তেলের বন্যায় কি ভেসে যাবে অন্যায়?

তেলের বন্যায় কি ভেসে যাবে অন্যায়?
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক

সকাল সকাল ছাপা পত্রিকায় চোখ বোলায় সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশ। যদিও এখন ইন্টারনেটের বাড়-বাড়ন্তের সময়। তারপরও নেটের দুনিয়াতেও ই-পেপার পড়ার চল শহুরে নাগরিকদের আছে বটে। আর এই পত্রিকা দেখতে গিয়েই হলো বিপত্তি। প্রশ্ন উঠল, তেলের বন্যায় কি তবে ভেসে যাবে অন্যায়?

১৮ ফেব্রুয়ারির সকালটা ছিল এ দেশের সদ্য গঠিত নতুন সরকারের প্রথম দিন। আগের দিনই সরকার শপথ নিয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নিয়েছেন। ফলে একটি নতুন সরকারের প্রথম সকাল বলা যেতেই পারে।

এই দিনটার ছাপা পত্রিকাগুলো দেখলে চোখে আটকাবে বড় বড় অনেকগুলো বিজ্ঞাপন। এমনিতেই নতুন সরকার ও নতুন মন্ত্রিসভার খবরে পূর্ণ পত্রিকাগুলো। তার ওপর আছে বড় বড় সব বিজ্ঞাপন। সেসব বিজ্ঞাপনের বেশির ভাগটাই অভিনন্দন বার্তায় পূর্ণ। নতুন সরকারের বদলে নতুন সরকারপ্রধানকে অভিনন্দন জানানোর প্রতিযোগিতাই সেখানে মূখ্য। তাই নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানা ভঙ্গির ছবিই শোভা পেতে দেখা গেল সেসব বিজ্ঞাপনে।

এসব বিজ্ঞাপনের প্রায় সবই বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের। বিভিন্ন কোম্পানি, গ্রুপ অব কোম্পানিজ, কোনো খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইত্যাদিদের দেওয়া বিজ্ঞাপনই বেশি। প্রধান প্রধান প্রায় সব দৈনিক পত্রিকারই প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠাতে এসব বিজ্ঞাপন জ্বলজ্বল করছে। সেই সাথে আরও চিকচিক করছে ‘তেল’!

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারপ্রধানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ এমন বিজ্ঞাপন নতুন কিছু নয়। গত আওয়ামী লীগের সরকারের আমল থেকেই এমনটা চলে আসছে। মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোরও এতে বাণিজ্য ভালোই হয়। আওয়ামী সরকারের আমলে তো কোনো একটা উদযাপনের ইস্যু তৈরি করতে পারলেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও সরকারপ্রধানের স্তুতিতে ভেসে যাওয়া এমন বিজ্ঞাপনে পত্রিকা ভরে উঠত। এরপর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের প্রতিও এ ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিল এ দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। আর ঠিক একইভাবে এবারের নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানের প্রতিও একই মনোভাব দেখাচ্ছে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একটি অংশ।

এসব বিজ্ঞাপন যে শুধুই দৃষ্টি আকর্ষণের উপায়, তা বুঝতে গবেষক হতে হয় না। দৃষ্টি আকর্ষণ কেন করা হয়? এই দুনিয়ায় ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক বাদে, আর কোথাও উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কাজ হয় না। পুঁজিবাদী সমাজে তো আরও না। ফলে সংবাদপত্রের পাতায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে যখন বিভিন্ন কোম্পানি বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা সংঘ ‘অভিনন্দন’ জানানোর জোয়ার বইয়ে দেয়, তখন বুঝতেই হয় যে, উদ্দেশ্য আছেই। সেটি অনেকটাই ‘সুনজর’ প্রত্যাশী। অন্ততপক্ষে নজরে পড়ার ইচ্ছাটা তো থাকেই। আর সেই সুনজর বা নজর দিয়ে পরবর্তীতে কী হাসিলের চেষ্টা চলে, তা তো জানাই!

তাই নিন্দুকেরা যদি এত এত বিজ্ঞাপনকে ‘তেল’ দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে ধরে নিতে চায়, তবে তাতে দোষ দেওয়া যায় না। কারণ, বাংলাদেশে এ ধরনের অদৃশ্য ‘তেল’ প্রবলভাবেই দৃশ্যমান। দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু এর প্রভাব দারুণ।

হাওয়ার মতো তেল ছাড়াও আমাদের এই দেশ অচল। এটি ছাড়া গাড়ি যেমন চলে না, তেমনি এখানকার মানুষের জীবনও চলে না। তেল কোথায় না লাগে বলুন? প্রাত্যহিক জীবনের নানা ক্ষেত্রে একটু কায়দা করে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের তেল দিতে হয় নাকে-মুখে। আবার ভাজা-পোড়া খেতেও তেল খরচ হয়। ওই তেলের দাম যদিও একটু বেশি, মর্জিমতো ওঠা-নামা করে। এর দামে উল্টো-পাল্টা হলেই আবার পকেটের তেল বেরিয়ে যায়। সে যাক গে, আসল কথা হলো–এ দেশের মানুষের জীবনে তেলের প্রয়োজনীয়তা ও ভূমিকা অপরিসীম। আমাদের তেল দিতে হয়, আবার খেতেও হয়। কম খেলেও সমস্যা নেই। কিন্তু দেওয়ার সময় যদি তেল কম পড়ে যায়, তবে আর রক্ষে নেই বলেই জনমনে ধারণা। তাই ‘তৈলমর্দন’ বাংলায় বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। আমরাও অনেক যুগের চেষ্টায় তৈলমর্দনে বেশ এগিয়ে গেছি। খানিকটা অপচয়কারীও বলা যায়। তেল কাউকে দিতে হলে, তাকে তেলে না চুবিয়ে আমরা যে ছাড়ি না!

আর এই চুবিয়ে ফেলা নিয়েই যত ঝামেলা। কারণ ক্ষমতাকে তেল দেওয়ার ক্ষেত্রে এ দেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী বেপরোয়া। মাত্রাজ্ঞানের কোনো ধারণা সেখানে থাকে না। আর তাতে যদি অর্থ বা বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট স্বার্থের দূরতম সম্পর্কও থাকে, তবে তো কথাই নেই। কারণ ১৮ ফেব্রুয়ারির ছাপা পত্রিকাগুলোয় যেসব বিজ্ঞাপন দেখা গেছে, সেগুলোয় যেসব কোম্পানির অভিনন্দন বার্তা দেখা গেছে বিজ্ঞাপনের ঢঙে, সেসব কোম্পানিগুলোর কয়েকটির বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি থাকার অভিযোগ আছে। আছে বাণিজ্যিক নানা আইন না মানার এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও। আবার যে ব্যবসায়ী সংগঠনের দেওয়া বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে, তাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে টালবাহানার অভিযোগ এন্তার। ঈদ এলেই সেই টালবাহানা আরও বেড়ে যায়।

সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে যে, বিশাল বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে অভিনন্দন জানানোয় কিছু ‘কিন্তু’ থাকার বিষয়টি সন্দেহ করলে, তা দোষের হবে না। কারণ ডালে কিছু ‘কালা কালা’ দেখা যাচ্ছে যে!

অথচ এই অতিরিক্ত ‘তেল’ ক্ষমতার জন্যই ক্ষতিকর আদতে। এতে ক্ষমতা উঠে পড়ে এক পিচ্ছিল পথে। তাতে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ততোধিক। তেলে পা পিছলে ক্ষমতা হারানোর তরতাজা উদাহরণও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক অতীতেই দেখা গেছে। অতিরিক্ত তেল তাই মানবশরীরের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অত্যন্ত ক্ষতিকর ক্ষমতা ও সরকারের জন্যও।

তেল থেকে দূরে থাকার পরামর্শ তাই আমাদের দেশের যেকোনো সরকারের জন্যই সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ। কারণ এ হলো পচা শামুক। আগের কোনো সরকারই অবশ্য এই সতর্কীকরণ থেকে শিক্ষা নেয়নি পুরোপুরি, তা রাজনৈতিক হোক বা অরাজনৈতিক। এখন নতুন নির্বাচিত সংসদীয় সরকার যদি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয় অবশেষে, তবেই মঙ্গল।

তা না হলে সেই আগেকার মতোই অতিরিক্ত তেলের বন্যায় সব অন্যায় হয়তো ভেসেই যাবে, বিস্মৃত হবে! তখন আর দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। যদিও সেটির জন্যই এই দেশের নাগরিকেরা বারে বারে নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসছে!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত