২০২৬ সালে কোন পথে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
২০২৬ সালে কোন পথে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান?
দক্ষিণ এশিয়ায় কট্টর ডান-বাম রাজনীতির বিকল্প হিসাবে মধ্যবর্তী পথটি বেশ জনপ্রিয়। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

উত্থান-পতন আর চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ২০২৫ সাল। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বছরজুড়ে চলা সংঘাত এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়ে আলোচিত ছিল। ২০২৬ সালের শুরুর এই সময়ে ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ এই অঞ্চলের তিন প্রধান দেশ—বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের জন্য একটি ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস সম্বলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ইকোনমিষ্ট বলছে, বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সাল হবে এক ঐতিহাসিক পালাবদলের বছর। আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের একমাত্র পথ নির্বাচন। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হয়ে দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় ফিরতে পারে বলে জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কাজ চালাচ্ছে, তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ ছাড়ের ওপর।

অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ থাকলেও, ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের বড় দুশ্চিন্তা মূল্যস্ফীতি নিয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বরে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৯ শতাংশ, ২০২৬ সালে তা কমে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে। যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি আনবে।

ভারতের ক্ষেত্রে ইকোনমিস্ট বলছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমে যাওয়ায় নীতিগত সংস্কারের গতি কিছুটা ধীর হতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় কিছুটা চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।

২০২৬ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। শিথিল মুদ্রানীতি, স্থিতিশীল পরিষেবা রপ্তানি এবং গ্রামীণ চাহিদার পুনরুত্থান ভারতকে এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করবে। তবে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) চাঙ্গা থাকলেও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ধরণের বাণিজ্যিক সংস্কার থমকে যেতে পারে। নতুন বছরে ভারতে মুদ্রাস্ফীতি ৩ দশমিক ৮ শতাংশের আশেপাশে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখনও সেনাবাহিনী এবং জোট সরকারের সমীকরণে বন্দি। পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) ও পিপলস পার্টির জোট সরকার একটি নড়বড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টিকে আছে। নীতিনির্ধারণে সেনাবাহিনীর প্রভাব ২০২৬ সালেও বজায় থাকবে।

অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশকে সামান্য পেছনে ফেলে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জন করতে পারে। তবে ভারতের সাথে সিন্ধু নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত হওয়া এবং মার্কিন শুল্ক নীতির কারণে দেশটি বড় ধরণের চাপের মুখে পড়বে। তাসত্ত্বেও পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি ৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের তুলনায় কিছুটা কম।

সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সাল দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক সন্ধিক্ষণ। একদিকে বাংলাদেশে নতুন নির্বাচিত সরকারের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা নিরসন করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলটি বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

সম্পর্কিত