বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি–লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি)। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং নগরাঞ্চলের গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখতে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
২০০৬ সালে বিএনপি সরকার যখন ক্ষমতা ছাড়ে, তখন এই পণ্যের কোনো উপযোগিতা অর্থনীতিতে ছিলো না। এখন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের এক বৈচিত্র্যময় ও অত্যাবশ্যকীয় উপাদান, তরল আকারে বিদেশ থেকে আনা প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি।
তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, দেখিয়ে দিচ্ছে–এই নির্ভরতা বা অপরিহার্যতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল এনার্জি মনিটর (জিইএম) তাদের সাম্প্রতিক ব্রিফিং ‘সাউদার্ন এশিয়াস গ্যাস প্ল্যানস মে বি ওভারব্লোউন”–এ সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ গ্যাস অবকাঠামো সম্প্রসারণে যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দেশীয় গ্যাস কমছে, বাড়ছে আমদানি
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৫ শতাংশই গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ।
তবে গত এক দশকে এই ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৯.৩ শতাংশ কমেছে। পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসছে, অন্যদিকে নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধানেও বিনিয়োগ ছিল না।
ওই পরিস্থিতিতে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য বাড়তে থাকে। সেই ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানি শুরু করে। ২০১৮ সালে প্রথম এলএনজির চালান দেশে আসে। তখন প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজির (স্পট এবং চুক্তি) দাম ছিল ০৭ থেকে ১১ ডলারের মধ্যে। অথচ ওই পরিমাণ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় ছিল মাত্র ৩ ডলার। অর্থাৎ, দেশীয় গ্যাসের তিনগুণ বেশি দামে গ্যাস আমদানি শুরু হয়। তখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে আমদানির পথে হাঁটে বাংলাদেশ। ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তবে অর্থনীতির প্রশ্নে নিখাদ একটি কৌশলগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখনকার সরকার।
আর বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, ২০২৬ সালে প্রায় ১২০টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং বাকিটা স্পট মার্কেট থেকে কেনা হবে।
প্রতীকী ছবি
এলএনজির দাম বড় সীমাবদ্ধতা
এলএনজি ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর ব্যয়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী আমদানি করা এলএনজির দাম দেশীয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৩.৫-৪ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে, যার জন্য বছরে প্রায় ২-৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয় বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)-এর তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে।
এই অর্থের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
যুদ্ধের প্রভাব: দ্বিগুণ দামে এলএনজি
বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার প্রভাব ইতোমধ্যেই এলএনজি আমদানির ব্যয়ে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক বৈঠকে স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২,৬৫৪ কোটি টাকা।
এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিজ গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে কেনা এক কার্গো এলএনজির দাম ধরা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২১.৫৮ মার্কিন ডলার। মাত্র কয়েক মাস আগে একই প্রতিষ্ঠান থেকে এক কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ১০.৩৭ মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ, বাজারদর অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।
বিশ্ববাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারের প্রধান সূচক জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম), সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
গ্যাস সংকটের প্রভাব: বন্ধ সার কারখানা
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জানিয়েছে, দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, এসব কারখানা পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতির কারণে গত সপ্তাহ থেকে সেখানে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগেও কারখানাগুলো আংশিক সক্ষমতায় চলছিল।
এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানি সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের এশিয়া গ্যাস ট্র্যাকার অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বছরে প্রায় ৮.৩ মিলিয়ন টন (এমটিপিএ)।
নতুন টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াতে পারে বছরে প্রায় ১৯.৬ এমটিপিএ; অর্থাৎ, বর্তমানের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ।
জিইএম-এর হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম যদি এমএমবিটিইউপ্রতি গড়ে ১০ মার্কিন ডলার থাকে, তাহলে এই সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করলে বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হতে পারে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
সরবরাহের ভূরাজনীতি
এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও জড়িয়ে আছে। জিইএম-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার ৮০ শতাংশের বেশি যায় এশিয়ার বাজারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
অর্থনীতিতে এলএনজির প্রভাব
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রমাণিত গ্যাস মজুতের কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। কারণ, নতুন অনুসন্ধান সীমিত এবং বড় মাপের নতুন ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়নি। তাই দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জন্য গ্যাসকে একটি নিশ্চিন্ত রিজার্ভ হিসেবে ধরা সম্ভব নয়। তবে স্ট্র্যাটেজিক পণ্য হিসেবে এলএনজি ব্যাকআপ কিছুটা অবকাঠামোগত নিরাপত্তা দেয়। জিইএম ২০২৬ প্রতিবেদন এবং আইইএ-এর সাউথ এশিয়া গ্যাস স্টাডি ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোতে সংরক্ষিত এলএনজি দেশের ন্যূনতম তিন দিনের চাহিদা কভার করতে পারে। অর্থাৎ, এটি স্ট্র্যাটেজিক ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু দেশের মোট চাহিদা বা পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা কভার করার জন্য যথেষ্ট নয়। জিইএম-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপলাইন ও ইমার্জেন্সি স্টক ছাড়া সরবরাহ চক্রে কোনো বিঘ্ন দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতকে তাড়াতাড়ি প্রভাবিত করতে পারে।
কোন পথে হাঁটবে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে এলএনজি এখন একটি বাস্তবতা। স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় এটি প্রয়োজনীয় সমাধানও বটে। তবে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, বাড়তি আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ ঝুঁকি–সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এই নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরপত্তায় সহায়ক নাকি হুমকি? আজকের জ্বালানি সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তি ও ঝুঁকির সীমা। তবে, পুরো পরিণতিই নির্ভর করছে অর্থনীতির জটিল হিসাব করে জ্বালানি মিশ্রণে কতটা দুরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারেক রহমানের সরকার, তার ওপর।
ছবি: রয়টার্স
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি–লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি)। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং নগরাঞ্চলের গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখতে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
২০০৬ সালে বিএনপি সরকার যখন ক্ষমতা ছাড়ে, তখন এই পণ্যের কোনো উপযোগিতা অর্থনীতিতে ছিলো না। এখন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের এক বৈচিত্র্যময় ও অত্যাবশ্যকীয় উপাদান, তরল আকারে বিদেশ থেকে আনা প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি।
তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, দেখিয়ে দিচ্ছে–এই নির্ভরতা বা অপরিহার্যতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল এনার্জি মনিটর (জিইএম) তাদের সাম্প্রতিক ব্রিফিং ‘সাউদার্ন এশিয়াস গ্যাস প্ল্যানস মে বি ওভারব্লোউন”–এ সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ গ্যাস অবকাঠামো সম্প্রসারণে যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দেশীয় গ্যাস কমছে, বাড়ছে আমদানি
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৫ শতাংশই গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ।
তবে গত এক দশকে এই ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৯.৩ শতাংশ কমেছে। পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসছে, অন্যদিকে নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধানেও বিনিয়োগ ছিল না।
ওই পরিস্থিতিতে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য বাড়তে থাকে। সেই ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানি শুরু করে। ২০১৮ সালে প্রথম এলএনজির চালান দেশে আসে। তখন প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজির (স্পট এবং চুক্তি) দাম ছিল ০৭ থেকে ১১ ডলারের মধ্যে। অথচ ওই পরিমাণ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় ছিল মাত্র ৩ ডলার। অর্থাৎ, দেশীয় গ্যাসের তিনগুণ বেশি দামে গ্যাস আমদানি শুরু হয়। তখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে আমদানির পথে হাঁটে বাংলাদেশ। ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তবে অর্থনীতির প্রশ্নে নিখাদ একটি কৌশলগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখনকার সরকার।
আর বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, ২০২৬ সালে প্রায় ১২০টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং বাকিটা স্পট মার্কেট থেকে কেনা হবে।
প্রতীকী ছবি
এলএনজির দাম বড় সীমাবদ্ধতা
এলএনজি ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর ব্যয়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী আমদানি করা এলএনজির দাম দেশীয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৩.৫-৪ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে, যার জন্য বছরে প্রায় ২-৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয় বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)-এর তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে।
এই অর্থের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
যুদ্ধের প্রভাব: দ্বিগুণ দামে এলএনজি
বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার প্রভাব ইতোমধ্যেই এলএনজি আমদানির ব্যয়ে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক বৈঠকে স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২,৬৫৪ কোটি টাকা।
এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিজ গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে কেনা এক কার্গো এলএনজির দাম ধরা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২১.৫৮ মার্কিন ডলার। মাত্র কয়েক মাস আগে একই প্রতিষ্ঠান থেকে এক কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ১০.৩৭ মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ, বাজারদর অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।
বিশ্ববাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারের প্রধান সূচক জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম), সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
গ্যাস সংকটের প্রভাব: বন্ধ সার কারখানা
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জানিয়েছে, দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, এসব কারখানা পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতির কারণে গত সপ্তাহ থেকে সেখানে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগেও কারখানাগুলো আংশিক সক্ষমতায় চলছিল।
এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানি সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের এশিয়া গ্যাস ট্র্যাকার অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বছরে প্রায় ৮.৩ মিলিয়ন টন (এমটিপিএ)।
নতুন টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াতে পারে বছরে প্রায় ১৯.৬ এমটিপিএ; অর্থাৎ, বর্তমানের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ।
জিইএম-এর হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম যদি এমএমবিটিইউপ্রতি গড়ে ১০ মার্কিন ডলার থাকে, তাহলে এই সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করলে বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হতে পারে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
সরবরাহের ভূরাজনীতি
এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও জড়িয়ে আছে। জিইএম-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার ৮০ শতাংশের বেশি যায় এশিয়ার বাজারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
অর্থনীতিতে এলএনজির প্রভাব
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রমাণিত গ্যাস মজুতের কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। কারণ, নতুন অনুসন্ধান সীমিত এবং বড় মাপের নতুন ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়নি। তাই দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জন্য গ্যাসকে একটি নিশ্চিন্ত রিজার্ভ হিসেবে ধরা সম্ভব নয়। তবে স্ট্র্যাটেজিক পণ্য হিসেবে এলএনজি ব্যাকআপ কিছুটা অবকাঠামোগত নিরাপত্তা দেয়। জিইএম ২০২৬ প্রতিবেদন এবং আইইএ-এর সাউথ এশিয়া গ্যাস স্টাডি ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোতে সংরক্ষিত এলএনজি দেশের ন্যূনতম তিন দিনের চাহিদা কভার করতে পারে। অর্থাৎ, এটি স্ট্র্যাটেজিক ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু দেশের মোট চাহিদা বা পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা কভার করার জন্য যথেষ্ট নয়। জিইএম-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপলাইন ও ইমার্জেন্সি স্টক ছাড়া সরবরাহ চক্রে কোনো বিঘ্ন দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতকে তাড়াতাড়ি প্রভাবিত করতে পারে।
কোন পথে হাঁটবে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে এলএনজি এখন একটি বাস্তবতা। স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় এটি প্রয়োজনীয় সমাধানও বটে। তবে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, বাড়তি আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ ঝুঁকি–সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এই নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরপত্তায় সহায়ক নাকি হুমকি? আজকের জ্বালানি সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তি ও ঝুঁকির সীমা। তবে, পুরো পরিণতিই নির্ভর করছে অর্থনীতির জটিল হিসাব করে জ্বালানি মিশ্রণে কতটা দুরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারেক রহমানের সরকার, তার ওপর।