Advertisement Banner

দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ

রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ভূ-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ

রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ভূ-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ
নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বিএনপির সৌজন্যে

বাংলাদেশের নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, তবে এটি এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।

সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও দুর্বল রাজস্ব আদায়, আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং নীতি নির্ধারণে ভুলের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ফলে ঢাকাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তার ভূ-অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো পরিচালনা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি ও বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্কের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এই তিন অংশীদারের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের পরিপূরক। তাই ঢাকার সামনে চ্যালেঞ্জটি কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া নয় বরং সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে সুবিধা আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা ও কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখা।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কেবল নিম্ন প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা, আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার ঘাটতিও বড় সমস্যা। নতুন সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, তারা এই চ্যালেঞ্জের গভীরতা উপলব্ধি করছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি উদ্যোক্তা মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জানুয়ারির মূল্যায়নে জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশে ফিরে আসতে পারে। তবে এই উন্নতি নির্ভর করবে শক্তিশালী কর আদায়, ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা দ্রুত নিরসনের ওপর। বিশ্বব্যাংকও ২০২৫ সালের অক্টোবরের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ একই ধরনের পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের মতে, সময়োপযোগী ও টেকসই সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৮ শতাংশ হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অর্থনৈতিক স্বস্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছিল। নির্বাচনে জয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি, শিক্ষার্থীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজ এবং স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিসরের নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে বর্তমান বৃহত্তম বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, মজুরি বৃদ্ধি, অসহায় গোষ্ঠীর জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা এবং বৃহত্তর কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কাঠামোর কথা বলেছে।

এ ধরনের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন সামনে আনে-নিম্ন রাজস্ব আয়, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ভঙ্গুর আর্থিক কাঠামোর এই অর্থনীতিতে সংস্কারের শৃঙ্খলা বজায় রেখে কীভাবে এসব সামাজিক সহায়তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব? সে দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক সুবিধা কোনো নতুন রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের চেয়ে বেশি নির্ভর করবে নির্বাচনী লক্ষ্যকে একটি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতায় রূপান্তর করার সক্ষমতার ওপর।

আগামী ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ ঘোষিত স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের উত্তরণ নির্ধারিত রয়েছে। খুব শিগগিরই দেশটিকে এমন এক বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হবে, যেখানে বাণিজ্য সুবিধা যেমন জিএসপি নিশ্চিত থাকবে না। ফলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার চাপও বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বাংলাদেশ কি তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উন্নত লজিস্টিকস ও বন্দর অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, স্থিতিশীল আর্থিক খাত এবং শক্তিশালী রাজস্ব ভিত্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবে?

তবে কেবল ভৌগোলিক নৈকট্যই কার্যকর ভূ-অর্থনীতি নিশ্চিত করে না; নীতিগত পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও বাণিজ্য ও ট্রানজিট ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত কর্তৃক ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি এর একটি উদাহরণ। এই সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্য ভারতের স্থলসীমা ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে তৃতীয় দেশের বাজারে পৌঁছাতে পারত। ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে উৎপাদনশীল পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও বৃহত্তর নীতিগত পরিবেশের পরিবর্তনের মুখে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে চীন বাংলাদেশকে ভিন্ন ধরনের সুবিধা দিচ্ছে। এরমধ্যে রয়েছে বৃহৎ পুঁজি বিনিয়োগ, অবকাঠামো অর্থায়নে আগ্রহ এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় গভীর সংযোগ। এ কারণেই ঢাকায় সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, চীনের অর্থনৈতিক ভূমিকা কমার সম্ভাবনা খুব কম। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল এবং মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প পরিবহন যোগাযোগ ও জ্বালানি লজিস্টিকসে চীনা অর্থায়নের কৌশলগত গুরুত্বকে তুলে ধরে।

তবে এখানেও বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। বৈদেশিক পুঁজি প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও তা কখনোই অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিকল্প হতে পারে না। আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে, প্রকল্প পরিচালনায় সুশাসনের ঘাটতি থাকলে কিংবা রপ্তানি বহুমুখীকরণ ধীরগতিতে চললে সুসংগঠিত বৈদেশিক অংশীদারত্বও টেকসই উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে না।

এই সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ভিন্ন ধরনের। অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বাজার সুবিধা প্রদান, বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উচ্চমানের সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করা। বর্তমানে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহ উৎস পুনর্বিবেচনা করছে এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ও ব্যয়-সাশ্রয়ী উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখন আর কেবল সস্তা শ্রমই যথেষ্ট নয়; প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতা, নীতিমালার স্বচ্ছতা এবং লজিস্টিকস সক্ষমতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংকট বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংকট বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ছবি: রয়টার্স

এসব ঘটছে অত্যন্ত অস্থির এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংকট বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, জাহাজ চলাচলের খরচ বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরান ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতার ফলে তেল ও এলএনজির দাম বেড়েছে, একই সঙ্গে ট্যাঙ্কার ও যুদ্ধঝুঁকি বিমার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর প্রভাব সুস্পষ্ট। এর ফলে শুধু জ্বালানি নয়, উচ্চ মালবাহী ভাড়া, বিমা ব্যয় এবং জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তনের কারণে আমদানিকৃত পণ্যের দামও বাড়তে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে এবং রপ্তানি সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্নটি আর কেবল এটি নয় যে নির্বাচনের পর নতুন সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো তারা কি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার উৎসে পরিণত করতে পারবে? শেষ পর্যন্ত একটি বিভক্ত ভূ-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্য নির্ভর করবে এই প্রশ্নের ওপর দেশটি কতটা স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: দিল্লিভিত্তিক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ওআরএফ)-এর একজন ফেলো এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির প্রধান

(নিবন্ধটি দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনূদিত)

সম্পর্কিত