তরুণ চক্রবর্তী

বহুল চর্চিত ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো কি এখন অস্তমিত সূর্য? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক যুগের শাসনামলে এই প্রশ্নটি ফের নতুন করে উঠতে শুরু করেছে। বিজেপির ঘোষিত নীতি হচ্ছে, ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’। এই লক্ষ্যে নানা ভাষা, নানা মতের এই ১৪০ কোটির দেশে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে ‘বিতর্কিত’ আইন তৈরির প্রক্রিয়াও। ফলে এমনিতেই অস্তিত্ব সঙ্কটে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। সম্প্রতি কলকাতায় ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর তল্লাশি অভিযান এবং রাজ্য সরকারের শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পাল্টা অভিযান, নতুন করে বেশকিছু প্রশ্ন বা আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। সেই প্রশ্ন বা আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার প্রমাণ পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে ইডি অফিসে সেখানকার রাজ্য পুলিশের পাল্টা অভিযানে। বিষয়টি বেশ গুরুতর, বুঝেছেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও।
জন্মলগ্ন থেকেই ভারতে যুক্তরাষ্ট্র কাঠামো বেশ কিছু নীতি ও আদর্শগত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। সেই আলোকেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে সংবিধান প্রণেতারা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্দিষ্ট করে দেন সংবিধানে। ভারতে উভয় সরকারই নির্বাচিত হয় একই নির্বাচকদের ভোটে। পদ্ধতি ও মেয়াদ একই। তবে নির্বাচন প্রয়োজনের খাতিরেই আলাদা আলাদা সময়ে হয়। সংবিধান অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ একাধিক বিষয় রাজ্য সরকারের হাতে সমর্পিত। কেন্দ্রের হাতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রসহ অন্যান্য বিষয় রয়েছে। দুর্নীতি তদন্তে রয়েছে উভয় সরকারেরই ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সরকারই সবার ওপরে। এমনকী, কোনো রাজ্যে সাংবিধানিক সংকট দেখা দিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারই নেয়। কেন্দ্রীয় সরকার দায়বদ্ধ জাতীয় সংসদের কাছে। আর রাজ্য সরকার বিধানসভার কাছে দায়বদ্ধ। প্রতিটি রাজ্যেই রাজ্যপাল থাকেন কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসাবে।
অতীতেও বহুবার কেন্দ্রীয় সরকার নিজেদের ক্ষমতা জাহির করে রাজ্য সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুর্নীতির অভিযোগ এনে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই), এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) প্রভৃতি কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দিয়ে যেভাবে বিরোধী দলের রাজ্য সরকারগুলোকে বিপাকে ফেলাটাকে নিয়মে পরিণত করা হয়েছে তার নজির অতীতে নেই। অ-বিজেপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য মন্ত্রীদের জেলে ভরাটাও এখন জলভাতে পরিণত হয়েছে। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল তো জেলে বসেই বহুদিন মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি সামলিয়েছেন! এক সময় মুখ্যমন্ত্রীত্ব ছেড়ে জেলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন ঝাড়খণ্ডের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। জেল খেটেছেন পশ্চিমবঙ্গেরও বহু মন্ত্রী। আবার জেল খাটার ভয়ে বিরোধীদলের বহু হেভিওয়েট নেতা দল বদলে বিজেপিতে যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। যেমন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদরার মতে বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিন’-এ ঢুকলেই দুর্নীতিই সাফ হয়ে যায়।
সবই গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত ৮ জানুয়ারি কেন্দ্র ও রাজ্য সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন কলকাতায় ভোট কৌশলী সংস্থা আইপ্যাক-এর অধিকর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন ইডির কর্মকর্তারা। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান তৃণমূল নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তার অভিযোগ, তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল ও সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা হাতাতেই ইডিকে দিয়ে তল্লাশি করাচ্ছিলেন বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি মোবাইল ও একটি ল্যাপটপ নিয়ে সেই তল্লাশিস্থল থেকে বেরিয়ে আসেন। তার সঙ্গে কলকাতা ও রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তারাও ছিলেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বক্তব্য, ‘কিছু অচেনা লোক’ সেখানে ঢুকে পড়েছেন শুনে গিয়েছিলেন পুলিশ কর্তারা। মমতার দাবি, দলের সভানেত্রী হিসাবে দলীয় কাগজ উদ্ধারই ছিল তার উদ্দেশ্য। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে তল্লাশি শুরু হলেও ইডি তাদের ই-মেল পাঠায় বেলা সাড়ে এগারোটায়। তৃণমূলের অভিযোগ, ‘এত দিন কী করছিল ইডি? ২০২৪ থেকে চুপ থাকার পর ভোটের আগেই কেন তল্লাশি! পুরোটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ অন্যদিকে, ইডির তরফে মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপুলিশের শীর্ষকর্তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্তের স্বার্থেই ছিল তাদের এই তল্লাশি।
বিষয়টি গুরুতর। একটি দেশের নির্বাচিত সরকার ও প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের বিরুদ্ধে সেই দেশেরই নির্বাচিত আরেকটি সরকার চুরি-ডাকাতির অভিযোগ তুলছে। তাই সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করে বলেছেন, “দেশে আইনের শাসন বজায় রাখা এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সংস্থা যাতে স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ করতে পারে, তার জন্য এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।”
সুপ্রিম কোর্টে ইডি বনাম পশ্চিমবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ মামলা চলাকালেই ঝাড়খণ্ডে সেখানকার পুলিশের সঙ্গে শুরু হলো ইডির সংঘাত। রাঁচি পুরসভার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী সন্তোষ কুমার ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে থানায় মারধরের অভিযোগ দায়ের করেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ১২ জানুয়ারি পাল্টা তল্লাশি চালায় রাঁচির ইডি দপ্তরে। নতুন করে শুরু হয় সংঘাত। চাঞ্চল্য ছড়ায় গোটা দেশেই। কারণ অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির সঙ্গে ইডি, সিবিআইয়ের সংঘাত এখন জলভাত। বিরোধীদের অভিযোগ, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে। এমনকী, জোটশরিকদের চাপে রাখতেও ব্যবহৃত হচ্ছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। উদাহরণের কোনো অভাব নেই। কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের ৯০ শতাংশই হচ্ছে বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে।
কেন্দ্রীয় সরকার বিজেপির দখলে থাকলেও অনেক রাজ্যে এখনো অ-বিজেপি সরকার রয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের ভিন্নমতের সরকারই ভারতীয় গণতন্ত্রের আসল উজ্জ্বলতা। অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপির সরকারের শাসনামলেও সেই ঔজ্জ্বল্য বজায় ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে দলবদলের মতোই বিরোধীদের জেলে ভরাটা রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অতীতে জরুরি অবস্থা জারি করে ইন্দিরা গান্ধি বিরোধী কণ্ঠকে দমনের চেষ্টা করেছিলেন এবং তার শাস্তিও তিনি ভোগ করেন নিজের জীবদ্দশাতেই। কিন্তু মোদির আমলে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। সেই ‘জরুরি অবস্থা’র হাত ধরেই জম্মু ও কাশ্মীর পূর্ণ রাজ্য থেকে এখন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। রাজ্যে রাজ্যে চলছে বিরোধী কণ্ঠ দাবিয়ে রাখার প্রক্রিয়া।
সামনেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ ৫ রাজ্যে বিধানসভা ভোট। তার আগে কেন্দ্রীয় সংস্থার তৎপরতা নতুন করে শুরু হয়েছে। আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আঘাত আরও তীব্র হবে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, সংবিধানের ওপর আঘাত হানছে বর্তমান সরকার। সংসদের বিরোধী দলনেতাও তার মর্যাদা পাচ্ছেন না। স্বদেশে তো বটেই বিদেশেও নাকি তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ না করার জন্য রাষ্ট্রনায়কদের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। অথচ, এক সময় বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীকেই কংগ্রেস ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতা করেছিল। আবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বিজেপির নেতারাই একাত্তরে যুদ্ধ জয়ের জন্য ইন্দিরা গান্ধির প্রশংসা করেছিলেন। রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য ছিল ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য। কিন্তু দিন দিন সেই সৌন্দর্যেও ভাটা পড়ছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা।
‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’ বনাম ‘হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান’-এর লড়াইতে ‘বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান’ কত দিনে দেখা যাবে সেই আশঙ্কাও বাড়ছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

বহুল চর্চিত ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো কি এখন অস্তমিত সূর্য? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক যুগের শাসনামলে এই প্রশ্নটি ফের নতুন করে উঠতে শুরু করেছে। বিজেপির ঘোষিত নীতি হচ্ছে, ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’। এই লক্ষ্যে নানা ভাষা, নানা মতের এই ১৪০ কোটির দেশে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে ‘বিতর্কিত’ আইন তৈরির প্রক্রিয়াও। ফলে এমনিতেই অস্তিত্ব সঙ্কটে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। সম্প্রতি কলকাতায় ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর তল্লাশি অভিযান এবং রাজ্য সরকারের শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পাল্টা অভিযান, নতুন করে বেশকিছু প্রশ্ন বা আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। সেই প্রশ্ন বা আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার প্রমাণ পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে ইডি অফিসে সেখানকার রাজ্য পুলিশের পাল্টা অভিযানে। বিষয়টি বেশ গুরুতর, বুঝেছেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও।
জন্মলগ্ন থেকেই ভারতে যুক্তরাষ্ট্র কাঠামো বেশ কিছু নীতি ও আদর্শগত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। সেই আলোকেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে সংবিধান প্রণেতারা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্দিষ্ট করে দেন সংবিধানে। ভারতে উভয় সরকারই নির্বাচিত হয় একই নির্বাচকদের ভোটে। পদ্ধতি ও মেয়াদ একই। তবে নির্বাচন প্রয়োজনের খাতিরেই আলাদা আলাদা সময়ে হয়। সংবিধান অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ একাধিক বিষয় রাজ্য সরকারের হাতে সমর্পিত। কেন্দ্রের হাতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রসহ অন্যান্য বিষয় রয়েছে। দুর্নীতি তদন্তে রয়েছে উভয় সরকারেরই ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সরকারই সবার ওপরে। এমনকী, কোনো রাজ্যে সাংবিধানিক সংকট দেখা দিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারই নেয়। কেন্দ্রীয় সরকার দায়বদ্ধ জাতীয় সংসদের কাছে। আর রাজ্য সরকার বিধানসভার কাছে দায়বদ্ধ। প্রতিটি রাজ্যেই রাজ্যপাল থাকেন কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসাবে।
অতীতেও বহুবার কেন্দ্রীয় সরকার নিজেদের ক্ষমতা জাহির করে রাজ্য সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুর্নীতির অভিযোগ এনে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই), এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) প্রভৃতি কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দিয়ে যেভাবে বিরোধী দলের রাজ্য সরকারগুলোকে বিপাকে ফেলাটাকে নিয়মে পরিণত করা হয়েছে তার নজির অতীতে নেই। অ-বিজেপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য মন্ত্রীদের জেলে ভরাটাও এখন জলভাতে পরিণত হয়েছে। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল তো জেলে বসেই বহুদিন মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি সামলিয়েছেন! এক সময় মুখ্যমন্ত্রীত্ব ছেড়ে জেলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন ঝাড়খণ্ডের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। জেল খেটেছেন পশ্চিমবঙ্গেরও বহু মন্ত্রী। আবার জেল খাটার ভয়ে বিরোধীদলের বহু হেভিওয়েট নেতা দল বদলে বিজেপিতে যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। যেমন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদরার মতে বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিন’-এ ঢুকলেই দুর্নীতিই সাফ হয়ে যায়।
সবই গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত ৮ জানুয়ারি কেন্দ্র ও রাজ্য সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন কলকাতায় ভোট কৌশলী সংস্থা আইপ্যাক-এর অধিকর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন ইডির কর্মকর্তারা। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান তৃণমূল নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তার অভিযোগ, তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল ও সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা হাতাতেই ইডিকে দিয়ে তল্লাশি করাচ্ছিলেন বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি মোবাইল ও একটি ল্যাপটপ নিয়ে সেই তল্লাশিস্থল থেকে বেরিয়ে আসেন। তার সঙ্গে কলকাতা ও রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তারাও ছিলেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বক্তব্য, ‘কিছু অচেনা লোক’ সেখানে ঢুকে পড়েছেন শুনে গিয়েছিলেন পুলিশ কর্তারা। মমতার দাবি, দলের সভানেত্রী হিসাবে দলীয় কাগজ উদ্ধারই ছিল তার উদ্দেশ্য। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে তল্লাশি শুরু হলেও ইডি তাদের ই-মেল পাঠায় বেলা সাড়ে এগারোটায়। তৃণমূলের অভিযোগ, ‘এত দিন কী করছিল ইডি? ২০২৪ থেকে চুপ থাকার পর ভোটের আগেই কেন তল্লাশি! পুরোটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ অন্যদিকে, ইডির তরফে মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপুলিশের শীর্ষকর্তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্তের স্বার্থেই ছিল তাদের এই তল্লাশি।
বিষয়টি গুরুতর। একটি দেশের নির্বাচিত সরকার ও প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের বিরুদ্ধে সেই দেশেরই নির্বাচিত আরেকটি সরকার চুরি-ডাকাতির অভিযোগ তুলছে। তাই সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করে বলেছেন, “দেশে আইনের শাসন বজায় রাখা এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সংস্থা যাতে স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ করতে পারে, তার জন্য এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।”
সুপ্রিম কোর্টে ইডি বনাম পশ্চিমবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ মামলা চলাকালেই ঝাড়খণ্ডে সেখানকার পুলিশের সঙ্গে শুরু হলো ইডির সংঘাত। রাঁচি পুরসভার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী সন্তোষ কুমার ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে থানায় মারধরের অভিযোগ দায়ের করেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ১২ জানুয়ারি পাল্টা তল্লাশি চালায় রাঁচির ইডি দপ্তরে। নতুন করে শুরু হয় সংঘাত। চাঞ্চল্য ছড়ায় গোটা দেশেই। কারণ অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির সঙ্গে ইডি, সিবিআইয়ের সংঘাত এখন জলভাত। বিরোধীদের অভিযোগ, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে। এমনকী, জোটশরিকদের চাপে রাখতেও ব্যবহৃত হচ্ছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। উদাহরণের কোনো অভাব নেই। কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের ৯০ শতাংশই হচ্ছে বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে।
কেন্দ্রীয় সরকার বিজেপির দখলে থাকলেও অনেক রাজ্যে এখনো অ-বিজেপি সরকার রয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের ভিন্নমতের সরকারই ভারতীয় গণতন্ত্রের আসল উজ্জ্বলতা। অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপির সরকারের শাসনামলেও সেই ঔজ্জ্বল্য বজায় ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে দলবদলের মতোই বিরোধীদের জেলে ভরাটা রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অতীতে জরুরি অবস্থা জারি করে ইন্দিরা গান্ধি বিরোধী কণ্ঠকে দমনের চেষ্টা করেছিলেন এবং তার শাস্তিও তিনি ভোগ করেন নিজের জীবদ্দশাতেই। কিন্তু মোদির আমলে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। সেই ‘জরুরি অবস্থা’র হাত ধরেই জম্মু ও কাশ্মীর পূর্ণ রাজ্য থেকে এখন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। রাজ্যে রাজ্যে চলছে বিরোধী কণ্ঠ দাবিয়ে রাখার প্রক্রিয়া।
সামনেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ ৫ রাজ্যে বিধানসভা ভোট। তার আগে কেন্দ্রীয় সংস্থার তৎপরতা নতুন করে শুরু হয়েছে। আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আঘাত আরও তীব্র হবে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, সংবিধানের ওপর আঘাত হানছে বর্তমান সরকার। সংসদের বিরোধী দলনেতাও তার মর্যাদা পাচ্ছেন না। স্বদেশে তো বটেই বিদেশেও নাকি তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ না করার জন্য রাষ্ট্রনায়কদের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। অথচ, এক সময় বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীকেই কংগ্রেস ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতা করেছিল। আবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বিজেপির নেতারাই একাত্তরে যুদ্ধ জয়ের জন্য ইন্দিরা গান্ধির প্রশংসা করেছিলেন। রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য ছিল ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য। কিন্তু দিন দিন সেই সৌন্দর্যেও ভাটা পড়ছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা।
‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’ বনাম ‘হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান’-এর লড়াইতে ‘বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান’ কত দিনে দেখা যাবে সেই আশঙ্কাও বাড়ছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)