রাজ শুভ নারায়ন চৌধুরী

লিওনেল স্কালোনি প্রশ্নটা শুনে চমকে গিয়েছিলেন। কিছুটা বিরক্তও হলেন বুঝি! লিওনেল মেসি আবার আর্জেন্টিনা দলের বোঝা হন কী করে!
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নটাই এক সাংবাদিক করেছেন স্কালোনিকে। আর্জেন্টিনা কোচ চোখমুখ কুঁচকেই দলের মেসির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করলেন।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে আজ মেসিকে যখন ৭৯ মিনিটে তুলে নিচ্ছেন স্কালোনি, ওই সাংবাদিকের কথা মনে করে কি মনে মনে একটু হেসে নিয়েছিলেন?
মেসি নাকি আর্জেন্টিনার বোঝা! পাগল নাকি!
৭ দিন বাদে মেসি ৩৯-এ পা দিতে পারেন, মেসির এটা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ হতে পারে, আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ২০০তম হতে পারে, বাংলাদেশ সময় ১৭ জুনে গড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে আজকের ম্যাচটা যে তারিখে – ২০ বছর আগের সেই ১৬ জুনেই মেসি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম নেমে প্রথম গোলও করে ফেলার কিছু ভিডিও আর অনেক স্মৃতি সামনে আসতে পারে…তবে এর সবই মেসির বড় হওয়ার কথা বলে। সময় আর ফুটবলের চাহিদা মেনে মেসির রূপান্তরের কথা বলে।
বুড়ো হওয়া? সেসব মেসির অভিধানে নেই।
বোঝা? ও শব্দ মুখে আনাও অনুচিত! আলজেরিয়ার বিপক্ষে আজ মেসির পারফরম্যান্সের পর তো ঘোর অপরাধ!
মেসি যে বুড়ো হচ্ছেন না, সে সার্টিফিকেট আপনি আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার-মিডফিল্ডারদের কাছে পাবেন। কিংবা নিতে পারেন কিলিয়ান এমবাপ্পে আর আর্লিং হালান্ডের কাছ থেকে।
সেই চার বছর আগে মেসি কাতারে বিশ্বজয়ের পর বুঝি-বা একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন এমবাপ্পে-হালান্ড। এবার বুঝি এই লোকের হাত থেকে নিস্তার মিলল! সব ইঙ্গিত সেদিকেই ছিল। এদিকে মেসি আর ওদিকে রোনালদোর শেষ দেখে ফেলা সে বিশ্বকাপে তাদের বিদায়ের পর ফুটবলের ঝাণ্ডাটা কার হাতে থাকবে, কারা জন্ম দেবেন ভবিষ্যতের মেসি-রোনালদো দ্বৈরথের – সে বিশ্লেষণে বারবার হালান্ড আর এমবাপ্পের নাম এসেছে। খেলার ধরনে যদিও মেসি আর রোনালদো দ্বৈরথ এ দুজনকে দিয়ে সম্ভব নয় - দুজনের কেউই মেসির মতো প্লেমেকার নন, এমবাপ্পে রোনালদোর মতো একাই কিছু গোল করতে পারলেও হালান্ড পুরোপুরিই গোলের জন্য সতীর্থদের পাসের ওপর নির্ভরশীল। তবু দুজনই যেহেতু গোল করে চলেছিলেন, এর বাইরে আর কাউকে খুঁজে নেওয়া যাচ্ছিল না, মেসি-রোনালদোর সম্ভাব্য বিদায় দেখা ফুটবল এমবাপ্পে-হালান্ডেই বিজ্ঞাপনী মুখ খুঁজে নিতে উঠেপড়ে লেগেছিল তখন।
মাঝের চার বছরে ভিনিসিয়ুসের উত্থান দেখেছে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল। লামিন ইয়ামাল নামের এক বালক ১৬ বছরেই ইউরোপ মাতিয়ে এবার ১৮ পেরোতে না পেরোতেই বিশ্বজয়ের দাবি নিয়ে হাজির। হালান্ড-এমবাপ্পের কল্পনার ‘বাইপোলার’ ফুটবল দুনিয়ায় এখন ‘মাল্টিপোলার’ হতে চলেছে। কিন্তু এ সময়েও আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করতে হয় যে, চার বছর পরও এই চল্লিশ ছুঁইছুঁই মেসিই এখনো একইরকম প্রাসঙ্গিক।
প্রাসঙ্গিক বললেও কমই বলা হয়ে যায়! কিছু কিছু জায়গায় মনে হবে, মেসির হাতেই এখনো ফুটবল দুনিয়ার একক কর্তৃত্ব। সে দুনিয়াটা এখনো ইউনিপোলার। এখন মেসিকেই সেলাম ঠোকে গ্যালারি। মুখে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি আসতেই অবধারিতভাবে দুই হাত সামনে টেনে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশও চলে আসে দর্শকের। এখনো এমবাপ্পে বা হালান্ডরা যা করেন, মেসি কখনো কখনো তার চেয়ে এক কাঠি এগিয়েই থাকেন।
তুলনাটার জন্য আজকের দিনের চেয়ে, আরও নির্দিষ্ঠভাবে বললে গত কয়েকটি ঘণ্টার চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে!
কয়েক ঘণ্টা আগে, বাংলাদেশ সময় গতকাল রাতে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো মাঠে নেমেছে ফ্রান্স। সেনেগালের বিপক্ষে প্রথমার্ধে ধুঁকলেও দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ম্যাচটা জিতেছে ৩-১ গোলে, জোড়া গোল করেছেন এমবাপ্পে। তার ঘণ্টাখানেক পর একই গ্রুপের অন্য ম্যাচে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে মাঠে নেমেছে ইরাকের বিপক্ষে। হালান্ডও করলেন জোড়া গোল, এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ডার্ক হর্স নরওয়ে জিতল ৪-১ গোলে।
হালান্ডের জোড়া গোল, এমবাপ্পেরও তা-ই…আজ রাতে যখন মাঠে নামবেন আরও দুই ‘গোলশিকারি’ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর হ্যারি কেইন – বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়ের আলোচনা শুরু হতে আর কী লাগে! মেসি নিজে গোল করার চেয়েও গত কয়েক বছরে প্লেমেকিংয়ে বেশি নজর দেওয়ায় তার নামটা সেভাবে এই হিসাবে আসেনি। মানে, গতকাল রাত পর্যন্ত আসেনি।

বাংলাদেশে রাত গড়াল, সকাল হলো। চোখ কচলাতে কচলাতে আবিষ্কার করা গেল, মেসি হ্যাটট্রিক করে ফেলেছেন! ব্যক্তিগত রেকর্ডের হিসাবে বিশ্বকাপে তার প্রথম হ্যাটট্রিক, এবারের বিশ্বকাপেরও প্রথম। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে এমবাপ্পে কাল রাতে তাকে পেছনে ফেলে এক গোলে এগিয়ে গিয়েছিলেন, মেসি আজ এমবাপ্পে তো এমবাপ্পে, বাকি সবাইকেই পেছনে ফেলে বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে গেলেন। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ওই সোনালি জুতোটার দৌড়ে এমবাপ্পে-হালান্ড আবিষ্কার করলেন, মেসিই চোখের পলকে সবার ওপরে। রোনালদো-কেইন টের পেলেন, মাঠে নামার আগেই ঘাড়ের ওপর চাপটা বেড়ে গেছে।
এবং এই আলোচনাটা কেমন অনুচিত ঠেকছে না? শুধু গোলের সংখ্যা দিয়েই মেসিকে বর্ণনা করার মতো বোকামি তো ফুটবল বিশ্লেষণে আর হয় না! মেসির বেলায় গোলের সংখ্যায় চোখ রাখতে পারেন, তবে তার চেয়ে বেশি দেখতে হবে গোলের ধরন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আজ ‘ট্যাপ-ইনে’ দ্বিতীয় গোলটাতে পজিশনিংয়ের দক্ষতার কথা যদি বাদও দেন, বাকি দুই গোল আপনি একেবারে পরিষ্কার ভিডিওতে না দেখলেও, শুধু অবয়ব বা ‘সিলুয়েট’ ঢংয়ের ভিডিওতে দেখলেও বলবেন – আরে, মেসির গোল!
১৭ মিনিটে প্রথম গোলটা এমন যে, আর্জেন্টিনা আর মেসির খেলার ধরনের সঙ্গে পরিচয় থাকলে গোলটার বর্ণনা আপনার চেনা। বল যখন আর্জেন্টিনার অর্ধে, হাঁটতে হাঁটতেই আলজেরিয়া মিডফিল্ডের পেছনে পাস নেওয়ার মতো জায়গায় চলে গেলেন মেসি। আর্জেন্টিনার অর্ধ থেকেই রদ্রিগো দে পলের এক কাঁটা কম্পাসে মাপা পাস চলে গেল তার কাছে আলজেরিয়ার অর্ধে - আলজেরিয়ার মিডফিল্ড কিছু বুঝতেই পারল না! এরপর আর কী, গত ২০ বছরে এমন কিছু আপনি অনেক দেখেছেন - বার্সেলোনায়, পিএসজিতে, মায়ামিতে, আর্জেন্টিনায়। মেসি বল পেলেন, এক দৌড়ে বল নিয়ে কিছুটা এগোতেই তিনি আলজেরিয়ার বক্সের মাথায়। সেখান থেকে বাঁ পায়ের অসাধারণ বাঁকানো শট! আলজেরিয়ার গোলকিপার লুকা জিদান - জিনেদিন জিদানের ছেলে - লাফিয়ে বলে আঙুল ছোঁয়াতে পারলেন বটে, তাতে বলের গতিপথ একটু বদলালেও ঠিকানা বদলাল না। বল জালে!

তৃতীয় গোলটাতে আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণ প্রাণই পেল তার পায়ে। মাঝবৃত্তে বল পেয়ে ছুটলেন দারুণ গতিতে, বাঁ পায়ের বাইরের অংশের স্পর্শে লেফট উইংয়ে নিকো গনসালেসের কাছে পাস দিয়েই চলে গেলেন ফাঁকা জায়গায়, ঠিক আলজেরিয়া বক্সের ওপরে। বল ক্যারিইং, পাসিং, ভিশন, পজিশনিং…এক মুভেই দেখা হয়ে গেল সব। বাকি যা থাকল, তাতে দর্শন মিলল ভিনটেইজ মেসির! বল পায়ে পেয়ে এক মুহূর্তের থামা, যেন সিনেম্যাটিক পজ! এরপর বাঁ পায়ের বাঁকানো শট। এত বছরেও কোনো গোলকিপারের সাধ্য হয়নি এমন শত শট ঠেকানোর। আলজেরিয়ায় জন্ম নিয়েও ফ্রান্সের কিংবদন্তি বনে যাওয়া জিনেদিন জিদান ভিআইপি গ্যালারিতে বসে দেখলেন, আলজেরিয়ার গোলপোস্টে দাঁড়ানো তার ছেলে লুকারও সে সাধ্য হলো না। হওয়ার কথা ছিল কি? অসাধ্য এমন শটে, অবিশ্বাস্য এমন মেসির হ্যাটট্রিকের শিকার তার ছেলে – ওতে খুব বেশি খারাপও কি লাগবে জিদানের?
এক সময়ে পিএসজিতে সতীর্থ মেসি যে গোলের সংখ্যায় তাকে টেক্কা দিয়ে দিলেন আপাতত, তাতে এমবাপ্পেরও কি খারাপ লাগবে? প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে নিশ্চিত, তবে হয়তো গা জ্বলবে না।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার একজনের সাফল্যে ব্রাজিলিয়ানদেরও যেমন জ্বলছে না। ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনামজুড়ে মেসির জয়জয়কার। তাদের দল জেতেনি, তাদের একজন নেইমার এখনো ফিট হয়ে ওঠেননি, তাদের একজন ভিনিসিয়ুস গোল করলেও এখনো একাই দলকে জেতানোর মতো কেউ হয়ে উঠতে পারেননি… সেখানে এই বয়সেও মেসির একাই সবাইকে ছাপিয়ে যাওয়ার ক্ষণে ব্রাজিলে হিংসা নেই। বড়জোর নিজেদের এমন কেউ না থাকার দীর্ঘশ্বাস আছে।
ক্যারিয়ারের সব গোল-অ্যাসিস্ট-রেকর্ড ছাপিয়ে মেসির বড় অর্জন হয়তো ওখানেই। ‘আমাদের আর ওদের’ যে সীমারেখা সাধারণ মনে টানা থাকে, মেসি নামে সেটা মুছে যায়।
ঠিক যেভাবে বয়সের সীমারেখা মুছে যায় মেসির ছন্দে।

লিওনেল স্কালোনি প্রশ্নটা শুনে চমকে গিয়েছিলেন। কিছুটা বিরক্তও হলেন বুঝি! লিওনেল মেসি আবার আর্জেন্টিনা দলের বোঝা হন কী করে!
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নটাই এক সাংবাদিক করেছেন স্কালোনিকে। আর্জেন্টিনা কোচ চোখমুখ কুঁচকেই দলের মেসির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করলেন।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে আজ মেসিকে যখন ৭৯ মিনিটে তুলে নিচ্ছেন স্কালোনি, ওই সাংবাদিকের কথা মনে করে কি মনে মনে একটু হেসে নিয়েছিলেন?
মেসি নাকি আর্জেন্টিনার বোঝা! পাগল নাকি!
৭ দিন বাদে মেসি ৩৯-এ পা দিতে পারেন, মেসির এটা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ হতে পারে, আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ২০০তম হতে পারে, বাংলাদেশ সময় ১৭ জুনে গড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে আজকের ম্যাচটা যে তারিখে – ২০ বছর আগের সেই ১৬ জুনেই মেসি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম নেমে প্রথম গোলও করে ফেলার কিছু ভিডিও আর অনেক স্মৃতি সামনে আসতে পারে…তবে এর সবই মেসির বড় হওয়ার কথা বলে। সময় আর ফুটবলের চাহিদা মেনে মেসির রূপান্তরের কথা বলে।
বুড়ো হওয়া? সেসব মেসির অভিধানে নেই।
বোঝা? ও শব্দ মুখে আনাও অনুচিত! আলজেরিয়ার বিপক্ষে আজ মেসির পারফরম্যান্সের পর তো ঘোর অপরাধ!
মেসি যে বুড়ো হচ্ছেন না, সে সার্টিফিকেট আপনি আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার-মিডফিল্ডারদের কাছে পাবেন। কিংবা নিতে পারেন কিলিয়ান এমবাপ্পে আর আর্লিং হালান্ডের কাছ থেকে।
সেই চার বছর আগে মেসি কাতারে বিশ্বজয়ের পর বুঝি-বা একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন এমবাপ্পে-হালান্ড। এবার বুঝি এই লোকের হাত থেকে নিস্তার মিলল! সব ইঙ্গিত সেদিকেই ছিল। এদিকে মেসি আর ওদিকে রোনালদোর শেষ দেখে ফেলা সে বিশ্বকাপে তাদের বিদায়ের পর ফুটবলের ঝাণ্ডাটা কার হাতে থাকবে, কারা জন্ম দেবেন ভবিষ্যতের মেসি-রোনালদো দ্বৈরথের – সে বিশ্লেষণে বারবার হালান্ড আর এমবাপ্পের নাম এসেছে। খেলার ধরনে যদিও মেসি আর রোনালদো দ্বৈরথ এ দুজনকে দিয়ে সম্ভব নয় - দুজনের কেউই মেসির মতো প্লেমেকার নন, এমবাপ্পে রোনালদোর মতো একাই কিছু গোল করতে পারলেও হালান্ড পুরোপুরিই গোলের জন্য সতীর্থদের পাসের ওপর নির্ভরশীল। তবু দুজনই যেহেতু গোল করে চলেছিলেন, এর বাইরে আর কাউকে খুঁজে নেওয়া যাচ্ছিল না, মেসি-রোনালদোর সম্ভাব্য বিদায় দেখা ফুটবল এমবাপ্পে-হালান্ডেই বিজ্ঞাপনী মুখ খুঁজে নিতে উঠেপড়ে লেগেছিল তখন।
মাঝের চার বছরে ভিনিসিয়ুসের উত্থান দেখেছে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল। লামিন ইয়ামাল নামের এক বালক ১৬ বছরেই ইউরোপ মাতিয়ে এবার ১৮ পেরোতে না পেরোতেই বিশ্বজয়ের দাবি নিয়ে হাজির। হালান্ড-এমবাপ্পের কল্পনার ‘বাইপোলার’ ফুটবল দুনিয়ায় এখন ‘মাল্টিপোলার’ হতে চলেছে। কিন্তু এ সময়েও আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করতে হয় যে, চার বছর পরও এই চল্লিশ ছুঁইছুঁই মেসিই এখনো একইরকম প্রাসঙ্গিক।
প্রাসঙ্গিক বললেও কমই বলা হয়ে যায়! কিছু কিছু জায়গায় মনে হবে, মেসির হাতেই এখনো ফুটবল দুনিয়ার একক কর্তৃত্ব। সে দুনিয়াটা এখনো ইউনিপোলার। এখন মেসিকেই সেলাম ঠোকে গ্যালারি। মুখে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি আসতেই অবধারিতভাবে দুই হাত সামনে টেনে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশও চলে আসে দর্শকের। এখনো এমবাপ্পে বা হালান্ডরা যা করেন, মেসি কখনো কখনো তার চেয়ে এক কাঠি এগিয়েই থাকেন।
তুলনাটার জন্য আজকের দিনের চেয়ে, আরও নির্দিষ্ঠভাবে বললে গত কয়েকটি ঘণ্টার চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে!
কয়েক ঘণ্টা আগে, বাংলাদেশ সময় গতকাল রাতে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো মাঠে নেমেছে ফ্রান্স। সেনেগালের বিপক্ষে প্রথমার্ধে ধুঁকলেও দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ম্যাচটা জিতেছে ৩-১ গোলে, জোড়া গোল করেছেন এমবাপ্পে। তার ঘণ্টাখানেক পর একই গ্রুপের অন্য ম্যাচে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে মাঠে নেমেছে ইরাকের বিপক্ষে। হালান্ডও করলেন জোড়া গোল, এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ডার্ক হর্স নরওয়ে জিতল ৪-১ গোলে।
হালান্ডের জোড়া গোল, এমবাপ্পেরও তা-ই…আজ রাতে যখন মাঠে নামবেন আরও দুই ‘গোলশিকারি’ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর হ্যারি কেইন – বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়ের আলোচনা শুরু হতে আর কী লাগে! মেসি নিজে গোল করার চেয়েও গত কয়েক বছরে প্লেমেকিংয়ে বেশি নজর দেওয়ায় তার নামটা সেভাবে এই হিসাবে আসেনি। মানে, গতকাল রাত পর্যন্ত আসেনি।

বাংলাদেশে রাত গড়াল, সকাল হলো। চোখ কচলাতে কচলাতে আবিষ্কার করা গেল, মেসি হ্যাটট্রিক করে ফেলেছেন! ব্যক্তিগত রেকর্ডের হিসাবে বিশ্বকাপে তার প্রথম হ্যাটট্রিক, এবারের বিশ্বকাপেরও প্রথম। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে এমবাপ্পে কাল রাতে তাকে পেছনে ফেলে এক গোলে এগিয়ে গিয়েছিলেন, মেসি আজ এমবাপ্পে তো এমবাপ্পে, বাকি সবাইকেই পেছনে ফেলে বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে গেলেন। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ওই সোনালি জুতোটার দৌড়ে এমবাপ্পে-হালান্ড আবিষ্কার করলেন, মেসিই চোখের পলকে সবার ওপরে। রোনালদো-কেইন টের পেলেন, মাঠে নামার আগেই ঘাড়ের ওপর চাপটা বেড়ে গেছে।
এবং এই আলোচনাটা কেমন অনুচিত ঠেকছে না? শুধু গোলের সংখ্যা দিয়েই মেসিকে বর্ণনা করার মতো বোকামি তো ফুটবল বিশ্লেষণে আর হয় না! মেসির বেলায় গোলের সংখ্যায় চোখ রাখতে পারেন, তবে তার চেয়ে বেশি দেখতে হবে গোলের ধরন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আজ ‘ট্যাপ-ইনে’ দ্বিতীয় গোলটাতে পজিশনিংয়ের দক্ষতার কথা যদি বাদও দেন, বাকি দুই গোল আপনি একেবারে পরিষ্কার ভিডিওতে না দেখলেও, শুধু অবয়ব বা ‘সিলুয়েট’ ঢংয়ের ভিডিওতে দেখলেও বলবেন – আরে, মেসির গোল!
১৭ মিনিটে প্রথম গোলটা এমন যে, আর্জেন্টিনা আর মেসির খেলার ধরনের সঙ্গে পরিচয় থাকলে গোলটার বর্ণনা আপনার চেনা। বল যখন আর্জেন্টিনার অর্ধে, হাঁটতে হাঁটতেই আলজেরিয়া মিডফিল্ডের পেছনে পাস নেওয়ার মতো জায়গায় চলে গেলেন মেসি। আর্জেন্টিনার অর্ধ থেকেই রদ্রিগো দে পলের এক কাঁটা কম্পাসে মাপা পাস চলে গেল তার কাছে আলজেরিয়ার অর্ধে - আলজেরিয়ার মিডফিল্ড কিছু বুঝতেই পারল না! এরপর আর কী, গত ২০ বছরে এমন কিছু আপনি অনেক দেখেছেন - বার্সেলোনায়, পিএসজিতে, মায়ামিতে, আর্জেন্টিনায়। মেসি বল পেলেন, এক দৌড়ে বল নিয়ে কিছুটা এগোতেই তিনি আলজেরিয়ার বক্সের মাথায়। সেখান থেকে বাঁ পায়ের অসাধারণ বাঁকানো শট! আলজেরিয়ার গোলকিপার লুকা জিদান - জিনেদিন জিদানের ছেলে - লাফিয়ে বলে আঙুল ছোঁয়াতে পারলেন বটে, তাতে বলের গতিপথ একটু বদলালেও ঠিকানা বদলাল না। বল জালে!

তৃতীয় গোলটাতে আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণ প্রাণই পেল তার পায়ে। মাঝবৃত্তে বল পেয়ে ছুটলেন দারুণ গতিতে, বাঁ পায়ের বাইরের অংশের স্পর্শে লেফট উইংয়ে নিকো গনসালেসের কাছে পাস দিয়েই চলে গেলেন ফাঁকা জায়গায়, ঠিক আলজেরিয়া বক্সের ওপরে। বল ক্যারিইং, পাসিং, ভিশন, পজিশনিং…এক মুভেই দেখা হয়ে গেল সব। বাকি যা থাকল, তাতে দর্শন মিলল ভিনটেইজ মেসির! বল পায়ে পেয়ে এক মুহূর্তের থামা, যেন সিনেম্যাটিক পজ! এরপর বাঁ পায়ের বাঁকানো শট। এত বছরেও কোনো গোলকিপারের সাধ্য হয়নি এমন শত শট ঠেকানোর। আলজেরিয়ায় জন্ম নিয়েও ফ্রান্সের কিংবদন্তি বনে যাওয়া জিনেদিন জিদান ভিআইপি গ্যালারিতে বসে দেখলেন, আলজেরিয়ার গোলপোস্টে দাঁড়ানো তার ছেলে লুকারও সে সাধ্য হলো না। হওয়ার কথা ছিল কি? অসাধ্য এমন শটে, অবিশ্বাস্য এমন মেসির হ্যাটট্রিকের শিকার তার ছেলে – ওতে খুব বেশি খারাপও কি লাগবে জিদানের?
এক সময়ে পিএসজিতে সতীর্থ মেসি যে গোলের সংখ্যায় তাকে টেক্কা দিয়ে দিলেন আপাতত, তাতে এমবাপ্পেরও কি খারাপ লাগবে? প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে নিশ্চিত, তবে হয়তো গা জ্বলবে না।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার একজনের সাফল্যে ব্রাজিলিয়ানদেরও যেমন জ্বলছে না। ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনামজুড়ে মেসির জয়জয়কার। তাদের দল জেতেনি, তাদের একজন নেইমার এখনো ফিট হয়ে ওঠেননি, তাদের একজন ভিনিসিয়ুস গোল করলেও এখনো একাই দলকে জেতানোর মতো কেউ হয়ে উঠতে পারেননি… সেখানে এই বয়সেও মেসির একাই সবাইকে ছাপিয়ে যাওয়ার ক্ষণে ব্রাজিলে হিংসা নেই। বড়জোর নিজেদের এমন কেউ না থাকার দীর্ঘশ্বাস আছে।
ক্যারিয়ারের সব গোল-অ্যাসিস্ট-রেকর্ড ছাপিয়ে মেসির বড় অর্জন হয়তো ওখানেই। ‘আমাদের আর ওদের’ যে সীমারেখা সাধারণ মনে টানা থাকে, মেসি নামে সেটা মুছে যায়।
ঠিক যেভাবে বয়সের সীমারেখা মুছে যায় মেসির ছন্দে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল, দায়িত্বশীল এবং অংশীদারত্বভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান। শ্রম অধিকার, অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতেও তিনি বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।