক্যাট ডিসেম্বর মাসে বিজেপির আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ শাখার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ৪৯৯টি পোস্ট বিশ্লেষণ করে। এর মধ্যে ১৯৪টি পোস্ট জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের মধ্যে পড়ে। এসবের মধ্যে ৩১টি পোস্টে স্পষ্টভাবে এআই-নির্মিত ছবি বা ভিডিওর ব্যবহার দেখা গেছে।

বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, আসামে বিজেপির ২৮টি পোস্টে এআই ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে, যার মধ্যে ২৪টিতেই ছিল বিদ্বেষমূলক বার্তা। অন্যদিকে কংগ্রেসের ১৯৪টি পোস্টের মধ্যে ৪১টিতে এআই ব্যবহারের লক্ষণ থাকলেও সেগুলোতে বিদ্বেষমূলক কিছু পাওয়া যায়নি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ১৪টি পোস্টে এআই ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৭টি ছিল বিদ্বেষপূর্ণ। তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫টি পোস্টে এআই ব্যবহারের প্রমাণ থাকলেও সেখানে বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট দেখা যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপির পোস্টগুলোর বড় একটি অংশে বাংলাদেশি বা বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী বা বিদেশি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মোট ৬৬টি পোস্টে এ ধরনের বার্তা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কয়েকটিতে এআই-নির্মিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

কিছু ভিডিওতে এআই-তৈরি দৃশ্যের সঙ্গে বাস্তব সহিংসতার ফুটেজ মিলিয়ে দেখানো হয়েছে, যেখানে মুসলিমদেরকে আসামের জমি দখলকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এসব কনটেন্টে ধর্মীয় পোশাককে পরিচয়ের চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের প্রচার কেবল ভারতের ভেতরেই নয়, বাংলাদেশেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, এসব ভিডিও দ্রুত সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়াতে পারে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ জিসান বলেন, “অমানবিক ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং বাংলাদেশে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে।”

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বার্তায় বাংলাদেশ ইস্যু ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিজেপির পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দলটির আসাম শাখার মুখপাত্র রুপম গোস্বামী বলেন, তারা গগৈকে নিয়ে কোনো এআই-সম্পাদিত ছবি প্রকাশ করেনি। তবে বিতর্কিত ভিডিওর বিষয়ে তিনি বলেন, দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠছে।

ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের অধ্যাপক জয়জিত পাল বলেন, “রাজনীতিতে এখন কনটেন্টের মানের চেয়ে তার প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যা বিশ্বাস করতে চায়, এআই সেটাকেই আরও জোরালোভাবে সামনে আনছে।”

শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি
শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

এদিকে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মেটা ও এক্স—উভয় প্ল্যাটফর্মেরই বিদ্বেষমূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে নীতিমালা রয়েছে। মেটা জানিয়েছে, তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং নীতিমালা লঙ্ঘন হলে ব্যবস্থা নেবে। তবে এক্স এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

গবেষণা সংস্থা দ্য সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের (সিএসওএএইচ) ডেটা বিশ্লেষক জেনিথ খান বলেন, এআই-নির্ভর প্রচার সাধারণত সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকে। এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে সঠিক সময়ে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর, বিশেষ করে যখন মানুষ আবেগপ্রবণ অবস্থায় থাকে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার ঘটনাকে ব্যবহার করে ভারতে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করার চেষ্টা করেছে বিজেপি।

দীপু দাসকে পিটিয়ে হত্যার কয়েকদিন পর, বিজেপির আসাম শাখা একটি ভিডিও পোস্ট করে, যেখানে তার মুখের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়। তবে সেটি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে এমনভাবে দেখানো হয়, যেন তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। ভিডিওটির সঙ্গে লেখা ছিল—“হিন্দুদের বাঁচান”।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পোস্টগুলোতেও মুসলমানদের অপরাধী বা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা গেছে।

কংগ্রেস গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে গৌরব গগৈ ও মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এআই ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে বিজেপির বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করে। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে দুই ব্যক্তিকে কাছ থেকে গুলি করতে দেখানো ভিডিও নিয়েও আরেকটি অভিযোগ করা হয়।

কংগ্রেসের আসাম শাখার মুখপাত্র আমান ওয়াদুদ বলেন, তাদের করা অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তিনি জানেন।

ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি নিয়ে কাজ করা গবেষক ভরত নায়েক বেলিংক্যাটকে বলেন, নতুন ধরনের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোরই দায়িত্ব।

তার ভাষায়, “এই দায়িত্ব থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। এটি সবসময়ই প্রযুক্তিগত সমস্যা।”

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। ছবি: রয়টার্স
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। ছবি: রয়টার্স

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক মেটা এবং এক্স—উভয় প্ল্যাটফর্মেরই বিদ্বেষমূলক আচরণের বিরুদ্ধে নীতিমালা রয়েছে। মেটা ২০২৪ সালে ঘোষণা দেয়, তারা এআই-নির্মিত কনটেন্ট শনাক্ত হলে এআই ইনফো লেবেল যুক্ত করবে। এক্সেও সম্প্রতি একই ধরনের একটি ফিচার চালুর কথা ব্যবহারকারীরা লক্ষ্য করেছেন।

তবে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কংগ্রেসের মাত্র পাঁচটি এআই-নির্মিত কনটেন্টে এই ধরনের সতর্কবার্তা ছিল, আর বিজেপি বা তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো পোস্টেই এমন লেবেল দেখা যায়নি।

বেলিংক্যাট এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে মেটা ও এক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করলে মেটার একজন মুখপাত্র জানান, তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন এবং নীতিমালা লঙ্ঘন হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত এক্স কোনো জবাব দেয়নি।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, নির্বাচন ঘিরে এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর প্রচার ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, যদি তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়।

সম্পর্কিত