প্রযুক্তির জোয়ারে কমছে মেধা, ‘রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট’ ও বর্তমানের চ্যালেঞ্জ
কৌশিক আহমেদ
প্রযুক্তির জোয়ারে কমছে মেধা, ‘রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট’ ও বর্তমানের চ্যালেঞ্জ
কৌশিক আহমেদ
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১৮: ৫৫
একটা সময় প্রতি দশকে মানুষের গড় আইকিউ প্রায় ৩ পয়েন্ট করে বেড়েছে। ছবি: এআই থেকে তৈরি
বিংশ শতাব্দীজুড়ে মানবসভ্যতা এক অদ্ভুত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সময় দেখা গিয়েছিল, প্রতি দশকে মানুষের গড় আইকিউ প্রায় ৩ পয়েন্ট করে বাড়ছে। নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস ফ্লিনের নামানুসারে এই ধারাকে বলা হয় ‘ফ্লিন ইফেক্ট’। উন্নত পুষ্টি, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা এবং জটিলতর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ফলে মানুষ ক্রমেই বুদ্ধিমান হয়ে ওঠার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। বর্তমান জেনারেশন; অর্থাৎ, ‘জেন জি’-এর ক্ষেত্রে এই বুদ্ধি বাড়া তো দূরের কথা, বরং তা নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট’।
২০১৮ সালে নরওয়ের রাগনার ফ্রিশ সেন্টার ফর ইকোনমিক রিসার্চ বড় একটি গবেষণা চালায়। তাতে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের পর জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের আইকিউ স্কোর তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় কমছে। যুক্তরাষ্ট্রে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকরাও একই প্রবণতা লক্ষ্য করেন। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আইকিউ টেস্টের তিনটি প্রধান নির্ণায়ক–যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, শব্দভাণ্ডার এবং গাণিতিক দক্ষতা–সবগুলোতেই স্কোর কমেছে।
গবেষকেরা মনে করছেন, মানুষের জিনগত পরিবর্তনের চেয়ে আমাদের চারপাশের পরিবেশ এবং অভ্যাসের পরিবর্তনই এর জন্য বেশি দায়ী। এর প্রধান কারণ হলো–
কগনিটিভ অফলোডিং: এটি মেধা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ। আমরা এখন তথ্য মনে রাখার চেয়ে তা সার্চ করার ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফোন নম্বর থেকে শুরু করে সাধারণ হিসাব–সবকিছুর জন্যই আমরা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করি। যখন আমরা মস্তিষ্ককে কোনো তথ্য মনে রাখার বা প্রক্রিয়া করার চ্যালেঞ্জ দিই না, তখন তার কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। জিপিএস ব্যবহার করে পথ চেনার ফলে আমাদের স্থানিক স্মৃতি আজ হুমকির মুখে।
ডিজিটাল ফ্লুয়েন্সি বনাম গভীর মনোনিবেশ: সোশ্যাল মিডিয়ার শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম বদলে দিচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও আমাদের ডোপামিন দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কোনো জটিল সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। একটি বই পড়া বা দীর্ঘ প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করার জন্য যে ধৈর্যের প্রয়োজন, তা ভার্চুয়াল জগতের চটজলদি আনন্দের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্মার্টফোনের শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম বদলে দিচ্ছে। ছবি: ফ্রিপিক
পরিবেশগত ও খাদ্যতালিকাগত প্রভাব: শুধু প্রযুক্তি নয়, পরিবেশ দূষণ, রাসায়নিক সার-নির্ভর খাদ্য উৎপাাদন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্যও মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন। পুষ্টির মান বাড়লেও খাবারে থাকা প্রিজারভেটিভ এবং রাসায়নিক আমাদের নিউরাল বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভার্চুয়াল জগৎ আমাদের তথ্যের ভাণ্ডার দিতে পারে, কিন্তু তা আমাদের সুগভীর জ্ঞান দিতে পারে না। এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয় হলো আমাদের মস্তিষ্কের ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ বা ডিএমএন। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, যখন আমরা কোনো নির্দিষ্ট কাজে ব্যস্ত না থেকে কিছুটা অলস সময় কাটাই–যেমন প্রকৃতিতে হাঁটাহাঁটি করা, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকা বা কেবল আপন মনে চিন্তা করা–তখন মস্তিষ্কের এই ডিএমএন অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আমাদের এই অলস সময় একদম হারিয়ে গেছে। বাসের জন্য অপেক্ষা করা বা লিফটে ওঠার সামান্য কয়েক সেকেন্ডও আমরা স্মার্টফোনে ডুব দিই। ফলে মস্তিষ্ক কখনোই তার ডিএমএন সক্রিয় করার সুযোগ পায় না। অথচ এই ডিএমএন-ই মানুষের সৃজনশীলতা বাড়াতে, স্মৃতি গুছিয়ে রাখতে এবং জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজতে সাহায্য করে। বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া নিউরাল নেটওয়ার্ক পূর্ণতা পায় না। বাইরে হাঁটা বা কোনো শারীরিক শ্রমের সময় মস্তিষ্ক যে স্তরে চিন্তা করতে পারে, স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা অবস্থায় তা সম্ভব নয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন বাস্তব পৃথিবীর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা। একজন মানুষ যখন নিজে হাতে কোনো কাজ করে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায় কিংবা সরাসরি মানুষের সাথে বিতর্কে জড়ায়, তখন তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে যে সুসংগত যোগাযোগ তৈরি হয়, তা কেবল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় সম্ভব নয়।
প্রযুক্তি আমাদের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু চালিকাশক্তি নয়। আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহার এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সুষম সমন্বয়। গণিতের জটিল সূত্র ক্যালকুলেটরে না চেপে মাথায় করার চেষ্টা করা, কিবোর্ডের বদলে কলমে লেখার অভ্যাস রাখা কিংবা স্ক্রিন টাইমের চেয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনার সময় বাড়ানো–এগুলোই হতে পারে আমাদের মেধাকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়।
ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। কিন্তু সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার ধার থাকা চাই। আমরা যদি কেবল ভার্চুয়াল জগতের ভোক্তা হয়ে থাকি, তবে রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট আমাদের মেধাকে আরও সংকুচিত করে তুলবে।
একটা সময় প্রতি দশকে মানুষের গড় আইকিউ প্রায় ৩ পয়েন্ট করে বেড়েছে। ছবি: এআই থেকে তৈরি
বিংশ শতাব্দীজুড়ে মানবসভ্যতা এক অদ্ভুত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সময় দেখা গিয়েছিল, প্রতি দশকে মানুষের গড় আইকিউ প্রায় ৩ পয়েন্ট করে বাড়ছে। নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস ফ্লিনের নামানুসারে এই ধারাকে বলা হয় ‘ফ্লিন ইফেক্ট’। উন্নত পুষ্টি, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা এবং জটিলতর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ফলে মানুষ ক্রমেই বুদ্ধিমান হয়ে ওঠার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। বর্তমান জেনারেশন; অর্থাৎ, ‘জেন জি’-এর ক্ষেত্রে এই বুদ্ধি বাড়া তো দূরের কথা, বরং তা নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট’।
২০১৮ সালে নরওয়ের রাগনার ফ্রিশ সেন্টার ফর ইকোনমিক রিসার্চ বড় একটি গবেষণা চালায়। তাতে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের পর জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের আইকিউ স্কোর তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় কমছে। যুক্তরাষ্ট্রে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকরাও একই প্রবণতা লক্ষ্য করেন। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আইকিউ টেস্টের তিনটি প্রধান নির্ণায়ক–যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, শব্দভাণ্ডার এবং গাণিতিক দক্ষতা–সবগুলোতেই স্কোর কমেছে।
গবেষকেরা মনে করছেন, মানুষের জিনগত পরিবর্তনের চেয়ে আমাদের চারপাশের পরিবেশ এবং অভ্যাসের পরিবর্তনই এর জন্য বেশি দায়ী। এর প্রধান কারণ হলো–
কগনিটিভ অফলোডিং: এটি মেধা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ। আমরা এখন তথ্য মনে রাখার চেয়ে তা সার্চ করার ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফোন নম্বর থেকে শুরু করে সাধারণ হিসাব–সবকিছুর জন্যই আমরা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করি। যখন আমরা মস্তিষ্ককে কোনো তথ্য মনে রাখার বা প্রক্রিয়া করার চ্যালেঞ্জ দিই না, তখন তার কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। জিপিএস ব্যবহার করে পথ চেনার ফলে আমাদের স্থানিক স্মৃতি আজ হুমকির মুখে।
ডিজিটাল ফ্লুয়েন্সি বনাম গভীর মনোনিবেশ: সোশ্যাল মিডিয়ার শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম বদলে দিচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও আমাদের ডোপামিন দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কোনো জটিল সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। একটি বই পড়া বা দীর্ঘ প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করার জন্য যে ধৈর্যের প্রয়োজন, তা ভার্চুয়াল জগতের চটজলদি আনন্দের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্মার্টফোনের শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম বদলে দিচ্ছে। ছবি: ফ্রিপিক
পরিবেশগত ও খাদ্যতালিকাগত প্রভাব: শুধু প্রযুক্তি নয়, পরিবেশ দূষণ, রাসায়নিক সার-নির্ভর খাদ্য উৎপাাদন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্যও মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন। পুষ্টির মান বাড়লেও খাবারে থাকা প্রিজারভেটিভ এবং রাসায়নিক আমাদের নিউরাল বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভার্চুয়াল জগৎ আমাদের তথ্যের ভাণ্ডার দিতে পারে, কিন্তু তা আমাদের সুগভীর জ্ঞান দিতে পারে না। এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয় হলো আমাদের মস্তিষ্কের ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ বা ডিএমএন। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, যখন আমরা কোনো নির্দিষ্ট কাজে ব্যস্ত না থেকে কিছুটা অলস সময় কাটাই–যেমন প্রকৃতিতে হাঁটাহাঁটি করা, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকা বা কেবল আপন মনে চিন্তা করা–তখন মস্তিষ্কের এই ডিএমএন অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আমাদের এই অলস সময় একদম হারিয়ে গেছে। বাসের জন্য অপেক্ষা করা বা লিফটে ওঠার সামান্য কয়েক সেকেন্ডও আমরা স্মার্টফোনে ডুব দিই। ফলে মস্তিষ্ক কখনোই তার ডিএমএন সক্রিয় করার সুযোগ পায় না। অথচ এই ডিএমএন-ই মানুষের সৃজনশীলতা বাড়াতে, স্মৃতি গুছিয়ে রাখতে এবং জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজতে সাহায্য করে। বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া নিউরাল নেটওয়ার্ক পূর্ণতা পায় না। বাইরে হাঁটা বা কোনো শারীরিক শ্রমের সময় মস্তিষ্ক যে স্তরে চিন্তা করতে পারে, স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা অবস্থায় তা সম্ভব নয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন বাস্তব পৃথিবীর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা। একজন মানুষ যখন নিজে হাতে কোনো কাজ করে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায় কিংবা সরাসরি মানুষের সাথে বিতর্কে জড়ায়, তখন তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে যে সুসংগত যোগাযোগ তৈরি হয়, তা কেবল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় সম্ভব নয়।
প্রযুক্তি আমাদের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু চালিকাশক্তি নয়। আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহার এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সুষম সমন্বয়। গণিতের জটিল সূত্র ক্যালকুলেটরে না চেপে মাথায় করার চেষ্টা করা, কিবোর্ডের বদলে কলমে লেখার অভ্যাস রাখা কিংবা স্ক্রিন টাইমের চেয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনার সময় বাড়ানো–এগুলোই হতে পারে আমাদের মেধাকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়।
ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। কিন্তু সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার ধার থাকা চাই। আমরা যদি কেবল ভার্চুয়াল জগতের ভোক্তা হয়ে থাকি, তবে রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট আমাদের মেধাকে আরও সংকুচিত করে তুলবে।