শুক্রবার চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্তমানে সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুত আছে। এর আগে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে এক লাখ ১৩ হাজার ৮৫ টন ডিজেল, ৩১ হাজার ৮২১ টন অকটেন, ১৮ হাজার ২১ টন পেট্রোল ও ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন ফার্নেস অয়েল আছে।
মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় যখন দেশবাসীকে আশার বাণী শোনাচ্ছেন, তখন বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুক্রবার বেলা ১১টায় রাজধানীর পরীবাগের একটি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার তেলের জন্য অপেক্ষায় ছিল এক হাজার ১১টি যান। মৎস্য ভবনের আরেকটি ফিলিং স্টেশনেও অপেক্ষায় ছিল ৪২২টি মোটরসাইকেল ও ৩৫৮টি প্রাইভেট কার।
কেবল এই দুটি স্টেশন নয়, দেশের বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনের চিত্র এক। শহর ও মহাসড়কের অনেক ফিলিং স্টেশনের সামনে তেল নেই ব্যানার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
এই জ্বালানি সংকটের কারণে কেবল পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে না, এর অভিঘাত এসে পড়েছে কৃষি, শিল্পকারখানা ও ব্যবসা বাণিজ্যেও। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকার প্রথমে ঢাকা শহরের দোকানপাট ও শপিং মল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। পরে ব্যবসায়ীদের অনুরোধে এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়। অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রী জ্বালানি সাশ্রয় করতে মহানগরীর কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও অফ লাইনে ক্লাস চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। জ্বালানি নিয়ে জনমনে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা আছে। এই সুযোগে এক শ্রেণির মানুষ বাড়তি মজুত করছেন।
জ্বালানি সংকটের পাশপাশি হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন প্রথমে বললেন, ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার আট বছর ধরে টিকা না কেনার জন্য হামের চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না। পরে দেখা গেল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই টিকা কেনা হয়েছে সবচেয়ে কম। জনসচেতনতার জন্য যে প্রচার প্রয়োজন, সেটাও বন্ধ ছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ এপ্রিল থেকে সরকার টিকা দেওয়া শুরু করলেও খুব শিগগিরই সুখবর পাওয়ার সম্ভাবনা কম। হামের প্রভাব আরও এক মাস থাকবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারণা।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিন পরই ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বেধে যায়; যাতে জ্বালানি আমদানি নির্ভর বাংলাদেশ মারাত্মক সংকটে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে লুকোচুরি না করে জনগণের সামনে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরলে সরকারের জন্য যেমন দায়িত্বশীল আচরণ হতো, জনগণও কিছুটা স্বস্তি পেত। সেটা স্বস্তিদায়কই হতো। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারত। কিন্তু বিরোধী দলও এটাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করে কোনো মূলতুবি প্রস্তাব আনেনি। সরকারি দল তো সরকারকে রক্ষা করতে চাইবে। বিরোধী দলের কাছে একমাত্র জুলাই সনদই সর্বরোগহারী ঔষধ মনে হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জুলাই সনদের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু সেই মীমাংসা দুই দিন পরও হতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে জনজীবনের প্রধান সমস্যাটি যদি তারা সংসদে কথা না বলেন, তাহলে মানুষ তাদের ওপর আস্থা রাখবে কী করে?
অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাসের শাসনকালে যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সংসদ বসার ৩০দিনের মধ্যে সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেও। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, সরকার সেই অধ্যাদেশগুলোই পাস করছে, যেখানে তারা রাজনৈতিক সুবিধা পাবে। আর যেগুলোতে জবাবদিহির প্রশ্ন আছে, সেগুলো হয় স্থগিত করেছে, না হয় রহিত করে দিচ্ছে ভবিষ্যতে ‘ভালো আইন’ করবে এই দোহাই দিয়ে।
বিএনপি এর আগেও দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছিল; কিন্তু সে সময় বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। এখন জামায়াতে ইসলামী। আগে লড়াইটা ছিল মধ্যপন্থার সঙ্গে মধ্যপন্থার। এখন ডানপন্থার সঙ্গে মধ্যপন্থার। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই অনেকটা ফাঁকা মাঠ পেয়েছিল। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনটিও যদি আওয়ামী লীগ না থাকে সেটা হবে সংসদে থাকা দলগুলোর বড় স্বস্তির জায়গা। কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তি গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেতও হতে পারে। গণতন্ত্রের মূল কথা হলো বাছাই করার উন্মুক্ত সুযোগ।
নানা হিসেব-নিকেশের কারণে জামায়াত জাতীয় নির্বাচনে যেই ফল করেছে, তার ধারাবাহিকতা উপনির্বাচন কিংবা স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনে থাকার সম্ভাবনা কম। বগুড়া ও শেরপুরের দুটি উপনির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।
সরকার একটি কারণে ধন্যবাদ পেতে পারে। কারণ তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে দলীয় প্রতীক বাদ দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে এই বিধান জারি করে। স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো যে পুরোপুরি ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, তার কারণও দলীয় প্রতীকে নির্বাচন। এর ফলে স্থানীয় সরকার সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের (ক্ষমতাসীন) যে ন্যূনতম ফারাক ছিল সেটাও ঘুচে যায়।
দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চালু হওয়ার পর তৎকালীন বিরোধী দলগুলো সেই নির্বাচন বর্জন করে এবং আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলো প্রীতিম্যাচ খেলে। এই কঠিন ও করুণ বাস্তবতায় সংসদের সব দলই দলীয় প্রতীক না রাখার বিষয়ে একমত হয়। কিন্তু দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ এবং নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার সঙ্গে তারা একমত হতে পারেনি। বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে দক্ষিণের মেয়র পদে বসতে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে উত্তরে জাতীয় নাগিরক পার্টির (এনসিপি) একজন নেতাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে।
এখানে একটি অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে আরেকটি অন্যায় উদাহরণ সামনে নিয়ে আসা হলো। প্রশ্ন হলো বিএনপি সরকারও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায় কি না। যদি না চায় তাহলে তাদের উচিত ছিল আমলা প্রশাসকদের না সরিয়ে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন দেওয়া। তবে এক্ষেত্রেও সমস্যা আছে। হাজার হাজার সংস্থার নির্বাচন তিন–ছয় মাসের মধ্যে করা সম্ভব নয়। কিছুটা বাড়তি সময় দিতে হবে। কিন্তু পুরনো ফ্যাসিবাদীরা এসে যাবে, এই অজুহাত দেখিয়ে আইন পাস করা ও দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ আইনের দৃষ্টিতে অন্যায় না হলেও নৈতিকতার মাপকাঠিতে টেকে না।
এখানে যেই প্রশ্নটি উঠবে তা হলো যারা অনির্বাচিত প্রশাসক হিসেবে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দায়িত্ব পেয়েছেন, তারাই যদি বিএনপির প্রার্থী হন, তাহলে নৈতিকতার প্রশ্ন উঠবে। আর যদি সরকার সম্ভাব্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দিত, প্রশ্ন কম উঠত। সরকার বলতে পারত, আমরা তো তাদের নির্বাচনে প্রার্থী করছি না। তারা রাজনৈতিক দলের নেতা হলেও অরাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছে সাময়িকভাবে।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচন কবে হবে এখনো নিশ্চিত নয়। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের তারিখ নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে ঠিক করতে পারে না। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন। তাদের ইচ্ছেই নির্বাচন কমিশন পূরণ করবে।
অতীতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের তারিখ নিয়ে অনেক সমস্যা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা কারো কথায় কর্ণপাত করেনি। আমরা দেখলাম ২০১৩ সালে একযোগে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পর তারা নানাভাবে নির্বাচন রহিত করার চেষ্টা করে। সাদেক হোসেন খোকাকে ঠেকাতে ঢাকা ভেঙে দুই সিটি করপোরেশন করে দুজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে দুই সিটির নির্বাচন হলেও জবরদস্তির অভিযোগ আছে। বিরোধী দলের প্রার্থীর জয় বানচাল করতে নানা অপকৌশলের আশ্রয়ও নেন ক্ষমতাসীনেরা।
বিএনপি সরকারের বয়স মাত্র দুই মাস। এই স্বল্প সময়ের কার্যক্রম দিয়ে সরকারের সাফল্য ব্যর্থতা নিরূপন করা যায় না। তদুপরি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হলো, যার প্রচণ্ড অভিঘাত বাংলাদেশে এসেও পড়েছে। অতএব, সরকার আরও কিছুটা ছাড় বা গ্রেস পিরিয়ড পেতে পারে।