পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের মিত্রজোট। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত থাকা ভারতের পাঁচটি রাজ্যেই এখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায়। এতে নয়াদিল্লির জন্য বাংলাদেশ বিষয়ক নীতিগুলো বাস্তবায়ন করা এখন অনেক সহজ হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ রাজ্য সরকারগুলোর কাছ থেকে আর আগের মতো জোরালো কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হবে না।
তবে বিজেপি জোটের এই নিরঙ্কুশ আধিপত্য মানেই যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন ঘটবে, বিষয়টি তেমন নাও হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, যথাযথ কৌশল ও দূরদর্শিতার অভাব এবং কট্টরপন্থী কোনো নীতির অপপ্রয়োগ ঢাকাকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে। এতে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বর্তমান যে ইতিবাচক পরিবেশ রয়েছে, তা-ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে (টিএমসি) পরাজিত করে বিজেপি জয়লাভ করায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিজেপিকে অভিনন্দন জানিয়েছে।
তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে পরাজিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি ‘প্রতিবন্ধক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বিএনপি। বিজেপির জয়লাভের পর দলটি আশা প্রকাশ করেছে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার এ বিষয়ে ভিন্নতর ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
একই সঙ্গে, ভারতের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করার সম্ভাব্য চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এই ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় সতর্ক থাকবে বলে ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এই ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ঢাকা ব্যবস্থা নেবে।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। ছবি: রয়টার্স
বাংলাদেশ থেকে আসা তথাকথিত অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের বের করে দেওয়া বিজেপির অন্যতম লক্ষ্য। জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি পশ্চিমবঙ্গে দলটির নির্বাচনী জয়ে বড় ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। ফলে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন রাজ্য সরকারের পক্ষে এই নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা সুবিধাজনক হবে। তবে এই ইস্যুতে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কোনো ঐকমত্য না থাকায়, বিষয়টি ঢাকা সহজভাবে নেবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে গত এপ্রিলে বাংলাদেশে নতুন ভারতীয় হাই কমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দিয়েছে নয়াদিল্লি। সচরাচর পেশাদার কূটনীতিকদের এই পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও, এবার পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির এই রাজনীতিককে বেছে নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ না জানালেও ধারণা করা হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারতের অস্বীকৃতি নিয়ে ঢাকার সঙ্গে তৈরি হওয়া অস্বস্তি দূর করতেই একজন রাজনীতিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার প্রভাবে সংকটে থাকা প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী জানিয়েছেন যে, নিজেদের চাহিদা মিটিয়েই কেবল বাড়তি জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব। বর্তমানে আসামের রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের পরিমাণও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য এবং অভিবাসীদের উইপোকা হিসেবে সম্বোধন করার মতো বিষয়গুলো ত্রিবেদীর কাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সহিংসতায় অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা বিএনপির জন্য বড় অগ্রাধিকার হলেও, এই একটি ইস্যুতে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট করতে চায় না।
এপ্রিলের শুরুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারত সফরে গিয়ে শেখ হাসিনার ইস্যু ছাড়াও ডিজেল ও সার সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা জটিলতা নিরসনের অনুরোধ জানান। ডিজেল ও সারের বিষয়ে ভারতের সাড়া ইতিবাচক হলেও তাতে প্রত্যাশিত উষ্ণতা ছিল না। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার প্রভাবে সংকটে থাকা প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী জানিয়েছেন যে, নিজেদের চাহিদা মিটিয়েই কেবল বাড়তি জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব। বর্তমানে আসামের রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের পরিমাণও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নয়াদিল্লির বর্তমান মূল্যায়ন হলো, জ্বালানি, পানি, কাঁচামাল ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক প্রয়োজনের জন্য বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এই সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকেই বর্তমানে ঢাকার বিরুদ্ধে এক ধরনের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।
বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত থাকা ভারতের পাঁচটি রাজ্যেই এখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায়। ছবি: রয়টার্স
ভারতই একমাত্র দেশ নয় যাদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এখন বন্ধুর চেয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিবেশীর সংখ্যাই বেশি। ভারতের ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতি নিয়ে অনেক প্রচার চালানো হলেও, নয়াদিল্লি এখনো বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করে এবং প্রতিবেশীদের প্রয়োজনে উদাসীন থাকে। তবে এই দেশগুলো যখন তাদের সমস্যার সমাধানের জন্য চীনের দিকে হাত বাড়ায়, তখনই কেবল ভারতের টনক নড়ে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের প্রতি ভারতের অতীত বিদেশনীতি এর বড় প্রমাণ।
বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারও একই পথে হাঁটতে আগ্রহী। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র আমন্ত্রণে গত ৫ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তিন দিনের সরকারি সফরে চীনে গিয়েছেন। ঢাকা ছাড়ার আগে তিনি নয়াদিল্লির প্রতি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারতের দীর্ঘসূত্রতায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি জানান, এই চুক্তির জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা না করে বাংলাদেশ এখন চীনের সাথে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করবে। চীন সফরে তিনি বাণিজ্য, স্বল্প সুদে ঋণ, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর গত দুই বছর বেইজিং কিছুটা ধীরগতিতে চললেও, এখন তারা ঢাকায় তাদের তৎপরতা নতুন করে জোরদার করছে। এটি নয়াদিল্লির ঘুম ভাঙাতে পারে, কিন্তু ততক্ষণে প্রতিযোগিতায় চীন অনেকটাই এগিয়ে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
*লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত*