Advertisement Banner

সিটি নির্বাচনে ‘একাই লড়বে’ জামায়াত

সিটি নির্বাচনে ‘একাই লড়বে’ জামায়াত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর লোগো। ছবি: বাসস

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জোটগতভাবে লড়লেও স্থানীয় সরকার, বিশেষ করে সিটি করপোরেশনে এককভাবে ভোট করবে জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিকরাও বলছে, তারা দলগতভাবে নির্বাচন করবে। জামায়াত জানিয়েছে, এরই মধ্যে ঢাকাসহ অন্য সিটিগুলোতে প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে তারা।

জোটের অন্য দলগুলো বলছে, জোটগতভাবে নির্বাচন করা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে তাদের কোনো বৈঠক হয়নি। দলগুলো এককভাবেই প্রার্থী চূড়ান্ত করতে কাজ করছে।

জামায়াতের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১১ দলীয় জোট সংসদে বিরোধী জোটের ভূমিকায় আছে। সংসদে সরাসরি নির্বাচিতদের মধ্যে ১১ দলীয় জোটের জামায়াত পেয়েছে ৬৮টি আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয়টি আসন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি ও খেলাফত মজলিস পেয়েছে এক আসন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংস্কারের জন্য ‘আন্দোলনে রয়েছে’ সংসদের এই বিরোধী জোট।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯ আগস্ট দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে প্রশাসক বসানো হয়। বিএনপিও সিটি করপোরেশনগুলোতে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা উঠতে শুরু করেছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কিছু বলা হয়নি। গত ২৭ এপ্রিল সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।”

জামায়াত নেতারা বলছেন, ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন জোটগতভাবে করার কোনো ইচ্ছা এখনো কোনো দল থেকে প্রকাশ করা হয়নি। তবে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও হতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরচাকে বলেন, ‘‘আমাদের (১১ দল) প্রাথমিক সিদ্ধান্তটা এমন যে, এই নির্বাচনটা আমরা আলাদা আলাদাভাবেই করব। স্ব স্ব দল থেকে সিটি করপোরেশনগুলোতে আমাদের প্রার্থী দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত এমনই সিদ্ধান্ত।”

জামায়াতের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এই নেতা বলেন, ‘‘আমাদের (১১ দল) শীর্ষ নেতাদের বৈঠকেও এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, স্ব স্ব দল থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করব, প্রার্থী দেব, এবং সেখানে নির্বাচন করব। তবে শীর্ষ নেতারা যদি এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, সেটা তো আলাদা বিষয়। তবে আপাতত এমন সিদ্ধান্তই আছে।”

জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের এক নেতা জানান, তাদের দল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করার পক্ষে। এমন সিদ্ধান্তই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত। ওই নেতা বলেন, ‘‘স্থানীয় নির্বাচন জোটগতভাবে করার সিদ্ধান্ত দলের নেই। যখন অতীতে বিএনপির সঙ্গে আমাদের জোট ছিল (সাবেক ২০ দলীয় জোট) তখনো এককভাবেই স্থানীয় নির্বাচন করা হতো। সে সময় কোথাও কোথাও বোঝাপড়া হয়েছিল; কিন্তু জোটগতভাবে হয়নি।”

৫ সিটিতে প্রার্থী এনসিপির

গত ২৯ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তরসহ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে এনসিপি। সেখানে বাকি সাত সিটি করপোরেশনেও শিগগিরই প্রার্থী ঘোষণার তথ্য জানায় দলটি।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। ফাইল ছবি
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। ফাইল ছবি

ওই দিন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ঘোষণা অনুযায়ী, দলীয় প্রার্থীরা হলেন–ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। উত্তরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজাল মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

আরিফুল ইসলাম আদীব চরচাকে বলেন, ‘‘মার্চেই আমাদের দল পাঁচ সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে।”

সিটি নির্বাচন এককভাবে, না জোটগতভাবে করা হবে জানতে চাইলে আদীব বলেন, ‘‘আপাতত আমাদের এককভাবে নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। যদি জোট থেকে একসঙ্গে নির্বাচন করা হয়, সেটা পরবর্তী বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত হবে। তবে আপাতত সিদ্ধান্ত হলো এককভাবে নির্বাচন করার।”

এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত জোটের শীর্ষ নেতাদের কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্তই আছে। যার যার মতো প্রার্থী ঘোষণাও করছে। যদি পরে জোটে করার আলাপ এগোয়, তবে তা হতেও পারে।”

কী করছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস

জোটের অন্যতম দল বাংলাদেশ খেলাফত মসলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দিন আহমেদ চরচাকে জানিয়েছেন, সিটি নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জোট পর্যায়ে এখনো কোনো বৈঠক হয়নি। আর তারা দলীয় প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত করেনি।

নির্বাচনী প্রচারে মামুনুল হক। ফাইল ছবি
নির্বাচনী প্রচারে মামুনুল হক। ফাইল ছবি

মামুনুল হকের দলের এই নেতা আরও বলেন, ‘‘স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জোটে কোনো আলোচনা হয়নি। আলোচনা হয়তো ভবিষ্যতে হতেও পারে। তবে এখন দলগুলো নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্তে কাজ করছে। আমরা স্থানীয় নির্বাচনের জন্য একটি কমিটি করে দিয়েছি। উনারা সারা দেশের প্রার্থী বাছাই করবে, এ নিয়ে কাজ হচ্ছে। আমরা এখনো কোথাও প্রার্থী চূড়ান্ত করিনি।”

জামায়াতের সম্ভব্য প্রার্থী যারা

জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের দায়িত্বশীল এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, ‘‘ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে দলের মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন নির্বাচন করবেন–এটা মোটামুটি নিশ্চিত। এর বাইরে দুই-একজনের নাম শোনা গেলেও তাদের সম্ভাবনা খুব একটা নেই।”

ওই নেতা আরও জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমের নাম আলোচনায় বেশ জোরেশোরে রয়েছে। যদিও তার প্রার্থী হতে বড় বাধা ডাকসুর পদ। এ ছাড়া ছাত্রশিবির করা অবস্থায় কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে না। সেক্ষেত্রে ডাকসুতে সাদিক কায়েমের মেয়াদ শেষে দল তাকে প্রার্থী করতে পারে।

গত শুক্রবার রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী সম্মেলনে মেয়র পদের জন্য কয়েকজন জামায়াত নেতার পক্ষ থেকে সাদিক কায়েমের নাম ওঠে বলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করে। পরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ওই খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের সংগঠনের যেকোনো পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ চরচাকে বলেন, ‘‘ইসলামী ছাত্রশিবিরের কোনো দায়িত্বশীল পদে থাকা অবস্থায় কেউ কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, সামনেও করতে পারবে না।”

ছাত্রশিবিরের এই নেতা বলেন, ‘‘অনেকে বলছে, জামায়াত সাদিক কায়েমকে প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের জানামতে, জামায়াতে ইসলামীও চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা দেয়নি। যেটা হচ্ছে, এটা একটি বিভ্রান্তিকর তথ্য।”

তবে জামায়াত নেতারা জানিয়েছে, কয়েক মাসের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা তারা দেখছেন না। আর এই কয়েক মাসের মধ্যে ডাকসুর মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। এর পর সাদিক কায়েম ডাকসু ও ছাত্রশিবিরের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে নির্বাচন করতে পারেন।

জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সিটি নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ দিকে রয়েছে। মোট ১২টি সিটি করপোরেশনে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারে দল।

জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের দায়িত্বশীল ওই নেতা আরও বলেন, ‘‘নির্বাচনের আগে আগে সাদিক কায়েমকে শিবির থেকে সরিয়ে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা হতে পারে।”

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরচাকে বলেন, ‘‘ডাকসুর ভিপি হিসেবে তরুণ প্রজন্ম আছে। তরুণ প্রজন্ম তাদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব চায়। এ ধরনের প্রস্তাব, পরামর্শ (সাদিক কায়েমকে মেয়র প্রার্থী করার) আছে। তবে এমন সম্ভাবনা অস্বাভাবিক নয়। জাতীয় সংসদেও তো অনেক তরুণদের প্রার্থী করা হয়েছে। তরুণদের রেপুটেশন ভালো।”

জামায়াতের একটি সূত্র জানিয়েছে, সেলিম উদ্দিন ঢাকা উত্তরের প্রার্থী হচ্ছেন–এটা প্রায় চূড়ান্ত। যদিও শিবিরের সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমানও শুরু থেকে সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী ছিলেন। দক্ষিণে জোটের কোনো মিত্রকে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করতে একটু সময় নেবে দলটি।

প্রার্থী চূড়ান্তে যা যা গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত

সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে তরুণদের প্রাধান্য দেওয়ার কথা জানিয়েছেন জামায়াত নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। চরচাকে তিনি বলেন, “তারুণ্যকে দল গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া যারা স্থানীয়, তাদের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি ভালো মানুষ, জনগণের আস্থা রয়েছে, দক্ষতা, যোগ্যতা–এসব হলো দলের ক্রাইটেরিয়া। দলীয় ফোরামের পাশাপাশি আমরা প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বিভিন্ন মহল থেকেও পরামর্শ নিচ্ছি। জনগণও কাকে চায়, সেটা দেখেই আমরা প্রার্থী চূড়ান্ত করছি। এ জন্য একটু সময় লাগছে।”

সম্পর্কিত