পর্ব ২
অর্ণব সান্যাল

আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতার বাইরে আলাদা করে ফ্যাক্ট-চেকিং চালু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। এ দেশে এখনো এমন একটি মনোভাব চালু আছে যে, ফ্যাক্ট-চেক করা মানেই সেটি অবধারিত সত্য! এ ধরনের মনোভাব ছড়ানোর পেছনে ফ্যাক্ট-চেকারদেরও অবদান আছে। প্রচলিত সংবাদমাধ্যমকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে গিয়েই এমনটা করা হয়েছে বা এমন মনোভাব গড়ে উঠেছে কিছুটা। হ্যাঁ, প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতাই এ দেশে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে বটে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি নিরপেক্ষ কি না, সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।
কথা হলো, কীভাবে পক্ষপাত প্রকাশিত হয়? ধরুন, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক আদর্শের পক্ষে যায়–এমন ঘটনা খুবই দ্রুত গতিতে আতস কাচের নিচে পড়ল। তা হয়তো ডিবাংক করাও হলো। আবার, অন্য কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক আদর্শের বিপক্ষে যায়–এমন ঘটনাও খুব দ্রুত গতিতে আতস কাচের নিচে নিয়ে আসা হলো। তার সত্যাসত্য নির্ধারণ করে ফেলা হলো। এই দুটি প্রক্রিয়াতেই কোনো একটি পক্ষ লাভবান হবে, আরেকটি পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন এমন কর্মকাণ্ড যদি নিয়মিত বিরতিতে একই রকমভাবে ঘটতে থাকে পরপর, তাহলে বুঝতেই হবে যে, সেখানে স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকার বা ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান কোনো একটি পক্ষে ঝুঁকে রয়েছে। এই প্রবণতা যতই ঢেকে রাখার চেষ্টা হোক না কেন, সেটি এক না একদিন প্রকাশ্যে আসে। আর তখনই কোনটা প্রোপাগান্ডা চালানোর মেশিন, কোনটা আদতেই নিরপেক্ষ ফ্যাক্ট-চেকিং–তা নিয়ে সংশয় উঠে যায়।
স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে বেশির ভাগ সময়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ইস্যু নিয়েই কাজ করতে দেখা যায়। হালে চালু হয়েছে এআই জেনারেটেড কনটেন্ট ডিটেকশন। সমস্যা হলো–কোনো এআই ডিটেকশন সফটওয়্যার কখনোই শতভাগ নিশ্চিত হয় না কোনটি এআই জেনারেটেড, সে বিষয়ে। এবং কখনো কখনো এমনও দেখা গেছে যে, একটি ডিটেকশন সফটওয়্যার হয়তো একটি কনটেন্টের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ সম্ভাবনা দেখিয়েছে যে, সেটি এআই জেনারেটেড। পরে ম্যানুয়াল চেকের পর দেখা গেছে যে, সেটি আসল! হ্যাঁ, এমনটা হরদমই হয়। এবং তাই কোনো এআই ডিটেকশন সফটওয়্যার কখনো শতভাগ নিশ্চয়তার দাবিও করে না।
তবে আমাদের দেশের প্রচলিত ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রায় সময়ই এমন সফটওয়্যারে পাওয়া ফলাফল বেশ বিরাট আকারে উপস্থাপন করা হয়। যদিও যে সতর্কীকরণের বিষয়টি আছে, সেটি কিছুটা অনুচ্চারে থেকে যায়। আর আমাদের দেশের নেটিজেনদের এ-সংক্রান্ত জানাশোনার গড় মান যেমন, তাতে করে মৃদু উচ্চারিত, অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি একেবারে হারিয়েই যায়। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু ভুল বিষয়ও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এদেশের মানুষ বাস্তবের সামাজিক কিংবা ভার্চুয়াল সামাজিক পরিসরেও ‘চিলে কান নিয়েছে’ তত্ত্বে বিশ্বাসী।
এই চিলে কান নেওয়ার তত্ত্বে আবার এমন কিছু ব্যক্তিত্বকেও আমরা নাচতে দেখেছি, যাতে তাদের অধীনে থাকা ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠে যায়। প্রায় দেড় বছর আগে, চট্টগ্রামের একটি পূজা মণ্ডপে ইসলামী সংগীত পরিবেশনের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে এ দাবির বিপরীতে সত্যিকারের সত্যাসত্য বিচারের আগেই দুজন ব্যক্তি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ওই ভিডিওকে ‘ফেক’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাদের একজন ছিলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাক্ট-চেকিং সংক্রান্ত একটি উইং-এর প্রধান। ফ্যাক্ট-চেকিং বিষয়ে নানা সময়ে তিনি নানা পরামর্শ দিয়ে গেছেন পেশাদার সাংবাদিকদেরও। অথচ সেই শিক্ষকই এক কথায় ‘ফেক’ বলে দিয়েছিলেন সেই সত্যিকারের ভিডিওকে। পরে যখন ঘটনা সত্যি বলে প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তখন অবশ্য ওই শিক্ষক স্রেফ দুঃখপ্রকাশ করেই পার পেয়েছিলেন। অথচ, ফ্যাক্ট-চেকিং নিয়ে সিরিয়াস কাজ করা একজন ব্যক্তির পক্ষে কোনোভাবেই কোনো ঘটনার সত্যাসত্য বিচার ছাড়া সেটি নিয়ে রায় দেওয়া উচিত ছিল না। যদি না কেউ আগে থেকে ঠিক করে নেয় যে, কোনটিকে সত্য বলে মানবে, আর কোনটিকে মিথ্যা।
একই ঘটনাকে ‘ফেক’ বলে ফেসবুকে রায় দেওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তিটি ছিলেন সংবাদমাধ্যম নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নধর্মী কাজের দায়িত্বে থাকা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের হর্তাকর্তা। তার প্রতিষ্ঠান থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সরকারি উদ্যোগে। আর সেই কর্তাব্যক্তিটি কোনো বিচার ছাড়া শুরুতেই বলে দিয়েছিলেন, এমন ঘটনা ঘটতেই পারে না। এটি ফেক। আর ঘটি উল্টানোর পর করেছিলেন ‘দুঃখপ্রকাশ’।

তো, এসব ক্ষেত্রে যদি ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের সাথে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে জড়িত পদস্থ কেউ এমন আচরণ করে থাকে, তবে কি তাদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না? ওঠাটাই স্বাভাবিক। যেমন: বাংলাদেশের একটি ‘বিশিষ্ট ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দাবি করা একটি সংস্থার দেশীয় প্রধান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে সরকারি যেকোনো বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের প্রতিবাদ করতেন। এমনকি সরকার কর্তৃক পরিবেশিত তথ্য পরিবেশনের দায়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে মেটা থেকে পাওয়া তৎকালীন ক্ষমতাসূত্রে ফ্যাক্ট-চেকিং বিষয়ক নেগেটিভ ফ্ল্যাগ তোলার কাজটিতেও অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। অথচ ৫ আগস্টের পর তাকে প্রকাশ্যে ফেসবুক স্ট্যাটাসে পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করতে দেখেছে মানুষ। ঠিক যেভাবে একজন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তি ক্ষমতার রাজনৈতিক পালাবদলে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলে এবং পছন্দের ক্ষমতাসীনের দোষ চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, ঠিক তেমন পরিবর্তনই এক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। সেক্ষেত্রে ফ্যাক্ট-চেকিং নিয়ে এ ধরনের ব্যক্তিবর্গের দেওয়া নসিহত মানা কতটা ঠিক, সেই সংশয় মনে গেঁড়ে বসাও বিচিত্র নয়!
ওদিকে এ দেশে সরকারি উদ্যোগে বেশ জোরেশোরে ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রম চলেছে এই কিছুদিন আগেও। সরকার পরিবর্তনের পর তাতে একটু ভাটা পড়েছে হয়তো। তবে এর আগে যেসব ফ্যাক্ট-চেকিং কর্মকাণ্ড চলেছে, তা অনেকাংশেই কেবল সরকারের পক্ষ সমর্থনমূলক কর্মকাণ্ড। ফ্যাক্ট-চেকিং বলতে যা বোঝায়, তেমন আসলে কিছু নয়। এর জন্য ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’-এর মতো গালভরা নাম দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বললেই হয় যে, সরকারের হয়ে ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু তা না করে, ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের নামে আসলে সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়া সব ধরনের সংবাদকে গণহারে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ফেক নিউজ’ বলে দেওয়ার ট্রাম্পীয় মনোভাবে আস্থা রাখার শুরু। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে সব বিপক্ষে যাওয়া সংবাদকে ‘ফেক’ বলে দেন, ঠিক সেভাবেই দেশের সব সংবাদমাধ্যমকে কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় ‘ফেক’ লেবেল দেওয়ার তাড়নাতেই যেন সরকারিভাবে শুরু হলো ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রম। তা না হলে কি আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও প্রকাশিত একটি সূচকে দেশের অবস্থা প্রকাশক সোশ্যাল কার্ডকেও ফ্যাক্ট-চেকের নামে ‘মিসলিড’ বা ‘ফেক’ লেবেল দেওয়া হয় সরকারিভাবে!
কিন্তু এ দেশের সব ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমই কি এমন? নাহ্, তা অবশ্যই নয়। কোনো কোনো স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকার বা ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান অবশ্যই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে রয়েছে, নইলে তো আর মিস, ডিস বা ম্যাল-ইনফরমেশন ডিবাংকের কাজটি কণামাত্রও হতো না। তবে ওপরে বর্ণিত পরিস্থিতি এই দেশে প্রবলভাবে বিরাজমান। সেই হিসেবে বলতেই হয় যে, এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে যেমন পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে, ঠিক তেমনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমও একই দোষে দুষ্ট হয়েছে।
তাই বর্তমানে যেভাবে আমরা সংবাদমাধ্যমগুলোর ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করি, সমাধানের পথ খুঁজি, ঠিক সেভাবেই এ দেশের ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমকেও নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ‘গুপ্ত’ আছে সবখানেই! তাই ফ্যাক্ট-চেকড কোনো তথ্যকেই একেবারে ‘উত্তম সত্য’ হিসেবে চোখ বন্ধ করে গ্রহণ করার দিন শেষ। বরং সন্দেহপ্রবণ হলেই বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমবে, ঠিক যেমনটা মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ এই বিশেষায়িত খাতেও যে একচোখা নীতি ভালোভাবেই চলে, তা ইতিমধ্যেই দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতার বাইরে আলাদা করে ফ্যাক্ট-চেকিং চালু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। এ দেশে এখনো এমন একটি মনোভাব চালু আছে যে, ফ্যাক্ট-চেক করা মানেই সেটি অবধারিত সত্য! এ ধরনের মনোভাব ছড়ানোর পেছনে ফ্যাক্ট-চেকারদেরও অবদান আছে। প্রচলিত সংবাদমাধ্যমকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে গিয়েই এমনটা করা হয়েছে বা এমন মনোভাব গড়ে উঠেছে কিছুটা। হ্যাঁ, প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতাই এ দেশে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে বটে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি নিরপেক্ষ কি না, সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।
কথা হলো, কীভাবে পক্ষপাত প্রকাশিত হয়? ধরুন, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক আদর্শের পক্ষে যায়–এমন ঘটনা খুবই দ্রুত গতিতে আতস কাচের নিচে পড়ল। তা হয়তো ডিবাংক করাও হলো। আবার, অন্য কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক আদর্শের বিপক্ষে যায়–এমন ঘটনাও খুব দ্রুত গতিতে আতস কাচের নিচে নিয়ে আসা হলো। তার সত্যাসত্য নির্ধারণ করে ফেলা হলো। এই দুটি প্রক্রিয়াতেই কোনো একটি পক্ষ লাভবান হবে, আরেকটি পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন এমন কর্মকাণ্ড যদি নিয়মিত বিরতিতে একই রকমভাবে ঘটতে থাকে পরপর, তাহলে বুঝতেই হবে যে, সেখানে স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকার বা ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান কোনো একটি পক্ষে ঝুঁকে রয়েছে। এই প্রবণতা যতই ঢেকে রাখার চেষ্টা হোক না কেন, সেটি এক না একদিন প্রকাশ্যে আসে। আর তখনই কোনটা প্রোপাগান্ডা চালানোর মেশিন, কোনটা আদতেই নিরপেক্ষ ফ্যাক্ট-চেকিং–তা নিয়ে সংশয় উঠে যায়।
স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে বেশির ভাগ সময়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ইস্যু নিয়েই কাজ করতে দেখা যায়। হালে চালু হয়েছে এআই জেনারেটেড কনটেন্ট ডিটেকশন। সমস্যা হলো–কোনো এআই ডিটেকশন সফটওয়্যার কখনোই শতভাগ নিশ্চিত হয় না কোনটি এআই জেনারেটেড, সে বিষয়ে। এবং কখনো কখনো এমনও দেখা গেছে যে, একটি ডিটেকশন সফটওয়্যার হয়তো একটি কনটেন্টের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ সম্ভাবনা দেখিয়েছে যে, সেটি এআই জেনারেটেড। পরে ম্যানুয়াল চেকের পর দেখা গেছে যে, সেটি আসল! হ্যাঁ, এমনটা হরদমই হয়। এবং তাই কোনো এআই ডিটেকশন সফটওয়্যার কখনো শতভাগ নিশ্চয়তার দাবিও করে না।
তবে আমাদের দেশের প্রচলিত ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রায় সময়ই এমন সফটওয়্যারে পাওয়া ফলাফল বেশ বিরাট আকারে উপস্থাপন করা হয়। যদিও যে সতর্কীকরণের বিষয়টি আছে, সেটি কিছুটা অনুচ্চারে থেকে যায়। আর আমাদের দেশের নেটিজেনদের এ-সংক্রান্ত জানাশোনার গড় মান যেমন, তাতে করে মৃদু উচ্চারিত, অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি একেবারে হারিয়েই যায়। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু ভুল বিষয়ও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এদেশের মানুষ বাস্তবের সামাজিক কিংবা ভার্চুয়াল সামাজিক পরিসরেও ‘চিলে কান নিয়েছে’ তত্ত্বে বিশ্বাসী।
এই চিলে কান নেওয়ার তত্ত্বে আবার এমন কিছু ব্যক্তিত্বকেও আমরা নাচতে দেখেছি, যাতে তাদের অধীনে থাকা ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠে যায়। প্রায় দেড় বছর আগে, চট্টগ্রামের একটি পূজা মণ্ডপে ইসলামী সংগীত পরিবেশনের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে এ দাবির বিপরীতে সত্যিকারের সত্যাসত্য বিচারের আগেই দুজন ব্যক্তি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ওই ভিডিওকে ‘ফেক’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাদের একজন ছিলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাক্ট-চেকিং সংক্রান্ত একটি উইং-এর প্রধান। ফ্যাক্ট-চেকিং বিষয়ে নানা সময়ে তিনি নানা পরামর্শ দিয়ে গেছেন পেশাদার সাংবাদিকদেরও। অথচ সেই শিক্ষকই এক কথায় ‘ফেক’ বলে দিয়েছিলেন সেই সত্যিকারের ভিডিওকে। পরে যখন ঘটনা সত্যি বলে প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তখন অবশ্য ওই শিক্ষক স্রেফ দুঃখপ্রকাশ করেই পার পেয়েছিলেন। অথচ, ফ্যাক্ট-চেকিং নিয়ে সিরিয়াস কাজ করা একজন ব্যক্তির পক্ষে কোনোভাবেই কোনো ঘটনার সত্যাসত্য বিচার ছাড়া সেটি নিয়ে রায় দেওয়া উচিত ছিল না। যদি না কেউ আগে থেকে ঠিক করে নেয় যে, কোনটিকে সত্য বলে মানবে, আর কোনটিকে মিথ্যা।
একই ঘটনাকে ‘ফেক’ বলে ফেসবুকে রায় দেওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তিটি ছিলেন সংবাদমাধ্যম নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নধর্মী কাজের দায়িত্বে থাকা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের হর্তাকর্তা। তার প্রতিষ্ঠান থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সরকারি উদ্যোগে। আর সেই কর্তাব্যক্তিটি কোনো বিচার ছাড়া শুরুতেই বলে দিয়েছিলেন, এমন ঘটনা ঘটতেই পারে না। এটি ফেক। আর ঘটি উল্টানোর পর করেছিলেন ‘দুঃখপ্রকাশ’।

তো, এসব ক্ষেত্রে যদি ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের সাথে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে জড়িত পদস্থ কেউ এমন আচরণ করে থাকে, তবে কি তাদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না? ওঠাটাই স্বাভাবিক। যেমন: বাংলাদেশের একটি ‘বিশিষ্ট ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দাবি করা একটি সংস্থার দেশীয় প্রধান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে সরকারি যেকোনো বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের প্রতিবাদ করতেন। এমনকি সরকার কর্তৃক পরিবেশিত তথ্য পরিবেশনের দায়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে মেটা থেকে পাওয়া তৎকালীন ক্ষমতাসূত্রে ফ্যাক্ট-চেকিং বিষয়ক নেগেটিভ ফ্ল্যাগ তোলার কাজটিতেও অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। অথচ ৫ আগস্টের পর তাকে প্রকাশ্যে ফেসবুক স্ট্যাটাসে পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করতে দেখেছে মানুষ। ঠিক যেভাবে একজন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তি ক্ষমতার রাজনৈতিক পালাবদলে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলে এবং পছন্দের ক্ষমতাসীনের দোষ চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, ঠিক তেমন পরিবর্তনই এক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। সেক্ষেত্রে ফ্যাক্ট-চেকিং নিয়ে এ ধরনের ব্যক্তিবর্গের দেওয়া নসিহত মানা কতটা ঠিক, সেই সংশয় মনে গেঁড়ে বসাও বিচিত্র নয়!
ওদিকে এ দেশে সরকারি উদ্যোগে বেশ জোরেশোরে ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রম চলেছে এই কিছুদিন আগেও। সরকার পরিবর্তনের পর তাতে একটু ভাটা পড়েছে হয়তো। তবে এর আগে যেসব ফ্যাক্ট-চেকিং কর্মকাণ্ড চলেছে, তা অনেকাংশেই কেবল সরকারের পক্ষ সমর্থনমূলক কর্মকাণ্ড। ফ্যাক্ট-চেকিং বলতে যা বোঝায়, তেমন আসলে কিছু নয়। এর জন্য ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’-এর মতো গালভরা নাম দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বললেই হয় যে, সরকারের হয়ে ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু তা না করে, ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের নামে আসলে সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়া সব ধরনের সংবাদকে গণহারে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ফেক নিউজ’ বলে দেওয়ার ট্রাম্পীয় মনোভাবে আস্থা রাখার শুরু। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে সব বিপক্ষে যাওয়া সংবাদকে ‘ফেক’ বলে দেন, ঠিক সেভাবেই দেশের সব সংবাদমাধ্যমকে কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় ‘ফেক’ লেবেল দেওয়ার তাড়নাতেই যেন সরকারিভাবে শুরু হলো ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রম। তা না হলে কি আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও প্রকাশিত একটি সূচকে দেশের অবস্থা প্রকাশক সোশ্যাল কার্ডকেও ফ্যাক্ট-চেকের নামে ‘মিসলিড’ বা ‘ফেক’ লেবেল দেওয়া হয় সরকারিভাবে!
কিন্তু এ দেশের সব ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমই কি এমন? নাহ্, তা অবশ্যই নয়। কোনো কোনো স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকার বা ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান অবশ্যই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে রয়েছে, নইলে তো আর মিস, ডিস বা ম্যাল-ইনফরমেশন ডিবাংকের কাজটি কণামাত্রও হতো না। তবে ওপরে বর্ণিত পরিস্থিতি এই দেশে প্রবলভাবে বিরাজমান। সেই হিসেবে বলতেই হয় যে, এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে যেমন পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে, ঠিক তেমনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমও একই দোষে দুষ্ট হয়েছে।
তাই বর্তমানে যেভাবে আমরা সংবাদমাধ্যমগুলোর ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করি, সমাধানের পথ খুঁজি, ঠিক সেভাবেই এ দেশের ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমকেও নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ‘গুপ্ত’ আছে সবখানেই! তাই ফ্যাক্ট-চেকড কোনো তথ্যকেই একেবারে ‘উত্তম সত্য’ হিসেবে চোখ বন্ধ করে গ্রহণ করার দিন শেষ। বরং সন্দেহপ্রবণ হলেই বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমবে, ঠিক যেমনটা মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ এই বিশেষায়িত খাতেও যে একচোখা নীতি ভালোভাবেই চলে, তা ইতিমধ্যেই দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট