Advertisement Banner

আমিরাতের ওপেক ত্যাগ এবং রিয়াদ-আবুধাবি দ্বন্দ্বে নতুন মোড়

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আমিরাতের ওপেক ত্যাগ এবং রিয়াদ-আবুধাবি দ্বন্দ্বে নতুন মোড়
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

গত ২৮ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) আনুষ্ঠানিকভাবে পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক এবং ওপেক প্লাস জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ১ মে থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। এই পদক্ষেপে বহু বছরের সদস্যপদের অবসান ঘটে। একই সঙ্গে এটি জ্বালানি নীতি নিয়ে আবুধাবির দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

দ্য ক্র্যাডেলে প্রকাশিত বিশ্লেষণে লেখক মাওয়াদ্দা ইসকান্দার বলেছেন, আবুধাবি এই সিদ্ধান্তকে তাদের উৎপাদন কৌশলের পুনর্বিবেচনার ফল হিসেবে দেখাচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। পারস্য উপসাগরে ভূরাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলেও প্রভাব পড়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ওপেক ছাড়া মানে বাজার ছাড়া নয়। বরং তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চায়।

সয়ুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) জ্বালানি মন্ত্রী সুহাইল আল-মাজরুয়েই এই সিদ্ধান্তকে একটি সার্বভৌম পদক্ষেপ বলেছেন। তিনি বলেন, আগে থেকেই সৌদি আরব, রাশিয়া এবং ওপেক সচিবালয়কে জানানো হয়েছিল। আবুধাবি ১৯৬৭ সালে ওপেকে যোগ দিয়েছিল। তখনও ইউএই রাষ্ট্র গঠিত হয়নি। ফলে এই প্রস্থান একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি।

এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক তেল বাজারের বড় পরিবর্তনের অংশ। ইউএই-র তেল মজুদ বিশাল। প্রায় ১.২০ লাখ কোটি ব্যারেল মজুদ রয়েছে। মজুদে তারা বিশ্বে ষষ্ঠ। উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তারা বড় খেলোয়াড়। ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক হিসেবে তারা আগে প্রতিদিন প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল উৎপাদন করত। যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় চার শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে মার্চে উৎপাদন কমে প্রায় ১৯ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।

এই পতনের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি সরাসরি জড়িত। ২০২৫ সালে ইউএই প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে রপ্তানি করত। কিন্তু উত্তেজনা বাড়ার পর রপ্তানি অর্ধেকে নেমে আসে। ফুজায়রাহর তেল স্থাপনায় হামলা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। রপ্তানি টার্মিনালে আগুন লাগে। লোডিং কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। মজুদও কমে যায়। ফুজায়রাহতে মজুদ ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে আসে। এটি একটি রেকর্ড পরিমাণ নিচে আসার ঘটনা। এর প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়ে। বিনিয়োগকারীরা সরে যায়। প্রায় ১২ হাজার কোটি ডলার ক্ষতি হয়। পর্যটন খাতও ধাক্কা খায়।

এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ নয়। ওপেকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে কোটা নিয়ে মতবিরোধ ছিল। ইউএই মনে করত, তাদের উৎপাদন সীমা অন্যায়ভাবে কম। বাস্তবে তারা নির্ধারিত কোটার চেয়ে বেশি সরবরাহ করছিল। তাদের আনুষ্ঠানিক কোটা ছিল প্রায় ৩৪.১১ লাখ ব্যারেল। কিন্তু রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল। তাই ওপেক ছাড়ার পর বড় সরবরাহ পরিবর্তন হবে না। বরং এটি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার পদক্ষেপ।

তবে ওপেকের জন্য এটি বড় ধাক্কা। ইউএই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কোটা নির্ধারণে তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাদের চলে যাওয়া অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। সংগঠনটির স্থিতিশীলতা সবসময় বড় উৎপাদকদের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে। এই প্রস্থান সেই ভারসাম্যে চাপ তৈরি করবে।

এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মার্কিন রাজনীতিরও সম্পর্ক আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ওপেকের সমালোচনা করে আসছেন। তিনি তেলের দাম বাড়ানোর জন্য ওপেককে দায়ী করেন। ইউএই-র এই পদক্ষেপ সেই চাপের সঙ্গে আংশিকভাবে মিল খুঁজে পায়।

আবুধাবি ও রিয়াদের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা বেড়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে ওপেক-প্লাস আলোচনা ভেঙে পড়ে। কারণ ইউএই উৎপাদন কাটছাঁট বাড়াতে রাজি হয়নি। তারা বলেছিল, তাদের কোটা অন্যায়। সেই বিরোধ পরে বড় রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নেয়।

এই দ্বন্দ্বের পেছনে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে। সৌদি আরব বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা দাম নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়। অন্যদিকে ইউএই বেশি উৎপাদন করে বাজার দখল করতে চায়। তাদের উৎপাদন খরচ কম। অবকাঠামো শক্তিশালী। তাই তারা সুযোগ নিতে চায়।

এই পার্থক্য এখন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়ও প্রভাব ফেলছে। ইউএই তাদের অর্থনীতি বদলাতে চায়। তারা পরিষ্কার জ্বালানি ও হাইড্রোজেনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর জন্য স্থায়ী আয়ের দরকার। তাই তারা উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী।

এই সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি আঞ্চলিক রাজনীতিরও অংশ। উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়া নিয়ে সৌদি আরব ও ইউএই-র মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এখন জ্বালানি নীতিও সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

সৌদি আরব নিজেকে অঞ্চলের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। তারা আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। অন্যদিকে ইউএই নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। তারা নতুন জোটে যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ইসরায়েল-এর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউএই-র ওপেক ত্যাগ একটি বড় বার্তা বহন করে। এটি শুধু নীতিগত পরিবর্তন নয়। এটি একটি নতুন কৌশল। এখানে জ্বালানি নীতি, রাজনীতি ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা একসঙ্গে কাজ করছে। আবুধাবি ও রিয়াদ এখন শুধু মিত্র নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীও। আর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সম্পর্কিত