Advertisement Banner

শুধু টেস্ট খেলেন বলেই নাঈমের এই দশা?

শুধু টেস্ট খেলেন বলেই নাঈমের এই দশা?
ক্রিকেটার নাঈম হাসান। ছবি: বিসিবি

সেই ২০১৮ সালে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক। পরিসংখ্যান খুব ভালো হওয়ার পরও দীর্ঘ সময়ে খেলেছেন মাত্র ১৪টি টেস্ট। বাকি দুই ফরম্যাটে এখনও অভিষেকের সুযোগ মেলেনি। নাঈম হাসানের পরিচিতি তাই কেবলই টেস্ট ক্রিকেটার, যিনি আবার সুযোগ পান কালেভদ্রে। এমনিতেই দেশে নেই টেস্ট ক্রিকেটের কদর, সেখানে একজন যদি সেই ফরম্যাটেও হন অনিয়মিত, তার সেই জনপ্রিয়তা থাকার কোনো কারণ নেই। ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি দলের সদস্যদের তুলনায় তাই খ্যাতির দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে এই অফ স্পিনার। আর সেই কারণেই কি পরিচয় দেওয়ার পরও পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাকে?

অনেকের কাছেই প্রশ্নটি বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। তবে একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার তার পরিচয় দেওয়ার পরও যখন তার গায়ে হাত তুলতে পারেন পুলিশ সদস্যরা, তখন এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করাটা কঠিনই বটে। নিজের পরিচয় বিশ্বাস করাতে না পারার কারণেই যেন এই নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে তাকে। আর আট বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পরও একজন খেলোয়াড় যখন ‘অপরিচিত’ থেকে যান, সেটা দেশের ক্রিকেটের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও হতাশাজনক।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) একজন কর্মকর্তা অবশ্য মনে করছেন, এক ফরম্যাটের ক্রিকেটার হিসেবেই হয়তো বিপদে পড়েছেন নাঈম। চরচাকে তিনি বলেন, “দেখুন, এটা কিন্তু খুব স্পর্শকাতর ব্যাপার। জাতীয় পর্যায়ে চলে গেছে ইস্যুটা। আমরা এখনো জানি না ঠিক কেন এটা ঘটেছে। তবে পরিচয় দেওয়ার পরও যেহেতু বিশ্বাস করেনি, এর মানে হলো শুধু টেস্ট খেলার কারণে নাঈম নামটা হয়তো তাদের কাছে পরিচিত মনে হয়নি।”

নাঈম যে বোলার হিসেবে খারাপ, তাও নয়। ছোট ক্যারিয়ারে চারবার নিয়েছেন ইনিংসে পাঁচ উইকেট। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নিজের সর্বশেষ টেস্টেও এক ইনিংসে নিয়েছিলেন তিন উইকেট। মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের মতো দুজন প্রতিষ্ঠিত স্পিনার থাকায় এখন ফর্মে থেকেও আছেন দলের বাইরে। আর ২০২৪ সালের আগে সাকিব আল হাসানও থাকায় সেভাবে খেলার সুযোগই মেলেনি।

চলতি বছর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩০০ উইকেট শিকারিদের ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন নাঈম। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের দলে আছেন তিনি। কোথায় নিজেকে প্রস্তুত করবেন, তা ভাবার কথা থাকলেও ভাগ্যের পরিহাসে তাকে এখন পার করতে হচ্ছে শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন এক সময়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পর তাকে যেভাবে পুলিশের তিন সদস্য মিলে মারধর করেছেন, সেটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

স্রেফ সন্দেহের জেরে একজন ক্রিকেটারকে বারবার নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও যেভাবে পাত্তাই দেওয়া হয়নি, সেটা বিস্ময়কর। ধরে নেওয়া যাক, তারা কেউই ক্রিকেট অনুসরণ করেন না। তবুও যে দেশে ক্রিকেট এত জনপ্রিয়, সে দেশের পুলিশ হয়ে তারা জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয়টিকেই কীভাবে গুরুত্বহীন মনে করলেন? ‘সন্দেহভাজন’ কারও পরিচয় শনাক্ত করা বা নিশ্চিত হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি কি পুলিশ সদস্যরা অনুসরণ করেন না?

আর এখানেই চলে আসে নাঈমের তারকাখ্যাতি না থাকার বিষয়টি। এমনিতে ব্যক্তি হিসেবে তিনি বেশ লাজুক ও নম্র স্বভাবের। কথাও বলেন কম। আলাদা কোনো এজেন্সি রেখে নিজের প্রচারণার কাজ করেন না। আর সাদা বলের ক্রিকেট না খেলার কারণে বিজ্ঞাপনের বাজারেও তার খুব একটা কদর নেই। সব মিলিয়ে সাদামাটা একজন ক্রিকেটার যাকে বলে, নাঈম ঠিক সেটাই। মাঠে নিজের সেরাটা দেওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য।

তবে সেটাই যে একদিন এভাবে তাকে বিপদে ফেলতে পারে, কে জানত! এই কদিন আগেই আরেক টেস্ট বিশেষজ্ঞ সাদমান ইসলাম আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এই দেশে আর কেউ টেস্ট ক্রিকেটার হতে চাইবে না। যদিও তিনি কথাটা বলেছিলেন ভিন্ন বাস্তবতায়।

তবে নাঈমের ঘটনা যেন আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, জাতীয় দলে খেললেই সবাই সমান পরিচিত হয়ে যান না। জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে পিছিয়ে থাকলে নিজের পরিচয় প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার যদি পরিচয় দেওয়ার পরও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের অবস্থাটা কেমন হতে পারে, সেই প্রশ্নও উঠে আসে।

এই যখন বাস্তবতা, তখন আগামীতে কে চাইবে শুধু টেস্ট খেলতে? তামিম ইকবালের বোর্ডকে দিতে হবে এই প্রশ্নের উত্তর আর সরকারকে নিতে হবে কার্যকরী পদক্ষেপ। কেবল তাহলেই তরুণরা টেস্ট ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে চাইবেন।

সম্পর্কিত