Advertisement Banner

ধস নামা চামড়া বাজার যেভাবে মেটাচ্ছে অভাবী মানুষের ক্ষুধা

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
ধস নামা চামড়া বাজার যেভাবে মেটাচ্ছে অভাবী মানুষের ক্ষুধা
ছবি: চরচা

পবিত্র ঈদুল আজহার রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। রাজধানীর পোস্তাগোলার একটি গলির মুখে আলো-আঁধারির মধ্যে কয়েকজন মানুষ নিচু হয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা কাটাকুটি করছেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বেশ কিছু ছাগলের চামড়া। চামড়ার মূল ক্রেতা বা আড়তদাররা এগুলো রাস্তায় ফেলে গেছেন অথবা নামমাত্র দামেও কেউ তা কিনতে আগ্রহ দেখায়নি। আর সেই ফেলে যাওয়া চামড়া থেকেই এখন এক ‘জীবিকা’ আর ‘আহারের’ খোঁজ করছেন রঞ্জিত ও নিমাইয়ের মতো কয়েকজন ভাসমান ও নিম্নআয়ের মানুষ।

তারা চামড়া কেনাবেচার ব্যবসায়ী নন। তাদের লক্ষ্য চামড়ার ভেতরের অংশে লেগে থাকা চর্বি এবং মাংসের অবশিষ্টাংশ। ধারালো ছুরি দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও দক্ষতার সাথে চামড়া থেকে সেই মাংস ও চর্বি ছাড়িয়ে নিচ্ছেন তারা।

ফেলে যাওয়া চামড়া, কুড়িয়ে পাওয়া আহার চামড়া ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত রঞ্জিত বলেন, ‘‘ঈদের দিন বড়লোকেরা কোরবানি দিছে, চামড়া নিয়া কেউ পোস্তাগোলায় আইসা দাম পায় নাই। ছাগলের চামড়া তো কেউ পুছতেও (জিজ্ঞেস করা) চায় না। অনেকে রাস্তায় ফেলে চইলা গেছে। আমরা এইগুলা থেইকা মাংস আর চর্বি কাইটা নিচ্ছি। ধুইয়া-মুইছা রাইতে এইডাই রান্না কইরা খামু।’’

পাশে বসে থাকা নিমাই জানান, প্রতি বছরই ঈদের রাতে তারা এভাবে বিভিন্ন আড়ত বা রাস্তার মোড় থেকে ফেলে দেওয়া কিংবা নামমাত্র মূল্যে পাওয়া চামড়া সংগ্রহ করেন। তাদের মতো অভাবী মানুষের জন্য ঈদের দিনের মাংসের সংস্থান হয় এভাবেই।

শুধু নিজেদের পেটের তাগিদেই নয়, এই ফেলে দেওয়া চামড়া এখন অনেকের জন্য বাড়তি আয়েরও সুযোগ তৈরি করেছে। চামড়া থেকে চর্বিযুক্ত মাংস আলাদা করতে থাকা আরেকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, এখান থেকে যতটা সম্ভব পরিষ্কার মাংসের অংশ আলাদা করছেন তারা।

তিনি বলেন, ‘‘পুরাডা তো খাওন যায় না। ভালো কইরা কাইটা পরিষ্কার কইরা কিমা বানামু। বাজারে নিয়া অল্প দামে বিক্রি করতে পারলে ঈদের দিনে কয়েকটা টাকা হাতে আইব।’’

পোস্তাগোলা ও এর আশপাশের চামড়া ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরের মতো এবারও ছাগলের চামড়া নিয়ে পাইকারি ক্রেতাদের মধ্যে চরম অনীহা দেখা গেছে। লবণ দেওয়ার খরচ, লেবার (শ্রমিক) খরচ এবং ট্যানারির সঠিক দাম না পাওয়ার অজুহাতে ছাগলের চামড়া কিনতে চাচ্ছেন না বেশির ভাগ আড়তদার। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে চামড়া রাস্তায় ফেলে যাচ্ছেন, যা প্রকারান্তরে শহরের বর্জ্য বাড়াচ্ছে।

তবে মুদ্রার ওপিঠের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চামড়া বাজারের এই চরম মন্দা এবং অব্যবস্থাপনা রঞ্জিত ও নিমাইদের মতো সমাজের প্রান্তিক মানুষদের জন্য সাময়িক একবেলা আহারের জোগান দিচ্ছে। যেখানে চামড়া শিল্পে ধস নামায় ব্যবসায়ীরা হাহাকার করছেন, সেখানে সেই ‘ফেলে দেওয়া’ বর্জ্যই হয়ে উঠেছে ক্ষুধার্ত কিছু মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

সম্পর্কিত