অর্ণব সান্যাল

এক সহকর্মীর অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করা যাক। দু-একদিন আগের কথা। অফিসে ঢোকার মুখে এক কোণায় তিনি দেখলেন একটা বিড়ালের চারটা বাচ্চা হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বাচ্চাদের নিয়ে ভবনের এক পাশে একটু আশ্রয় বের করে নিয়েছিল মা বিড়ালটি। আর বাচ্চাগুলোকে আগলে রেখেছিল যতনে, যতটুকু পারছে।
সহকর্মী সেই দৃশ্যের ছবি তুলেছিলেন, ভিডিও করেছিলেন। কেমন যেন মন আর্দ্র করে দেওয়া দৃশ্য। দেখার পর মনে হয়, এই দুনিয়াটায় মায়া এখনও অবশিষ্ট আছে। আছে শর্তহীন ভালোবাসাও।
আজকের পৃথিবীতে এমন নিঃশর্ত মায়া, ভালোবাসা অবশ্য শিশুসংশ্লিষ্ট দৃশ্যেই মেলে সাধারণত। যেকোনো শাবক, তা মানুষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণির হলেও মানবমন নরম হয়ে যায় সাধারণত। শিশুর প্রতি তাই স্বাভাবিকভাবেই থাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। একটু হলেও আদর থাকে, স্নেহ থাকে।
অথচ আমাদের এই বাংলাদেশে মানবশিশুরাই কেন জানি দিনকে দিন বিপন্ন ও বিপদগ্রস্ত হয়ে উঠছে। এই তো, ঠিক ঈদের আগের দিন এ দেশে কয়েকদিন বয়সী ৬ শিশু মরে গেল। এর আগে ৭ বছর বয়সী ছোট্ট এক কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হলো, তাকে মেরেও ফেলা হলো। আবার গত প্রায় তিন মাস ধরে বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শয়ে শয়ে শিশু মরছে।
আসুন, বিস্তারিত জানি। ঈদের এই দিনটায় আমরা জানি যে, শিশুর মৃত্যুকে কতটা স্বাভাবিক বানানো হচ্ছে এই দেশে।
রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঈদের আগের দিন একসঙ্গে ছয় শিশু মরে গেছে। হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন জানান, ১১ শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়েছিল। এর মধ্যে ৬ জন মারা যায়। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো অভিযোগের আঙুল তুলেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দিকে। আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সঠিক কারণ জানা যাবে তদন্তের পর। এরই মধ্যে তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের তথ্য মিলেছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, “এই কক্ষে এসি-সংক্রান্ত জটিলতা অথবা অন্য যেকোনো কারণে এখানে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি পাওয়া গেছে। আমরা দেখেছি, এসিটি এমনভাবে ছিল যে, এটি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে আর কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে এখানে চিকিৎসাধীন ছয়টি শিশুকে আমরা হারিয়েছি।”
আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন খানিকটা রায় দেওয়ার মতো করেই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি কিশোরগঞ্জে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “তাদের (হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ) অবহেলার কারণে ছয়টি প্রাণ ঝরে গেছে। এসির সঙ্গে অক্সিজেন সাপোর্টের সংযোগ ছিল। কিন্তু তারা এসি চালু করেনি। ফলে অক্সিজেন সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয় এবং ৬টি শিশু মারা যায়।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আমাদের দেশের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সব ব্যবস্থার দায়িত্বে। তাই এই মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের প্রধানদের কথায় আমাদের আস্থা রাখতেই হয়। রাখা উচিতও। তাছাড়া তারাই যেহেতু প্রাথমিকভাবে জনগণকে তথ্য দেওয়ার জায়গায় আছেন, সেহেতু আস্থা রাখা ছাড়া উপায়ই বা কী? তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও অধিপ্তরের মহাপরিচালক–দুজনই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দিকেই দোষের আঙুল তাক করে রেখেছেন। সেটাই যদি তদন্তে প্রমাণিত হয়, তাহলে ঘটনাটি কি দাঁড়ায়? অর্থাৎ, ৬ শিশুকে আসলে দমবন্ধ করে মেরে ফেলা হয়েছে। ওই ঠিক যেভাবে বালিশ চাপা দিয়ে মানুষ মারা দেখানো হয় নাটক-সিনেমায়, সেভাবে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নয়, এখানে নিহতরা হলো মাত্র দুনিয়ার আলো দেখা শিশুরা। দুধের শিশু বলতে যা বোঝায়, আক্ষরিক অর্থেই তাই।
একবার নিজের নাক বন্ধ করে থাকার চেষ্টা করুন তো। কতক্ষণ পারেন? দুই মিনিট পার হয়? হাঁফ ধরে যায় না? বুকে অক্সিজেনের জন্য উথাল-পাথাল হয় না?
বুঝুন এখন, ওই ৬ শিশু মাত্র ক’দিন আগে জন্ম নিয়ে দমবন্ধ হয়ে মরে গেল। একটু অক্সিজেনের অভাবে। বিষয়টা এমন না যে, দুনিয়ায় অক্সিজেন কমে গেছে। বরং মানুষের অব্যবস্থাপনায় মরে গেল শিশুগুলো। এটি কি ‘মরে গেল’, নাকি ‘মেরে ফেলা হলো’? যুক্তির হিসাব বলে দ্বিতীয়টাই ঘটেছে। স্রেফ বালিশ চাপা দিয়েই মেরে ফেলা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। হ্যাঁ, বালিশটা দেখা যায়নি বটে, সরাসরি কেউ গলা টিপে দেয়নি। কিন্তু বালিশ চাপা দিলে যেমন হতো, ঠিক তেমনটাই ঘটেছে।
অবশ্য সরাসরি শিশু হত্যাও চলছে এ দেশে ব্যাপক হারে। ক’দিন আগেই ৭ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হলো খোদ রাজধানী ঢাকাতেই। কোমল শিশুটির মায়াবী মুখটা এখনও অনেক সংবেদনশীল নাগরিককে দুঃস্বপ্নে তাড়া করে ফেরে। এ নিয়ে সারা দেশে বেশ তোলপাড় হলো। মামলার কাজ দ্রুত করা, বিচার দ্রুততম সময়ে শেষ করার আশ্বাস মিলল সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। এর ফাঁকে শিশুটির বাবা রাগে-ক্ষোভে বলেই ফেললেন আসল কথাটা। তিনি বললেন, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না, আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই…।”
বাবা যখন নিজের মেয়ের হত্যার বিচার চান না, তখন সেটি কতটা অসহায় পরিস্থিতি, তা কি বোঝা যায়? আর এমন কথা তিনি বলবেনই না কেন? পরিস্থিতি তো ভয়াবহই। পরিসংখ্যান জানা যাক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৯৯টি শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, এসিড সন্ত্রাস ইত্যাদি। একই সময়সীমায় ১১৫ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আসক।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে দেশে বছরজুড়ে ১০২৩ জন শিশু বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আসক জানিয়েছে, একই সময়সীমায় হত্যা হয়েছে ৪১০ শিশু। ২০২৪ সালে এই হত্যার সংখ্যা ছিল ৫৭৪। আর ওই বছরে সহিংসতার শিকার হয়েছিল ৬৭০ শিশু।
অর্থাৎ, আমাদের দেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যার বিষয়টি ধারাবাহিকভাবেই ঘটে চলেছে। এতটাই ধারাবাহিক যে, দেশীয় সংবাদমাধ্যমে এমন শিরোনামও দেখতে হয় যে–ধর্ষণের শিকার ১১ বছরের শিশু ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এতেই বোঝা হয়ে যায়, কতটা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বেড়ে উঠছে আমাদের শিশুরা।
এখন আবার সরাসরি হত্যার সাথে যুক্ত হয়েছে পরোক্ষ হত্যার বিষয়টি। মানে ঠিক গলা টিপে মারা হলো না, কিন্তু এমন অবস্থা তৈরি করা হলো, যাতে হত্যার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় বা দায় এড়ানোর পিলো পাসিং করা যায়। যেমন: সংবাদমাধ্যমের এখন রুটিন কাজ হয়ে গেছে হামে আক্রান্ত বা হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর খবর দেওয়া। চলতি মাসের ২৬ তারিখ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৭২ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫৫৫-এ দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৬৭ শিশু ও হাম শনাক্ত ৮৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এতগুলো বাচ্চা স্রেফ মরে গেছে হামে। এ এমন এক রোগ, যাতে নিকট অতীতে প্রাণহানির খবর মেলেনি খুব একটা। বেশ সাধারণ একটি রোগ হিসেবে হাম আমাদের দেশে পরিগণিত হচ্ছিল। আর সেই রোগেই কিনা শয়ে শয়ে শিশুর মৃত্যু হলো!

এখন চলছে দোষ চাপানোর খেলা। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সিদ্ধান্তের পরই বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে সায়েন্স নামের জার্নালে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টিকার ব্যাপারে উন্মুক্ত দরপত্রের সিদ্ধান্ত নিলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে–এমন সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও তাদের পরামর্শ আমলে নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার।
বর্তমান সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাই বেশ জোরেশোরেই আগের অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছেন। ওদিকে সাবেক সরকারের মানুষজন অস্বীকার করছেন, দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সংকট কি ঠিকঠাকভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে? সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনের সময় আইসিইউ বেড মিলছে না। আমরা দেখছি, বাবা হামে আক্রান্ত মেয়েকে সুস্থ করে তুলেও ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না অতিরিক্ত বিলের কারণে। কারণ বেসরকারি হাসপাতাল ঝোপ বুঝে কোপ মারছে মানুষের পকেটে। তা এসব ঠিক করবে কে? সরকার নাকি অন্য কেউ?
ওদিকে প্রতিদিন শিশুদের হামে মরে যাওয়ার খবর আসছেই। এতগুলো শিশুর মৃত্যুর দায় কার? যদি আগের সরকারের ভুল সিদ্ধান্তেরই হয়, তবে অবশ্যই তৎকালীন দায়িত্বশীলদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। তার আগে সঠিক ও পূর্ণ তদন্তও প্রয়োজন। হাম নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এ কারণেই প্রয়োজন যে, আমাদের দেশে সরকারে থাকলেই যা খুশি তা-ই করে পার পাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার অবসান হওয়া দরকার। এটি একটি দুষ্টচক্র। এ দেশের মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে উঠেছে যে, আমাদের বাংলাদেশে ক্ষমতাবানদের কোনো অন্যায়ের বিচার হয় না। একে সমর্থন করার মতো অসংখ্য ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি। ফলে আমাদের সমাজে বিচারহীনতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এর ব্যতিক্রমের উদাহরণ তৈরি করা না গেলে, এ দেশকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলাটাই একটা উপহাসের বিষয় হয়ে যেতে পারে।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন আমাদের বাংলাদেশে শিশুহত্যা কতটা অবলীলায় ঘটে! এখানে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া রোগে শিশুদের মেরে ফেলা যায়। ধর্ষণ করে গলা কেটে মাথা আলাদা করে ফেলা যায়। এমনকি স্রেফ শ্বাস নিতে না দিয়েও মেরে ফেলা হয়। এই সবই হত্যা। কোনোটায় হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা যায়, কোনোটায় হত্যাকারী থাকে পর্দার আড়ালে। আর বাচ্চা হারিয়ে ফেলা বাবা-মায়েরা চরম শ্লেষে বলতে থাকেন–আমরা বিচার চাই না।
তবে কি আমাদের বাংলাদেশ ‘শিশুহত্যার দেশ’ হিসেবেই পরিচিতি পাবে বিশ্বে? আমরা কি এতটা নিষ্ঠুর পরিচয়কেই গলার হার বানাতে চাই? এত এত উন্নয়নের বুলির পাশে সেটি কি মানাবে? মনে রাখা জরুরি, এ দায় কিন্তু চাপবে এই দেশ, দেশ চালানো সরকার এবং দেশে থাকা জনতার ঘাড়েই!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

এক সহকর্মীর অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করা যাক। দু-একদিন আগের কথা। অফিসে ঢোকার মুখে এক কোণায় তিনি দেখলেন একটা বিড়ালের চারটা বাচ্চা হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বাচ্চাদের নিয়ে ভবনের এক পাশে একটু আশ্রয় বের করে নিয়েছিল মা বিড়ালটি। আর বাচ্চাগুলোকে আগলে রেখেছিল যতনে, যতটুকু পারছে।
সহকর্মী সেই দৃশ্যের ছবি তুলেছিলেন, ভিডিও করেছিলেন। কেমন যেন মন আর্দ্র করে দেওয়া দৃশ্য। দেখার পর মনে হয়, এই দুনিয়াটায় মায়া এখনও অবশিষ্ট আছে। আছে শর্তহীন ভালোবাসাও।
আজকের পৃথিবীতে এমন নিঃশর্ত মায়া, ভালোবাসা অবশ্য শিশুসংশ্লিষ্ট দৃশ্যেই মেলে সাধারণত। যেকোনো শাবক, তা মানুষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণির হলেও মানবমন নরম হয়ে যায় সাধারণত। শিশুর প্রতি তাই স্বাভাবিকভাবেই থাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। একটু হলেও আদর থাকে, স্নেহ থাকে।
অথচ আমাদের এই বাংলাদেশে মানবশিশুরাই কেন জানি দিনকে দিন বিপন্ন ও বিপদগ্রস্ত হয়ে উঠছে। এই তো, ঠিক ঈদের আগের দিন এ দেশে কয়েকদিন বয়সী ৬ শিশু মরে গেল। এর আগে ৭ বছর বয়সী ছোট্ট এক কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হলো, তাকে মেরেও ফেলা হলো। আবার গত প্রায় তিন মাস ধরে বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শয়ে শয়ে শিশু মরছে।
আসুন, বিস্তারিত জানি। ঈদের এই দিনটায় আমরা জানি যে, শিশুর মৃত্যুকে কতটা স্বাভাবিক বানানো হচ্ছে এই দেশে।
রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঈদের আগের দিন একসঙ্গে ছয় শিশু মরে গেছে। হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন জানান, ১১ শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়েছিল। এর মধ্যে ৬ জন মারা যায়। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো অভিযোগের আঙুল তুলেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দিকে। আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সঠিক কারণ জানা যাবে তদন্তের পর। এরই মধ্যে তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের তথ্য মিলেছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, “এই কক্ষে এসি-সংক্রান্ত জটিলতা অথবা অন্য যেকোনো কারণে এখানে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি পাওয়া গেছে। আমরা দেখেছি, এসিটি এমনভাবে ছিল যে, এটি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে আর কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে এখানে চিকিৎসাধীন ছয়টি শিশুকে আমরা হারিয়েছি।”
আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন খানিকটা রায় দেওয়ার মতো করেই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি কিশোরগঞ্জে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “তাদের (হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ) অবহেলার কারণে ছয়টি প্রাণ ঝরে গেছে। এসির সঙ্গে অক্সিজেন সাপোর্টের সংযোগ ছিল। কিন্তু তারা এসি চালু করেনি। ফলে অক্সিজেন সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয় এবং ৬টি শিশু মারা যায়।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আমাদের দেশের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সব ব্যবস্থার দায়িত্বে। তাই এই মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের প্রধানদের কথায় আমাদের আস্থা রাখতেই হয়। রাখা উচিতও। তাছাড়া তারাই যেহেতু প্রাথমিকভাবে জনগণকে তথ্য দেওয়ার জায়গায় আছেন, সেহেতু আস্থা রাখা ছাড়া উপায়ই বা কী? তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও অধিপ্তরের মহাপরিচালক–দুজনই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দিকেই দোষের আঙুল তাক করে রেখেছেন। সেটাই যদি তদন্তে প্রমাণিত হয়, তাহলে ঘটনাটি কি দাঁড়ায়? অর্থাৎ, ৬ শিশুকে আসলে দমবন্ধ করে মেরে ফেলা হয়েছে। ওই ঠিক যেভাবে বালিশ চাপা দিয়ে মানুষ মারা দেখানো হয় নাটক-সিনেমায়, সেভাবে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নয়, এখানে নিহতরা হলো মাত্র দুনিয়ার আলো দেখা শিশুরা। দুধের শিশু বলতে যা বোঝায়, আক্ষরিক অর্থেই তাই।
একবার নিজের নাক বন্ধ করে থাকার চেষ্টা করুন তো। কতক্ষণ পারেন? দুই মিনিট পার হয়? হাঁফ ধরে যায় না? বুকে অক্সিজেনের জন্য উথাল-পাথাল হয় না?
বুঝুন এখন, ওই ৬ শিশু মাত্র ক’দিন আগে জন্ম নিয়ে দমবন্ধ হয়ে মরে গেল। একটু অক্সিজেনের অভাবে। বিষয়টা এমন না যে, দুনিয়ায় অক্সিজেন কমে গেছে। বরং মানুষের অব্যবস্থাপনায় মরে গেল শিশুগুলো। এটি কি ‘মরে গেল’, নাকি ‘মেরে ফেলা হলো’? যুক্তির হিসাব বলে দ্বিতীয়টাই ঘটেছে। স্রেফ বালিশ চাপা দিয়েই মেরে ফেলা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। হ্যাঁ, বালিশটা দেখা যায়নি বটে, সরাসরি কেউ গলা টিপে দেয়নি। কিন্তু বালিশ চাপা দিলে যেমন হতো, ঠিক তেমনটাই ঘটেছে।
অবশ্য সরাসরি শিশু হত্যাও চলছে এ দেশে ব্যাপক হারে। ক’দিন আগেই ৭ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হলো খোদ রাজধানী ঢাকাতেই। কোমল শিশুটির মায়াবী মুখটা এখনও অনেক সংবেদনশীল নাগরিককে দুঃস্বপ্নে তাড়া করে ফেরে। এ নিয়ে সারা দেশে বেশ তোলপাড় হলো। মামলার কাজ দ্রুত করা, বিচার দ্রুততম সময়ে শেষ করার আশ্বাস মিলল সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। এর ফাঁকে শিশুটির বাবা রাগে-ক্ষোভে বলেই ফেললেন আসল কথাটা। তিনি বললেন, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না, আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই…।”
বাবা যখন নিজের মেয়ের হত্যার বিচার চান না, তখন সেটি কতটা অসহায় পরিস্থিতি, তা কি বোঝা যায়? আর এমন কথা তিনি বলবেনই না কেন? পরিস্থিতি তো ভয়াবহই। পরিসংখ্যান জানা যাক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৯৯টি শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, এসিড সন্ত্রাস ইত্যাদি। একই সময়সীমায় ১১৫ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আসক।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে দেশে বছরজুড়ে ১০২৩ জন শিশু বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আসক জানিয়েছে, একই সময়সীমায় হত্যা হয়েছে ৪১০ শিশু। ২০২৪ সালে এই হত্যার সংখ্যা ছিল ৫৭৪। আর ওই বছরে সহিংসতার শিকার হয়েছিল ৬৭০ শিশু।
অর্থাৎ, আমাদের দেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যার বিষয়টি ধারাবাহিকভাবেই ঘটে চলেছে। এতটাই ধারাবাহিক যে, দেশীয় সংবাদমাধ্যমে এমন শিরোনামও দেখতে হয় যে–ধর্ষণের শিকার ১১ বছরের শিশু ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এতেই বোঝা হয়ে যায়, কতটা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বেড়ে উঠছে আমাদের শিশুরা।
এখন আবার সরাসরি হত্যার সাথে যুক্ত হয়েছে পরোক্ষ হত্যার বিষয়টি। মানে ঠিক গলা টিপে মারা হলো না, কিন্তু এমন অবস্থা তৈরি করা হলো, যাতে হত্যার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় বা দায় এড়ানোর পিলো পাসিং করা যায়। যেমন: সংবাদমাধ্যমের এখন রুটিন কাজ হয়ে গেছে হামে আক্রান্ত বা হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর খবর দেওয়া। চলতি মাসের ২৬ তারিখ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৭২ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫৫৫-এ দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৬৭ শিশু ও হাম শনাক্ত ৮৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এতগুলো বাচ্চা স্রেফ মরে গেছে হামে। এ এমন এক রোগ, যাতে নিকট অতীতে প্রাণহানির খবর মেলেনি খুব একটা। বেশ সাধারণ একটি রোগ হিসেবে হাম আমাদের দেশে পরিগণিত হচ্ছিল। আর সেই রোগেই কিনা শয়ে শয়ে শিশুর মৃত্যু হলো!

এখন চলছে দোষ চাপানোর খেলা। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সিদ্ধান্তের পরই বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে সায়েন্স নামের জার্নালে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টিকার ব্যাপারে উন্মুক্ত দরপত্রের সিদ্ধান্ত নিলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে–এমন সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও তাদের পরামর্শ আমলে নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার।
বর্তমান সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাই বেশ জোরেশোরেই আগের অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছেন। ওদিকে সাবেক সরকারের মানুষজন অস্বীকার করছেন, দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সংকট কি ঠিকঠাকভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে? সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনের সময় আইসিইউ বেড মিলছে না। আমরা দেখছি, বাবা হামে আক্রান্ত মেয়েকে সুস্থ করে তুলেও ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না অতিরিক্ত বিলের কারণে। কারণ বেসরকারি হাসপাতাল ঝোপ বুঝে কোপ মারছে মানুষের পকেটে। তা এসব ঠিক করবে কে? সরকার নাকি অন্য কেউ?
ওদিকে প্রতিদিন শিশুদের হামে মরে যাওয়ার খবর আসছেই। এতগুলো শিশুর মৃত্যুর দায় কার? যদি আগের সরকারের ভুল সিদ্ধান্তেরই হয়, তবে অবশ্যই তৎকালীন দায়িত্বশীলদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। তার আগে সঠিক ও পূর্ণ তদন্তও প্রয়োজন। হাম নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এ কারণেই প্রয়োজন যে, আমাদের দেশে সরকারে থাকলেই যা খুশি তা-ই করে পার পাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার অবসান হওয়া দরকার। এটি একটি দুষ্টচক্র। এ দেশের মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে উঠেছে যে, আমাদের বাংলাদেশে ক্ষমতাবানদের কোনো অন্যায়ের বিচার হয় না। একে সমর্থন করার মতো অসংখ্য ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি। ফলে আমাদের সমাজে বিচারহীনতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এর ব্যতিক্রমের উদাহরণ তৈরি করা না গেলে, এ দেশকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলাটাই একটা উপহাসের বিষয় হয়ে যেতে পারে।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন আমাদের বাংলাদেশে শিশুহত্যা কতটা অবলীলায় ঘটে! এখানে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া রোগে শিশুদের মেরে ফেলা যায়। ধর্ষণ করে গলা কেটে মাথা আলাদা করে ফেলা যায়। এমনকি স্রেফ শ্বাস নিতে না দিয়েও মেরে ফেলা হয়। এই সবই হত্যা। কোনোটায় হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা যায়, কোনোটায় হত্যাকারী থাকে পর্দার আড়ালে। আর বাচ্চা হারিয়ে ফেলা বাবা-মায়েরা চরম শ্লেষে বলতে থাকেন–আমরা বিচার চাই না।
তবে কি আমাদের বাংলাদেশ ‘শিশুহত্যার দেশ’ হিসেবেই পরিচিতি পাবে বিশ্বে? আমরা কি এতটা নিষ্ঠুর পরিচয়কেই গলার হার বানাতে চাই? এত এত উন্নয়নের বুলির পাশে সেটি কি মানাবে? মনে রাখা জরুরি, এ দায় কিন্তু চাপবে এই দেশ, দেশ চালানো সরকার এবং দেশে থাকা জনতার ঘাড়েই!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

গত দুই মাসে বাংলাদেশে উগ্র জনতার হামলায় অন্তত দুটি সুফি মাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ১১ এপ্রিল। ওই দিন কুষ্টিয়ায় একটি মাজারে একদল উত্তেজিত জনতা হামলা চালায় এবং এক পীরকে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর, গত ১৪ মে ঢাকার মিরপুরে হযরত শাহ আলী বাগদাদীর শতাব্দী প্রাচীন মাজারে হামলা চালায়।