“ভাই, ২০২৫ বিপিএলের পাওনা টাকার জন্য এখনও দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। অনেকেই আশা ছেড়ে দিছে। কিন্তু আমার তো হালাল উপার্জন, কেন এভাবে আপনি সেটা মেরে দিবেন। ক্রিকেটের ক-ও বোঝে না এমন মানুষ দল কিনে ফেলে দেখেই এসব হয়। দল ভালো করে নাই বলে আপনি আমার পাওনা টাকা দিবেন না, এইটা কেমন কথা?” আক্ষেপ নিয়ে চরচাকে কথাগুলো বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘরোয়া ক্রিকেটের এক পরিচিত মুখ।
শুধু তিনিই নন, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ার দীর্ঘ তালিকায় বছরের পর বছর ধরে এসেছে অস্ট্রেলিয়ার ব্র্যাড হজ থেকে শুরু করে জিম্বাবুয়ের রায়ান বার্লের নামও। বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গেই যদি এমন অপেশাদার আচরণ হতে পারে, তাহলে দেশি ক্রিকেটারদের বাস্তবতা খুব সহজেই অনুমান করা যায়।
মাঝেমধ্যে ফিক্সিং কেলেঙ্কারি কিংবা খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক জটিলতা থাকলেও লিগটির আকর্ষণ ছিল চোখে পড়ার মতো। দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও তখন আগ্রহ দেখাত বিপিএলে যুক্ত হতে।
বিসিবির এডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল সম্প্রতি বিপিএল নিয়ে যে মন্তব্যগুলো করেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তিনি বলেছেন, বিপিএলের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ঘুম থেকে উঠেই একটি দল কেনা সম্ভব। অর্থাৎ, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক হওয়া এতটাই সহজলভ্য হয়ে গেছে। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে, একসময় আইপিএলের পর সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক টি-টোয়েন্টি লিগ হিসেবে বিবেচিত বিপিএলের এই বেহাল দশা কেন?
গত বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে তামিম আরও জানান, বিপিএলের সবশেষ আসরে বিসিবির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। তার মতে, এভাবে জোড়াতালি দিয়ে টুর্নামেন্ট চালিয়ে নেওয়ার চেয়ে প্রয়োজনে সাময়িক বিরতি দেওয়া ভালো। তিনি মনে করেন, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় দিন দিন কমছে বিপিএলের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা।
অথচ ২০১২ সালে যাত্রা শুরুর পর প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত বিপিএলকে ধরা হতো আইপিএলের পর অঘোষিত দ্বিতীয় সেরা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হিসেবে। মাঝেমধ্যে ফিক্সিং কেলেঙ্কারি কিংবা খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক জটিলতা থাকলেও লিগটির আকর্ষণ ছিল চোখে পড়ার মতো। দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও তখন আগ্রহ দেখাত বিপিএলে যুক্ত হতে।
রংপুর রাইডার্স, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কিংবা ফরচুন বরিশালের মত কয়েকটি দল ধীরে ধীরে নিজেদের ব্র্যান্ড পরিচিতি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সমস্যার শুরু তখন থেকেই, যখন প্রতি আসরের আগে প্রশ্ন উঠতে থাকে, আদৌ বিপিএল হবে তো?
গত বিপিএলে ট্রফি জেতে রাজশাহী। ছবি: ফেসবুক২০২০ সালে কোভিড পরিস্থিতিতে বিসিবি নিজেদের ব্যবস্থাপনায় আয়োজন করে বিপিএলের বিশেষ আসর। সেখানে আগের ফ্র্যাঞ্চাইজি ছিল না। পরের বছর আবার নতুন নামে, নতুন মালিকানায় হাজির হয় দলগুলো। বিশেষ করে ঢাকা ফ্র্যাঞ্চাইজির নাম পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সাধারণ দর্শকরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাবেও হারিয়ে গেছে কুমিল্লাও। আর টানা দুইবার শিরোপা জেতা বরিশালও সরে দাঁড়ায় স্বেচ্ছায়।
ফলে ১৪ বছর পরও বিপিএলের নেই কোনো স্থায়ী কাঠামো। নেই নির্ভরযোগ্য রেভিনিউ মডেল, নেই দীর্ঘমেয়াদি ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানার নিশ্চয়তা। ফলাফল, জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিপিএল এখন পিছিয়ে পড়ছে বিশ্বের অনেক নতুন লিগের কাছেও।
বর্তমানে বিপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একজনের কাছে চরচা জানতে চেয়েছিল, মালিকানা পাওয়া কতোটা সহজ। তিনি বলেন, “বিসিবি নিজেই তো পেশাদার না। আপনি আমাকে একটা লিগ দেখান, যেখানে দল গোছানো আর স্পনসর জোগাড়ের জন্য দুই মাস সময়ও পাবেন না। নাই তো। ব্র্যান্ডিং করার সুযোগই তো নেই। চ্যাম্পিয়ন হলে যে প্রাইজমানি পাওয়া যায়, দল চালাতে তার চার-পাঁচগুণ খরচ হয়। তারপরও যারা দল নেয়, তারা ক্রিকেটকে ভালোবেসেই নেয়।”
বিপিএলের বর্তমান অবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত সেই ‘সহজলভ্য মালিকানা’। বিশ্বের অন্য কোনো বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে প্রতি বছর নতুন নতুন দল এসে জায়গা নেয় না। অথচ বিপিএলে টুর্নামেন্ট শুরুর অল্প কিছুদিন আগেও ন্যূনতম আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক হওয়া সম্ভব।
তামিম যদি ভবিষ্যতে পূর্ণ মেয়াদে বিসিবির নেতৃত্বে আসেন, তাহলে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে এই সংস্কৃতি বদলে দেওয়া। বিপিএলকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা পাওয়া হবে কঠিন, মর্যাদাপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর।
ফলে মালিকদের বড় অংশের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় প্রচার-প্রচারণা, গ্যালারিতে উপস্থিতি বা ক্রিকেটারদের সঙ্গে ছবি তোলা। ক্রিকেট পরিচালনা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সেখানে গৌণ হয়ে যায়। অনেকের কাছে ক্রিকেটাররাও যেন ‘চুক্তিভিত্তিক কর্মচারি’, যাদের পারফরম্যান্স খারাপ হলে বেতন আটকে রাখাও স্বাভাবিক।
আর এই সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর ধরে অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে ফেলার মাধ্যমে। বোর্ডের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেই অনেকেই সহজে ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক হয়ে যান। ফলে ক্রিকেটীয় দর্শন বা পেশাদার পরিকল্পনার চেয়ে প্রাধান্য পায় ব্যক্তিগত যোগাযোগ।
বাংলাদেশের মতো ক্রিকেট পাগল দেশেও তাই বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক হওয়াটা বড্ড সহজ হয়ে গেছে। তাই কাল কেউ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধান্ত নিলেও, সঠিক যোগাযোগ থাকলে হয়তো তিনি বিপিএলের মালিকদের একজন হয়ে যাবেন।
তামিম যদি ভবিষ্যতে পূর্ণ মেয়াদে বিসিবির নেতৃত্বে আসেন, তাহলে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে এই সংস্কৃতি বদলে দেওয়া। বিপিএলকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা পাওয়া হবে কঠিন, মর্যাদাপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর।
ধাপে ধাপে বিপিএলকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে, যাতে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা পাওয়া যেন সোনার হরিণ হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে তাতে বড়জোর কেউ স্বপ্ন দেখতে পারবেন বিপিএলের দল পাওয়ার। সেটা বাস্তবে রুপ দিতে করতে হবে বিনিয়োগ, দিতে হবে পেশাদারত্বের পরিচয়। সেটা হবে তো?