জনমতের নতুন ম্যান্ডেট: বৈধতা না কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা?

হামিদ রায়হান
হামিদ রায়হান
জনমতের নতুন ম্যান্ডেট: বৈধতা না কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা?
প্রতীকী ছবি

গত ১২ ফেব্রুয়ারি দিনের শেষ আলো ম্লান হওয়ার আগেই দেশের নির্বাচনী মাঠে এক অন্যরকম সাড়া ফেলে ভোটের সংখ্যা, প্রতিক্রিয়া ও মানুষের মনে প্রশ্নের ঢেউ। চোখ বলতে পারে ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোটার নিবন্ধিত ভোটারের কন্ঠ তুলে ভোটদান করে, নির্বাচনী কমিশনের হিসাবে তা নিশ্চিত হয়। দেশের রাজনৈতিক বিবর্তনে এই অনুপাত যেন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রতিটা ভোট মানেই লেখা-কঠিন সংখ্যা নয়; তা মানুষের প্রত্যাশা, হতাশার আড়ালে লুকানো আস্থা ও পুনর্বিন্যাসের স্বপ্নও। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সাড়া জাগানো সেই দিন, অনেকের মনে বাজছিল প্রশ্ন আসন সংখ্যা কি কেবল জয়ী ও পরাজিতের খাতা, নাকি জনমত ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের পুনর্গঠনের গল্প? একরাশ ভাবনায় মনে এলো, ভোট বাক্সে ঢালা প্রতিটি বলেট-পেপার কি নিজের ব্যথা, আশা ও ভরসার সঙ্গে কণ্ঠ মিশিয়ে লিপিবদ্ধ হয়নি?

এ দেশের বহু মানুষ ২০০৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দ্বিগুণ ওঠা-নামা দেখে। কখনো কঠিন উৎসাহে ভোট দেয়, আবার কখনো অগোছালো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হতাশায় মুখ ঘুরায়। এ বছর ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি বলছে যে ভোটকেন্দ্রে মানুষের পা কম হলেও তারা আসে। তবু প্রশ্নটা সহজে মুছছে না তারা কি আসলে রাজনৈতিক বৈধতার অনুভূতিই পুনরুজ্জীবিত করতে আসে? আবার কোথাও কোথাও ছিল বিরোধীদের অনিয়মের অভিযোগ ও বিতর্কের সাদা-কালো ছায়া। কিছু কেন্দ্রকে ঘিরে ভোটারদের বক্তব্য, কারচুপির অভিযোগ– মনে পড়ছে অন্য এক প্রশ্নের শব্দবৃষ্টি।

এ ভোটের প্রেক্ষাপটও একেবারেই নতুন। এই নির্বাচন হলো ২০২৪ সালের রাজনৈতিক উত্তাল সময়ের পর প্রথম সাধারণ নির্বাচন। যারা দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতি দেখে, তারা ভাবেন এ ফল কি কেবল ভোটের সংখ্যা, নাকি একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার রূপ? যেকোনো দিক থেকে দেখা হোক, ভোটে মানুষের অংশগ্রহণ স্বভাবতই একটি শক্তি হতে পারে। তরুণ ভোটারদের মূল্যায়ন, নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি, নানা দলের প্রার্থীযোগ্যতা সব মিলিয়ে যেন একটা জটিল অনুভূতি তৈরি হয়। বৈধতা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয় ভোটের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা হাত ধরে চলে। অনেকে চাকরি, শিক্ষা ও ডিজিটাল অধিকারসহ মৌলিক চাহিদার কথা মানসিক তালিকায় রাখতে এসেছে। মনে মনে ভাবে, খুব সহজ নয়, কিন্তু এ ভোটের মাধ্যমে যদি সমাজে নতুন আশা জাগে– তাহলে কি এটিই জনআস্থার পুনরুদ্ধার?

এবারের নির্বাচনের সংকেত কি শুধু গণনা কেন্দ্রের জয়ের তালিকা, নাকি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি নতুন সূচনা? জনগণের ওঠা-নামা, ভোট কেন্দ্রের থেমে-থাকা কণ্ঠস্বররা যেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরে আসে ম্যান্ডেট-পরবর্তী প্রথম দিনে, প্রথম সপ্তাহে, প্রথম ১০০ দিনে রাজনীতির ভাষা কি বদলাবে? যদি বদলায়, তা কি আসবে শুধু সংখ্যার ওপর ভর করে, নাকি বদলে যাবে মানুষের মন, মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে? এসব প্রশ্নের ভেতরেই গণতান্ত্রিক এ আনন্দবর্ষের নতুন রিভার্স পড়ে আছে, যেন সময় নিজেই বলে উঠছে ভোট শুধু সংখ্যা নয়, মানুষের বিশ্বাসের গল্পও বয়ে নিয়ে আসে।

এ নির্বাচনের দিনগুলো যেন এক গভীর নদীর মতো উঠা-নামা, প্রবাহে ভরিয়ে দেওয়া অনুভূতি আর শেষে নতুন এক দিগন্তের প্রতিশ্রুতি। ভোট গণনা শেষে যখন সব সংখ্যা শোয়ের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকল, তখন মনে হচ্ছিল ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের ভার কোথায় পড়বে, কীভাবে পড়ে যাবে– এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। নির্বাচনে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেল। সঙ্গে, সংসদীয় নীতি প্রণয়নের নিয়ন্ত্রণও হাতে আসে। কিন্তু এ অবস্থায় কি নির্বাহী ও আইনসভার ভারসাম্য ঠিক থাকে, নাকি একপক্ষে সব কিছু কেন্দ্রীভূত হয়– এটা জরুরি আলোচ্য বিষয়। মনে আসে পূর্বেকার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, এবং অপূরণীয় এককেন্দ্রিক শক্তির সময় গিয়ে রাজনৈতিক এলাকায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়া বিরোধী কণ্ঠস্বরগুলোকে ঝরিয়ে দেয়– এ নির্বাচন সেই ইতিহাসকে কি ভুলিয়ে দেয়?

রাষ্ট্রের কাজ হলো ক্ষমতা ও দায়িত্বকে ভারসাম্য রাখা– এটা শুধু আইন নয়, অনুভূতির জায়গাও। সংসদ যখন জীবন্ত বিতর্কের মঞ্চ, তখন বৈচিত্র্যময় মতামত উঠে আসার সুযোগ থাকে; দলীয় শৃঙ্খলা যেন তা গুটিয়ে ফেলে না, সেটাই চ্যালেঞ্জ। ক্ষমতা যখন একদিকের মাথার ওপর সেঁটে বসে, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনে হয়তো দ্রুততা আসে। কিন্তু সেই দ্রুততা কি বাধ্যতামূলকভাবে জনমানুষের আস্থা ও অংশগ্রহণকে ধরে রাখতে পারে? আবার কখনো কখনো বলাই চলে, সংসদীয় বিতর্কের প্রাণবন্ততা ও বিরোধী দলের ভূমিকা প্রয়োজনে সরকারকে নিজেকে কাটবার সুযোগ দেয়। সরকারকে জবাবদিহিতেও বাধ্য করে। আরেক দিক আছে স্থানীয় সরকার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। নির্বাচনী রণপরিকল্পনা গড়ে ওঠার সময় থেকে অনেকেই বলছিলেন, ক্ষমতার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে কিনা, নাকি আগের মতোই সব কিছু কেন্দ্রেই জমা হবে? নির্বাচনের প্রস্তুতি কিংবা ভোটের দিন পর্যন্ত যারা মাঠে ছিলেন তারা দেখেন, স্থানীয় ভোটদান শুধু কেন্দ্রীয় রাজনীতির একটি অনুলিপি নয়, বরং তা জায়গায় জায়গায় ভিন্ন রঙ তৈরি করে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরেও এমনই প্রশ্ন থাকে, এবং জেলা, উপজেলা বা পৌরসংসদ স্তরে লোকসানের আগে সেবা-দায়িত্বের কথা আসে, সেখানে কেন্দ্রীয় দপ্তরের নির্দেশের বাইরে কি আসল ক্ষমতা ব্যবহৃত হয়?

এবারের নির্বাচনে জোটরাজনীতির ভূমিকা বিশেষভাবে নজরে আসে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের কিছু আসনে পুনরায় ভোটের দাবি ওঠায় নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকও হয়। এ অবস্থায় নতুন সরকার কীভাবে সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে-নীতিনির্ধারণে অংশীদারিত্ব কতটা বিস্তৃত হতে পারে তা ভাবনার জায়গা। শক্তিমান কোন দলই একা সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না, আর সেই অনুভূতি মানুষের মনে বিরামহীন প্রবাহে ভেসে বেড়ায়। প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের বদলি-নিয়োগও আজ রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আছে। নতুন সরকার ঘোষণা করে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জনমুখী সেবার প্রতিশ্রুতি, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাই গুরুত্ব পাবে বলে বলা হচ্ছে। প্রশাসন যদি শুধু আনুগত্যের খেলায় বাধা থাকে, তাহলে আমলাতন্ত্র ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় দায়বদ্ধ থাকতে পারবে কি? তথাকথিত দক্ষ প্রশাসন মানুষকে সরকারের প্রতি আস্থা দিতে সাহায্য করে। সেটাই প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রাণ।

এ কারণে, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ই জেগে ওঠে। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কতটা নিশ্চিত হবে-তা নির্ভর করবে নতুন সরকারের দায়িত্বশীলতা, বিরোধী দলের অংশগ্রহণীয়তা ও বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর। যতই প্রবাহে ডুবে থাকা ভাবনায় যেমন আবেগ থাকে, তেমনই বাস্তব রাজনৈতিক প্রয়োগের দিকেও চোখ রাখতে হবে। কারণ শুধু কেন্দ্রের প্রভাবে না, বরং দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তেও যদি ক্ষমতার অংশগ্রহণের অনুভূতি ঘটে। তবে সত্যিকারের পুনর্বিন্যাসের গল্প শুরু হবে। যখন নতুন নির্বাচনের ফলের আলোয় দেশ জেগে ওঠে, তখন মনে হয়– রাজনীতির ভাষা, সহনশীলতা আর বিরোধিতার জায়গা কি বদলে যাচ্ছে? বছরের প্রথম দিনগুলো থেকে রাজনৈতিক জীবন যেন এক গভীর নদীর মতো মথিত হচ্ছে। মানুষের মন, গণমাধ্যম, সংসদ– সবকিছুই তরঙ্গমান ও প্রশ্নে ভরা।

এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জনসমর্থন ফিরে আসে, এবং বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হয়েছে, প্রায় ২১০টি আসন ভর করছে এবং বিরোধী দলগুলোকেও সংসদে জায়গা মিলছে বলে খবর পাওয়া যায়। এ পরিবর্তন শুধু আসন সংখ্যা নয় এটা প্রতিফলন করছে একটি কন্ঠস্বরের মুক্তি ও আশা। একইসঙ্গে, বিরোধী কণ্ঠের জন্য সংসদ ও গণমাধ্যমে বাস্তব স্পেস কতটা বাড়ছে তা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। মনে পড়ে গত বছরকে, যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল– খবরের প্রকাশে রাজনৈতিক দল ও সরকারের প্রভাব, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা– এসব নিয়ে সংবাদিকরা নিয়মিত প্রতিবাদ করতেন। তখনই গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠনের কথা ওঠে, যাতে সংবাদমাধ্যমকে ‘স্বাধীন, শক্তিশালী ও বস্তুনিষ্ঠ’ রাখা যায়। এইসব চেষ্টা আজ নতুন দৃষ্টিকোণ নিয়ে ফিরে আসে, কারণ মানুষের আশা, সমালোচনা ও বিরোধিতার ভাষা খোলামেলা হওয়া দরকার বলে মনে হচ্ছে সমাজের নানা শ্রেণির মধ্যে। রাজনৈতিক ভাষার মান নিজে এক নদীর মতো, বিভিন্ন পাড় ঘুরে বেড়ায়। কেউ বলছে, ‘সহিংসতার রাজনীতি শেষ’ আর অন্য কেউ মনে করে পুরনো অভ্যাস আবার ফিরে আসছে। কয়েক মাস আগে বিএনপির এক নেতা স্পষ্টভাবে বলেন যে প্রতিহিংসা বা সংঘাতের রাজনীতি নয়, বরং সহনশীলতার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতেই হবে। এই ভাবনা যেন মানুষের মনস্তত্ত্বে গভীর ভাবে লুকিয়ে আছে– ভিন্নমত থাকলেও একে অন্যকে শ্রদ্ধা করার পরিবেশ তৈরি করা অতি জরুরি। তবে সব প্রশ্ন শান্ত নয়। নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরাবৃত্তি নিয়ে সমালোচকরা ভয় প্রকাশ করছেন, কারণ পূর্বে যেমন রাজনৈতিক অস্থিরতার চক্র ছিল, তা আবার কি ফিরে আসছে? এ কথাগুলো মানুষের মুখে ঘুরপাক খায়– সাংসদ ভবন, গণমাধ্যম, মানুষের সমালোচনার ভাষা। সব জায়গায় প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।

একটি শক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুধু সংলাপ নয়, বরং লোককে নিজের মত প্রকাশ করতে দেয়; বিরোধিতাকে স্তব্ধ করে না, বরং তাকে অংশীদারি আলোচনায় পরিণত করে। জনগণের কণ্ঠস্বর যদি সংসদে, বিক্ষোভে, সামাজিক আলোচনায়, সংবাদপত্রে স্বাধীনভাবে ওঠে-তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রকৃত অর্থেই সংলাপপূর্ণ হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই রাজনৈতিক ভাষা, সহনশীলতা ও বিরোধিতা নিয়েই দীর্ঘ উন্নয়ন ঘটে। বাংলাদেশের মতো দেশেও এখন সেই পথ চলা শুরু হয়। ভোটের দিন শুধু জয়ের সংখ্যা নয়, বরং মানুষের আশাবান বক্তৃতা, অন্য পথের প্রতি শ্রদ্ধা, ভিন্নমতকে সহ্য করার শক্তি– এসবই আগামী দিনে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গড়ে তুলবে।

এসব ভাবনার ভেতরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নতুন করে মনোযোগ পাচ্ছে– ভাষার স্বচ্ছতা, সহনশীলতার পুনরুদ্ধার, বিরোধিতার সামাজিক অবস্থান ও জনগণের কণ্ঠস্বরকে সত্যিকার অর্থে শোনা। এসব মিশে এক নতুন রাজনৈতিক ভাষা গড়ে তুলছে, এবং সহমতের বিকল্পে সংলাপ আর সমালোচনা ছেড়ে দিলেও দরজা খোলা থাকবে–অন্যদের কথার জায়গা, মানুষের মতামতের স্থান, এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রকৃত সংকটে ও সম্ভাবনাতে। দেশের অর্থনীতি যেন একটি গভীর নদীর মতো ওঠা-নামা, চাপা মনে ভাবনার স্রোত ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রশ্নে ভরিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমের পাতাগুলোতে আলোচিত হয়েছে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা মজুত, ঋণ বোঝা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার রোডম্যাপ নিয়ে নানা আলোচনার ঢেউ। দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার বাংলাদেশের উচ্চ থাকলেও তা কিছুটা কমার ধারা দেখা গেছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে ধীরে ধীরে, তবু বিশ্লেষকরা বলছেন পরিস্থিতি এখনও সহজ নয়।

যখন বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ে এবং মানুষের আয় সেই সাথে ছুটে না, তখন সেই প্রতিটি টাকার পিছনে একটা গল্প থাকে– জীবিকার সন্ধান, ঘরের খরচ, ঋণগ্রস্ত বাড়ি। শুরুর দিকে মনে হচ্ছিল সমাধান শুধু মুদ্রানীতি কষিয়ে লাগাম টানা– বাংলাদেশ ব্যাংক ধরে রাখে সংকোচনমূলক নীতি, সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। কিন্তু তারপরই গভর্নর স্বীকার করেন যে সরকারের নীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হচ্ছে। এটা যেন বাজারে প্রতিটি মানুষের মনেও প্রশ্ন তুলেছে, কে কতটা দায়িত্বশীল?

এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটা বড় চিত্তাকর্ষক সংখ্যা হয়ে উঠে-গত বছর শেষে রিজার্ভ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছড়ায়, যা কয়েক বছর পরে এমন উচ্চতায় পৌঁছায়। এ রিজার্ভ সত্যিই আশা জাগাচ্ছে। নিজেদের মুদ্রা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনছে, কিন্তু মনে হয় যেন এই সংখ্যার পিছনে প্রতিটি বিদেশি মুদ্রার গল্পটি কঠিন সংগ্রামের প্রতিফলন। তা ছাড়া এ রিজার্ভ দিয়েই এখন প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি বিল মেটানো সম্ভব বলে বলা হচ্ছে।

ঋণের বিষয়টা আরেক গভীর প্রশ্ন। বিদেশি ঋণ পরিশোধের হিসেব থেকে বোঝা যায় যে প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক সম্পর্কও জড়িত-বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য সংস্থার রিপোর্টে বলা হয় বাহ্যিক ঋণের বোঝা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ-সেটেলমেন্ট-বোঝা বৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতিবিদদের সন্দেহ থাকে যে ঋণের বোঝা আগের তুলনায় বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে চাপ ফেলছে। এ জটিল আর্থিক পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা ও বৈষম্যের প্রশ্নও পেছনে পড়ে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তখন সাধারণ মানুষের জীবনে বৈষম্য আরও বাড়ে। জীবনযাত্রার ব্যথা যেন প্রতিদিনের খবরের শিরোনাম হয়ে দাঁড়ায়-খাবারের দাম বাড়ছে, আয় কমছে, আর মানুষের প্রত্যাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে। অন্যদিকে ডিজিটাল শাসন ও তথ্য-স্বচ্ছতা নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় যে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং সুযোগ সৃষ্টি করে– মানুষ এখন সহজে তথ্য পাচ্ছে। আর নাগরিকরা অনলাইনে নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের পথ খুঁজছে। যদিও সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা এ বিষয়ে আলাপ করছে, বাস্তবে নাগরিক অংশগ্রহণ কতটা শক্তিশালী হবে-এটা এখনো সময়ই বলবে। পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যের দিকেও চোখ আছে। নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক নেতৃত্বগুলোর শুভেচ্ছা এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠন সংবাদে আসে, যা নতুন ম্যান্ডেটের ফলে কূটনৈতিক ভারসাম্য কেমন হতে পারে তা নিয়ে মানুষের ভেতর প্রত্যাশা সৃষ্টি করে।

সত্যি বলতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাহিনি যেন এক দীর্ঘ নদীর মতো– প্রতিটি প্রবাহে আছে সংগ্রাম, আশা, সংকট ও সমাধানের খোঁজ। আর এ সন্ধানে প্রতিটি নতুন নীতি, প্রতিটি জবাবদিহি ব্যবস্থা মানুষকে একটি দৃঢ় আর্থিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারে। যদি সমন্বয় ঘটে, স্থায়িত্ব আসে এবং জনগণের আস্থা জেগে ওঠে। নির্বাচনের ফলাফল শুধু আসনের সংখ্যা নয়, এটা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাস্তব পরীক্ষা। নতুন ম্যান্ডেট কি কেবল শক্তির পুনর্বিন্যাস নাকি জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণকে নতুন দিশা দেবে, এটাই এখন বড় প্রশ্ন। কেন্দ্র ও প্রান্তের সম্পর্ক, সংসদীয় বিতর্ক, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের ভারসাম্য–সবই অনিশ্চিত।

রাজনৈতিক ভাষা ও সহনশীলতার ক্ষেত্রেও একই বিতর্ক। গণমাধ্যমে বিরোধী কণ্ঠ কতটা জায়গা পাবে, দলীয় সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ হবে, নাগরিক অংশগ্রহণ কেমন শক্তিশালী হবে– এই সব প্রশ্ন প্রতিদিনের আলোচনায় ঘুরছে। অর্থনীতি ও নীতি জবাবদিহিও পিছিয়ে নেই; মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা, ঋণ, সামাজিক বৈষম্য– সবই নাগরিকদের বিশ্বাস ও নিরাপত্তার পরীক্ষা নিচ্ছে।

এ নির্বাচন একটি বিতর্কমূলক মোড়। প্রশ্ন উঠে, আমরা কি সত্যিই সংস্কারমুখী, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারব, নাকি পুরনো সংকটের ছায়া আবারও ফিরবে? পাঠক, ভাবুন– ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস কি আসলেই বদলাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাকি শুধু সংখ্যা ও আসনের খেলাই চলবে?

হামিদ রায়হান: লেখক ও গবেষক

সম্পর্কিত