Advertisement Banner

পাম্পে তেল ‘নাই’, সরকারের সংকট ‘নাই’!

পাম্পে তেল ‘নাই’, সরকারের সংকট ‘নাই’!
ফিলিং স্টেশন। ছবি: চরচা

অফিসে আসার সময়। তবে ঠিক পিক আওয়ার নয়। প্রায় ১২টা ছুঁই ছুঁই। অর্থাৎ, দুপুর প্রায় শুরু হচ্ছে।

সেই সময়টায় পাঠাও বা উবার অ্যাপে রাইড রিকোয়েস্ট দিলে জ্যাম কম থাকায় বিল একটু কম আসে সাধারণত। তাই নিজেকে ‘মধ্যবিত্ত’ দাবি করা এই লেখক পকেট বাঁচাতেই ওই সময়টা বেছে নেন যাতায়াতে।

রিকোয়েস্ট দেওয়ার পর যথারীতি একজন রাইডার এলেন। খুবই ভদ্র মানুষ। তবে আসার আগেই ফোনে তিনি একটি ছোট্ট অনুরোধ জানিয়ে দিলেন। সেটি হলো–‘ভাই, একটু আন্তরিকতা দেখায়েন।’

কিছুটা অবাক হতেই হলো। গত কয়েক বছরে অনেকবারই মোটরসাইকেল রাইড শেয়ার করা হয়েছে। তবে কখনো ‘আন্তরিকতা’ দেখানোর অনুরোধ পাওয়া যায়নি। কী সেই আন্তরিকতা?

রাইডার পৌঁছানোর পর জানা হলো বিস্তারিত। তিনি এসেই জানালেন তার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে তেলের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানোর বৃত্তান্ত। জানালেন, কোথাও অকটেন পাচ্ছেন না। তিনি শুনেছেন, ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদের হাত করে কেউ কেউ নাকি তেল পাচ্ছে! কিন্তু তাকে নাকি কেউ স্টেশনে ঢুকতেই দিচ্ছে না, তেল তো পরে। ফলে স্টেশনে ঢুকে একটু ‘দুই নাম্বারি’ করার সুযোগও মিলছে না।

তাই রাইডারের সনির্বন্ধ অনুরোধ–‘ভাই, একটু আন্তরিকতা দেখায়েন।’ সেই আন্তরিকতাটুকু হলো, অ্যাপে আসা বিলের সাথে যদি কিছু বেশি দেওয়া হয়। কারণ, তার নাকি অকটেন কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকা করে! সাথে সাথেই শুনিয়ে দেওয়া হলো, সরকারের নির্ধারিত মূল্যতালিকার কথা। তবে রাইডার ভাইটির বক্তব্য–‘বাস্তবতা ভিন্ন, ভাই। ২০০ টাকার নিচে অকটেন নাই।’

এরপর পুরো যাত্রাপথেই তেল নিয়ে ভোগান্তির কথা শুনিয়ে গেলেন রাইডার ভাইটি। তিনি মধ্যবয়স্ক, বোঝাই যায় পরিবারের বোঝা ঘাড়ে আছে ভালোমতোই। তবে ‘আন্তরিকতা’ দেখানোর কথা বলার সাথে সাথে সেটি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তিনি করেননি একেবারেই। বরং পুরোটাই ছেড়ে দেন যাত্রীর ওপরই। অর্থাৎ, আন্তরিকতা নির্ধারক রেট তিনি বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করেননি একটুও।

চালক ভাইয়ের বক্তব্য হলো, তিনি তেল সংকটে ভুগছেন। যতটুকু তেলই পাচ্ছেন নানা ফিলিং স্টেশন ঘুরে, দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ইচ্ছেমতো যে নেওয়া যাচ্ছে, তাও না।

অথচ, এই রাজধানী শহরে সময় মানেই টাকা। বাংলা সিনেমাতেও দেখানো হয়, ঢাকার বাতাসে টাকা ওড়ে! যদিও সেই টাকা উপার্জনে সময় কতটা বেচতে হয়, ঘাম কতটা ঝরাতে হয়–সেটির উল্লেখ থাকে না। তাই সেই সময় ও শ্রমের অপচয়ের বিপরীতেই ক্ষতি পোষাণোর আকাঙ্ক্ষায় আসে ‘আন্তরিকতা’ প্রদর্শনের আহ্বান। যাতে লাভ-ক্ষতির পাল্লাটা একটু সমানে সমান থাকে।

অবশ্য বাংলা সিনেমারই আরেক নিদর্শন ‘ভালোবাসা দিবি কিনা বল?’–এর মতো জোর করে ‘আন্তরিকতা’ আদায়ের পথে চালক ভাইটি হাঁটেননি। তিনি যাত্রী, তথা এ লেখকের ইচ্ছের ওপরই পুরোটা ছেড়েছিলেন। শেষে ২০/৩০ টাকা বেশি দিয়েই ‘আন্তরিকতা’ প্রদান কার্যক্রম শেষ হলো অবশ্য। রাইডার ভাইটি তাতেই খুশি। এবং সেই সাথে বারবার দুঃখপ্রকাশমূলক বক্তব্যে বললেন–‘ভাই, কিছু মনে কইরেন না, আমি নিরুপায় হইয়া…।’

কথাটা আর শেষ করতে দেওয়া হয়নি। মানুষের নিরুপায় হওয়ার গল্প আসলে সকরুণ হয় সাধারণত। ওতে দয়া মিশে থাকে বেশি, মায়া কম। কিছু করার সুযোগও থাকে কম। তাই এমন গল্প যত কম শোনা যায়, ততই ভালো।

যদিও যাদের এসব ক্ষেত্রে বেশি করার কথা, তারা বলে চলেছে–তেলের কোনো সংকট নাই। হ্যাঁ, সরকারের কথাই বলা হচ্ছে। অনির্বাচিত নয়, একটি নির্বাচিত সরকারই বটে।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সার্বিক জ্বালানির পরিস্থিতি নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। তাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো ধরনের সংকট নেই। তিনি আরো বলেছেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা রুখতে মজুতদারদের বিরুদ্ধে বা অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শুধু সচিবালয় নয়, সংসদেও একই কথা। গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাশেমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। একই দিনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও বলেছেন, “জনগণের স্বস্তি নিশ্চিত করতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত দেশের জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই।”

অর্থাৎ, সরকারি বয়ান শুনলে মনে হতেই বাধ্য যে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নাই। অথচ, রাস্তায় নামলে পরিস্থিতি ভিন্ন। মিল শুধু ‘নাই’–এর জায়গাতেই। কারণ, বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনেও সেই ‘নাই’ লেখা সাইনবোর্ডই ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। সামনে কখনো পেট্রল বসছে, তো কখনো অকটেন। একেবারেই নিজের মালিকানাধীন চর্মচক্ষুতে তা দেখাও গেছে।

আমাদের বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষীয় বয়ানের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। সেটি হলো–শুরুতেই অস্বীকার করে ফেলা। এই দেশের শাসনক্ষমতায় থাকা সব সরকারই এই বৈশিষ্ট্য মেনে চলে প্রবলভাবে। অবস্থাটি অনেকটা এমন, যেন চোখ বুজে থাকলেই আর কিছু দেখা লাগল না যেহেতু, সেহেতু কিছু ঘটেওনি! এই মন্ত্রটি এ দেশের সব সরকারই মেনে চলে চোখ বুজেই, তা নির্বাচিত হোক বা অনির্বাচিত।

বর্তমান তেল সংকটেও সদ্য নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের পক্ষ থেকে একই ধরনের আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারি ভাষ্যেই স্পষ্ট যে, অবৈধভাবে তেল মজুতের ঘটনা ঘটছে। অভিযান চালানোর পর সেসবের কিছু কিছু ধরা পড়ার খবরও মিলছে। এখন কথা হলো–জ্বালানি তেল নিয়ে এমন হুলুস্থূলটা হলো কেন? প্রথমে রেশনিং, পরে ফিলিং স্টেশনের সামনে লম্বা লম্বা লাইন, এরপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার আলাপ–এত কিছুর পর সরকারের পক্ষ থেকে যদি জনসাধারণের ‘প্যানিক বায়িং’কে সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে–সংকট যদি না-ই থাকে, তবে প্যানিক সৃষ্টির শুরুর প্রদীপে ঘি ঢালল কে? সঠিক পরিকল্পনা কি আদৌ ছিল?

জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন। ছবি: চরচা
জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন। ছবি: চরচা

কেউ কেউ অবশ্য বলছেন–জ্বালানি তেলের দাম যে বাড়েনি এখনো, সেটি বর্তমান সরকারের একটি প্রধান সফলতা। হ্যাঁ, সফলতা তো অবশ্যই। এতে করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারের সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি, তথা জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতিকে হয়তো কিছুটা আটকানো যাচ্ছে। কিছুটা, কারণ সাধারণের অনানুষ্ঠানিক ব্যয়বৃদ্ধি ঘটছেই। সেটির উদাহরণ এই লেখার শুরুতেই পাওয়া যাচ্ছে নিশ্চয়ই। এমন সংশ্লিষ্ট খাত আছে আরো অনেক, খুঁজলে পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই।

তাই সরকারকে শুরুতেই অস্বীকারের মনোভাব থেকে বের হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক স্লোগানের মতো করে ‘সংকট নাই, সংকট নাই’ করলেই বহুরূপী সংকট আসলে ‘নাই’ হয়ে যায় না। বরং নানা রূপে সেসব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। মানুষের তখন কষ্ট হয় দুই ধরনের। একটি হলো, আক্ষরিক কষ্ট। আরেকটি হলো, সরকার বা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সেই কষ্ট অস্বীকার করায় তৈরি কষ্ট। আমার যন্ত্রণা যার বোঝার কথা, সে যখন না বোঝে, তখন যা হয় আর কি!

দ্বিতীয়টায় তাই কষ্ট একসময় ক্ষোভে পরিণত হয়। ওই ক্ষোভের প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। গড়াতে গড়াতে তা একসময় ব্যালট বাক্স পর্যন্তও পৌঁছে যায় কিন্তু। আশা করা যায়, ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ব্যালটের হিসাব অন্তত বুঝবে। সেই হিসাব-নিকাশ করেই তো তাদের ক্ষমতায় আসতে হয়েছে। একেকটা ভোট মানে একেকজন মানুষ, একেকটা মন। সেসব মনের কষ্ট বোঝাটা তাই সরকারের টিকে থাকার জন্যই অতি জরুরি। তা না হলে জনভিত ক্ষয় হতে থাকে ক্রমশ।

এখন বুঝলেই ভালো। আর না বুঝলে কী হয়, তা তো জানাই।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত