২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের রায় ঘোষিত হয়েছে। এটি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য একটি নিরঙ্কুশ বিজয়। এই জয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি নাগরিকদের অনীহারই প্রতিফলন। ২০১১ সালের মে মাস থেকে তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের শিখরে ছিল, যার অবসান ঘটল ২০২৬ সালের মে মাসে।
তৃণমূল কংগ্রেস তাদের শাসনের শুরুতে একটি ইতিবাচক সুরেই যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু তাদের শাসনের প্রতিটি পর্যায় অতিক্রম করার সাথে সাথে আমরা দেখলাম যে, দলটি ক্রমশ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে মোড় নিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্য যে তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছিল, তা ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে বলে দেখা গেছে।
তৃণমূলের কয়েকজন বাদে বাকি সংসদ সদস্যরা তহবিলের চরম অপব্যবহার করেছেন। স্বাস্থ্য, মাধ্যমিক শিক্ষা, আইন ইত্যাদি উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে দলটি বরাদ্দকৃত তহবিলের অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকেরা এক রূপান্তরমূলক লক্ষ্য বা মোটিফের আশায় তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিল। দুঃখজনক দিকটি হলো, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে বড় বড় কথা বলা নিছকই একটি ইতিবাচক অবস্থান ছিল, কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমরা এটিকে একটি দাম্ভিক আচরণ হিসেবেই দেখতে পাই। এই প্রসঙ্গে একটি পরিতাপের বিষয় হলো, শিক্ষিত সমাজ তৃণমূলের আশ্বাসগুলো সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিল যে, এই দলটি হলো ‘হুক অ্যান্ড ক্রুক’ বা অসদুপায়ের একটি সংমিশ্রণ। ভারত হয়ত একটি উন্নত রাষ্ট্র হতে পারে, কিন্তু বাস্তব অর্থে দেশটি এখনো পুরোপুরি দারিদ্র্যপীড়িত। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে দেখা যায় এটি সত্যিই করুণ।
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা আনুমানিক ১০ কোটির বেশি। কলকাতার জনসংখ্যা ২.১১ কোটি। মোট ভোটার সংখ্যা ২৯৩ (আসন সংখ্যা অনুযায়ী)। নিবন্ধিত ভোটার ৬.৮ কোটি এবং ভোট প্রদানের হার ৯৩%।
সাম্প্রতিক ভোটটি ছিল অত্যন্ত আতঙ্কজনক, যার কারণ পাঠকদের কাছে সুপরিচিত। গত ১৫ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস শাসন ক্ষমতায় ছিল। তৃণমূলের শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে সবাই দলটিকে অভিবাদন জানিয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমরা দেখলাম যে তৃণমূলের ভূমিকা ক্রমশ ফাটল ধরা বা ভেঙে পড়া অবস্থায় পৌঁছেছে। যার ফলে রাজধানী কলকাতা এবং রাজ্যের অন্যান্য অংশের নাগরিকেরা রাজ্য সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
গত দশ থেকে বারো বছর ধরে তৃণমূল সরকার অভ্যন্তরীণ কলহে এতটাই লিপ্ত ছিল যা সাধারণ নাগরিকদের ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাজ্যকে স্বর্ণালী উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, তার দলের কর্মীরা এতটাই বিরক্তিকর ছিলেন যে তারা রাজ্যের নাগরিকদের মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করেন, যা আমাদের সবাইকে এক নিস্তেজ বা তন্দ্রাচ্ছন্ন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। এসআইআর, সিএএ, বাংলাদেশের অস্থিরতা–এই সব মৌলিক ইস্যুগুলো থেকে শুরু করে রাজ্য সরকার এক নোংরা রাজনীতি খেলেছে, যা ভারতের এই গর্বিত রাজ্যের নাগরিকদের মনে একটি নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করেছে।
২০২৪ সালের দুর্গাপূজার আগে একটি উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছিল–কলকাতার উপকণ্ঠের একজন প্রতিশ্রুতিমান পালমোনোলজিস্ট মৌমিতা দেবনাথের হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত দুর্ধর্ষ অপরাধীদের কঠোরভাবে শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। মূল চিকিৎসক, যিনি ছিলেন একজন বড় অপরাধী, তাকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকার নগ্নভাবে আড়াল করেছিল। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের কারণে কলকাতা, ভারতের অন্যান্য অংশ এবং বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনরোষ দেখা দেয়। এমনকি বিবিসি, সিএনএন এবং অন্যান্য নামী সংবাদমাধ্যমগুলোও এর ওপর গুরুত্বপূর্ণ কভারেজ দিয়েছিল। নাগরিকদের এই আন্দোলনের ফলে দেখা গেছে যে, ডা. এস ঘোষকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে একজন নির্দোষ নিম্নস্তরের কর্মীকে কঠোরভাবে তিরস্কার করা হয়। নিম্নস্তরের কর্মী সঞ্জয় রায়কে গরাদের পেছনে পাঠানো হয়। আজ অবধি সঞ্জয় একই অবস্থায় রয়েছেন।
অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে শনাক্ত করা হয়েছে যে, একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এমন কিছু কুরুচিপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা সুশীল সমাজকে অত্যন্ত বিরক্ত করে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন বিজেপি সরকার এই রাজ্যের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা উচিত–শাসনের ধরন হতে হবে সুশৃঙ্খল এবং পদ্ধতিগত, যা অসংখ্য নাগরিকের (যাদের কথা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে) হৃদয় স্পর্শ করবে, যাতে আমাদের রাজ্য দ্রুত জাতীয় স্তরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমানে ‘নবান্ন’ কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রয়েছে, যাতে রাজ্যের কোনো গোপন নথিপত্রের অপব্যবহার না হয়। সল্টলেকে আই-প্যাক-এর সেই ঘটনাটি এখনো আমাদের মনে গেঁথে আছে। এই কারণেই ভারত সরকার অত্যন্ত সতর্ক, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
আমার ওপরের আলোচনার সারমর্ম এই–একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, নতুন সরকারকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যা রাজ্যের সমস্ত স্তরের মানুষের প্রয়োজন মেটাবে। সবচেয়ে জরুরি যা প্রয়োজন তা হলো, আধুনিক প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষার পরে কর্মসংস্থান প্রদান করা। এছাড়াও, জনবসতি এলাকার স্যানিটেশন বা পয়ঃনিষ্কাশনের দিকে যথাযথ নজর দিতে হবে। বিদ্যমান দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে যার মাধ্যমে আমরা সমাজের শুভবোধ বা গাম্ভীর্য নিশ্চিত করতে পারি, যা আমাদের সমাজের পুনর্জাগরণের জন্য একটি মহিমান্বিত সংকেত দেবে।
লেখক: কলামিস্ট, কলকাতা