চরচা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় হুমকির মুখোমুখি ইরান। দেশটি হারিয়েছে তাদের বহু নেতা। তা সত্ত্বেও এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, ইরানের এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিকভাবে নিজেদের পক্ষে অবস্থান পুনর্গঠন করা।
গত কয়েক সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক কমান্ড কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বহু শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক নেতার মৃত্যু হয়েছে, যা শাসনব্যবস্থাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
ইতোমধ্যেই দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ক্লান্ত ইরানের জনগণ এখন যুদ্ধজনিত সংকটের নতুন চাপের মুখে পড়েছে। খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযানের পরিবেশ তাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
এদিকে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বাস্তব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা নেতৃত্ব আরও কঠোর ও সংঘাতমুখী বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরান বারবারই তাদের আঘাত সহ্য করার সক্ষমতা, নেতৃত্বের আরও ক্ষয়ক্ষতিকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার স্পষ্ট ইচ্ছার কথা তুলে ধরছে। যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ দাবি জানালেও ইরানের টিকে থাকা নেতৃত্ব নিজেদের বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং শান্তির জন্য সর্বোচ্চ শর্ত সামনে আনছে। তারা একটি নতুন আঞ্চলিক ‘স্থিতাবস্থা’, যুদ্ধক্ষতিপূরণ এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জোটে পরিবর্তন দাবি করেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের একজন মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, “যুদ্ধবিরতি তখনই যৌক্তিক হবে, যখন এটি নিশ্চিত হবে যে যুদ্ধ আবার শুরু হবে না। শত্রুকে তাদের সমস্যা সমাধানের সুযোগ দেওয়ার জন্য যুদ্ধবিরতি নয়; যেমন ধ্বংস হওয়া রাডার মেরামত করা বা প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণ করা, যাতে তারা আবার আমাদের ওপর হামলা চালাতে পারে।”

কালিবাফ আরও বলেন, “শত্রু তাদের আগ্রাসনের জন্য আসলেই অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এবং বিশ্ব ও উপসাগরীয় অঞ্চলে উপযুক্ত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”
ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন একটি ‘প্রটোকল’ চালুর দাবি জানিয়েছে, যেখানে দেশটির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ‘নির্দিষ্ট শর্তের’ অধীনে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান বিদেশে জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করার দাবি তুলতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাছ থেকে টোল আদায়ের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার কালিবাফ গত মঙ্গলবার এক্সে লিখেছেন, “হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি আর যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না।”
‘যুদ্ধ-পরবর্তী’ চাপ
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলার পর গত মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন এবং সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব কাঠামো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তেহরানকে পাল্টা জবাবও ছিল দ্রুত ও তীব্র। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ফলে আরব প্রতিবেশিদের সঙ্গে সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে অব্যাহত হামলার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠার সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো সিনা তুসি বলেন, “ইরানের লক্ষ্য হচ্ছে এই চাপকে ‘যুদ্ধ-পরবর্তী’ ফলাফলে রূপান্তর করা।”
সিনা সিএনএনকে বলেন, “ইরান এমন এক পরিস্থিতি চায়, যেখানে তারা আর বিচ্ছিন্নতা বা ধ্বংসের লক্ষ্য নয় বরং নতুন এক আঞ্চলিক ভারসাম্যের অংশ, যেখানে তাদের স্থিতিশীলতা পারস্য উপসাগর ও বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।”
গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধে পিছিয়ে পড়ছে। ট্রাম্প মঙ্গলবার ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, ইরানের সামরিক শক্তি ‘ধ্বংস করা হয়েছে’ এবং তাদের নেতৃত্ব ‘প্রায় সব স্তরেই’ বিলুপ্ত।
এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ৬১তম দফা হামলা চালায়, যাতে ইসরায়েলে এক দম্পতি নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক নার্গেস বাজোগলি বলেন, “প্রচলিত সামরিক বিচারে ইরান হয়ত জিতছে না, অবশ্য তাদের জেতার প্রয়োজনও নেই।” তিনি বলেন, ইরানের পুরো কৌশলই অসম যুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে। তারা মূলত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে প্রতিপক্ষের জন্য ব্যয়বহুল করে তুলতে চায়।
নার্গিস আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তেলের বাণিজ্যে বিঘ্ন ও মূল্যবৃদ্ধি সহ্য করতে পারবে না। তার ভাষ্য, “কোন পর্যায়ে তারা বলবে ‘এবার যথেষ্ট’? ইরান ঠিক সেই চাপের জায়গাগুলোতেই আঘাত করছে।”
বিকল্প পরিকল্পনা
ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে শত্রুতার কারণে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সংঘাতের সময় বিকেন্দ্রীভূত ইউনিট সক্রিয় করার জন্য আগেই বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছিল।

সরকারিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে আইআরজিসি বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতেও নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও সৌদি আরবের বিভিন্ন হোটেল, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বহুতল ভবন এবং জ্বালানি স্থাপনায় এসব হামলার ঘটনা ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের এই দ্রুত ও তীব্র সামরিক তৎপরতা একটি নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করা।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নার্গেস বাজোগলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় পুরোনো কমান্ড কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আইআরজিসিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব উঠে এসেছে। ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের আঞ্চলিক শক্তি প্রয়োগের অভিজ্ঞতা তাদের ঝুঁকি ও সংঘাতের হিসাবকে প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, ইরান এখন তার ভবিষ্যৎকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে। তার মতে, ইরান যদি স্থিতিশীল না থাকে, তবে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে-সাম্প্রতিক জ্বালানি বাজার ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সেই বাস্তবতাই তুলে ধরছে।
এদিকে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আমির আকরামিনিয়া দাবি করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়েছে।
সিএনএন বলছে, ইরানের আঞ্চলিক কৌশল শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। এখন পর্যন্ত তেহরানের অব্যাহত হামলার মুখে পড়লেও বেশিরভাগ আরব প্রতিবেশী দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি।
তবে অন্তত দুটি উপসাগরীয় দেশের কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক আরও জোরদার করবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসকে বলেন, “উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানকেই প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমি মনে করি, আগামী কয়েক দশকেও এই ধারণা বদলাবে না।”
গারগাশ জানান, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে গঠিত কোনো জোটে যোগ দিতে আমিরাত প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, ইরানের যুদ্ধ কৌশলে ‘ভুল ধারণা’ রয়েছে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি যেতে পারে।
দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী রিম আল হাশিমি অস্ট্রেলিয়ার এবিসি নেটওয়ার্ককে বলেন, ইরানের হামলা তাদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তির গতিপথ বদলাবে।
সিএনএন বলছে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার লক্ষ্য সরাসরি জয় নয় বরং টিকে থাকা, প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেদের শর্ত আরোপের সক্ষমতা ফিরে পাওয়া।
বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, “চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল উত্তেজনা বাড়ানো নয় বরং সেই উত্তেজনাকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে সমঝোতায় বাধ্য করা। ইরানের এই যুদ্ধে সামরিকভাবে জয়ী হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে অন্য সবার জন্য এত ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে, যাতে তারা সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়।”

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় হুমকির মুখোমুখি ইরান। দেশটি হারিয়েছে তাদের বহু নেতা। তা সত্ত্বেও এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, ইরানের এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিকভাবে নিজেদের পক্ষে অবস্থান পুনর্গঠন করা।
গত কয়েক সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক কমান্ড কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বহু শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক নেতার মৃত্যু হয়েছে, যা শাসনব্যবস্থাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
ইতোমধ্যেই দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ক্লান্ত ইরানের জনগণ এখন যুদ্ধজনিত সংকটের নতুন চাপের মুখে পড়েছে। খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযানের পরিবেশ তাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
এদিকে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বাস্তব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা নেতৃত্ব আরও কঠোর ও সংঘাতমুখী বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরান বারবারই তাদের আঘাত সহ্য করার সক্ষমতা, নেতৃত্বের আরও ক্ষয়ক্ষতিকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার স্পষ্ট ইচ্ছার কথা তুলে ধরছে। যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ দাবি জানালেও ইরানের টিকে থাকা নেতৃত্ব নিজেদের বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং শান্তির জন্য সর্বোচ্চ শর্ত সামনে আনছে। তারা একটি নতুন আঞ্চলিক ‘স্থিতাবস্থা’, যুদ্ধক্ষতিপূরণ এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জোটে পরিবর্তন দাবি করেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের একজন মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, “যুদ্ধবিরতি তখনই যৌক্তিক হবে, যখন এটি নিশ্চিত হবে যে যুদ্ধ আবার শুরু হবে না। শত্রুকে তাদের সমস্যা সমাধানের সুযোগ দেওয়ার জন্য যুদ্ধবিরতি নয়; যেমন ধ্বংস হওয়া রাডার মেরামত করা বা প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণ করা, যাতে তারা আবার আমাদের ওপর হামলা চালাতে পারে।”

কালিবাফ আরও বলেন, “শত্রু তাদের আগ্রাসনের জন্য আসলেই অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এবং বিশ্ব ও উপসাগরীয় অঞ্চলে উপযুক্ত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”
ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন একটি ‘প্রটোকল’ চালুর দাবি জানিয়েছে, যেখানে দেশটির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ‘নির্দিষ্ট শর্তের’ অধীনে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান বিদেশে জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করার দাবি তুলতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাছ থেকে টোল আদায়ের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার কালিবাফ গত মঙ্গলবার এক্সে লিখেছেন, “হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি আর যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না।”
‘যুদ্ধ-পরবর্তী’ চাপ
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলার পর গত মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন এবং সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব কাঠামো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তেহরানকে পাল্টা জবাবও ছিল দ্রুত ও তীব্র। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ফলে আরব প্রতিবেশিদের সঙ্গে সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে অব্যাহত হামলার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠার সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো সিনা তুসি বলেন, “ইরানের লক্ষ্য হচ্ছে এই চাপকে ‘যুদ্ধ-পরবর্তী’ ফলাফলে রূপান্তর করা।”
সিনা সিএনএনকে বলেন, “ইরান এমন এক পরিস্থিতি চায়, যেখানে তারা আর বিচ্ছিন্নতা বা ধ্বংসের লক্ষ্য নয় বরং নতুন এক আঞ্চলিক ভারসাম্যের অংশ, যেখানে তাদের স্থিতিশীলতা পারস্য উপসাগর ও বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।”
গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধে পিছিয়ে পড়ছে। ট্রাম্প মঙ্গলবার ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, ইরানের সামরিক শক্তি ‘ধ্বংস করা হয়েছে’ এবং তাদের নেতৃত্ব ‘প্রায় সব স্তরেই’ বিলুপ্ত।
এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ৬১তম দফা হামলা চালায়, যাতে ইসরায়েলে এক দম্পতি নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক নার্গেস বাজোগলি বলেন, “প্রচলিত সামরিক বিচারে ইরান হয়ত জিতছে না, অবশ্য তাদের জেতার প্রয়োজনও নেই।” তিনি বলেন, ইরানের পুরো কৌশলই অসম যুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে। তারা মূলত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে প্রতিপক্ষের জন্য ব্যয়বহুল করে তুলতে চায়।
নার্গিস আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তেলের বাণিজ্যে বিঘ্ন ও মূল্যবৃদ্ধি সহ্য করতে পারবে না। তার ভাষ্য, “কোন পর্যায়ে তারা বলবে ‘এবার যথেষ্ট’? ইরান ঠিক সেই চাপের জায়গাগুলোতেই আঘাত করছে।”
বিকল্প পরিকল্পনা
ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে শত্রুতার কারণে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সংঘাতের সময় বিকেন্দ্রীভূত ইউনিট সক্রিয় করার জন্য আগেই বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছিল।

সরকারিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে আইআরজিসি বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতেও নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও সৌদি আরবের বিভিন্ন হোটেল, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বহুতল ভবন এবং জ্বালানি স্থাপনায় এসব হামলার ঘটনা ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের এই দ্রুত ও তীব্র সামরিক তৎপরতা একটি নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করা।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নার্গেস বাজোগলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় পুরোনো কমান্ড কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আইআরজিসিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব উঠে এসেছে। ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের আঞ্চলিক শক্তি প্রয়োগের অভিজ্ঞতা তাদের ঝুঁকি ও সংঘাতের হিসাবকে প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, ইরান এখন তার ভবিষ্যৎকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে। তার মতে, ইরান যদি স্থিতিশীল না থাকে, তবে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে-সাম্প্রতিক জ্বালানি বাজার ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সেই বাস্তবতাই তুলে ধরছে।
এদিকে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আমির আকরামিনিয়া দাবি করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়েছে।
সিএনএন বলছে, ইরানের আঞ্চলিক কৌশল শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। এখন পর্যন্ত তেহরানের অব্যাহত হামলার মুখে পড়লেও বেশিরভাগ আরব প্রতিবেশী দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি।
তবে অন্তত দুটি উপসাগরীয় দেশের কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক আরও জোরদার করবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসকে বলেন, “উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানকেই প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমি মনে করি, আগামী কয়েক দশকেও এই ধারণা বদলাবে না।”
গারগাশ জানান, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে গঠিত কোনো জোটে যোগ দিতে আমিরাত প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, ইরানের যুদ্ধ কৌশলে ‘ভুল ধারণা’ রয়েছে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি যেতে পারে।
দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী রিম আল হাশিমি অস্ট্রেলিয়ার এবিসি নেটওয়ার্ককে বলেন, ইরানের হামলা তাদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তির গতিপথ বদলাবে।
সিএনএন বলছে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার লক্ষ্য সরাসরি জয় নয় বরং টিকে থাকা, প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেদের শর্ত আরোপের সক্ষমতা ফিরে পাওয়া।
বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, “চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল উত্তেজনা বাড়ানো নয় বরং সেই উত্তেজনাকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে সমঝোতায় বাধ্য করা। ইরানের এই যুদ্ধে সামরিকভাবে জয়ী হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে অন্য সবার জন্য এত ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে, যাতে তারা সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়।”

বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন বাস্তব পৃথিবীর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা। একজন মানুষ যখন নিজে হাতে কোনো কাজ করে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায় কিংবা সরাসরি মানুষের সাথে বিতর্কে জড়ায়, তখন তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে যে সুসংগত যোগাযোগ তৈরি হয়, তা কেবল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় সম্ভব নয়।