জামায়াতের আমির শফিক বনাম বিএনপির শফিক: জোর লড়াইয়ের আভাস

জামায়াতের আমির শফিক বনাম বিএনপির শফিক: জোর লড়াইয়ের আভাস
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন)

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে কাছাকাছি নামের দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একজন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান। অন্যজন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন)।

সরেজমিন ঘুরে বোঝা গেল, দলীয় প্রধান ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে ভোটের মাঠে শফিকুর রহমান বেশ ভালোই সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দার প্রভাব ও প্রতিদ্বন্দ্বীর শারীরিক অনুপস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন বিএনপির শফিকুল ইসলাম। স্থানীয়রা বলছেন, বড় দুই দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে আরও ছয়জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এই দুজনের মধ্যেই।

ঢাকা-১৫ আসন উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। যার মধ্যে তালতলা, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত ও পূর্ব সেনপাড়া আছে। এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৬ জন এবং নারী ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৮ জন। চারজন হিজড়া ভোটার রয়েছে এই আসনে। মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ৪৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ফলে নারী ভোটারদের এই আসনের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে।

দীর্ঘদিন বিএনপি–জামায়াতের জোট থাকলেও এবার এই দুই দল সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে মুখোমুখি। এই আসনে ২০১৮ সালে জামায়াতের শফিকুর ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করেছিলেন। ওই সময় নিবন্ধন না থাকায় জোটের হয়ে বিএনপির প্রতীকেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। বিতর্কিত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে হেরে যান তিনি। অন্যদিকে শফিকুল মিল্টন ঢাকা মহানগরের যুবদল নেতা। বিএনপির সহযোগী এ সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি।

বিএনপি প্রার্থীর প্রচার ক্যাম্প। ছবি: চরচা
বিএনপি প্রার্থীর প্রচার ক্যাম্প। ছবি: চরচা

ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগে গত ২০ জানুয়ারি পীরেরবাগে প্রচারপত্র বিলিকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে এলাকায় তৈরি হয় উত্তেজনা, একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে দলগুলো।

এই আসনের কয়েকটি এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় বিএনপি প্রার্থীর ব্যানার সব অলিগলিতে। জামায়াতে ইসলামের ব্যানার–পোস্টার বিএনপি প্রার্থীর তুলনায় কিছুটা কম। এছাড়া কয়েকটি জায়গায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে ও জাতীয় পার্টির লাঙ্গল মার্কার ব্যানার দেখা গেছে।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সেন্ট্রাল মসজিদের পাশে বিএনপির নির্বাচনী অফিস থেকে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারের কাজ করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। তারা ছোট ছোট দল হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইছিলেন। এছাড়া নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরছেন তারা।

একই দিনে একই ওয়ার্ডে জামায়াতের একটি নির্বাচনী অফিসে কয়েকজন কর্মী বসে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা সাধারণ লোকজনের কাছে দাঁড়িপাল্লা মার্কার পক্ষে ভোট চাইছিলেন। দলের নারী কর্মীরা বিভিন্ন এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারের কাজ করছিলেন।

১৬ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের আমির মো. মামুন বলেন, “আমরা আচরণবিধি মেনে ভোটারের কাছে গিয়ে ভোট চাইছি। কিন্তু আমাদের বিপক্ষ দলের কর্মীরা পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভোট চাইছেন এবং সাধারণ মানুষদের প্রভাবিত করছেন।”

একই ওয়ার্ডের বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আনিছুর রহমান বলেন, “এই এলাকায় বিএনপির অনেক সমর্থক রয়েছে। আমরা প্রতিদিন ভোটারদের কাছে গিয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথা জানাচ্ছি। সবার কাছ থেকে খুবই ভালো সাড়া পাচ্ছি। আশা করি ভালো লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে আমরা জয়ী হব।”

দলীয় প্রধানের ‘সুবিধা’য় আমির, স্থানীয়দের ‘সহমর্মিতা’য় বিএনপি প্রার্থী

ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি থেকে। শুরুর দিনই জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে জনসভার মধ্য দিয়ে প্রচারে নামেন। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জোট ও দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। এতে নিজ আসনে সময় দিতে পারছেন কম।

অন্যদিকে এই আসনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিএনপি প্রার্থী শফিকুল মিল্টন পুরো এলাকায় সকাল-বিকাল মানুষের কাছে যাচ্ছেন। শুরুর দিন থেকে মিরপুর-কাফরুলকে বদলে দেওয়ার নানা অঙ্গীকার ও সব সময় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন তিনি।

এই ওয়ার্ড বিএনপির নিজস্ব এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে স্থানীয় নেতা কিসমত আলী বলেন, “এই আসন অনেক আগে থেকেই বিএনপির। এই এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছে আমাদের শফিকুল ভাই। ভোটারদের থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। সবাই তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচন করবে বলে আশা করছি।”

অন্যদিকে মনজু ইসলাম নামে জামায়াতের একজন কর্মী বলেন, “আমাদের আমির সাহেবকে নিয়ে কিছু বলার নেই। উনি কেমন মানুষ সেটি দেশবাসীর জানা রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের বিশাল সংখ্যক নিজস্ব কর্মী রয়েছে। আশা করি বিপুল ভোটে জয়লাভ করব আমরা।”

জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ক্যাম্প। ছবি: চরচা
জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ক্যাম্প। ছবি: চরচা

স্থানীয় চায়ের দোকানে এই এলাকার ৩০ বছরের বাসিন্দা আবুল কাসেম বলেন, “পাকিস্তান আমলের দল জামায়াত। আগে তাদের দলে কিছু রাজাকার থাকলেও এখন তেমন কেউ নেই। এবার নির্বাচনে জামায়াতের সব প্রার্থী খুব ভালো চরিত্রের। তারা নির্বাচিত হলে দেশের উন্নয়ন হবে।”

মনির হোসেন নামের আরেকজন স্থায়ী বাসিন্দা বলেন, ‘‘জামায়াত–বিএনপির প্রার্থী দুইজনই ভালো। তাগো মধ্যে যেই জিতুক হেয় ভালো করবো এলাকার লিগা। ভালা লড়াই হইব এবার নির্বাচনে।”

শুরুতে অভিযোগ, এখন সৌহার্দ্য

নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দিয়েছিল বিএনপির প্রার্থী ও জামায়াতের প্রার্থীর প্রতিনিধিরা।

ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের নারী কর্মীরা বাসায় বাসায় গিয়ে ভোটারদের আইডি কার্ড ও ‘বিকাশ নম্বর’ সংগ্রহ করছেন বলে অভিযোগ তুলেছিলেন শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। বিএনপি প্রার্থী সেদিন দাবি করেছিলেন, পীরেরবাগ, শেওড়াপাড়াতেও একই ঘটনা ঘটেছে।

তবে সেদিন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন জামায়াতের মুখপাত্র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। বলেছিলেন, “পুরোপুরি অসত্য তথ্য। তফসিল ঘোষণার পর সব প্রচার সামগ্রী আমরা অপসারণ করেছি, ইসির অপেক্ষা করিনি।”

ওই ঘটনার সপ্তাহখানেক পর থেকে এই আসনে আর কোনো উত্তেজনার ঘটনা ঘটেনি। দুই দলের নেতাকর্মীদের মিলেমিশেই প্রচার চালাতে দেখা গেছে।

গতকাল বুধবার বিকেলে শেওড়াপাড়া মেট্রো স্টেশনের পাশে বিএনপির প্রচার দেখা যায়। সেখানে অন্তত ৫০ জন স্থানীয় নেতাকর্মীরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাইছিলেন।

সেখানে জিল্লুর রহমান নামের একজন বিএনপিকর্মী বলেন, “এই আসন হলো বিএনপির ঘাঁটি। দীর্ঘদিন থেকে শফিক ভাই এলাকার মানুষদের জন্য রাজনীতি করেছেন। এবার সুযোগ আসছে এলাকার আরও বেশি উন্নয়ন করার। আমরা নিয়মিত ধানের শীষের প্রচার করে যাচ্ছি। আশা করি স্থানীয় ছেলে হিসেবে জয়ী হবেন শফিক ভাই।”

অন্যদিকে জামায়াতের স্থানীয় নেতা–কর্মীরা এলাকাভিত্তিক ছোট অফিস থেকে দলীয় প্রচার কাজ ও সন্ধ্যায় মিছিল করছেন। জামায়াতের কর্মী আল-আমিন বলেন, “আমরা প্রতিদিন ভোটারদের কাছে গিয়ে সমস্যার কথা শুনছি। আমিরে জামায়াত নির্বাচিত হলে কী ধরনের সুফল পাব, সেসব তুলে ধরছি। জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।”

সম্পর্কিত