গ্রামের নিরুত্তাপ ভোট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জটিল অঙ্ক

গ্রামের নিরুত্তাপ ভোট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জটিল অঙ্ক
ফাইল ছবি: চরচা

ঢাকায় যেমন সড়কের মোড়ে মোড়ে প্রার্থীদের বিলবোর্ড-ব্যানার, গ্রামে তেমনটি দেখা যায় না। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) সকালে ঢাকা থেকে গাড়িযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেতে কাঁচপুর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে হরেক রকম বিলবোর্ড, ব্যানারের ছড়াছড়ি। অন্তত তিনটি নির্বাচনি এলাকার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সহাস্য চেহারা চোখে পড়বে। কিন্তু সেতু পার হতেই ভিন্ন চিত্র। সকাল ৯টায় অসহনীয় যানজটে যাত্রীরা নাকাল, কেউ পেছনের বাস থেকে নেমে সামনের বাস ধরার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে শত শত মানুষ রাস্তার দুই পারে দাঁড়িয়ে আছেন বাস-ভ্যান-ট্রাকের অপেক্ষায়। বাংলাদেশে গরিব মানুষ, যাদের বাসের ভাড়া জোগানোর সামর্থ্য নেই, তারা কম ভাড়ায় ট্রাকে যান দূরের গন্তব্যে এবং প্রায়শই দুর্ঘটনার শিকার হন। উন্নয়নশীল দেশের তকমা নেওয়া বাংলাদেশের এ হরদিনের চিত্র।

কাঁচপুর সেতু পার হয়ে তারাব মোড় যেতে ঘণ্টা খানেক লেগে গেল। রাস্তা তো নয়, যেন ধুলি ধূসরিত প্রান্তর। সড়ক তো বটেই তার আশপাশেও ধুলোর আস্তর পুরো হচ্ছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ চলছে। সাউথ এশিয়া সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) প্রকল্পের আওতায় ছয় লেনের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালে। এখন ২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। সরকার আসে, সরকার যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ শেষ হয় না। এই সড়কে যাত্রীদের নিয়ত যন্ত্রণা পোহাতে হয়।

সড়কের পাশে এক ছাপড়া হোটেলে আমরা নাস্তা করার সময় কয়েকজন উদ্বেগাকুল যাত্রীর সঙ্গে কথা হলো। তাদের কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কেউ হবিগঞ্জ, সিলেট কিংবা কিশোরগঞ্জের যাত্রী। নির্বাচনের কথা জিজ্ঞেস করতেই একজন বললেন, তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটি নিয়েছেন ভোটের জন্য। কাকে ভোট দেবেন জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ আসনের বাসিন্দা জানান, তারা বরাবর ধানের শীষে ভোট দিয়ে এসেছেন। এবারেও ধানের শীষে ভোট দেবেন। আরেকজন বললেন, ধানের শীষ দাঁড়িপাল্লা বোঝেন না। এলাকার উন্নয়নে যিনি কাজ করবেন তাকেই ভোট দেবেন। তবে হোটেলের দুই কর্মচারী বললেন, তারা এখানকার ভোটার নন। পটুয়াখালীর ভোটার। কিন্তু হোটেল বন্ধ করে ভোট দিলে তো চলবে না। আরও অনেকের মতো তারা ভোটের দর্শক, অংশীদার নন।

তারাবো মোড় পার হয়ে নরসিংদীর দিকে যেতে চোখে পড়ল ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার কিছু বিলবোর্ড ও ব্যানার। অন্য দলের প্রার্থীদের বিল বোর্ড চোখে পড়ল না। আর একটু সামনে যেতেই সাবেক মন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীরের পুড়ে যাওয়া কারখানা চোখে পড়ল। মহাসড়কের পাশেই। দস্তগীর এখন জেলে। কিন্তু তার কারখানা কী দোষ করল? আরও মর্মান্তিক ঘটনা হলো, ৫ আগস্টের পর একদল লোক যখন কারখানায় লুটপাট করছিল, তখন আরেক দল লোক নিচে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েক শ লোক মারা যান বলে অভিযোগ রয়েছে। আশপাশের যে-সব শ্রমিক এই কারখানায় কাজ করতেন তারা সবাই বেকার হয়ে পড়েছেন। আশপাশের লোকেরা বললেন, গাজী সাহেবের কারখানা পুড়ে যাওয়ায় ভারতীয় কোম্পানি লাভবান হয়েছে। যে টায়ার আগে ৩০০ টাকায় কেনা যেত, সেই টায়ার এখন ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আমাদের গন্তব্য ছিল ভৈরব হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। পথে যে-সব নির্বাচনী আসন পড়বে, সেখানকার নির্বাচনী উত্তাপ আঁচ করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সকালে মহাসড়কের আশপাশে কোনো জটলা দেখলাম না। ভাবলাম, সকালে নির্বাচনী প্রচারে বিধিনিষেধ আছে, সে কারণে হয়তো সবাই চুপচাপ। দুপুরের পর নিশ্চয়ই মাঠ গরম হবে। কিন্তু ফেরার পথেও নির্বাচনী উত্তাপ দেখলাম না কোথাও। কদাচিৎ মাইকে ধানের শীষ কিংবা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার আহ্বান শোনা গেল।

এমনকি বাস টার্মিনালগুলোতে দেখলাম মানুষ ভোটের চেয়ে তাদের নিত্যকার সমস্যা নিয়ে বেশি কথা বলছেন। সেতু পেরিয়ে আশুগঞ্জের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সেখানে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা নেই। অন্য প্রার্থীদের ঢাউস আকারের ছবি শোভা পাচ্ছে বিলবোর্ডে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা ও বিএনপির জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ জুনায়েদ আল হাবীবের। এই আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির জিয়াউল হক মৃধাও আছেন, যিনি ২০০৮ সালে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছিলেন।

রুমিন ফারহানা। ছবি: ফেসবুক
রুমিন ফারহানা। ছবি: ফেসবুক

আশুগঞ্জ থেকে ১০ কিলোমিটার পার হলেই সরাইল বিশ্বরোড মোড়। সেখানে আমাদের সহযাত্রী হলেন সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন। আরও কিছুটা পথ পার হতেই শাহবাজপুরে রুমিন ফারহানার বাড়ি। শুক্রবারও সেখানে নির্বাচনী আমেজ। নির্বাচনী অফিসে দেখলাম নেতা-কর্মীদের ভিড়। বেশির ভাগই বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত। এই আসনে রুমিন এক দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করলেও তিনি দলের মনোনয়ন পাননি। মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির জোটসঙ্গী জমিয়াতুল উলামায় ইসলামের নেতা জুনায়েদ আল হাবীব। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার জন্য রুমিন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। বহিষ্কৃত হয়েছেন আরও অনেক নেতা-কর্মী। এমনকি কোনো কোনো কমিটি স্থগিত করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন নিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বললেন, বিএনপির দাবি সারা দেশে তাদের পক্ষে জোয়ার এসেছে। কিন্তু এখানকার নেতা-কর্মীরা রুমিনের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। এর কারণ বিএনপি যাকে সমর্থন করেছেন তিনি এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন।

পাশের গ্রাম বড় দেওয়ার বাড়ির দীঘিতে হাঁস ধরার প্রতিযোগিতা উপলক্ষে এক মজার আয়োজন করা হয়। খেলাটি মূলত কিশোর ও তরুণদের জন্য। পুকুরে বেশ কিছু হাঁস ছেড়ে বলা হয়, যে যে ধরতে পারবে, সে ওই হাঁসের মালিক হবে। এটা এলাকার ঐতিহ্যবাহী খেলা। এবারে হাঁস ধরার খেলাটি রুমিন ফারহানা উদ্বোধন করায় তা নির্বাচনী প্রচারে রূপ নিল।

সেখানে কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে আলাপ হয়। জিজ্ঞাসা করলে তারা বেশ জোরের সঙ্গে বললেন, হাঁস মার্কাই পাস করবে। কেন তাদের এমনটি মনে হলো? এর জবাবে একজন বললেন, রুমিন তো আমাদের গ্রামের মেয়ে। তিনি এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছেন। তাদের পাল্টা প্রশ্ন করি, গত ২২ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী সভায় জোট প্রার্থী মওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে ভোট দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন, সেটা কি তারা জানেন? তারা বললেন, জানি। কিন্তু যেই প্রার্থীর পক্ষে তারেক রহমান ভোট চেয়েছেন, তিনি তো এই এলাকার বাসিন্দা নন।

রুমিন ফারহানা নিজের নামেই পরিচিত। তারপরও এলাকার মানুষ তাকে চেনে ভাষা সংগ্রামী অলি আহাদের মেয়ে হিসেবে। অলি আহাদ ১৯৭৩ সাল এই আসন থেকে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করেন আশুগঞ্জ-সরাইলের মানুষ। কিন্তু সেবার সরকার জয়ী ঘোষণা করে তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে। পরবর্তীকালে তিনি খন্দকার মোশতাক আহমদের সহযোগী হয়েছিলেন। মোশতাককেও পাস করানো হয়েছিল ব্যালটবাক্স ঢাকায় নিয়ে। এরপর কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী পাস করেননি।

এবারে এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা ও তরুণ দে। দলীয় নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে দুজনকে বহিষ্কার করলেও দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তরুণ দে-কে দলেরই একাংশ প্রার্থী করেছে এই বিবেচনায় যে সংখ্যালঘুরা জোট প্রার্থীকে ভোট দেবেন না। তাহলে সংখ্যালঘুরা কাকে ভোট দেবেন? বিএনপির সাধারণ কর্মী ও সমর্থকেরাই বা কার পক্ষে থাকবেন, সেই জটিল প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে ১২ তারিখেই।

লেখক: সম্পাদক, চরচা।

সম্পর্কিত