আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বাংলাদেশের শ্রমিক প্রতিনিধি সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের একান্ত সাক্ষাৎকার
১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি। ছবি: লেখক
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বাংলাদেশের শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। সম্মেলনের ফাঁকে জেনেভায় তিনি বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অভিবাসী শ্রমিক, প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশ ভাবনা নিয়ে কথা বলেন।
তার সাক্ষাৎকার নেন সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ সহিদুল আলম স্বপন। তার সঙ্গে আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো—
প্রশ্ন: আমরা যতদূর জানি আইএলও-এর গভর্নিং বডি বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখে। এবারের সম্মেলনে রোডম্যাপ ২০২১-২০২৬ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে আপনারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কতটা ও কীভাবে আশ্বস্ত করছেন?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশ শ্রম অধিকার ও আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করছে। শ্রম আইন সংস্কার, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং সামাজিক সংলাপ জোরদারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়েছি যে, আইএলও রোডম্যাপ ২০২১-২০২৬ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং একটি অধিকতর অংশগ্রহণমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও অধিকারসম্মত শ্রমব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে।
প্রশ্ন: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পরিপ্রেক্ষিতে তরুণ ও যুবসমাজের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এই অধিবেশনে কী ধরনের কৌশল বা রোডম্যাপ উপস্থাপন করছে?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। আমরা দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারকে সামনে রেখে যুবসমাজকে প্রস্তুত করতে হবে। ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সৃজনশীল অর্থনীতি আগামী দিনের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন: বর্তমান সরকারের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত নতুন একটি উদ্যোগ ক্রিয়েটিভ ইকোনমি। অন্যদিকে আইএলসি-এর অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো ‘প্ল্যাটফর্ম ইকোনমিতে শোভন কর্মপরিবেশ’। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার, রাইড-শেয়ারিং বা ফুড ডেলিভারি কর্মীদের শ্রম অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষায় আইএলও-র নতুন স্ট্যান্ডার্ড কীভাবে ভূমিকা রাখবে?
শিমুল বিশ্বাস: প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু এই খাতের অনেক কর্মী এখনও শ্রম সুরক্ষার আওতার বাইরে। আমরা মনে করি, তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রতিনিধিত্বের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আইএলও যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতসহ বড় বড় উৎপাদনমুখী শিল্পে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি? এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও আপস্কিলিং বা রিস্কিলিংয়ের মতো খাতে বৈশ্বিক কোনো তহবিল বা প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়ে সম্মেলনে কোনো আলোচনা আছে?
শিমুল বিশ্বাস: প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সবসময়ই নতুন সুযোগ ও নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। এআই কিছু কাজের ধরন বদলে দেবে, কিন্তু নতুন কর্মক্ষেত্রও সৃষ্টি করবে। তাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি। আমি সম্মেলনে বলেছি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, আপস্কিলিং ও রিস্কিলিংয়ে বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির সুফল যেন সবার কাছে পৌঁছায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকেরা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রায়শই উচ্চ নিয়োগ ব্যয়, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হন। এ বিষয়ে কোনো নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আলোচনা হয়েছে কি?
শিমুল বিশ্বাস: অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা আমার বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। আমরা চাই শ্রমপ্রেরণকারী ও শ্রমগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা গড়ে উঠুক। নিরাপদ অভিবাসন, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ দায়িত্ব।
প্রশ্ন: অভিবাসী শ্রমিকদের বড় অংশই চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন। প্রত্যাগত অভিবাসীদের পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ কোনো গ্লোবাল পার্টনারশিপ খুঁজছে কি?
শিমুল বিশ্বাস: অবশ্যই। প্রত্যাগত অভিবাসীরা দেশের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ। তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পুনর্বাসন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা চাই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার ও আইএলও এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর সহযোগিতা করুক।
প্রশ্ন: এবারের সম্মেলনের আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সমতার রূপান্তরমূলক এজেন্ডা। নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য দূর করা এবং সহিংসতা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান কী?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী শ্রমিকদের অবদান অসামান্য। আমরা বিশ্বাস করি, সমমজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং হয়রানি ও সহিংসতামুক্ত কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারী শ্রমিকদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
প্রশ্ন: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকা হারাচ্ছেন। তাদের জন্য ‘গ্রিন জবস’ তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে বাংলাদেশ কী ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। তাই আমরা উন্নত দেশগুলোর কাছে জলবায়ু ন্যায়বিচার, প্রযুক্তি সহায়তা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রত্যাশা করি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
প্রশ্ন: এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড নির্ধারণে এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। শ্রমিক অধিকার, অভিবাসন, সামাজিক সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং ন্যায্য উন্নয়নের প্রশ্নে আমরা গ্লোবাল সাউথের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরছি। আন্তর্জাতিক শ্রমনীতি নির্ধারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতামতকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
প্রশ্ন: প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে আপনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার পুত্র ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশ নিয়ে সার্বিক ভাবনা সম্পর্কে কিছু বলুন।
শিমুল বিশ্বাস: আমি সৌভাগ্যবান যে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি সবসময় গণতন্ত্র, জাতীয় স্বার্থ, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। আমি বিশ্বাস করি, সেই রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতাই আজকের নেতৃত্বে প্রতিফলিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং সুযোগের সমতা নিশ্চিতকারী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান। তার ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে তরুণ সমাজ, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন তরুণ তার মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে, একজন শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার পাবে এবং একজন উদ্যোক্তা উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল, দায়িত্বশীল এবং অংশীদারত্বভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান। শ্রম অধিকার, অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতেও তিনি বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শেষ কথা
শিমুল বিশ্বাস: “প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আইএলওর এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ সেই বার্তাই বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরছে। আমরা বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক সংহতি, ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং ন্যায়ভিত্তিক নীতির মাধ্যমেই ভবিষ্যতের শ্রমবাজারকে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করা সম্ভব।”
১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি। ছবি: লেখক
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বাংলাদেশের শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। সম্মেলনের ফাঁকে জেনেভায় তিনি বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অভিবাসী শ্রমিক, প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশ ভাবনা নিয়ে কথা বলেন।
তার সাক্ষাৎকার নেন সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ সহিদুল আলম স্বপন। তার সঙ্গে আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো—
প্রশ্ন: আমরা যতদূর জানি আইএলও-এর গভর্নিং বডি বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখে। এবারের সম্মেলনে রোডম্যাপ ২০২১-২০২৬ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে আপনারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কতটা ও কীভাবে আশ্বস্ত করছেন?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশ শ্রম অধিকার ও আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করছে। শ্রম আইন সংস্কার, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং সামাজিক সংলাপ জোরদারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়েছি যে, আইএলও রোডম্যাপ ২০২১-২০২৬ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং একটি অধিকতর অংশগ্রহণমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও অধিকারসম্মত শ্রমব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে।
প্রশ্ন: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পরিপ্রেক্ষিতে তরুণ ও যুবসমাজের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এই অধিবেশনে কী ধরনের কৌশল বা রোডম্যাপ উপস্থাপন করছে?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। আমরা দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারকে সামনে রেখে যুবসমাজকে প্রস্তুত করতে হবে। ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সৃজনশীল অর্থনীতি আগামী দিনের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন: বর্তমান সরকারের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত নতুন একটি উদ্যোগ ক্রিয়েটিভ ইকোনমি। অন্যদিকে আইএলসি-এর অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো ‘প্ল্যাটফর্ম ইকোনমিতে শোভন কর্মপরিবেশ’। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার, রাইড-শেয়ারিং বা ফুড ডেলিভারি কর্মীদের শ্রম অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষায় আইএলও-র নতুন স্ট্যান্ডার্ড কীভাবে ভূমিকা রাখবে?
শিমুল বিশ্বাস: প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু এই খাতের অনেক কর্মী এখনও শ্রম সুরক্ষার আওতার বাইরে। আমরা মনে করি, তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রতিনিধিত্বের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আইএলও যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতসহ বড় বড় উৎপাদনমুখী শিল্পে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি? এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও আপস্কিলিং বা রিস্কিলিংয়ের মতো খাতে বৈশ্বিক কোনো তহবিল বা প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়ে সম্মেলনে কোনো আলোচনা আছে?
শিমুল বিশ্বাস: প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সবসময়ই নতুন সুযোগ ও নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। এআই কিছু কাজের ধরন বদলে দেবে, কিন্তু নতুন কর্মক্ষেত্রও সৃষ্টি করবে। তাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি। আমি সম্মেলনে বলেছি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, আপস্কিলিং ও রিস্কিলিংয়ে বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির সুফল যেন সবার কাছে পৌঁছায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকেরা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রায়শই উচ্চ নিয়োগ ব্যয়, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হন। এ বিষয়ে কোনো নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আলোচনা হয়েছে কি?
শিমুল বিশ্বাস: অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা আমার বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। আমরা চাই শ্রমপ্রেরণকারী ও শ্রমগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা গড়ে উঠুক। নিরাপদ অভিবাসন, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ দায়িত্ব।
প্রশ্ন: অভিবাসী শ্রমিকদের বড় অংশই চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন। প্রত্যাগত অভিবাসীদের পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ কোনো গ্লোবাল পার্টনারশিপ খুঁজছে কি?
শিমুল বিশ্বাস: অবশ্যই। প্রত্যাগত অভিবাসীরা দেশের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ। তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পুনর্বাসন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা চাই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার ও আইএলও এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর সহযোগিতা করুক।
প্রশ্ন: এবারের সম্মেলনের আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সমতার রূপান্তরমূলক এজেন্ডা। নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য দূর করা এবং সহিংসতা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান কী?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী শ্রমিকদের অবদান অসামান্য। আমরা বিশ্বাস করি, সমমজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং হয়রানি ও সহিংসতামুক্ত কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারী শ্রমিকদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
প্রশ্ন: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকা হারাচ্ছেন। তাদের জন্য ‘গ্রিন জবস’ তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে বাংলাদেশ কী ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। তাই আমরা উন্নত দেশগুলোর কাছে জলবায়ু ন্যায়বিচার, প্রযুক্তি সহায়তা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রত্যাশা করি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
প্রশ্ন: এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড নির্ধারণে এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
শিমুল বিশ্বাস: বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। শ্রমিক অধিকার, অভিবাসন, সামাজিক সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং ন্যায্য উন্নয়নের প্রশ্নে আমরা গ্লোবাল সাউথের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরছি। আন্তর্জাতিক শ্রমনীতি নির্ধারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতামতকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
প্রশ্ন: প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে আপনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার পুত্র ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশ নিয়ে সার্বিক ভাবনা সম্পর্কে কিছু বলুন।
শিমুল বিশ্বাস: আমি সৌভাগ্যবান যে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি সবসময় গণতন্ত্র, জাতীয় স্বার্থ, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। আমি বিশ্বাস করি, সেই রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতাই আজকের নেতৃত্বে প্রতিফলিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং সুযোগের সমতা নিশ্চিতকারী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান। তার ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে তরুণ সমাজ, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন তরুণ তার মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে, একজন শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার পাবে এবং একজন উদ্যোক্তা উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল, দায়িত্বশীল এবং অংশীদারত্বভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান। শ্রম অধিকার, অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতেও তিনি বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শেষ কথা
শিমুল বিশ্বাস: “প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আইএলওর এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ সেই বার্তাই বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরছে। আমরা বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক সংহতি, ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং ন্যায়ভিত্তিক নীতির মাধ্যমেই ভবিষ্যতের শ্রমবাজারকে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করা সম্ভব।”