একসময় এই দেশে রাজনীতি হতো চায়ের কাপের ঝড়, মাইকের চিৎকার আর পানের দোকানের ফিসফাসে। গভীর রাতে কেউ ফোন করে বলত, ‘হ্যালো... খবর আছে।’ পরদিন পুরো শহর সেই খবর নিয়ে গরম। তারপর এল অডিও ফাঁসের যুগ। মনে হয়েছিল, প্রযুক্তি বুঝি এখানেই থামবে। কিন্তু বাঙালি জাতি থেমে থাকার জন্য জন্মায়নি। আমরা এখন অডিও পেরিয়ে ভিডিও সভ্যতায় উন্নীত হয়েছি। দেশে গণতন্ত্র কতটা আছে, সেটা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তর্ক করতে পারেন। কিন্তু ভিডিওতন্ত্রের যে রমরমা চলছে, এ নিয়ে কোনো মতভেদ নেই।
এখন আর রাজনীতি বুঝতে অ্যারিস্টটল, ম্যাকিয়াভেলি বা রুশো পড়তে হয় না। একটা স্মার্টফোন, দশ মেগাবাইট ইন্টারনেট আর ফেসবুক আইডি থাকলেই আপনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিচারপতি এবং নৈতিকতার শেষ ঠিকাদার।
এই দেশে নতুন কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়া মানে ছোটখাটো জাতীয় উৎসব। ঈদের চাঁদ দেখার আগ্রহও সম্ভবত এতটা থাকে না। ভিডিও আপলোড হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হয় মহাযজ্ঞ। কেউ ভিডিও দেখার আগেই মতামত দিয়ে ফেলেন। মতামত কী, রায়ও ঘোষণা করে দেন! আর যারা কিছুই বুঝতে পারেন না, তারাই সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লিখে দেন, ‘সব বুঝে গেছি!’
ভিডিও প্রকাশের পর দেশের রাজনৈতিক নাটকের স্ক্রিপ্টও একেবারে বাঁধাধরা। প্রথমেই আসে বিবৃতি। বলা হয়, এটি গভীর ষড়যন্ত্র। কিছুক্ষণ পর আরেক বিবৃতি আসে, এটি আসলে ব্ল্যাকমেইল। তারপর আরেকজন জানান, এর পেছনে চাঁদাবাজ চক্র আছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ভিডিও পাঁচ শ শতাংশ জুম করে দেখিয়ে দেন, ডান কানের ছায়া বাম কানের সঙ্গে মিলছে না, অতএব এটি ডিপফেক। প্রশাসন বলে, তদন্ত কমিটি হচ্ছে। তদন্ত কমিটি হওয়ার আগেই ফেসবুকের তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়ে দেয়। আদালত বসার আগেই কমেন্ট বক্সে ফাঁসির রায় হয়ে যায়।
আমাদের দেশে এখন মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত নয়, সাত ভাগে বিভক্ত। একদল বলে ত্রিশ সেকেন্ডই যথেষ্ট। সত্য কখনো লম্বা হয় না। আরেকদল বলে, পাঁচ মিনিটের কম ভিডিও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তৃতীয় দল বলে, পুরো ভিডিও না দেখলে কিছুই বোঝা যাবে না। চতুর্থ দল বলে, ভিডিও না দেখেই বুঝে ফেলেছি। পঞ্চম দল শুধু কমেন্ট পড়ে সিদ্ধান্ত নেয়। ষষ্ঠ দল অন্যের কমেন্টের স্ক্রিনশট দেখে মত গড়ে। আর সপ্তম দল সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু একটি প্রশ্ন করে, ‘ভাই, পার্ট টু কই?’
দেশের সবচেয়ে বড় আদালতের নাম এখন আর সুপ্রিম কোর্ট নয়। সবচেয়ে বড় আদালতের নাম ফেসবুকের কমেন্ট সেকশন। এখানে বিচারপতির সংখ্যা কয়েক কোটি। সবাই একই সঙ্গে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, সাইবার বিশ্লেষক, মনোবিজ্ঞানী, চরিত্র মূল্যায়নকারী এবং ভিডিও এডিটিং বিশেষজ্ঞ। একজন হয়তো বাজারে চাল বিক্রি করছেন, কিন্তু ফেসবুকে এসে এমনভাবে পিক্সেল বিশ্লেষণ করছেন, যেন গত পনেরো বছর তিনি বিশ্বের সেরা কোনো ভিডিও ল্যাবে চাকরি করেছেন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই দেশে ঘটনা কখনো বড় নয়, বড় হলো ব্যাখ্যা। একটা ঘটনার চেয়ে তার ব্যাখ্যা বেশি ভাইরাল হয়। ব্যাখ্যার ব্যাখ্যা আরও ভাইরাল হয়। তারপর সেই ব্যাখ্যার প্রতিবাদ আসে। প্রতিবাদের প্রতিবাদ আসে। শেষে এমন অবস্থা হয় যে, মূল ঘটনাটা কোথায় ছিল, সেটা খুঁজে বের করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমতি লাগে।
একটা ভিডিও ঢাকতে একটা অডিও আসে। অডিও সামলাতে লিখিত বিবৃতি আসে। বিবৃতির ভুল ধরতে লাইভ আসে। লাইভের জবাবে প্রেস কনফারেন্স হয়। প্রেস কনফারেন্সের জবাবে আরেক ভিডিও আসে। তারপর সবাই মিলে ঘোষণা করে, সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সত্যটা ঠিক কোনটা, সেটি কেউ আর মনে করতে পারে না।
তবে এত ভিডিও, এত অডিও, এত বিবৃতি, এত প্রেস কনফারেন্স, এত লাইভ, এত ট্রোল, এত ফ্যাক্টচেকের পরও জাতির মনে একটি প্রশ্নই চিরকাল অপূর্ণ থেকে যায়।
প্রশ্নটি ভিডিওতে কে ছিল, সেটা নয়। প্রশ্নটি কে কী করল, সেটাও নয়। প্রশ্নটি হলো, ভিডিওটা করল কে?
এই মানুষটি যেন আমাদের সময়ের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র। চারপাশে যা-ই ঘটুক, তার হাত কাঁপে না। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও তিনি ক্যামেরা স্ট্যাবিলাইজ করে শট নেন। সবাই যখন পালাচ্ছে, তিনি তখন অ্যাঙ্গেল ঠিক করছেন। সবাই যখন চিৎকার করছে, তিনি তখন ভাবছেন, ‘ল্যান্ডস্কেপে নাকি পোর্ট্রেটে নেব?’
হলিউডে সুপারহিরো থাকে। আমাদের দেশে সুপারহিরো নয়, সুপার ক্যামেরাম্যান থাকে। তিনি সব জায়গায় উপস্থিত, কিন্তু কোথাও দৃশ্যমান নন। তিনি ইতিহাসের নেপথ্য নায়ক। ভিডিও ভাইরাল হয়, মানুষ ধরা পড়ে, সরকার নড়ে, দল বিবৃতি দেয়, ট্রোলাররা উৎসব করে, কিন্তু ক্যামেরাম্যান রয়ে যান অধরা। তিনি যেন কোয়ান্টাম কণার মতো, তার অস্তিত্বের প্রমাণ আছে, অবস্থান জানা যায় না।
আর ঠিক যেদিন মনে হয়, এবার বুঝি সেই রহস্যের সমাধান হবে, সেদিনই অন্য কোনো কোণ থেকে আরেকটি ভিডিও বেরিয়ে আসে। জাতি আবার সব ভুলে নতুন ভিডিওর নিচে ভিড় জমায়। কমেন্ট বক্সে প্রথমেই লেখা হয়, ‘ভাই, ফুল ভিডিও দেন।’ দ্বিতীয় কমেন্ট, ‘পার্ট টু কবে?’ তৃতীয় কমেন্ট, ‘এডিটিংটা ভালো, কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আরও জমতে পারত।’
আমরা সত্যিই ভাগ্যবান জাতি। পৃথিবীর অন্য দেশে রাজনীতি হয় সংসদে। আমাদের দেশে হয় সিসিটিভিতে!
পাদটিকা: অপকর্ম করতে চাইলে করুন, কিন্তু বুঝেশুনে। নিজের প্রবৃত্তির বাইরে যাবেন না। কারণ, অবদমন সব সময় ভালো নয়। কিন্তু যা কিছুই করুন না কেন, সাবধানে, একটু দেখেশুনে করুন। অন্তত চারদিকে একবার তাকিয়ে নেবেন। আগে দেয়ালেরও কান ছিল। এখন দেয়ালের চোখও আছে। শুধু ঘরে নয়, রাস্তায় নয়, আকাশেও ক্যামেরা। সবখানে সিসিটিভি। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা নাকি বিদেশে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবন কাটান। যাদের সে সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য সবচেয়ে সস্তা এবং সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প একটাই। ভালো মানুষ হয়ে যান। ভালো হতে কিন্তু পয়সা লাগে না!
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক