‘দেশ যেন ভালো থাকে, ঠিকানা–গণকটুলি যেন বৈষম্যের কারণ না হয়’

‘দেশ যেন ভালো থাকে, ঠিকানা–গণকটুলি যেন বৈষম্যের কারণ না হয়’
দ্যাশ ভালা থাকলে, আমরা ভালা থাকি- শান্তি রাণী দাস। ছবি: চরচা

সজল (ছদ্মনাম), পেশায় ঝাড়ুদার। মা-বাবাও ঝাড়ুদারের কাজ করেন। পারিবারিক পরম্পরায় তিনিও একই কাজ করছেন। পাড়ায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে কোনো ধরনের ঝামেলা বা দ্বন্দ্ব এখনো হয়নি। তবে নির্বাচনে নির্দিষ্ট একটি দলের মার্কায় ভোট দিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ঢাকা-১০ আসনের আওতাভুক্ত হাজারিবাগ থানাধীন গণকটুলি সিটি কলোনি এলাকায় আলাপকালে হরিজন সম্প্রদায়ের এ যুবকসহ কলোনির কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়।

রাজধানীর এই এলাকায় হরিজন সম্প্রদায়ের বসবাস। বিভিন্ন সময় নানা দল ক্ষমতায় এলেও তাদের ভাগ্যে বড় কোনো বদল হয়নি। কলোনির ভেতরের পরিবেশে তেমন বদল নেই। মাদকসহ নানা সংকট এখনো এই এলাকার বাসিন্দাদের মাথাব্যথার কারণ। রয়েছে বাসস্থানের সংকট। এখানকার শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ এখনো অধরাই রয়ে গেছে। আসন্ন নির্বাচনেও প্রার্থীদের কাছে এ সংকটগুলোর মীমাংসাই প্রত্যাশা করছেন এলাকাটির বাসিন্দারা।

অধিকাংশ বাসিন্দা জানান, এলাকায় হিন্দু-মুসলমান এক সঙ্গে বসবাস করছে দীর্ঘদিন। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে সেভাবে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।

হাজারিবাগ থানার গণকটুলি সিটি কলোনিতে প্রায় ১ হাজার হরিজন পরিবারের বাস। এর মধ্যে অর্ধেকর কমসংখ্যক পরিবার হিন্দু ধর্মালম্বী। এই হিসাবে হাজারের বেশি হিন্দুধর্মালম্বী হরিজন মানুষ বসবাস করেন।

কলোনির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মাদক- স্থায়ী বাসিন্দা আলাউদ্দিন। ছবি: চরচা
কলোনির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মাদক- স্থায়ী বাসিন্দা আলাউদ্দিন। ছবি: চরচা

এই কলোনিতে ডোমার, বাল্মীকি, ডোম ও রবিদাস–এই চার সম্প্রদায়ের দলিতের বসবাস। তবে ডোমার বা সুইপারদের মধ্যে শিক্ষিতের হার কিছুটা বেশি। শিক্ষার হার বাড়ায় এরা পূর্বপুরুষের পেশায় থাকতে চান না। অন্য চাকরি পেলে অনেকে গণকটুলির পরিচয় মুছতে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কারণ, কলোনির পরিচয়ের কারণে অনেকে চাকরি বঞ্চিত হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ হিসেবে এক কক্ষে এক পরিবার বাস করতে হয়। ফলে নাগরিক সংকট ব্যাপক মাত্রায়। নানা দল নানা সময়ে ক্ষমতায় এলেও এর কোনো মীমাংসা হয়নি। এখানকার ভোটারদের একটি বড় অংশ বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটার হিসেবে পরিচিত। এ কারণে বর্তমানে নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকা বিএনপি ও জামায়াতের তরফ থেকে এক ধরনের চাপ রয়েছে বলে জানান কয়েকজন।

সজল (ছদ্মনাম) বলেন, ‘‘হরিজন হিন্দুরা সবাই নৌকার লোক। এবার নির্বাচনী আমেজ শুরুর পর থেকে ভোট দেওয়ার জন্য চাপ দিতেছে।”

মূলত ভোট দিতে যাওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। কী হতে পারে–তা নিয়ে কোনো ধারণা অবশ্য নেই তার। বললেন, “এলাকায় নিজেদের মধ্যে ভোট নিয়ে এখনো কোনো ঝামেলা নাই। সামনেও কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে ভোট দিতে না গেলে বা ভোটের পরে কিছু হলে হতে পারে।’’

হরিজন সম্প্রদায়ের এই যুবক বলেন, ‘‘এই এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মাদক। এখানে গাঁজা থেকে শুরু করে সবকিছু পাওয়া যায়। দিনের বেলায়ও সবকিছু পাওয়া যায়। এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঝামেলা হয় কিছুটা।’’

শান্তি রাণী দাস বলেন, ‘‘আমি ঢাকা মেডিকেলে ঝাড়ুদারের চাকরিই করতাম। আমার ছামী (স্বামী) পারমেনভাবে (স্থায়ী) চাকরি করত। যখন করোনা আইচে (করোনার সময়), তখন থিকা আমারে বাইর কইরা দিছে। কত কষ্ট করে খাবার খাচ্ছি, সেটা আমি আর ভগবান জানেন।”

মেয়ে শিক্ষার্থী পড়িয়ে যা পায়, তা দিয়েই সংসার চলছে বলে জানান শান্তি। বলেন, “আমার মেয়ে আছে একটা। সে টিশুনি করে (শিক্ষার্থী পড়িয়ে) যা হয়, তাই দিয়ে আমরা খাই। শুকা ভাত, তেল ভাত খাই; কিন্তু কাউকে কইতে যাই না। মেয়ে কলেজ পর্যন্ত পড়ছে। পরে টাকা না থাকায় আর পড়ানু (পড়ানো) যায়নি। যেই আসুক, সেই ভালা করে দেশ চালাক। দেশ ছিন্নভিন্ন থাকলে কিচ্ছু ভালা থাকে না।”

আলাউদ্দিন নামের একজন বলেন, “আমার জন্ম এখানে। আমি সিটি করপোরেশনের কেরানি হিসেবে চাকরি করি। আমাদের সমস্যা নিয়ে যেই কাজ করবে, তারেই আমরা ভোট দিব। আমরা এখানে কাইজ্যা-ঝগড়া ছাড়াই থাকি। এখানে অনেকে মাদক বিক্রি করে। তারা তাদের নেতাদের পাওয়ার দেখায়। এটায় আমাগো হয়রানি হতে হয়। এসব বন্ধ করলেই ভোট দিব।”

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না রার শর্তে বলেন, ‘‘ম্যালাদিন পর দ্যাশে সুষ্ঠু ভোট হবে–এটাই চাই। আমাদের গণতান্ত্রিক চাওয়া-পাওয়া যেন পূরণ হয়। এই এলাকায় সবাই আমরা মিলেমিশে থাকি।’’

বিনয় চন্দ্র দাসের চাওয়া দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ। তার সোজাসাপটা চাওয়া–“নতুন সব সিদ্ধান্ত যাতে মানুষের কল্যাণে হয়। এখানে স্থায়ী বাসস্থান ও কাজের সংকট নিরসন হলে খুশি হব।’’

দুলারী রাণী দাসের জন্ম নারায়ণগঞ্জে। বিয়ের পর থেকে এই কলোনিতে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, “সবাই যাতে ভালা থাকে, এটাই চাই। আর কিচ্ছু চাই না। হিন্দুদের ওপর যাতে অত্যাচার না হয়, এটাই চাই। কোনো ভয়টয় নাই পাড়ার মধ্যে।”

কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় জন্ম হলেও এই কলোনিতে থাকেন উত্তম কর্মকার বলেন, “পৃথিবীজুড়েই টাকা-পয়সার মন্দাভাব চলছে। তাই হাতের কাজ কম। ভবিষ্যতে যাতে হাতের কাজ ভালো হয়, এটাই চাই।”

বিদ্যুৎ দাস নামের আরেকজন বলেন, ‘‘আমরা এমনিতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। আমরা যেন আর পেছনে পড়ে না থাকি, সেটার জন্যর প্রতিশ্রুতি চাই। সংখ্যালঘু হিসেবে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা যে দেবে, তারেই ভোট দেব। দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকার ও চাহিদা যা যা, সবকিছুই চাই।”

গণকটুলির দীর্ঘদিনের সংকটের কথা উঠে এল বিদ্যুৎ দাসের কথায়। বললেন, ‘‘থাকার বাসস্থানের অসুবিধা আছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করলেও ভালো চাকরি পায় না।”

সব মিলিয়ে গণকটুলির বাসিন্দারা একটা মাদকমুক্ত সমাজ চান, যেখানে তাদের বাসস্থানের সংকট এবং নতুন প্রজন্মের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ থাকবে। তারা চান, তাদের সন্তানরা যেন পড়াশোনা করে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান। ঠিকানা–গণকটুলি যেন এ ক্ষেত্রে সংকট না হয়।

সম্পর্কিত