নির্বাচনের আগে নারীরা এতটা নাই হয়েছে কবে?

নির্বাচনের আগে নারীরা এতটা নাই হয়েছে কবে?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সংসদ নির্বাচনের আর ৭ দিনও বাকি নেই। চারদিকে হই হই রবে চলছে প্রচার, নানা আলোচনা। সংঘাতও চলছে, সহিংসতা হচ্ছে। কিন্তু সবকিছুই হচ্ছে ‘ব্যাটাগিরি’র তালে, নারীরা সেখানে যেন অচ্ছুৎ। এবারের নির্বাচনে নারীদের কেমন যেন ‘আউটসাইডার’-এর মতো করে দেখা হচ্ছে, এক পাশে সরিয়ে রাখার মতো অবস্থা! নির্বাচনের আগে নারীরা এতটা ‘নাই’ হয়েছে কবে?

নিন্দুকেরা অনুযোগ করে বলতেই পারেন যে, নারী কই নাই? বাইরে বের হলে, নারীদের চোখে পড়ে। ঘরে তো আছেই। তবে এসব অর্থহীন যুক্তির বাইরে গিয়ে যদি একবার নিরপেক্ষভাবে একটু ভাবা যায়, তাহলে দেখা যাবে–জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের নারীরা এতটা ‘অদৃশ্য’ গত কয়েক দশকে হয়তো হননি!

এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধানতম রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানেরা এখন আর নারী নন। গত ৪ দশকের হিসাব ধরলে, বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই ছিল নারী নেতৃত্বে। ফলে নির্বাচন এলে অথবা স্বাভাবিক সময়েও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে থাকতেন দুই নারীই, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। এবার সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।

বিষয়টি এমন নয় যে, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নারীর হাতে থাকার সাথে সাথে রাজনীতির নাটাইও শুধু নারীদের হাতেই ছিল, বা নিয়ন্ত্রণে সমানাধিকার ছিল। এ দেশের রাজনীতিতে পুরুষের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা সব সময়ই পরিমাণে বেশি ছিল, পুরুষতান্ত্রিকও ছিল অনেকটাই। কিন্তু দলের ‘সুপ্রিম লিডার’ নারী হওয়ায় সার্বিক রাজনীতির বহিরাবরণে হলেও এক ধরনের শক্তিশালী নারী প্রতিনিধিত্ব অনুভূত হতো। কারণ গত ৩৫ বছরে এ দেশের মানুষ সরকারপ্রধান হিসেবে নারীকেই দেখে এসেছে। এটি দেশের সাধারণ নারী থেকে শুরু করে সার্বিকভাবে পুরুষদের মনস্তত্ত্বেও এক ধরনের প্রভাব ফেলেছে। যেটি রাজনীতির তৃণমূল ও মাঝারি পর্যায়ে নারীদের অনুপস্থিতিকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলেছিল হয়তো। অন্তত রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের একটি প্রধান ভূমিকা পরিলক্ষিত হতো। আর এই জায়গাতেই এখন ব্যাপকভাবে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

সেই সাথে পুরো দেশেই নারীদের প্রতি এক ধরনের ‘নিচু’ করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরেই নারীর কর্মসংস্থান, পোশাক থেকে শুরু করে সমাজে তাদের প্রাধান্য নিয়ে নানাভাবে বিরূপ মন্তব্যের প্রসার দেখা যাচ্ছে। নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় এই প্রবণতা যেন মহামারি আকার পেয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নারীদের কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ কমানো-বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক চলমান। কোনো দল নারীদের সমানাধিকার দিতে চাচ্ছে, আবার কোনো কোনো দল নারীদের ‘সুবিধা’ দেওয়ার কথা বলে কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সেসব দল আবার এও মনে করে যে, পুরুষেরা যত কাজ যেভাবে করতে পারে, নারীদের পক্ষে সেভাবে করা সম্ভব নয়! এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই তাই সিঁদুরে মেঘ দেখার মতো সমালোচকদের মনেও এসেছে ‘কৌশলে নারীদের একঘরে করে’ দেওয়ার হিসাব। কারণ এমন চেষ্টা এর আগেও হয়েছে বহুবার এবং বিগত সময়ে গোপনে বা প্রকাশ্যে সেই চেষ্টা নানা মাত্রায় অব্যাহতও থেকেছে।

উপরের এই দুটি প্রক্রিয়ার ফল সমাজ ও রাজনীতিতে বাজে প্রভাব ফেলছে ভালোমতোই। তার অন্যতম উদাহরণ এবারের সংসদ নির্বাচন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ১৭। নির্বাচনে এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৪ জন। এর বাইরে ১ জন প্রার্থী হিজড়া জনগোষ্ঠীর। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুসারে, মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ। দলের হয়ে প্রার্থী হয়েছেন ৬৬ জন নারী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১৯ জন।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্য হচ্ছিল না। পরে ন্যূনতম ৫ শতাংশ আসনে নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাবে সম্মত হয় ২৬টি দল ও জোট। নারী অধিকারকর্মীদের আপত্তির মুখে এবারের নির্বাচনের জন্য ন্যূনতম ৫ শতাংশ মনোনয়নের ব্যবস্থা রেখে পরে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা হয়। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। বড় দলের মধ্যে বিএনপি ১০ নারীকে; অর্থাৎ, ৩ দশমিক ৪ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। আর সব দলই নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢের পিছিয়ে, এমনকি বাংলাদেশের প্রগতিশীল হিসেবে খ্যাত বামপন্থীরাও। আর জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জনতার দল, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট, বাংলাদেশ কংগ্রেস, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ জাসদসহ অন্তত ৩০টি দল তো এবারের নির্বাচনে কেবল পুরুষ প্রার্থী দিয়েছে। কোনো নারীকে মনোনয়নই দেওয়া হয়নি।

তবে বিষয়টি এমন নয় যে, শুধু এই নির্বাচনেই নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুরবস্থা। এমন বেগতিক অবস্থা বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই। গত ২৮ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন জানান, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে। ওই নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন ১০১ জন, যা মোট প্রার্থীর ৫ শতাংশের বেশি। নারী প্রার্থীর বাইরে হিজড়া ও তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী ছিলেন দুজন। আর ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত নারী প্রার্থীর হার ১ শতাংশের নিচে ছিল। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ (জুন মাসে অনুষ্ঠিত) নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ১ শতাংশের ওপরে আসে। ২০০১ সালে ২ শতাংশ, ২০০৮ সালে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৫ শতাংশের বেশি ও ২০১৮ সালে প্রায় ৪ শতাংশ নারী প্রার্থী ছিল।

অর্থাৎ, সাধারণ রাজনীতি ও নির্বাচনের রাজনীতিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বরাবরই নগণ্য ছিল। তবে এই লেখার শুরুতেই যা বলা হয়েছে যে, আগে যেহেতু নারী নেতৃত্বের অধীনে রাজনীতি পরিচালিত হতো, ফলে সার্বিকভাবে শূন্যতা বোধ হতো কম। এখন সেটিও না থাকায় হুট করেই ‘কঙ্কালসার’ অবস্থাটি বেশি চোখে লাগছে। অথচ মজার বিষয় হলো, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের ৬৪ জনই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। এবং প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী কর্মজীবী। এর মানে হলো, নারী প্রার্থীরা যোগ্য নন বলে যে ধারণা ছড়ানোর চেষ্টা স্বাভাবিকভাবে চলে, সেটির ভিত্তি নেই।

অথচ তা সত্ত্বেও ফেসবুকসহ অনলাইনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অন্য দলের নারী এবং সার্বিকভাবে নারীদের নিয়ে মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য ছড়াচ্ছেন, বাজে মন্তব্য করছেন। আবার এসবের প্রতিকারে তেমন কোনো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে না। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম আয়োজিত এক আলোচনা সভাতেই আলোচকেরা এসব কথা বলেছেন। আলোচনায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ যেকোনো বিষয়ে কর্তৃপক্ষ চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু নারী বিষয়ে কুৎসা রটানোসহ বিভিন্ন ঘটনায় তেমন উৎসাহ দেখায় না।

জনপ্রতিনিধি হতে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারীদের ক্ষেত্রেই যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে এই দেশের সাধারণ নারীদের কী অবস্থা, তা সহজেই অনুমেয়। আসলে দেশজুড়েই একটি নারীবিদ্বেষী মনোভাব অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। সরকার ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি তাই অনেকটাই সঙীন। অবস্থাটি এমন যে–ক্ষমতায় যেতে নারীদের ভোট দরকার ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার আশপাশেও নারীদের যেন দেখা না যায়! দেখার সম্ভাবনা দৃশ্যমান হলেও তাই মারমুখী প্রবণতা ফুটে উঠছে অনেকের মধ্যে।

এমন একটি দেশে নির্বাচনের আগে নারীদের এ ধরনের কোণঠাসা অবস্থা, যে দেশটি নারীদের নির্যাতনেও শুধু এগিয়েই যাচ্ছে। নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন–কোনো কিছুর প্রাবল্য কমেনি, বরং বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ২০২৫ সালে ঘটেছে ৫৬০টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫২৩। ধর্ষণের ঘটনা ২০২৪ সালে ছিল ৪০১, ২০২৫ সালে হয়েছে ৭৪৯। আর নারীর প্রতি যৌন হেনস্থার ঘটনা ২০২৪ সালে ছিল ১৬৬, ২০২৫ সালে হয়েছে ১৯৩। আবার মহিলা পরিষদ বলছে, সারা দেশে গত জানুয়ারি মাসে ১৮৩ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে আট কন্যাশিশুসহ ২০ নারীকে হত্যা করা হয়েছে। মানে, নারীর প্রতি নির্যাতনের সব ক্ষেত্রেই শুধুই এগিয়ে যাওয়া! সেই সাথে তীব্র হচ্ছে নারীবিদ্বেষী মনোভাবের চাষাবাদও।

তো, এরূপ পরিস্থিতিতেই এ দেশের নারীরা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে ভোট দেবেন। বলা হচ্ছে, নারীদের ভোটই এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ৫০ শতাংশ (৪৯ দশমিক ২৬ শতাংশ)। অর্থাৎ, নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের কাছাকাছি। আবার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ।

সুতরাং, সব মিলিয়েই এই বাংলাদেশটার সত্যিকার অর্থেই এগিয়ে যাওয়াটা অনেকাংশে নির্ভর করছে এ দেশের নারীদের ওপর। অথচ চারদিক থেকে তাদেরই একঘরে করার চেষ্টা চলছে। সেটি যেমন বাস্তবের দুনিয়ায়, তেমনই ভার্চুয়ালেও। এবারের নির্বাচনেই আমাদের দেশের নারীরা এই জাল ছিঁড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন কিনা, তাই এখন দেখার। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, অধিকার কেউ উপহার আকারে হাতে তুলে দেয় না। আদায় করেই নিতে হয়। আমাদের মা-বোনেরা এখন তা বুঝতে পারলেই হয়!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা 

সম্পর্কিত