বাংলাদেশ ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। এর সাথে সাথে বাড়ছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি)। বৈশ্বিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) দ্রুত অগ্রগতি এবং ডিজিটাল জনসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এ প্রক্রিয়াকে আরও জরুরি ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় ডিজিটাল রূপান্তর এখন আর একটি বিকল্প নয়, বরং টেকসই অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, সেবাপ্রদানকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, যা জনসেবা সহজীকরণ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আইসিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ই-গভর্ন্যান্স কার্যক্রম চালুর ফলে সরকারি সেবায় জবাবদিহি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নাগরিকরা দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা পাচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়ছে। সেবাপ্রদান উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও ডিজিটাল হেল্পডেস্কের মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাচ্ছেন। ফলে সময় ও খরচ কমছে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ব্যক্তি ও থানা পর্যায়ে জেলাভিত্তিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ বিষয়ক সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়–দেশে বর্তমানে কম্পিউটার ব্যবহারকারী ৯.১%, ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন ৫৬.২%, মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ৯৮.৯%, স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ৭২.৪%, ফিক্সড ফোন ব্যবহারকারী ০.৮%, রেডিও ব্যবহার করেন ১৫.১%, টেলিভিশন ৫৮.৯%, এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ৯৮.৯%। এই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে পরিসংখ্যানের জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রতিবেদন হতে। তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর অপব্যবহারও বেড়ে চলেছে, বেড়েছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাও। সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিনিয়ত অনলাইনে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই নারী।
ডিসেম্বর, ২০২৪-এ ইউএনএফপিএ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জন নারী জীবনে অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার। বাংলাদেশে প্রায় ৮৯% নারী ও কন্যা শিশু এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। ৯-১৪ বছর বয়স থেকেই টিএফজিবিভির ঝুঁকিতে থাকার প্রবণতা শুরু হয় এবং ১৮-৩০ বছরের তরুণীরা সবচেয়ে বেশি টিএফজিবিভির শিকার হন। ৭৫% ভুক্তভোগীই তাদের পরিবারকে এ বিষয়ে জানান না এবং কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থাও নেন না। টিএফজিবিভি প্রতিকারে বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে কার্যকরী উদ্যোগ পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডিব্লিউ)-এর রিপোর্ট (২০২৪) অনুযায়ী, তাদের কাছে এ পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ দায়ের হয়েছে, যার ৪১% ডক্সিংয়ের শিকার, ১৮% ফেসবুক আইডি হ্যাক, ১৭% ব্ল্যাকমেইল, ৯% ইমপার্সোনেশন, ৮% সাইবার বুলিংজনিত সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করেছেন।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’ বাংলাদেশের নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর উদ্বেগের ছবি তুলে ধরেছে। এই জরিপে দেখা গেছে, টিএফজিবিভির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে তরুণীরা। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ; ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ; আর ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, বয়স যত কম, অনলাইনে ঝুঁকিও তত বেশি। তবে এ সহিংসতা শুধু তরুণীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জরিপে দেখা গেছে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের মধ্যেও ১ দশমিক ৪ শতাংশ এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতার চরিত্রও বদলেছে। জরিপে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত নারীরাই তুলনামূলক বেশি টিএফজিবিভির লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। স্নাতক বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী নারীদের মধ্যে এর হার ১৮.৮ শতাংশ, এইচএসসি পাস নারীদের মধ্যে ১৬.৭ শতাংশ, আর এসএসসি পাস কিশোরীদের মধ্যে ১২.৮ শতাংশ। বিপরীতে, কমশিক্ষিত বা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নারীদের মধ্যে এ হার তুলনামূলক কম। বৈবাহিক অবস্থার বিচারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন বিবাহিত হলেও স্বামীর থেকে আলাদা বা দূরে বসবাসরত নারীরা; তাদের মধ্যে এই সহিংসতার হার ১৯.৮ শতাংশ।
এই জরিপের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা শুধু ডিভাইস-ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেন না–এমন নারীদের মধ্যেও ৩.৪ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে টিএফজিবিভির শিকার হয়েছেন। এই তথ্য স্পষ্ট করে যে, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত সহিংসতা কেবল অনলাইন পরিসরের সমস্যা নয়; এটি অফলাইনে থাকা নারীদের গোপনীয়তা, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকেও সমানভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিসহ দেশের উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে। কেননা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে অনলাইনে অনিরাপদ রেখে অগ্রগতির কোনো লক্ষ্য পূরণ করাই সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানো এবং সশ্লিষ্ট অংশীজন তথা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ সংগঠন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, নীতি-নির্ধারক এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা জোরালো করার মাধ্যমে আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে সকলের বিশেষ গ্রামীণ নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা ভীষণভাবে জরুরি। আর তাই প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং এটি প্রতিরোধ ও প্রশমনে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জানা-বোঝা একান্তভাবে জরুরি। জনসেবার ডিজিটাইজেশন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বিস্তার এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে প্রযুক্তি আজ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নাগরিকসেবা সহজতর করেছে, সময় ও ব্যয় কমিয়েছে এবং অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহারও ক্রমেই বাড়ছে। ডিজিটাল পরিসর এখন শুধু যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি বা ব্যবসার ক্ষেত্র নয়; এটি হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং নানামুখী সহিংসতারও ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। এসব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন অনেকেই, তবে নারী ও মেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এর প্রভাব পড়ছে তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনলাইন অংশগ্রহণ, মানসিক সুস্থতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্ব বিকাশের ওপর। ফলে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ এখন জরুরি নীতিগত ও সামাজিক অগ্রাধিকার।
প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, সংক্ষেপে টিএফজিবিভি, বলতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করে জেন্ডারের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা, হয়রানি, হুমকি, নজরদারি, অপমান, শোষণ বা ক্ষতিকর আচরণকে বোঝায়। এ ধরনের সহিংসতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে এবং তা এক বা একাধিক ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হতে পারে।
টিএফজিবিভির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেবল অনলাইন পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, মোবাইল ফোন, জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস, রেকর্ডিং যন্ত্র এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করেও এ ধরনের সহিংসতা সংঘটিত হতে পারে। সে কারণে এটি শুধু প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিষয় নয়; বরং জেন্ডার বৈষম্য, ক্ষমতার অসমতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাহীনতার একটি বহুমাত্রিক প্রকাশ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) বাস্তবায়ন করছে ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে। এতে অর্থায়ন করেছে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
এর মাধ্যমে দেশের জেলা পর্যায়ে এবং তৃণমূলে কমিউনিটি রেডিওকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি, সক্ষমতা উন্নয়ন, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারত্ব জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা জোরদার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো সচেতনতা সৃষ্টি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা, প্রাথমিক সহায়তা ও রেফারেল প্রদান, সামাজিক সংলাপ সৃষ্টি এবং নীতিপর্যায়ে স্থানীয় বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধরন, প্রভাব, প্রতিরোধ কৌশল, আইনি প্রতিকার, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে এ সংগঠনগুলোর সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। জেলাভিত্তিক এই কর্মশালার লক্ষ্য হলো–নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোকে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) বিষয়ে ধারণাগত স্পষ্টতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তি জোরদার করা। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন করবে, যাতে তারা টিএফজিবিভি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি জোরদার করে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের দ্রুত আইনি, সামাজিক ও মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার পথ সুদৃঢ় করতে পারে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন এবং ভুলতথ্য ও অপতথ্য যাচাইয়ের কৌশল বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করে এ বিষয়ে কাজ করতে পারে।
জেলা পর্যায়ে টিএফজিবিভি মোকাবিলায় প্রধান চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা কী, এর ধরন কী এবং কোথায় বা কীভাবে অভিযোগ করতে হয়, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী আনুষ্ঠানিক প্রতিকার ব্যবস্থার বাইরে থেকে যান, নীরবতা বৃদ্ধি পায় এবং সহিংসতার প্রকৃত মাত্রা আড়ালে থেকে যায়। সুনির্দিষ্ট আইন, নীতিমালা ও নির্দেশনার ঘাটতি টিএফজিবিভি মোকাবিলায় পৃথক ও সুস্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রোটোকলের অভাব লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি আইন রয়েছে, যা টিএফজিবিভি-এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০), পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন (২০১২) এবং সম্প্রতি প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইন (২০২৬)। এই আইনগুলো একটি ভিত্তি প্রদান করলেও বড় ধরনের ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। আইন প্রয়োগ প্রায়শই অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হতে পারে এবং অনেক ভুক্তভোগী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। তাছাড়া প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তন বিশেষ করে এআই-চালিত অপব্যবহার বিদ্যমান আইনি কাঠামোকে ছাড়িয়ে গেছে। ক্রমাগত আপডেট এবং শক্তিশালী প্রয়োগ পদ্ধতি ছাড়া, আইনি ব্যবস্থা যে সমস্যাটি সমাধান করতে চায়, তার চেয়ে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তবে রাজনৈতিক স্তরে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অনলাইন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সুরক্ষা জোরদার করার অঙ্গীকার করেছে। এই ইশতেহারে আইসিটি খাতের সম্প্রসারণ, উদীয়মান প্রযুক্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য জনবল প্রস্তুত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তরিত করতে হবে। টিএফজিবিভি মোকাবিলায় কেবল নীতিগত বিবৃতি নয়, বরং টেকসই বিনিয়োগ, সমন্বয় এবং জবাবদিহি প্রয়োজন। এক বছর ধরে বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা এবং ময়মনসিংহ এই ছয়টি জেলায় সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আইনজীবী এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরসহ ১,১০০-এরও বেশি অংশীজনকে যুক্ত করেছে। সংলাপ, কর্মশালা এবং পরামর্শের মাধ্যমে বেশ কিছু মূল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডিজিটাল বিপ্লব আধুনিক সমাজের কাঠামোকে মৌলিকভাবে পুনর্গঠন করেছে। এটি মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা গ্রহণ, লেনদেন, সংগঠিত হওয়া এবং নাগরিক জীবনে অংশগ্রহণের পদ্ধতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-গভর্ন্যান্স এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা কার্যক্রম–প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্তি ও ক্ষমতায়নের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে ডিজিটাল সম্প্রসারণ দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে ঘটেছে, এসব পরিবর্তনকে প্রায়ই উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু এই আশাব্যঞ্জক চিত্রের আড়ালে একটি কঠিন এবং ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা রয়েছে। যে প্রযুক্তি মানুষকে সংযুক্ত ও ক্ষমতায়িত করার প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই প্রযুক্তিই আজ নারীদের এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, শোষণ এবং নীরব করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ডিজিটাল যুগের অন্যতম জটিল, ব্যাপক এবং এখনও পর্যাপ্ত গুরুত্ব না পাওয়া একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক সমস্যা নয়; বরং এটি জেন্ডার বৈষম্য, সামাজিক বঞ্চনা এবং ক্ষমতার অসমতার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি পদ্ধতিগত সমস্যা। সমাজ যত বেশি ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, ততই এই সহিংসতার মোকাবিলায় ব্যর্থতা শুধু ব্যক্তির নিরাপত্তা ও মর্যাদাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের লক্ষ্যকেও বিপন্ন করছে।
টিএফজিবিভি-এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন হয়রানি, সাইবার স্টকিং, সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও প্রচার, পরিচয় চুরি, ডক্সিং, ব্ল্যাকমেইল, ঘৃণাত্মক বক্তব্য এবং যৌন শোষণসহ নানা ধরনের অপরাধ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে ডিপফেক ছবি ও ভিডিও তৈরির মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের মানহানি, অপমান এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশে টিএফজিবিভি মোকাবিলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে; যেমন–নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০; পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২; এবং সম্প্রতি প্রণীত সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬। যদিও এসব আইন একটি প্রাথমিক ভিত্তি প্রদান করে, তবুও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। আইনের প্রয়োগ প্রায়ই অসামঞ্জস্যপূর্ণ, বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল, এবং অনেক ভুক্তভোগীই তাদের অধিকার সম্পর্কে অবগত নন।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, বিশেষত এআই-নির্ভর অপব্যবহারের বিস্তার, বিদ্যমান আইনি কাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আইনকে নিয়মিত হালনাগাদ এবং কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত না করা হলে সমস্যা যত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে, আইন তত দ্রুত তার পেছনে পড়ে যাবে।
রাজনৈতিক পর্যায়েও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে অনলাইন জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সুরক্ষা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; সেগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে। টিএফজিবিভি মোকাবিলায় নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সমন্বিত উদ্যোগ এবং জবাবদিহি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, এই প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়ন করছে ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে এতে অর্থায়ন করেছে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
গত এক বছরে বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ এবং রাজধানী ঢাকাসহ ছয়টি জেলায় ২৫৪ জনেরও বেশি সাংবাদিককে সম্পৃক্ত করে। সাংবাদিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত কর্মশালাগুলোতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ উঠে আসে: নিম্ন ডিজিটাল সাক্ষরতা, নিবন্ধনবিহীন সিম কার্ডের ব্যবহার, এআই-নির্ভর অপব্যবহারের বৃদ্ধি, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, সীমিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, বাংলা ভাষায় অপর্যাপ্ত কনটেন্ট মডারেশন, সামাজিক কলঙ্ক এবং ব্যাপক মাত্রায় অভিযোগ না করার প্রবণতা। এসব পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে যে, জাতীয় পর্যায়ের নীতিমালার পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক ও প্রেক্ষিতনির্ভর উদ্যোগও অত্যন্ত জরুরি।
প্রথাগত সহিংসতার তুলনায় টিএফজিবিভি-এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যাপকতা, গতি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষতিকর কনটেন্ট কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। অপরাধীরা অনেক সময় পরিচয় গোপন রেখে কাজ করে, ফলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। একবার কোনো ক্ষতিকর তথ্য বা ছবি ছড়িয়ে পড়লে তা সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব, ফলে ভুক্তভোগীকে বারবার একই ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো ডিজিটাল পরিসরে স্বাভাবিকীকৃত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বৃহত্তর সংস্কৃতির অংশ। নারী, কিশোরী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক কর্মী এবং বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে ডিজিটাল সংযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোন, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে অনলাইন পরিসর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক নারী ও কিশোরী অনলাইন সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানালেও অধিকাংশ ঘটনা সামাজিক লজ্জা, প্রতিশোধের ভয় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অভাবে অপ্রকাশিত থেকে যায়।
টিএফজিবিভি-এর প্রভাব কেবল অনলাইন জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের ওপরও পড়ে। অনেক ভুক্তভোগী উদ্বেগ, হতাশা, মানসিক আঘাত এবং আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগেন। গুরুতর ক্ষেত্রে তারা শিক্ষা বা কর্মসংস্থান থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
এই সমস্যার প্রভাব ব্যক্তি পর্যায়ের বাইরেও বিস্তৃত। টিএফজিবিভি নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে। অনলাইনে মতামত প্রকাশের কারণে যখন নারীরা হয়রানির শিকার হন, তখন কার্যত তাদের ডিজিটাল অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
গণতন্ত্রের জন্য এর তাৎপর্য গভীর। বর্তমানে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, জনআলোচনা এবং নাগরিক সংগঠনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য মতের বৈচিত্র্যও সংকুচিত হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং বিদ্যমান বৈষম্য আরও শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশ একটি ডিজিটাল, জ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নারীরা যদি নিরাপদভাবে ডিজিটাল পরিসরে অংশ নিতে না পারে, তবে দেশ তার মানবসম্পদের একটি বড় অংশকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হবে।
টিএফজিবিভি-এর অর্থনৈতিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরে দাঁড়ানো নারীরা ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, ফ্রিল্যান্সিং, দূরবর্তী কর্মসংস্থান এবং পেশাগত নেটওয়ার্কের সুযোগ হারায়। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত আয়ের ওপর নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ওপরও পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি এমন একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যা জনমত গঠন করে, সামাজিক মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
টিএফজিবিভি মোকাবিলায় গণমাধ্যমের দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে, এটি নির্যাতন ও অপব্যবহারকে প্রকাশ করবে, অপরাধীদের জবাবদিহি আওতায় আনবত সহায়তা করবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে তুলে ধরবে। অন্যদিকে, এটি জনসচেতনতার অগ্রদূত হিসেবে জনগণকে শিক্ষিত করবে, ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করবে এবং সম্মান, সমতা ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। বিশেষত স্থানীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। তারা সম্প্রদায়ের কাছাকাছি অবস্থান করে, স্থানীয় বাস্তবতা বুঝতে পারে এবং উদীয়মান সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।
তবে এই সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। টিএফজিবিভি সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনে প্রায়ই গুরুতর ত্রুটি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিচয় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রকাশ করা হয়, যা তাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। আবার অনেক সময় সংবেদনশীলতার পরিবর্তে চটকদার উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ করে এবং ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক সম্পাদকীয় নীতিতে টিএফজিবিভি অগ্রাধিকার পায় না এবং অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমে জেন্ডার-সংবেদনশীল রিপোর্টিংয়ের স্পষ্ট নির্দেশিকা অনুপস্থিত। ফলে সাংবাদিকরা প্রয়োজনীয় নৈতিক ও পেশাগত কাঠামো ছাড়া কাজ করতে বাধ্য হন।
এ ছাড়া ডিপফেক, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং জটিল সাইবার হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতারও ঘাটতি রয়েছে, বিশেষত জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে। একই সময়ে সাংবাদিকরাও অনলাইন হয়রানি ও ভয়ভীতির শিকার হচ্ছেন।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে নৈতিক সংস্কার জরুরি। ভুক্তভোগীর মর্যাদা, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জেন্ডার-সংবেদনশীল সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই, ট্রমা-সচেতন রিপোর্টিং এবং সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, সম্পাদকীয় নেতৃত্বকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সংবাদ অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও বিষয়ের উপস্থাপনার ক্ষেত্রে সম্পাদকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থত, সংবাদমাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। এটি শুধু বৈচিত্র্য নিশ্চিত করবে না, বরং রিপোর্টিংয়ের মান উন্নত করবে এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
পঞ্চমত, গণমাধ্যমকে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। নাগরিকদের আইনি অধিকার, অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি এবং নিরাপদ ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। সাম্প্রতিক জেলা-পর্যায়ের কর্মশালাগুলো দেখিয়েছে যে, সীমাবদ্ধতা থাকলেও সম্ভাবনাও কম নয়। সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং আইন বিশেষজ্ঞরা সচেতনতার ঘাটতি, তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা, দুর্বল সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবের কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তারা বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, অগ্রগতি সম্ভব। তবে সেগুলোকে সম্প্রসারণ, ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় কৌশলের সঙ্গে একীভূত করতে হবে।
সবশেষে, টিএফজিবিভি কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি গভীর সামাজিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক মানসিকতার প্রতিফলন। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হতে পারে গণমাধ্যম। কেবল ঘটনাভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান, ক্ষতিকর সামাজিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং সমতা ও সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে নেতৃত্ব দিতে হবে। ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিলে সহমর্মিতা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আইন কার্যকর হয়, নীতিমালা বাস্তবায়িত হয় এবং ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ হয়। এটি হতে পারে জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন।
টিএফজিবিভি মোকাবিলার লড়াই জরুরি, সমন্বিত এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রচেষ্টা দাবি করে। সরকার, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ–সবারই ভূমিকা রয়েছে। তবে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য গণমাধ্যম একটি অনন্য অবস্থানে রয়েছে। তার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রভাবের মাধ্যমে গণমাধ্যম জনমত গঠন করতে পারে, সমাজকে সংগঠিত করতে পারে এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। নৈতিক সাংবাদিকতা চর্চা, দক্ষতা বৃদ্ধি, অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ এবং জনস্বার্থভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে গণমাধ্যম ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।
চ্যালেঞ্জ বড়, কিন্তু সম্ভাবনাও বিশাল। যে ডিজিটাল প্রযুক্তি ক্ষতির কারণ হতে পারে, সেই প্রযুক্তিই আবার কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করতে, সংহতি গড়ে তুলতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পথ সুস্পষ্ট। এখন প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সদিচ্ছা। ক্রমবর্ধমান এবং পরিবর্তনশীল এই হুমকির মুখে গণমাধ্যমকে শুধু পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তাকে নেতৃত্ব দিতে হবে সাহস, সততা এবং মানবাধিকারের প্রতি অটল অঙ্গীকার নিয়ে। তবেই আমরা এমন একটি ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যা শুধু সংযুক্ত নয়, বরং নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সবার জন্য ন্যায়ভিত্তিক।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক