ননসেন্সের দুনিয়ায় কমনসেন্সের সাংবাদিকতা

ননসেন্সের দুনিয়ায় কমনসেন্সের সাংবাদিকতা
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি

ধরুন, আপনার বাসায় আগুন লাগিয়েছে একদল মানুষ। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত গতিতে। এখন আপনি ফোন দিলেন পুলিশে, ফোন দিলেন ফায়ার সার্ভিসেও। কিন্তু তড়িৎগতিতে কেউ এগিয়ে এল না, সাড়াও সেভাবে দিল না। এই সকল ‘রক্ষাকর্তা’রা এল রোগী মরে যাওয়ার পর, ডাক্তার সেজে! ততক্ষণে জ্বালাও-পোড়াও শেষ।

তা, এবার যদি আপনার অনুভূতি কেউ জানতে চায়, আপনি কি বলবেন? কেউ যদি আপনার কাছে ঘটনার কার্যকারণ জানতে চায়, বা ঘটনা সম্পর্কে জানতে চায়–আপনি কী বলবেন? উত্তরে নিশ্চয়ই জানাবেন, ‘সাহায্য চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি’। এখন বিক্ষুব্ধ আপনি এও অভিযোগ করে বসতে পারেন যে, যাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল, তারা যেহেতু ঠিক সময়ে এগিয়ে আসেনি, সুতরাং তারা প্রকারান্তরে এই হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটতে দিয়েছে।

একজন সাধারণ যুক্তিনির্ভর মানুষ হিসেবে যে কারও এমন অভিযোগ করা অস্বাভাবিক নয়। আমাদের দেশেও কিছুদিন আগেই এমন ঘটনা ঘটেছে। দুটি সংবাদমাধ্যমসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। নিউ এজ সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর এ ঘটনায় সরকারের কাঁধে দোষ চাপিয়েছেন, অভিযোগ করেছেন। আর সেই অভিযোগ শুনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বলে দিলেন, এটি নাকি ‘ননসেন্স’ আলাপ, এবং অবশ্যই ‘নিখাদ মিথ্যা’!

যে কারও মতের সঙ্গে সরকারপক্ষের দ্বিমত থাকতেই পারে। সেই দ্বিমত প্রকাশের ভাষা ভদ্রোচিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব যখন একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিশেষণ হিসেবে ‘ননসেন্স’ বা ‘নিখাদ মিথ্যা’ ব্যবহার করেন, তখন প্রশ্ন উঠে–‘নতুন’ দেশে সাংবাদিকতার পরিবেশ আসলে কেমন? ‘পুরনো’ দেশের মতোই কি?

এই নতুন, পুরনো প্রসঙ্গ এল, কারণ কথায় কথায় কর্তৃপক্ষীয় জ্ঞান হিসেবে আমরা এমন ‘নয়া’ রূপের সন্ধান পাই। আমাদের দেশের সাংবাদিকদের একটি বড় অংশই আবার সেসবে গা ভাসান। যে সাংবাদিকদের প্রশ্ন তোলার কথা, তারা পুরনো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ঠিকই, কিন্তু নতুন নিয়ে স্তুতিতে ভেসে যান অযাচিতভাবে!

এই ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি বুঝতে হলে আরও কিছু তথ্য প্রয়োজন। সেগুলো দেখলে দেশের সাংবাদিকতা কতটা বিরূপ পরিবেশে আছে, তার মাত্রা বোঝা আরও সহজ হয়ে যাবে।

২০২৫ সাল বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি–উভয় পক্ষের চাপ, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব আক্রমণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ–সব মিলিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৮১টি নিপীড়ন, হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা, সংবাদের জেরে মামলা, প্রাণনাশের হুমকি ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। এ ছাড়া প্রকাশিত সংবাদের কারণে ৭১টি মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গুরুতর হুমকি বলে মনে করা হয় বিশ্বজুড়েই।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানায়, ২০২৫ সালে ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক হত্যা, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে একজন নিহত, ২৯৫ জন আহত, ১৬৩ জন লাঞ্ছিত বা হুমকির শিকার এবং ১৭০ জন আইনি হয়রানির মুখে পড়েছেন। এ সময় ৪৬টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হন।

আরেক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানায়, ২০২৫ সালে ৩১৮টি ঘটনায় অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।

আর বিশ্বে সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) বলছে, ২০২৫ সালে গণমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম। দেশের স্কোর ৩৩.৭১। আরও উদ্বেগজনক হলো, নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৯তম। একই বছরে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলায় কমপক্ষে পাঁচজন সাংবাদিক আটক হয়েছেন।

আরএসএফ তাদের বিশ্লেষণে বলছে, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে প্রায় ৩ হাজার প্রিন্ট মিডিয়া, ৩০টি রেডিও, ৩০টি টিভি চ্যানেল ও কয়েক শ অনলাইন সংবাদমাধ্যম সক্রিয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলো অতীতে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সহায়ক ছিল এবং বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা থেকে বিরত রয়েছে বলে আরএসএফ নিজেদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

এবার এসব তথ্যের পাশে যদি এই লেখার শুরুতে থাকা ঘটনাটিকে মেলান, তবেই কিন্তু আমাদের ‘নতুন’ দেশের সাংবাদিকতার বর্তমান পরিস্থিতি বোঝা একেবারে পানির মতো সহজ হয়ে যাবে। যদিও আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের ভাষায়, এখন নাকি ‘দেশের ইতিহাসে সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছেন’, তবে ওপরের পরিসংখ্যান ও আরএসএফ-এর বিশ্লেষণ তা সমর্থন করে না।

তবে কি ‘নতুন’ দিনেই বেশি সমস্যা?

আসল কথা হলো, এই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কোনোকালেই সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের জন্য সুবিধার ছিল না। পুরনোতেও না, তথাকথিত নতুনেও না। বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে সব সময়ই ক্ষমতাকাঠামো চাপে রাখতে চেয়েছে এবং রেখেছে। এই বাস্তবতা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেও ছিল, পরেও আছে। সাংবাদিকতাকে চাপে রাখার কৌশলে হয়তো রকমফের আছে। কিন্তু চাপ অদৃশ্য হয়ে যায়নি। উল্টো আছে ভালোমতোই। আর সমালোচনা করার ক্ষেত্রেও এই দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো চলছে আগের নীতিতেই।

কারণ সংবাদমাধ্যমে হামলা করা, বিরুদ্ধে গেলেই মবের আক্রমণ চালানো এবং নিউজরুমের কর্তৃত্ব জবরদখল করার ঘটনা গত দেড় বছরে মহামারির মতো বেড়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নিউজরূম রাজনৈতিকভাবে দখল করা হয়েছে এবং হচ্ছে চর দখলের মতো করে। এবং এই জায়গায় দেশের প্রধান সকল রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে দারুণ সমতা আছে। সবাই মুখে বলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা, আর তলে তলে চলে নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা। এর বাইরে ‘ক্ষমতা’র চাপাচাপি তো আছেই।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সেটি হলো, আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদেরই অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার গুণগ্রাহী হওয়ার খায়েশ আছে ভালোমতোই। তাই স্বাধীন হওয়ার সুযোগ পেলেও এ দেশীয় সংবাদমাধ্যমের সত্যিকারের স্বাধীন হওয়ার সক্ষমতা সেই অর্থে নাই। কারণ, পুঁজি ও মালিকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ক্ষমতার হাত ধরার প্রবল ইচ্ছা অনেক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের প্রকৃতিই বদলে দিয়েছে আদতে। এসবের ব্যতিক্রম বাংলাদেশে এতটাই নগণ্য, যে আঙুল গুণে পরিমাপ সম্ভব।

সুতরাং, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের জগৎ ও সাংবাদিকতায় আদতে কোনো পরিবর্তনই আনতে পারেনি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। সাংবাদিকতা এই দেশে আগেও কম ছিল, এখনও নগণ্যই। বিপ্লব ও সততার বুলি আওড়ে এখনও এখানে তাই ‘প্রচারযন্ত্র’ হওয়ার ইচ্ছাই বেশি। অবজেক্টিভিটি নামের শব্দটি বাংলাদেশি সাংবাদিকতায় একটি বিরল বিষয় হয়েই যাচ্ছে। আর সেই ফাঁকে সারা জীবন অবিতর্কিত সাংবাদিকতা করে যাওয়া সাংবাদিককেও ক্ষমতার প্রতিনিধি হওয়া ভূতপূর্ব সাংবাদিকের কাছ থেকে অবলীলায় শুনতে হয় ‘ননসেন্স’ বিশেষণ! তাতে আর কোনো পরিমিতি বোধের চর্চা পরিলক্ষিত হয় না।

কী আর করা, ননসেন্সের দুনিয়ায় কমনসেন্স তো কমতেই থাকে কেবল!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত