ইসরায়েলের সরকার আর প্রতিরক্ষা কাঠামোর বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলোকে অভূতপূর্ব এবং কিছু ক্ষেত্রে কঠোর মনে হতে পারে, বিশেষ করে এগুলো যখন আসছে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে। কিন্তু অনেক বছর চুপ থাকার পর এই অভিযোগগুলো সামনে আনা ছাড়া আমার সামনে আর বিকল্প নেই।
এহুদ ওলমার্ট

পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটাকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে হবে এবং আরও বেশি চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা নিয়েই লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। ইসরায়েলি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, উৎসাহ, নির্দেশনা আর ব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে, এটাকে আর মেনে নেওয়া যায় না।
পশ্চিম তীরজুড়ে আজ যা হচ্ছে, সেটাকে আপনি ‘সত্তরের দশকের কোনো ভাঙা ঘরের’ সন্তানের কাজ হিসেবে দেখলে হবে না, যেটা কিনা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একবার দাবি করেছিলেন। কী ভয়ংকর শঠতা! এটাকে আপনি সেখানে (পশ্চিম তীর) বসতি গেড়ে বসা মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন বা সংখ্যালঘু কোনো গোষ্ঠীর অপরাধ হিসেবেও দেখতে পারেন না, যে দাবিটা সেটলার মুভমেন্টের নেতাদের অনেকে প্রায়ই বিভিন্ন তর্কে করেন।
আজ এটাই বলতে হবে যে, ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে, পদ্ধতিগত উপায়ে, রাষ্ট্রের অর্থে একটা জাতিকে নির্মূল করার লক্ষ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। এবং সেটা গাজা উপত্যকায় না, দক্ষিণ লেবাননে না, সিরিয়াতে না… বরং পশ্চিম তীরের এমন সব অঞ্চলে, যে অঞ্চলগুলো নিরাপত্তা বিশেষভাবে এই রাষ্ট্রের (ইসরায়েল) এবং এর নিরাপত্তা ও আইনপ্রয়োগকারী কাঠামোর নিয়ন্ত্রণে।
এই অপরাধ কর্মসূচির মূল হোতা প্রধানমন্ত্রী (নেতানিয়াহু) ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ… অবশ্যই মন্ত্রিসভার বাকিদের নামও আসবে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার বোঝা যাবে সিনিয়র মন্ত্রীদের বিবৃতি আর কাজে–যারা পশ্চিম তীরের পুরোটাই ইসরায়েলের সঙ্গে জুড়ে নিতে চান, তবে সেটা সেখানে থাকা ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের বাদ দিয়ে। আমি বিশেষভাবে ইতামার বেন-গাভির, বেজালেল স্মটরিচ এবং অন্য মন্ত্রীদের কথাই বলছি, যারা কিনা কথায়-কাজে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ওখান (পশ্চিম তীর) থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার নীতিকে সমর্থন করে আসছেন।

কথাগুলো শুনতে কঠোর মনে হতে পারে। ইসরায়েলি সরকার এবং এর পুরো প্রতিরক্ষা কাঠামোর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ এর আগে কেউ কখনো তোলেনি, একসময় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্বে থাকা কারও দিক তো নিশ্চিতভাবেই ওঠেনি। কিন্তু অনেক যন্ত্রণা সয়েও দীর্ঘ সময় চুপ থাকার পর এখন এসে এই কথাগুলো সরাসরি এবং রাখঢাক না রেখে বলা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।
পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে প্রতিনিয়ত যা হচ্ছে, সে ব্যাপারে চুপ থাকার কোনো অজুহাত হতে পারে না। সুপরিকল্পিত গণহত্যা চলছে সেখানে, শিশু ও বৃদ্ধরা তাদের নিজ ঘরে এবং ঘরের বাইরে আহত হচ্ছে, খেতখামার আর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং বৃহৎ পরিসরে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে–বিশেষ করে গবাদিপশু ও ভেড়া চুরি হচ্ছে, যা কিনা অনেক ফিলিস্তিনি বাসিন্দার জীবিকার প্রাথমিক উৎস। এতকিছু দেখার পর কিছু না করে চুপ থাকা, এড়িয়ে যাওয়া কিংবা এসব অপরাধী, তাদের সমর্থনকারী কিংবা নেতাদের মোকাবিলা না করে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না।
গত দুই বছরে প্রায় সব আন্তর্জাতিক মঞ্চেই ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মিত্র অনেক দেশও আছে, যারা অতীতে সংঘাত ও সংকটের সময়ে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমি যখনই সুযোগ পেয়েছি, এটা বারবার বলেছি যে, ইসরায়েল গাজায় কোনো গণহত্যা চালায়নি, কিংবা সে ইচ্ছাও তাদের ছিল না।
হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, ৭ অক্টোবর (২০২৩ সালের) হামাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে যুদ্ধটা চালিয়েছে ইসরায়েল, সেটা অনেক নিষ্ঠুর ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি যুদ্ধাপরাধও বলা যায়। এমন কিছু যে হয়েছে, সেটা আমরা সবাই জানি; এবার তা স্বীকার করার ইচ্ছা আমাদের থাকুক বা না থাকুক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সরকার কোনো গণহত্যার নীতি অনুসরণ করেনি, ইচ্ছাকৃতভাবে বা পদ্ধতিগতভাবে এমন কোনো কর্মকাণ্ডকেও সমর্থন করেনি, যা কিনা গণহত্যার আইনি সংজ্ঞার ভেতরে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রেই আমি স্বীকার করেছি যে, সত্যিকার অর্থেই যুদ্ধাপরাধ হয়েছে, সেটা হারেৎজেও বলেছি। বিদেশি অনেক সংবাদমাধ্যম মুখিয়ে ছিল, যাতে আমার মুখ থেকে সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ বের করতে পারে, বা আমাকে দিয়ে বলাতে পারে যে, ইসরায়েলের নেতাদের সম্মতিতে ও জ্ঞাতসারেই গাজায় হত্যাকাণ্ড চলেছে। সেসব বলা থেকে আমি বিরত থেকেছি এবং তা করে আমি কোনো ভুল করেছি বলেও মনে করি না। আমি জানি গাজায় যে সৈন্যরা যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধের সবচেয়ে কঠোর সময়গুলোতে যারা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের অনেকেই নিজের কিংবা নিজ ইউনিটের কর্মকাণ্ডের জন্য অপরাধবোধে ভোগে। নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে–এমন সব অপারেশনের জন্য অনেক পাইলট মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সেটা তাদের অনেকে নিজেরাই আমাকে বলেছেন।
কিন্তু ইসরায়েলের সৈন্যরা–সেটা বিমানবাহিনীরই হোক, কামান নিয়ে যাওয়া সৈন্যই হোক, সাঁজোয়া বাহিনী হোক বা পদাতিক, তারা কেউই ওসব অভিযানের উদ্দেশ্য কী হবে কিংবা অভিযানে কাদের লক্ষ্য বানানো হবে, সেটা ঠিক করেননি। তারা শুধু নির্দেশ পালন করেছেন। সেই নির্দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ছিল বেপরোয়া, কিংবা বলা যায় পূর্বাপর চিন্তা না করে নেওয়া সিদ্ধান্ত–যেখানে বেশির ভাগ সময়ই কত বেসামরিক মানুষ হতাহত হবে, সেটা না ভেবেই নির্দেশ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কখনোই গণহারে হত্যার উদ্দেশ্যে কোনো অভিযানে অনুমতি দেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত সচেতনভাবে নেওয়া হয়নি, বা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো নীতি নেওয়া হয়নি–সেটা সরকারের দিক থেকেও না, কিংবা তার কোনো সদস্যের দিক থেকেও না।
সে কারণে বলি, গাজায় যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেটাকে যদিও উপেক্ষা কিংবা অস্বীকার করা যায় না, তবু এটা মানতে হবে যে, সরকার এমন কিছু করার ব্যাপারে কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। এবং সে কারণে প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিংবা প্রতিরক্ষাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডারদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কোনো ন্যায়সঙ্গত ব্যাখ্যা হয় না। আমি আগেও এটা বিশ্বাস করেছি, এখনো তা-ই করি।

কিন্তু পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যা হচ্ছে, বিশেষ করে গত কয়েক মাসে, এই ক্ষেত্রে ওই উপসংহার টানা যাবে না।
এই ক্ষেত্রে অবশ্য প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোনোভাবেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকা হাজারো ফিলিস্তিনির ওপর ঘটা যুদ্ধাপরাধ কিংবা জাতিগত নির্মূলের পুরোপুরি দায় সরাসরি সরকারের ওপরই দিতে আমার একটুও সংশয় থাকবে না।
যে হাজারো সেটলার এসব অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছেন, তারা স্থানীয় ও জাতীয়–দুই পর্যায়েই সরকারি এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে সহায়তা, নিরাপত্তা, সমর্থন ও অর্থ না পেলে এটা করতে পারার কথা নয়। প্রতিটা ধাপে সমর্থন না থাকলে এই মাত্রার অপরাধ সম্ভব হতো না, যার মধ্যে যৌন নির্যাতনও আছে–যদিও সেটা নিউইয়র্ক টাইমস-এ নিকোলাস ক্রিস্টফ যেভাবে বর্ণনা করেছেন, অতটাও ভয়ংকর নয়।
পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, সেটাতে বাস্তবিক অর্থেই ইসরায়েলি পুলিশও অংশীদার। তারা এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের কোনো চেষ্টাই করছে না, অথচ এটা প্রতিরোধ করা তাদের দায়িত্ব। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ইহুদি সন্ত্রাসীদের উল্টো সাহায্যই করছে; এবং আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় সব ক্ষেত্রে অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করে উল্টো অপরাধের শিকার ফিলিস্তিনিকেই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে!
ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ বা আঘাতের ক্ষেত্রে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) নিয়মিত সদস্য ও রিজার্ভ রিজার্ভ বাহিনীর সেনাদের জড়িত থাকার ঘটনা কত যে সামনে এসেছে, তার হিসাব নেই। আইডিএফের মুখপাত্র এসব অভিযোগের জবাবে রুটিনমাফিকই বলে যাচ্ছেন যে, এসব ঘটনার সঙ্গে বাহিনীর নীতি বা পলিসির সংযোগ নেই। কিন্তু এটাকে ফাঁপা বুলি বললেও কম বলা হয়ে যাবে! বাস্তবতাটা হলো, অনেক জায়গায়ই সেনাসদস্যরা ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ওপর উগ্র–এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাণনাশী–আক্রমণে জড়িয়ে পড়েছেন।

ইহুদি সন্ত্রাস ঠেকানো এবং এর চিত্র সামনে তুলে আনায় শিন বেট-এর (ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিভাগ) ব্যর্থতাকেও উপেক্ষা করা যাবে না। আমার কাছে আইডিএফের মতো অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বছরের পর বছর আমি এই সংস্থাগুলোর কমান্ডারদের সঙ্গে কাজ করেছি। কাজের পেছনে তাদের সব উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা, সাহস আর পেশাদারত্ব কত বেশি, তা আমি জানি। একইসঙ্গে তাদের সামর্থ্য সম্পর্কেও ধারণা আছে আমার। পশ্চিম তীরে অবাধে বাড়তে থাকা ইহুদি সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে শিন বেট কেন তাদের হাতে থাকা সব সরঞ্জাম কাজে লাগাচ্ছে না, এটার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না। এজেন্সিটার কাজ সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা; সেটা ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসই হোক–এই কাজে তারা অবশ্য বলার মতো সাফল্য দেখাচ্ছে–বা হোক ইহুদি সন্ত্রাস।
শিন বেট-এর এই যে ব্যর্থতা, এটা কিন্তু বর্তমান শিন বেট প্রধানের সময়ে শুরু হয়নি। তার নিয়োগকে ঘিরে বিতর্কটা যথাযথ হলেও আমার কথাগুলোর উদ্দেশ্য তাকে অসম্মান করা নয়। এই ব্যর্থতা অনেক বছর ধরে চলছে। তবে এই ব্যর্থতা ঘোচানোর কোনো পথ নেই ধরে নেওয়ারও কোনো মানে হয় না।
পশ্চিম তীরে ইহুদিরা যা করছে, সেটা বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ইসরায়েলের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব। কিন্তু এটাই যেহেতু নিশ্চিত যে, সরকার এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেবে না, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইহুদি সন্দেহভাজন অপরাধীদের আটকের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেবেন না, পুলিশ বরং অপরাধীদের সঙ্গেই হাত মেলাবে, সেনাবাহিনী যেহেতু চোখ বন্ধই করে রাখবে, সেক্ষেত্রে এই সম্ভাবনাও খুব জোরালো হয়ে ওঠে যে, আন্তর্জাতিক অনেক পক্ষ এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা, এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে অনেক কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
মার্কিন প্রশাসন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারগুলো, তাদের তদন্ত ও আইনপ্রয়োগকারী ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় করে, শেষ পর্যন্ত এমন কিছু করতে পারে, যা ইসরায়েলি সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত করতে পারেনি–সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বের অধীনে থাকা এলাকাগুলোতে যে সন্ত্রাস চলতে দিচ্ছে ইসরায়েল। এমনও হতে পারে যে হেগ-এর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এসব অপরাধে রাশ টানার লক্ষ্যে অপরাধী ও তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে আরও সুনির্দিষ্ট, আরও শক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে–এসব অপরাধী ও নেতাদের অনেকেই তো সুপরিচিত, সহজেই খুঁজে নেওয়া যায় তাদের।
ইহুদি সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থনকারীরা–কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক ভদ্র ও ভালো ইসরায়েলিও–যেকোনো সমালোচনার প্রত্যুত্তরে একেবারে চোখ বন্ধ করে যে জবাবটা দেন, সেটাতে হয় ওই সমালোচনাকে উড়িয়ে দেন, নতুবা অন্য দেশে ইসরায়েলিদের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা ইসরায়েলি ও ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে ইহুদিবিদ্বেষের কথা বলেন। ইহুদিবিদ্বেষ অবশ্যই আছে, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটা আরও বেড়েছে। ইহুদিদের ইতিহাসেই এটা একেবারে ধ্রুব হয়ে আছে। কিন্তু ইসরায়েলের সরকার যা করছে, তার নিন্দা কিংবা ইসরায়েলের নাম নিয়ে যে পলিসি নেওয়া হচ্ছে বা যেসব কাজ করা হচ্ছে, তার সমালোচনার সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষকে গুলিয়ে ফেললে হবে না।
কেউ কি সত্যিই এটা বিশ্বাস করে যে (পশ্চিম তীরে) ফিলিস্তিনিদের ওপর যে সহিংসতা ইসরায়েলিরা চালাচ্ছে, সেটাকে চাইলেই হেসেখেলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে? এবং বিশ্বজুড়ে যারা ইসরায়েলিদের এই ধ্বংসযজ্ঞ, এই ঘৃণা, এই নিপীড়ন, জ্বালাও-পোড়াও এবং বর্বরতা দেখছেন, তারা সবাই চোখ বন্ধ করে রাখবেন, যেমনটা আমরা অনেকেই রাখছি?
সময় এসেছে নিজেদেরই সবার ওপরে ভাবার, এই ভণ্ডামি এবং এই নাটকের শেষ টানার। এবং নিজেদের ভেতরেই থাকা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার।
লেখক: ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
(ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এ প্রকাশিত লেখাটি চরচার পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করা হয়েছে)

পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটাকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে হবে এবং আরও বেশি চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা নিয়েই লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। ইসরায়েলি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, উৎসাহ, নির্দেশনা আর ব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে, এটাকে আর মেনে নেওয়া যায় না।
পশ্চিম তীরজুড়ে আজ যা হচ্ছে, সেটাকে আপনি ‘সত্তরের দশকের কোনো ভাঙা ঘরের’ সন্তানের কাজ হিসেবে দেখলে হবে না, যেটা কিনা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একবার দাবি করেছিলেন। কী ভয়ংকর শঠতা! এটাকে আপনি সেখানে (পশ্চিম তীর) বসতি গেড়ে বসা মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন বা সংখ্যালঘু কোনো গোষ্ঠীর অপরাধ হিসেবেও দেখতে পারেন না, যে দাবিটা সেটলার মুভমেন্টের নেতাদের অনেকে প্রায়ই বিভিন্ন তর্কে করেন।
আজ এটাই বলতে হবে যে, ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে, পদ্ধতিগত উপায়ে, রাষ্ট্রের অর্থে একটা জাতিকে নির্মূল করার লক্ষ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। এবং সেটা গাজা উপত্যকায় না, দক্ষিণ লেবাননে না, সিরিয়াতে না… বরং পশ্চিম তীরের এমন সব অঞ্চলে, যে অঞ্চলগুলো নিরাপত্তা বিশেষভাবে এই রাষ্ট্রের (ইসরায়েল) এবং এর নিরাপত্তা ও আইনপ্রয়োগকারী কাঠামোর নিয়ন্ত্রণে।
এই অপরাধ কর্মসূচির মূল হোতা প্রধানমন্ত্রী (নেতানিয়াহু) ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ… অবশ্যই মন্ত্রিসভার বাকিদের নামও আসবে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার বোঝা যাবে সিনিয়র মন্ত্রীদের বিবৃতি আর কাজে–যারা পশ্চিম তীরের পুরোটাই ইসরায়েলের সঙ্গে জুড়ে নিতে চান, তবে সেটা সেখানে থাকা ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের বাদ দিয়ে। আমি বিশেষভাবে ইতামার বেন-গাভির, বেজালেল স্মটরিচ এবং অন্য মন্ত্রীদের কথাই বলছি, যারা কিনা কথায়-কাজে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ওখান (পশ্চিম তীর) থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার নীতিকে সমর্থন করে আসছেন।

কথাগুলো শুনতে কঠোর মনে হতে পারে। ইসরায়েলি সরকার এবং এর পুরো প্রতিরক্ষা কাঠামোর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ এর আগে কেউ কখনো তোলেনি, একসময় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্বে থাকা কারও দিক তো নিশ্চিতভাবেই ওঠেনি। কিন্তু অনেক যন্ত্রণা সয়েও দীর্ঘ সময় চুপ থাকার পর এখন এসে এই কথাগুলো সরাসরি এবং রাখঢাক না রেখে বলা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।
পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে প্রতিনিয়ত যা হচ্ছে, সে ব্যাপারে চুপ থাকার কোনো অজুহাত হতে পারে না। সুপরিকল্পিত গণহত্যা চলছে সেখানে, শিশু ও বৃদ্ধরা তাদের নিজ ঘরে এবং ঘরের বাইরে আহত হচ্ছে, খেতখামার আর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং বৃহৎ পরিসরে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে–বিশেষ করে গবাদিপশু ও ভেড়া চুরি হচ্ছে, যা কিনা অনেক ফিলিস্তিনি বাসিন্দার জীবিকার প্রাথমিক উৎস। এতকিছু দেখার পর কিছু না করে চুপ থাকা, এড়িয়ে যাওয়া কিংবা এসব অপরাধী, তাদের সমর্থনকারী কিংবা নেতাদের মোকাবিলা না করে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না।
গত দুই বছরে প্রায় সব আন্তর্জাতিক মঞ্চেই ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মিত্র অনেক দেশও আছে, যারা অতীতে সংঘাত ও সংকটের সময়ে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমি যখনই সুযোগ পেয়েছি, এটা বারবার বলেছি যে, ইসরায়েল গাজায় কোনো গণহত্যা চালায়নি, কিংবা সে ইচ্ছাও তাদের ছিল না।
হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, ৭ অক্টোবর (২০২৩ সালের) হামাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে যুদ্ধটা চালিয়েছে ইসরায়েল, সেটা অনেক নিষ্ঠুর ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি যুদ্ধাপরাধও বলা যায়। এমন কিছু যে হয়েছে, সেটা আমরা সবাই জানি; এবার তা স্বীকার করার ইচ্ছা আমাদের থাকুক বা না থাকুক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সরকার কোনো গণহত্যার নীতি অনুসরণ করেনি, ইচ্ছাকৃতভাবে বা পদ্ধতিগতভাবে এমন কোনো কর্মকাণ্ডকেও সমর্থন করেনি, যা কিনা গণহত্যার আইনি সংজ্ঞার ভেতরে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রেই আমি স্বীকার করেছি যে, সত্যিকার অর্থেই যুদ্ধাপরাধ হয়েছে, সেটা হারেৎজেও বলেছি। বিদেশি অনেক সংবাদমাধ্যম মুখিয়ে ছিল, যাতে আমার মুখ থেকে সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ বের করতে পারে, বা আমাকে দিয়ে বলাতে পারে যে, ইসরায়েলের নেতাদের সম্মতিতে ও জ্ঞাতসারেই গাজায় হত্যাকাণ্ড চলেছে। সেসব বলা থেকে আমি বিরত থেকেছি এবং তা করে আমি কোনো ভুল করেছি বলেও মনে করি না। আমি জানি গাজায় যে সৈন্যরা যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধের সবচেয়ে কঠোর সময়গুলোতে যারা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের অনেকেই নিজের কিংবা নিজ ইউনিটের কর্মকাণ্ডের জন্য অপরাধবোধে ভোগে। নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে–এমন সব অপারেশনের জন্য অনেক পাইলট মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সেটা তাদের অনেকে নিজেরাই আমাকে বলেছেন।
কিন্তু ইসরায়েলের সৈন্যরা–সেটা বিমানবাহিনীরই হোক, কামান নিয়ে যাওয়া সৈন্যই হোক, সাঁজোয়া বাহিনী হোক বা পদাতিক, তারা কেউই ওসব অভিযানের উদ্দেশ্য কী হবে কিংবা অভিযানে কাদের লক্ষ্য বানানো হবে, সেটা ঠিক করেননি। তারা শুধু নির্দেশ পালন করেছেন। সেই নির্দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ছিল বেপরোয়া, কিংবা বলা যায় পূর্বাপর চিন্তা না করে নেওয়া সিদ্ধান্ত–যেখানে বেশির ভাগ সময়ই কত বেসামরিক মানুষ হতাহত হবে, সেটা না ভেবেই নির্দেশ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কখনোই গণহারে হত্যার উদ্দেশ্যে কোনো অভিযানে অনুমতি দেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত সচেতনভাবে নেওয়া হয়নি, বা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো নীতি নেওয়া হয়নি–সেটা সরকারের দিক থেকেও না, কিংবা তার কোনো সদস্যের দিক থেকেও না।
সে কারণে বলি, গাজায় যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেটাকে যদিও উপেক্ষা কিংবা অস্বীকার করা যায় না, তবু এটা মানতে হবে যে, সরকার এমন কিছু করার ব্যাপারে কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। এবং সে কারণে প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিংবা প্রতিরক্ষাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডারদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কোনো ন্যায়সঙ্গত ব্যাখ্যা হয় না। আমি আগেও এটা বিশ্বাস করেছি, এখনো তা-ই করি।

কিন্তু পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যা হচ্ছে, বিশেষ করে গত কয়েক মাসে, এই ক্ষেত্রে ওই উপসংহার টানা যাবে না।
এই ক্ষেত্রে অবশ্য প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোনোভাবেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকা হাজারো ফিলিস্তিনির ওপর ঘটা যুদ্ধাপরাধ কিংবা জাতিগত নির্মূলের পুরোপুরি দায় সরাসরি সরকারের ওপরই দিতে আমার একটুও সংশয় থাকবে না।
যে হাজারো সেটলার এসব অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছেন, তারা স্থানীয় ও জাতীয়–দুই পর্যায়েই সরকারি এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে সহায়তা, নিরাপত্তা, সমর্থন ও অর্থ না পেলে এটা করতে পারার কথা নয়। প্রতিটা ধাপে সমর্থন না থাকলে এই মাত্রার অপরাধ সম্ভব হতো না, যার মধ্যে যৌন নির্যাতনও আছে–যদিও সেটা নিউইয়র্ক টাইমস-এ নিকোলাস ক্রিস্টফ যেভাবে বর্ণনা করেছেন, অতটাও ভয়ংকর নয়।
পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, সেটাতে বাস্তবিক অর্থেই ইসরায়েলি পুলিশও অংশীদার। তারা এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের কোনো চেষ্টাই করছে না, অথচ এটা প্রতিরোধ করা তাদের দায়িত্ব। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ইহুদি সন্ত্রাসীদের উল্টো সাহায্যই করছে; এবং আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় সব ক্ষেত্রে অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করে উল্টো অপরাধের শিকার ফিলিস্তিনিকেই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে!
ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ বা আঘাতের ক্ষেত্রে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) নিয়মিত সদস্য ও রিজার্ভ রিজার্ভ বাহিনীর সেনাদের জড়িত থাকার ঘটনা কত যে সামনে এসেছে, তার হিসাব নেই। আইডিএফের মুখপাত্র এসব অভিযোগের জবাবে রুটিনমাফিকই বলে যাচ্ছেন যে, এসব ঘটনার সঙ্গে বাহিনীর নীতি বা পলিসির সংযোগ নেই। কিন্তু এটাকে ফাঁপা বুলি বললেও কম বলা হয়ে যাবে! বাস্তবতাটা হলো, অনেক জায়গায়ই সেনাসদস্যরা ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ওপর উগ্র–এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাণনাশী–আক্রমণে জড়িয়ে পড়েছেন।

ইহুদি সন্ত্রাস ঠেকানো এবং এর চিত্র সামনে তুলে আনায় শিন বেট-এর (ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিভাগ) ব্যর্থতাকেও উপেক্ষা করা যাবে না। আমার কাছে আইডিএফের মতো অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বছরের পর বছর আমি এই সংস্থাগুলোর কমান্ডারদের সঙ্গে কাজ করেছি। কাজের পেছনে তাদের সব উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা, সাহস আর পেশাদারত্ব কত বেশি, তা আমি জানি। একইসঙ্গে তাদের সামর্থ্য সম্পর্কেও ধারণা আছে আমার। পশ্চিম তীরে অবাধে বাড়তে থাকা ইহুদি সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে শিন বেট কেন তাদের হাতে থাকা সব সরঞ্জাম কাজে লাগাচ্ছে না, এটার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না। এজেন্সিটার কাজ সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা; সেটা ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসই হোক–এই কাজে তারা অবশ্য বলার মতো সাফল্য দেখাচ্ছে–বা হোক ইহুদি সন্ত্রাস।
শিন বেট-এর এই যে ব্যর্থতা, এটা কিন্তু বর্তমান শিন বেট প্রধানের সময়ে শুরু হয়নি। তার নিয়োগকে ঘিরে বিতর্কটা যথাযথ হলেও আমার কথাগুলোর উদ্দেশ্য তাকে অসম্মান করা নয়। এই ব্যর্থতা অনেক বছর ধরে চলছে। তবে এই ব্যর্থতা ঘোচানোর কোনো পথ নেই ধরে নেওয়ারও কোনো মানে হয় না।
পশ্চিম তীরে ইহুদিরা যা করছে, সেটা বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ইসরায়েলের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব। কিন্তু এটাই যেহেতু নিশ্চিত যে, সরকার এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেবে না, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইহুদি সন্দেহভাজন অপরাধীদের আটকের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেবেন না, পুলিশ বরং অপরাধীদের সঙ্গেই হাত মেলাবে, সেনাবাহিনী যেহেতু চোখ বন্ধই করে রাখবে, সেক্ষেত্রে এই সম্ভাবনাও খুব জোরালো হয়ে ওঠে যে, আন্তর্জাতিক অনেক পক্ষ এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা, এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে অনেক কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
মার্কিন প্রশাসন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারগুলো, তাদের তদন্ত ও আইনপ্রয়োগকারী ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় করে, শেষ পর্যন্ত এমন কিছু করতে পারে, যা ইসরায়েলি সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত করতে পারেনি–সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বের অধীনে থাকা এলাকাগুলোতে যে সন্ত্রাস চলতে দিচ্ছে ইসরায়েল। এমনও হতে পারে যে হেগ-এর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এসব অপরাধে রাশ টানার লক্ষ্যে অপরাধী ও তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে আরও সুনির্দিষ্ট, আরও শক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে–এসব অপরাধী ও নেতাদের অনেকেই তো সুপরিচিত, সহজেই খুঁজে নেওয়া যায় তাদের।
ইহুদি সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থনকারীরা–কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক ভদ্র ও ভালো ইসরায়েলিও–যেকোনো সমালোচনার প্রত্যুত্তরে একেবারে চোখ বন্ধ করে যে জবাবটা দেন, সেটাতে হয় ওই সমালোচনাকে উড়িয়ে দেন, নতুবা অন্য দেশে ইসরায়েলিদের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা ইসরায়েলি ও ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে ইহুদিবিদ্বেষের কথা বলেন। ইহুদিবিদ্বেষ অবশ্যই আছে, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটা আরও বেড়েছে। ইহুদিদের ইতিহাসেই এটা একেবারে ধ্রুব হয়ে আছে। কিন্তু ইসরায়েলের সরকার যা করছে, তার নিন্দা কিংবা ইসরায়েলের নাম নিয়ে যে পলিসি নেওয়া হচ্ছে বা যেসব কাজ করা হচ্ছে, তার সমালোচনার সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষকে গুলিয়ে ফেললে হবে না।
কেউ কি সত্যিই এটা বিশ্বাস করে যে (পশ্চিম তীরে) ফিলিস্তিনিদের ওপর যে সহিংসতা ইসরায়েলিরা চালাচ্ছে, সেটাকে চাইলেই হেসেখেলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে? এবং বিশ্বজুড়ে যারা ইসরায়েলিদের এই ধ্বংসযজ্ঞ, এই ঘৃণা, এই নিপীড়ন, জ্বালাও-পোড়াও এবং বর্বরতা দেখছেন, তারা সবাই চোখ বন্ধ করে রাখবেন, যেমনটা আমরা অনেকেই রাখছি?
সময় এসেছে নিজেদেরই সবার ওপরে ভাবার, এই ভণ্ডামি এবং এই নাটকের শেষ টানার। এবং নিজেদের ভেতরেই থাকা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার।
লেখক: ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
(ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এ প্রকাশিত লেখাটি চরচার পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করা হয়েছে)