সহিদুল আলম স্বপন

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলের সোনালি করিডোরে যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সি চিনপিংয়ের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলেন, তখন নয়াদিল্লিতে কী হচ্ছিল? সাউথ ব্লকের ফাইলপত্রে কোনো এক কর্মকর্তা হয়তো ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণাটা তাড়াহুড়ো করে টাইপ করছিলেন। ড্রাগন যখন ঢাকাকে বুকে টেনে নিচ্ছে, হাতি তখন একটু দেরিতে, একটু অস্বস্তিতে, একটু লজ্জায় অলিভ ব্রাঞ্চ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু ইতিহাস কি এত সহজে ক্ষমা করে?
৭২ ঘণ্টায় যা ঘটে গেল
তারেক রহমানের বেইজিং সফরটি কোনো সাধারণ কূটনৈতিক সফর ছিল না। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ক্ষমতায় আসার পর এটি ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর এবং সেই সফরে তিনি বেছে নিলেন কুয়ালালামপুর এবং বেইজিং। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ব্যাকরণে ‘প্রথম গন্তব্য’ মানে কেবল একটি দেশ নয়, এটি একটি বার্তা, একটি ইশতেহার, একটি ঘোষণাপত্র।
বেইজিংয়ে ৭২ ঘণ্টায় যা ঘটল, তা বিস্ময়কর–সতেরোটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সবুজ জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি–বিস্তৃত এক ক্যানভাসজুড়ে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন স্থাপত্য তৈরি হলো। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবিত হলো চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর–যা সংক্ষেপে সিএমবিসি।
এই করিডোরটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে চীনের সরাসরি প্রবেশের দরজা। ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের বন্দর পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন–এটি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সেই ‘মিসিং লিংক’, যা বেইজিং বহুদিন ধরে খুঁজছিল।
করিডোরের স্বপ্ন, বাস্তবতার কাঁটাতার
তবে এখানেই বাস্তবতার কড়া প্রশ্নটি আসে।
মিয়ানমার আজ একটি ভগ্নপ্রায় রাষ্ট্র। সামরিক জান্তা নেপিদো থেকে যতটুকু শাসন করার দাবি করে, মাঠের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক ভিন্ন। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ঠিক সেই রাখাইন, যেটি বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা। সিএমবিসি করিডোরের জন্য যে ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে রাস্তা যাবে, সেই ভূখণ্ড আজ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখলে। এই পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণ শুধু প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনা।
চীন অবশ্য ধৈর্যশীল খেলোয়াড়। বেইজিং জানে, প্রতিশ্রুতির ছায়াতলেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা যায়। সিএমবিসি প্রস্তাবটি এই মুহূর্তে একটি কৌশলগত সংকেত ঢাকার প্রতি, দিল্লির প্রতি, ওয়াশিংটনের প্রতি। বার্তাটি স্পষ্ট, বাংলাদেশ এখন চীনের কক্ষপথে।
মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল চুক্তিটিও এই প্রেক্ষাপটে পড়তে হবে। শ্রীলংকার হাম্বানটোটা, মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ আর এখন সম্ভাব্যভাবে বাংলাদেশের মংলা। ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ তত্ত্বটিকে যারা অতিরঞ্জিত ভাবতেন, তাদের জন্য এটি একটি অস্বস্তিকর মানচিত্র হয়ে উঠছে।
তারেকের কূটনীতি: বাস্তববাদ নাকি নতুন নির্ভরতা?
তারেক রহমান বেইজিংয়ে যা বললেন, তা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের ভাষা ছিল না। চীনকে ‘মহান জাতি’ এবং ‘বিশ্বস্ত অংশীদার’ বলা, সি চিনপিংয়ের নেতৃত্বের মডেলকে ‘বাংলাদেশের শেখার উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করা–এগুলো লিপিবদ্ধ কূটনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, এগুলো একটি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ।
বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে ‘লুক ইস্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে ভারত-নির্ভরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিকে একমাত্রিক করে ফেলেছিল। সেই নির্ভরতাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছিল। তারেক রহমান সেই বৃত্ত ভাঙতে চাইছেন এবং দ্রুত গতিতে চাইছেন।
প্রশ্ন হলো–বহুমাত্রিক কূটনীতি আর নতুন একমাত্রিক নির্ভরতার মধ্যে সীমারেখাটি কোথায়? চীনা বিনিয়োগের সঙ্গে যে শর্ত আসে, তা কখনো দৃশ্যমান, কখনো চুক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজে লুকানো। শ্রীলংকা এই পাঠ কঠিনভাবে শিখেছে। বাংলাদেশের উচিত সেই ইতিহাস পড়া, শুধু স্বাক্ষর করার আগে নয়, প্রতিটি ধারা যাচাই করার সময়ও।

ভারতের ব্যর্থতা: অহংকারের মূল্য
এখন সেই কথায় আসা যাক, যা বলতে অনেকে সংকোচ বোধ করেন, কিন্তু যা না বললে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থাকে। ভারত বাংলাদেশে যা হারিয়েছে, তার দায় মূলত তার নিজের।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নয়াদিল্লি বাংলাদেশ নীতিকে আওয়ামী লীগ নীতির সমার্থক বানিয়ে ফেলেছিল। শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভোজে চশমা ঠোকানো হতো, কিন্তু বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দেখানো হয়নি। ফলাফল? আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত আক্ষরিক অর্থেই ‘কথা বলার মানুষ’ হারিয়ে ফেলল।
চীন সেই একই সময়ে কী করছিল? চুপচাপ, ধৈর্য ধরে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বর্ণালির প্রতিটি রঙের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছিল। আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি–বেইজিং কারো সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেনি। আগস্ট ২০২৪-এর পর চীনকে নতুন করে কিছু সাজাতে হয়নি, শুধু আগে থেকে বোনা নেটওয়ার্ক সক্রিয় করতে হয়েছে।
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তটি ছিল কূটনৈতিক শাস্তির ভাষা, আর সেই শাস্তি পড়েছিল সাধারণ বাংলাদেশিদের ওপর। ২০২৩ সালে ১৬ লাখ বাংলাদেশি ভারতে গিয়েছিলেন, যাদের ৬০ শতাংশই পর্যটক। তাদের কী দোষ ছিল? রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশের জন্য সাধারণ মানুষের জীবনকে জিম্মি করা এটি কূটনীতি নয়, এটি অহংকার।
সেই অহংকারের মূল্য এখন দিতে হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগর: যে পুরস্কারের কথা কেউ সরাসরি বলছে না
বঙ্গোপসাগর আজ ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রীয় মঞ্চ। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই জলরাশির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত এই সংযোগ-পথটি ওয়াশিংটন, টোকিও, নয়াদিল্লি এবং বেইজিং সবার কাছেই অমূল্য।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই প্রতিযোগিতায় তাকে এক অসাধারণ কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেই গুরুত্বই আবার তাকে ঝুঁকিতেও ফেলে। ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর উত্তর-পূর্ব ভারতকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তকারী সেই সরু ভূমিপট্টি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমানা দিয়ে ঘেরা। চীনমুখী বাংলাদেশ ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক মাথাব্যথা নয়, এটি সরাসরি প্রতিরক্ষাগত উদ্বেগ।
কিন্তু এই সত্যটি যেন ঢাকার জন্যও একটি সতর্কবার্তা বহন করে। দুই মহাশক্তির মাঝখানে অবস্থান করা সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু কৌশলগত ভারসাম্য না রাখতে পারলে সেই অবস্থান বিপজ্জনকও হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকার সামনে এখন কোন পথ?
বাংলাদেশ কোনো দাবার ঘুঁটি নয়; এটি একটি সক্রিয় সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তারেক রহমানের সরকার সেই সার্বভৌমত্বকে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রয়োগ করছে। এটি প্রশংসনীয়।
কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রকৃত প্রমাণ গ্রেট হলের ঝলমলে ছবিতে নয়। সেটি থাকে ঋণের শর্তাবলিতে, চুক্তির সূক্ষ্ম ধারায়, বন্দর ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে তার প্রশ্নে। হাম্বানটোটার পাঠ ভুলে গেলে চলবে না। মোংলা যেন হাম্বানটোটা না হয়–এই নিশ্চয়তা চাই চুক্তির কালিতে, কূটনৈতিক বাগাড়ম্বরে নয়।
একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণও জরুরি। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতার ভিত্তিতে অনুগ্রহের নয়, অংশীদারত্বের। ভারতকেও বুঝতে হবে: বাংলাদেশ কোনো বাফার স্টেট নয়, এটি একটি গর্বিত জাতি যার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ আছে।
ইতিহাসের প্রথম খসড়া
ঢাকা তার পছন্দ বেছে নিয়েছে। সেই পছন্দ কি বিচক্ষণ সার্বভৌম বাস্তববাদ, নাকি নতুন এক নির্ভরতার সূচনা–এই রায় ইতিহাস দেবে।
কিন্তু এই গল্পের প্রথম খসড়া লিখেছে নয়াদিল্লি অহংকারের কালিতে, অনুমানের কাগজে।
একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ক্লায়েন্ট ভাবলে, তার গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে দেখলে এবং তার সাধারণ মানুষকে কূটনৈতিক শাস্তির হাতিয়ার বানালে এই পরিণতিই আসে।
আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে, নয়াদিল্লি।
সহিদুল আলম স্বপন: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলের সোনালি করিডোরে যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সি চিনপিংয়ের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলেন, তখন নয়াদিল্লিতে কী হচ্ছিল? সাউথ ব্লকের ফাইলপত্রে কোনো এক কর্মকর্তা হয়তো ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণাটা তাড়াহুড়ো করে টাইপ করছিলেন। ড্রাগন যখন ঢাকাকে বুকে টেনে নিচ্ছে, হাতি তখন একটু দেরিতে, একটু অস্বস্তিতে, একটু লজ্জায় অলিভ ব্রাঞ্চ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু ইতিহাস কি এত সহজে ক্ষমা করে?
৭২ ঘণ্টায় যা ঘটে গেল
তারেক রহমানের বেইজিং সফরটি কোনো সাধারণ কূটনৈতিক সফর ছিল না। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ক্ষমতায় আসার পর এটি ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর এবং সেই সফরে তিনি বেছে নিলেন কুয়ালালামপুর এবং বেইজিং। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ব্যাকরণে ‘প্রথম গন্তব্য’ মানে কেবল একটি দেশ নয়, এটি একটি বার্তা, একটি ইশতেহার, একটি ঘোষণাপত্র।
বেইজিংয়ে ৭২ ঘণ্টায় যা ঘটল, তা বিস্ময়কর–সতেরোটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সবুজ জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি–বিস্তৃত এক ক্যানভাসজুড়ে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন স্থাপত্য তৈরি হলো। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবিত হলো চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর–যা সংক্ষেপে সিএমবিসি।
এই করিডোরটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে চীনের সরাসরি প্রবেশের দরজা। ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের বন্দর পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন–এটি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সেই ‘মিসিং লিংক’, যা বেইজিং বহুদিন ধরে খুঁজছিল।
করিডোরের স্বপ্ন, বাস্তবতার কাঁটাতার
তবে এখানেই বাস্তবতার কড়া প্রশ্নটি আসে।
মিয়ানমার আজ একটি ভগ্নপ্রায় রাষ্ট্র। সামরিক জান্তা নেপিদো থেকে যতটুকু শাসন করার দাবি করে, মাঠের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক ভিন্ন। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ঠিক সেই রাখাইন, যেটি বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা। সিএমবিসি করিডোরের জন্য যে ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে রাস্তা যাবে, সেই ভূখণ্ড আজ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখলে। এই পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণ শুধু প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনা।
চীন অবশ্য ধৈর্যশীল খেলোয়াড়। বেইজিং জানে, প্রতিশ্রুতির ছায়াতলেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা যায়। সিএমবিসি প্রস্তাবটি এই মুহূর্তে একটি কৌশলগত সংকেত ঢাকার প্রতি, দিল্লির প্রতি, ওয়াশিংটনের প্রতি। বার্তাটি স্পষ্ট, বাংলাদেশ এখন চীনের কক্ষপথে।
মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল চুক্তিটিও এই প্রেক্ষাপটে পড়তে হবে। শ্রীলংকার হাম্বানটোটা, মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ আর এখন সম্ভাব্যভাবে বাংলাদেশের মংলা। ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ তত্ত্বটিকে যারা অতিরঞ্জিত ভাবতেন, তাদের জন্য এটি একটি অস্বস্তিকর মানচিত্র হয়ে উঠছে।
তারেকের কূটনীতি: বাস্তববাদ নাকি নতুন নির্ভরতা?
তারেক রহমান বেইজিংয়ে যা বললেন, তা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের ভাষা ছিল না। চীনকে ‘মহান জাতি’ এবং ‘বিশ্বস্ত অংশীদার’ বলা, সি চিনপিংয়ের নেতৃত্বের মডেলকে ‘বাংলাদেশের শেখার উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করা–এগুলো লিপিবদ্ধ কূটনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, এগুলো একটি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ।
বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে ‘লুক ইস্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে ভারত-নির্ভরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিকে একমাত্রিক করে ফেলেছিল। সেই নির্ভরতাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছিল। তারেক রহমান সেই বৃত্ত ভাঙতে চাইছেন এবং দ্রুত গতিতে চাইছেন।
প্রশ্ন হলো–বহুমাত্রিক কূটনীতি আর নতুন একমাত্রিক নির্ভরতার মধ্যে সীমারেখাটি কোথায়? চীনা বিনিয়োগের সঙ্গে যে শর্ত আসে, তা কখনো দৃশ্যমান, কখনো চুক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজে লুকানো। শ্রীলংকা এই পাঠ কঠিনভাবে শিখেছে। বাংলাদেশের উচিত সেই ইতিহাস পড়া, শুধু স্বাক্ষর করার আগে নয়, প্রতিটি ধারা যাচাই করার সময়ও।

ভারতের ব্যর্থতা: অহংকারের মূল্য
এখন সেই কথায় আসা যাক, যা বলতে অনেকে সংকোচ বোধ করেন, কিন্তু যা না বললে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থাকে। ভারত বাংলাদেশে যা হারিয়েছে, তার দায় মূলত তার নিজের।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নয়াদিল্লি বাংলাদেশ নীতিকে আওয়ামী লীগ নীতির সমার্থক বানিয়ে ফেলেছিল। শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভোজে চশমা ঠোকানো হতো, কিন্তু বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দেখানো হয়নি। ফলাফল? আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত আক্ষরিক অর্থেই ‘কথা বলার মানুষ’ হারিয়ে ফেলল।
চীন সেই একই সময়ে কী করছিল? চুপচাপ, ধৈর্য ধরে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বর্ণালির প্রতিটি রঙের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছিল। আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি–বেইজিং কারো সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেনি। আগস্ট ২০২৪-এর পর চীনকে নতুন করে কিছু সাজাতে হয়নি, শুধু আগে থেকে বোনা নেটওয়ার্ক সক্রিয় করতে হয়েছে।
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তটি ছিল কূটনৈতিক শাস্তির ভাষা, আর সেই শাস্তি পড়েছিল সাধারণ বাংলাদেশিদের ওপর। ২০২৩ সালে ১৬ লাখ বাংলাদেশি ভারতে গিয়েছিলেন, যাদের ৬০ শতাংশই পর্যটক। তাদের কী দোষ ছিল? রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশের জন্য সাধারণ মানুষের জীবনকে জিম্মি করা এটি কূটনীতি নয়, এটি অহংকার।
সেই অহংকারের মূল্য এখন দিতে হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগর: যে পুরস্কারের কথা কেউ সরাসরি বলছে না
বঙ্গোপসাগর আজ ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রীয় মঞ্চ। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই জলরাশির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত এই সংযোগ-পথটি ওয়াশিংটন, টোকিও, নয়াদিল্লি এবং বেইজিং সবার কাছেই অমূল্য।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই প্রতিযোগিতায় তাকে এক অসাধারণ কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেই গুরুত্বই আবার তাকে ঝুঁকিতেও ফেলে। ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর উত্তর-পূর্ব ভারতকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তকারী সেই সরু ভূমিপট্টি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমানা দিয়ে ঘেরা। চীনমুখী বাংলাদেশ ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক মাথাব্যথা নয়, এটি সরাসরি প্রতিরক্ষাগত উদ্বেগ।
কিন্তু এই সত্যটি যেন ঢাকার জন্যও একটি সতর্কবার্তা বহন করে। দুই মহাশক্তির মাঝখানে অবস্থান করা সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু কৌশলগত ভারসাম্য না রাখতে পারলে সেই অবস্থান বিপজ্জনকও হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকার সামনে এখন কোন পথ?
বাংলাদেশ কোনো দাবার ঘুঁটি নয়; এটি একটি সক্রিয় সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তারেক রহমানের সরকার সেই সার্বভৌমত্বকে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রয়োগ করছে। এটি প্রশংসনীয়।
কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রকৃত প্রমাণ গ্রেট হলের ঝলমলে ছবিতে নয়। সেটি থাকে ঋণের শর্তাবলিতে, চুক্তির সূক্ষ্ম ধারায়, বন্দর ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে তার প্রশ্নে। হাম্বানটোটার পাঠ ভুলে গেলে চলবে না। মোংলা যেন হাম্বানটোটা না হয়–এই নিশ্চয়তা চাই চুক্তির কালিতে, কূটনৈতিক বাগাড়ম্বরে নয়।
একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণও জরুরি। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতার ভিত্তিতে অনুগ্রহের নয়, অংশীদারত্বের। ভারতকেও বুঝতে হবে: বাংলাদেশ কোনো বাফার স্টেট নয়, এটি একটি গর্বিত জাতি যার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ আছে।
ইতিহাসের প্রথম খসড়া
ঢাকা তার পছন্দ বেছে নিয়েছে। সেই পছন্দ কি বিচক্ষণ সার্বভৌম বাস্তববাদ, নাকি নতুন এক নির্ভরতার সূচনা–এই রায় ইতিহাস দেবে।
কিন্তু এই গল্পের প্রথম খসড়া লিখেছে নয়াদিল্লি অহংকারের কালিতে, অনুমানের কাগজে।
একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ক্লায়েন্ট ভাবলে, তার গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে দেখলে এবং তার সাধারণ মানুষকে কূটনৈতিক শাস্তির হাতিয়ার বানালে এই পরিণতিই আসে।
আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে, নয়াদিল্লি।
সহিদুল আলম স্বপন: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট