সামদানী হক নাজুম

কাভার্ড ভ্যানচালক উবাইদুল হক ছিলেন বিএনপির কর্মী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার ‘অপরাধে’ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে বলে অভিযোগ আছে। প্রায় সাত দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে মারা যান তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার তাকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। গেজেটে তার নম্বর ৬৪৩। হত্যা মামলার অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে উবাইদুলের মৃত্যুর কথা বলা হয়। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কী ছিল মূল ঘটনা? সেটা জানতে অনুসন্ধান শুরু করে চরচা। দীর্ঘ অনুসন্ধানে মেলে চমকপ্রদ তথ্য। কারো হামলা নয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মারা যান উবাইদুল। আর আহত হলেও বেঁচে যান তার সঙ্গী মোটরসাইকেল চালক মো. রিপন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ৫ আগস্ট মধ্যরাতের ওই দুর্ঘটনাকে এক দিন আগের; অর্থাৎ, ৪ আগস্টের হামলার গল্প হিসেবে প্রচার করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পরিকল্পিতভাবে ভিন্ন ঘটনা সাজিয়ে করা হয় উবাইদুল হত্যা মামলা। আবার এই মামলাকে অকাট্য প্রমাণ দেখিয়ে নিহত উবাইদুলকে বানানো হয় জুলাই শহীদ; আর আহত মোটরসাইকেল চালক মো. রিপন ‘জুলাই যোদ্ধা’। এই কাণ্ডের মূল ক্রীড়নক ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল খান। যাকে ২০২৪ সালের শেষদিকে চাঁদাবাজির ঘটনায় বহিষ্কার করে বিএনপি।
উবাইদুলের মৃত্যু সনদে সড়ক দুর্ঘটনার কথা স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও ভুয়া মামলার সূত্র ধরে একজনকে ‘জুলাই শহীদ’ আরেকজনকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ স্বীকৃতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সবই হয়েছে কামাল খানের ‘ম্যাজিকে’, যিনি এ ক্ষেত্রে বিএনপি পরিচয়কে এই ম্যাজিকে কাজে লাগিয়েছেন।
মামলার অভিযোগে বাদি লিখলেন এক, বললেন আরেক
‘জুলাই শহীদ’ উবাইদুল ছিলেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল খানের ঘনিষ্ঠ কর্মী। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায়। থাকতেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উত্তর বেগুনবাড়ি এলাকায়। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট মধ্যরাতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতলে ভর্তির পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ আগস্ট রাতে মারা যান উবাইদুল। এর ছয় দিন পর ২০ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন উবাইদুলের বড় ভাই মো. এমদাদুল হক। মামলায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের ২৫ নেতাসহ আরও ২০-২৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, “আসামিদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করিতেছি যে, আমি গ্রামের বাড়িতে কৃষিকাজ করি। আমার ছোট ভাই উবাইদুল হক ঢাকা দারাজের ড্রাইভিং করিয়া আসিতেছিল এবং বিএনপি’র উত্তর বেগুন বাড়ির ৯ নং ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছিল। গত ইং ৪-০৮- ২০২৪ তারিখ সময় আনুমান সকাল ১০ ঘটিকায় আমার ভাই ও দলীয় লোকজন নিয়ে দুইটি মোটরসাইকেল যোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে বিএনপি পার্টি অফিসে যোগদান করে। আন্দোলন শেষে বাসায় ফেরার পথে পল্টন মডেল থানাধীন নাইটিংগেল ভবনের সামনে বিকেল অনুমান ৪ ঘটিকায় পৌঁছামাত্র উক্ত আসামীরা পথরোধ করিয়া উক্ত ১ নং আসামীর নির্দেশে অন্যান্য আসামীরা আমার ভাইকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে তাহাদের হাতে থাকা লোহার রড, লোহার চেইন, হাতুড়ি দিয়ে আমার ভাই ও তাহার সহযাত্রীর মোটরসাইকেলের সামনের দিকে আঘাত করিলে আমার ভাই ও তার সহযাত্রী মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় পড়িয়া গেলে আসামীগণ এলোপাতাড়িভাবে পিটাইয়া মাথার ডানপাশে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে এবং দুই হাত ভেঙে ফেলে। অতঃপর আমার ভাইয়ের সাথে থাকা লোকজন ও পথচারী আগাইয়া আসিলে আসামীরা বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে উক্ত পথচারীরা আমার ভাই ও তার সহযাত্রীকে কাকরাইলস্থ ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল ঢাকায় নিয়ে গেলে সেখানে তাহারা রিসিভ না করিয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।”
আরও লেখা হয়, “পথচারী লোকজন আমার ভাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে বাসায় নিয়ে যায়। গত ৫-০৮-২০২৪ ইং তারিখে আমার ভাইয়ের অবস্থার অবনতি হলে আমি তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার আমার ভাইকে আইসিইউতে ভর্তি করেন। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৩-০৮-২০২৪ ইং তারিখে রাত ১২.০১ মিনিটের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার আমার ভাইকে মৃত ঘোষণা করেন। ১৩-০৮-২০২৪ ইং তারিখ পল্টন থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে এবং আমি আমার ভাইয়ের ময়নাতদন্ত শেষে গ্রামের বাড়িতে দাফন করি। উক্ত আসামীগণ পরস্পর যোগসাজসে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বিগত কয়েকদিনের আইনশৃঙ্খলার অবনতির সুযোগ নিয়ে আমার ভাইকে গুরুতর আঘাত করে হত্যা করিয়াছে। আমি আমার ভাইয়ের দাফন-কাফন শেষে আসামীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করিয়া এবং আমার পরিবারের সাহিত আলাপ-আলোচনা করিয়া থানায় আসিয়া এজাহার দায়ের করিতে বিলম্ব হইল।”
কিন্তু মামলার বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে মামলার বাদি উবাইদুলের বড় ভাই এমদাদুল চরচাকে জানান ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, সরকার পতনের পর ৫ আগস্ট বিকেলে টেলিফোনে শেষ কথা হয় উবাইদুলের সঙ্গে। এ সময় গ্রামের বাড়িতে থাকা মা এবং এমদাদুল নিজে ঢাকার পরিস্থিতি ভালো নয় বলে উবাইদুলকে বাসায় থাকার পরামর্শ দেন। এরপর রাত ১২টার পরে ফোনে জানতে পারেন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন উবাইদুল।
এমদাদুল বলেন, “রাইতে ফোন পাইছি আমার ভাই হোন্ডা এক্সিডেন্ট করছে। অত রাইতে তো আর আওন যায় না, ৬ তারিখ সকালে ঢাকা মেডিক্যালে আইয়া দেখি আমার ভাইয়ের মাথা ফাডা, কুনু হুঁশ নাই, মুখে পাইপ দেওয়া (ভেন্টিলেশন)। লগের লোকজন কইলো রাইতে হোন্ডা এক্সিডেন্ট করছে।”
মামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমদাদুল বলেন, তিনি মামলা করতেই চাননি। এমদাদুল বলেন, “মামলা তো আমি লেখি নাই, আমরা তো মামলা দিতেই চাই নাই। উবাইদুলের নেতারা মামলা লেখছে, আমারে কইছে এমনে লেখলেই ভালা বিচার হইব। আমি তো থাকি বাড়িতে। খবর পাইয়া সকালে ঢাকায় আইছি। কামাল ভাই, আলী ভাই আর আনোয়ার ভাই মামলা লেখছে।”

এই ‘কামাল ভাই’ হলেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল খান, যাকে ২০২৪ সালের শেষের দিকে চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপি বহিষ্কার করে। কামাল খানের অনুসারী ছিলেন উবাইদুল। ‘আলী ভাই’ হলেন দল থেকে বহিষ্কৃত ২৪ নং ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী। আর ‘আনোয়ার ভাই’ হলেন মির্জা আনোয়ার, যিনি ২৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। মির্জা আনোয়ার এখনো স্বপদেই আছেন।
তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কামাল খান মামলা করার পুরো দায় চাপান মির্জা আনোয়ার এবং মোহম্মদ আলীর ওপর। তিনি বলেন, “আমি মামলার দিন থানায় যাই নাই, আনোয়ার, আর আলী গেছিল। আমাকে তারা মামলার দিন সাথে রাখে নাই। মামলায় আমার একজন পরিচিত লোকের নাম দিতে মানা করছিলাম। তারা আমার কথা শুনে নাই। উল্টা আমারে অবিশ্বাস করে। কয় আমি নাকি আওয়ামী লীগকে বাঁচাইতে চাইছি। হেরা আমারে সাইড কইরা বাদিরে দিয়া নিজেদের মতো মামলা লেখায়।”
কামাল খানের এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেন আনোয়ার ও আলী। তাদের দুজনের দাবি, উবাইদুল কামাল খানের কর্মী হওয়ায় সবকিছু তার ইচ্ছা অনুযায়ী হয়েছে। তারা জানান, এক নেতার কর্মীদের ওপর অন্য নেতার অধিকার থাকে না। তাই উবাইদুল হত্যা মামলার বিষয়ে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তারা শুধু কামাল খানকে সহযোগিতা করতে থানায় গিয়েছিলেন। ২০ আগস্ট কামাল খান নিজে থানায় উপস্থিত থেকে মামলার অভিযোগ লিখিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মির্জা আনোয়ার ও মোহাম্মদ আলী।
মামলার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করলেও তারা তিনজনই দাবি করেন–বাদি ‘ভুল বলেছেন’। তাদের দাবি, ৪ আগস্টেই হামলার শিকার হন উবাইদুল। প্রত্যেকের সঙ্গে আলোচনার শুরুতেই পুরো ঘটনার বর্ণনা জানতে চাওয়া হয়। তিনজনই শুধু হামলার তারিখ, হামলার বর্ণনা, আর হামলার পর আহত উবাইদুলকে এক দিন বাসায় রেখে পরদিন ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার তথ্য ছাড়া অন্য সব বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেন। তিনজনের কেউই হামলার সঠিক সময় জানাতে পারেননি। একজন বলেন, সকালে হামলার শিকার হন উবাইদুল। আরেকজন বলেন, সন্ধ্যায়; তো অপরজন বলেন, রাতে।
হামলায় আহত হওয়ার পর উবাইদুল এবং রিপনকে হাসপাতালে নেন কারা–এমন প্রশ্নে আনোয়ার এবং আলী জানান, কামাল নিজে এবং তার লোকজন ঘটনাস্থলে ছিল। তারাই উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়েছে। কামালের নেতৃত্বেই আন্দোলনে গিয়েছিলেন উবাইদুল আর রিপন। আর এ জন্যই কামাল আসামিদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন–এমনটাই দাবি দুজনের।
একই প্রশ্নে কামাল খান জানান, সে সময় প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তিনি অনেকটা আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি এদিন উবাইদুলের সঙ্গে ছিলেন না। উবাইদুলের ওপর হামলার খবর পান ফোনে। দুজন হামলার শিকার হয়ে আহত হলে তাদের হাসপাতালে নিলেন কারা, তাও জানেন না বলে দাবি কামালের।
৪ আগস্ট শয্যাশায়ী উবাইদুল ভাঙচুর করেন ৫ আগস্ট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দেশজুড়ে শুরু হয় হামলা, জ্বালাও-পোড়াও। একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া কিছু মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও এবং সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পেয়েছে চরচা। এতে দেখা যায়, তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ি এলাকার নাশকতার চিত্র। উত্তর বেগুনবাড়ি এলাকার পদ্মা গার্মেন্টসের পেছনে একটি ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৩টার দিকে উবাইদুলসহ বেশ কয়েকজন যুবক ওই ভবনে হমলা চালান। এর মাঝে ক্যামেরাটি দৃষ্টিগোচর হলে তা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন তারা। মামলার অভিযোগে ৪ আগস্টের হামলায় আহত উবাইদুলের মাথায় আঘাতের কথা বলা হলেও ৫ আগস্টের ফুটেজে সে রকম কিছু দেখা যায়নি।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওই দিন উবাইদুলের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাসায় হামলা চলে। দলটির নেতা-কর্মীরা যেসব বাড়িতে থাকতেন, প্রতিটি বাড়িতেই গিয়েছিলেন উবাইদুল ও তার সঙ্গীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ভবনমালিক চরচাকে জানান, তার বাড়িতে যুবলীগের এক কর্মী ভাড়া থাকতেন। উবাইদুল ৫ আগস্ট বিকেলে ওই কর্মীকে ছিনিয়ে নিতে ভবনে হামলা করলে বাধা দেন তিনি নিজে। পরে বাসার গ্যারেজে রাখা ওই যুবলীগ কর্মীর মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায় উবাইদুল ও তার সঙ্গীরা।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী চরচাকে জানান, উবাইদুল এলাকার পরিচিত মুখ। তাকে এলাকার মানুষজন শান্ত ও নিরীহ হিসেবেই চিনতেন। তবে ৫ আগস্ট বিকেল থেকে তাকে দেখা গেছে ভিন্ন রূপে। এদিন উবাইদুলসহ বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাসা-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট এবং জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। পাশের রিকশা গ্যারেজ থেকে শুরু করে ঘরের আসবাব–সবই পুড়িয়েছে তারা।
৫ আগস্ট মধ্যরাতের পর; অর্থাৎ, ৬ আগস্ট শুরুর দিকেই ফেসবুকে উবাইদুলের বন্ধুদের পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় তারা উবাইদুলের দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে তাকে বাঁচাতে জরুরি রক্ত চেয়ে পোস্ট দেন। ১৩ আগস্ট অনেকেই তার মৃত্যুর খবর জানিয়ে ফেসবুকে শোক প্রকাশ করেন।

উবাইদুলের এক সহকর্মী মনির আহমেদের ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা যায়, ১৩ আগস্ট উবাইদুলের সঙ্গে নিজের শেষ কথা নিয়ে স্মৃতিচারণ করে পোস্ট দেন তিনি। সেখানে নিজের ফোনের ডায়াল লিস্টের একটি স্ক্রিনশট এবং উবাইদুলের সঙ্গে তোলা ছবি শেয়ার করেন মনির। স্ক্রিনশটে দেখা যায়, উবাইদুলের নম্বরে তিনি সবশেষ ৫ আগস্ট বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে কল করে ৪০ সেকেন্ড কথা বলেন। মনির আহমেদ চরচাকে জানান, তিনি এবং উবাইদুল অনলাইনভিত্তিক শপিং প্ল্যাটফর্ম দারাজের কর্মী ছিলেন। একটি ডেলিভারি মিনিভ্যান তারা দুজনে শিফট ভাগ করে চালাতেন। দিনের শিফটে মনির ওই গাড়ি চালাতেন, আর উবাইদুল রাতে। ৩ আগস্ট বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দারাজ তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরদিন নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে যান মনির। আর উবাইদুল থেকে যান ঢাকায়।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর এলাকার খবর নিতে উবাইদুলকে ওই ফোন কলটি করেছিলেন মনির নিজেই। কী কথা হয়, জানতে চাইলে মনির আহমেদ চরচাকে বলেন, “আমি খবর নিছিলাম–কী অবস্থা এলাকার। উবাইদুল ভাই খুব খুশি হইয়া কইলো, ‘ভাই শেখ হাসিনা পালাইছে। আপনে আসেন আপনারে নিয়া ঘুরমু। অনেক বছর অনেক অত্যাচার সইয্য করছি এলাকায়। এইবার সব শোধ লমু।’ এইটুকুই কথা কইলাম উবাইদুল ভাইয়ের লগে। এরপর রাইতে হুনি ভাই হোন্ডা এক্সিডেন্ট করছে।”

আহত জুলাই যোদ্ধা শোনালেন জিনের গল্প
৫ আগস্ট রাতে মোটরসাইকেলের পেছনে আরোহী হয়েছিলেন উবাইদুল হক। চালাচ্ছিলেন একই এলাকার মো. রিপন। উবাইদুলের মৃত্যু নিয়ে সত্য-মিথ্যার মাঝে সমান্তরাল রেখা টানতে পারেন একমাত্র তিনিই। দুর্ঘটনায় উবাইদুল মারা গেলেও প্রাণে বেঁচে যান রিপন। তার ডান হাত ভেঙে যায়। চরচাকে রিপন জানান, প্রথমে তিনি ‘গ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হলেও সম্প্রতি গুরুতর আহত ‘খ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন। মাসে ১৫ হাজার টাকা সরকারি ভাতায় আগের চেয়ে ভালো আছেন পরিবার নিয়ে।
নানা আলোচনা শেষে রিপনের কাছে জানতে চাওয়া হয়–কী ঘটেছিল সেদিন? জবাবে হুবহু মামলার এজাহারের গল্প শোনান রিপন। শুধু মনে করতে পারছিলেন না যে, ৪ আগস্ট সকাল ঠিক কয়টায় বিএনপি অফিসের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করে রিপন বলেন, অনেক সকালে সেখানে গিয়েছিলেন, মিছিল করেছিলেন। তারপর সকাল ১০টার দিকে ফিরে আসার পথে হামলার শিকার হন তারা। যেখানে মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে–বিকেল ৪টার কথা। তথ্যটি শুধরে দিতেই তিনি জানান, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলায় জ্ঞান হারিয়েছিলেন তিনি। জ্ঞান ফিরে দেখতে পান তিনি তার নিজ বাসায়। এ কারণে হামলার সময়টা ঠিকঠাক বলতে পারেননি।
কারা হামলা করেছিল জানতে চাইলে বলেন, “উবাইদুল ভাইয়ের এলাকার আওয়ামী লীগের লোক; আমি তাদের চিনি না।”

অথচ উবাইদুলের সঙ্গে একই এলাকায় দীর্ঘ দিন রাজনীতির মাঠেও আছে তিনি। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, তারা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে নিজেদের এলাকা থেকে বিএনপি পার্টি অফিসে যান একসঙ্গেই।
কিছুটা কৌশলী হয়ে জানতে চাওয়া–সেদিন তো আন্দোলন চলছিল শাহবাগে। বিএনপি পার্টি অফিসে যে কর্মসূচির কথা বলছেন, তেমন কোনো কর্মসূচি তো ছিল না। রিপন দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলেন, “আমরা শাহবাগেই গিয়েছিলাম। আমি এই এলাকা চিনি না তো, তাই প্যাঁচ লাগায় ফেলছি।”
সেদিন কত তারিখ ছিল–জানতে চাইলে রিপন বলেন, “আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওইদিন ৪ তারিখ। কারণ, ওইদিন সরকার নাই, চারিদিকে কী একটা অবস্থা!”
এটুকু বলেই কিছুক্ষণ থেমে সচেতনভাবে শুধরে নেন, “না, মানে তখন তো অনেক ঝামেলা চলতেছিল, আর রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলন, এ জন্য আমাদের হাসপাতালে ট্রিটমেন্ট দেয় নাই। উপায় নাই দেখে আমাদের বাসায় নিয়া গেছে সবাই। একদিন বাসায় থাইক্কা উবাইদুল ভাইয়ের অবস্থা খারাপ হইয়া গেল। পরদিন আমরা আবার হাসপাতালে যাই।”
তাহলে ৫ আগস্ট সিসি ক্যামেরার ফুটেজে উবাইদুলকে দেখা গেল কীভাবে? এই প্রশ্নে রিপনের সাফ জবাব–এমন কোনো ফুটেজ থাকতে পারে, সেটা তিনি বিশ্বাস করেন না। ফুটেজ দেখাতেই রিপন বলেন, “এটা কেমনে সম্ভব! আমি যা বলছি, সব সত্য বলছি। ৫ তারিখ উবাইদুল ভাই এলাকায় থাকলে ৪ তারিখে আমার হোন্ডায় পিছনে অবশ্যই জিন ছাড়া কিছু ছিল না। ওইটা তাইলে উবাইদুল ভাইয়ের বেশে জিনই ছিল।”
ওই মোটরসাইকেলটি কার ছিল–জানতে চাইলে রিপন বললেন, তিনি জানেন না। উবাইদুল কোনো এক জায়গা থেকে মোটরসাইকেলটি জোগাড় করে, তাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিলেন।
মোটরসাইকেলটি কার?
সেদিন ১৫০ সিসি ইঞ্জিনের লাল রংয়ের একটি পালসার মোটরসাইকেলের আরোহী হয়েছিলেন উবাইদুল। চালাচ্ছিলেন রিপন। এটির মালিক রিপনের আপন খালাতো ভাই মাসুদ রানা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুদ রানা চরচাকে জানান, ৫ আগস্ট রাতে বিরিয়ানি আনতে যাওয়ার কথা বলে মোটরসাইকেলের চাবি নেন রিপন। পরে মাঝরাতে খবর আসে কাকরাইল এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়েছেন দুজন। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান মাসুদ রানাসহ এলাকার কয়েকজন। মোটরসাইকেলটির কেমন ক্ষতি হয়েছিল–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার হোন্ডার সামনে কিচ্ছু আছিল না। সব ভাইঙ্গা শেষ। ২৬ হাজার ট্যাকা লাগছে ঠিক করতে, কিন্তু এরপরও ভালমতো ঠিক হয় নাই।”

কোথায় এবং কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এক্সিডেন্ট হইছিল নাইটিঙ্গেল মোড় থেইকা এট্টু সামনে গিয়া। ডাইরেক্ট আইলেন্ডে মাইরা দিছে। এর লাইগ্গা হোন্ডার সামনে সব শ্যাষ। আমার হোন্ডা তিনদিন ওইহানেই পইড়া আছিল। ওইখানে আনন্দ কমিউনিটি সেন্টার আছে না, ওই সেন্টারের গেইটের সামনে পইড়া আছিল ভাঙ্গা হোন্ডাটা। সেন্টারের দারোয়ানরা পাহারা দিয়া রাখছিল। আর ক্যামনে হইলো, তা তো দেখি নাই। রিপন কইছে, সুলতানরে (মামলার ১ নম্বর আসামি) ধাওয়া দিতে গেছিল। হ্যায় নাকি চেইন দিয়া বাড়ি দিছে, আর রিপনে কন্ট্রোল রাখতে পারে নাই আইল্যান্ডে মাইরা দিছে।”
মাসুদ রানার সঙ্গে কথা শেষে আবারও ‘জুলাই যোদ্ধা’ রিপনের সঙ্গে কথা বলে চরচা। মাসুদ রানার মোটরসাইকেল নিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে রিপন বলেন তিনি মাসুদ রানা নামে কাউকে চেনেন না। রাগ দেখিয়ে তিনি এ বিষয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে আর কোনো কথা বলতে চান না। এরপর আর সাড়া দেননি রিপন।
মামলাটির তদন্তভার এখন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে। দুর্ঘটনায় পড়া মোটরসাইকেলের তথ্য এবং এর মালিক মাসুদ রানা যে রিপনের আত্মীয়–এ বিষয়ে সব তথ্য নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
মৃত্যু সনদের তথ্যে চক্ষু চড়ক গাছ
দুর্ঘটনার পর সাতদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৩ আগস্ট মারা যান উবাইদুল হক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দেওয়া উবাইদুলের মৃত্যু সনদটি সংগ্রহ করে চরচা। সেটির তথ্য বলছে, ৬ আগস্ট রাত ২টায় উবাইদুলকে ঢামেকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের আইসিইউ-এর ১৯ নম্বর বেডে রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ১৩ আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিটে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন উবাইদুলকে।
সেখানে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বলা হয়–Refractory septic shock, Type 1 respiratory failure, ASDH e` ICH (Acute subdural hematoma with intracranial hemorrhage), Fractured Radius-Ulna.
যার বাংলা অর্থ–উবাইদুলের মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতের ফলে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। একইসঙ্গে তার ফুসফুস অকার্যকর ছিল, সেই সাথে ইনফেকশনের কারণে তিনি শকে ছিলেন। আর তার ডান হাতের হাড় ছিল ভাঙা।

যে কারণে উবাইদুলের এমন অবস্থা হয়েছে, তার উল্লেখ করতে গিয়ে মৃত্যু সনদে লেখা হয় H/O RTA on 06.08.2024 at 1.30 am, যার অর্থ হলো–‘হিস্ট্রি অব রোড ট্রাফিক এক্সিডেন্ট’। অর্থাৎ, ৬ আগস্ট রাত দেড়টায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন উবাইদুল।
মৃত্যু সনদের Manner of death-এর অংশে চিকিৎসক টিক মার্ক দেন Accident-এর ঘরে।
প্রশ্ন আসে, মামলায় যেভাবে বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট হামলার ঘটনার পর উবাইদুলকে একদিন তার নিজ বাসায় রাখা হয়, তা আদৌ সম্ভব কি না? এ বিষয়ে জানতে চরচা কথা বলে ঢামেকের আইসিইউতে দায়িত্ব পালন করা একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে। বিস্ময় প্রকাশ করে তারা সকলেই জানান, এই ধরনের রোগীকে কোনোভাবেই বাসায় রাখার সুযোগ নেই।
সে সময় বিস্ময়কে সরাসরি চিকিৎসা দিয়েছেন–এমন একজন চিকিৎসকের মতামত জানতে চায় চরচা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “সে সময় কয়েকজন আইসিইউ রোগী ছিলেন, যারা জুলাই শহীদ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন। বেড ১৯ গেজেটভুক্ত হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে তার হিস্ট্রি ছিল, রোড এক্সিডেন্ট। তাকে এমন অবস্থায় আমাদের জরুরি বিভাগ রিসিভ করে যে, তাৎক্ষনিকভাবে লাইফ সাপোর্টে নিতে হয়। আরও সহজ করে বলতে গেলে, তার ব্রেইনে ইনজুরি এত ভয়াবহ ছিল যে, একদিন বাসায় রাখা তো দূরের কথা হাসপাতালে আনার পর একমাত্র চিকিৎসাই ছিল তাকে মেশিন সাপোর্টে বাঁচিয়ে রাখা।”
ওই চিকিৎসক বলেন, “এজন্য প্রথমেই তাকে ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয় আইসিইউতে রেখে। তিনি যদি সেখান থেকে রিকভার করতেন, তাহলে আমরা পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করতে পারতাম। তার অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল যে, তার মাথার আঘাতের সার্জারির সুযোগ আমরা পাইনি। এক কথায় বলতে গেলে আমরা বাকি ৫-৬ দিন তাকে শুধু কোনোরকম বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাটাই করেছি। কিন্তু আমরা সফল হইনি।”
সে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা নেওয়া উবাইদুলের একটি ছবি পায় চরচা। তাতে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারেই ভেন্টিলেটর মেশিনের মাধ্যমে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে। পরবর্তী সময়ে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। অর্থাৎ, হাসপাতালে আনার সঙ্গে সঙ্গেই উবাইদুলের জীবন বাঁচানোর সব শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান চিকিৎসকরা।

আরও নিশ্চিত হতে মামলায় উল্লেখ করা রাজধানী কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালেও খোঁজ নেয় চরচা, যেখানে ঘটনার পরপর চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছিল উবাইদুল ও রিপনকে। অতি গুরুতর হওয়ায় এবং হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থা না থাকায় সেদিন উবাইদুল ও রিপনকে চিকিৎসা দিতে পারেননি চিকিৎসকরা। তাৎক্ষণিকভাবে উবাইদুলের প্রাণ বাঁচাতে কোনো রকমে মাথায় ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন তারা। যেহেতু তাদের কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, তাই দুজনের চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো তথ্য রেকর্ড করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
উবাইদুলকে সেদিন বাসায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল কি না, তা আরও নিশ্চিত হতে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত দুজন চিকিৎসকের মতামত জানতে চায় চরচা। তাদের বোঝার সুবিধার্থে ঢামেকের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে তোলা উবাইদুলের ছবি এবং তার মৃত্যু সনদের কপি দেখানো হয়। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা দুজন জানান, সে সময় তাদের কেউ দায়িত্বে ছিলেন না। তবে, ছবিতে রোগীর অবস্থা এবং মৃত্যু সনদের তথ্য অনুযায়ী, উবাইদুলকে বাসায় রাখার সুযোগ নেই। তাদের ভাষ্যমতে উবাইদুলের অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল যে, ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। এরপর কয়েকদিন তাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাটাই চালানো হয়েছে, চিকিৎসা নয়।
‘অবাস্তব গল্প’র কারিগর যুবদল নেতা কামাল
অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয় উবাইদুল হত্যা মামলার এজাহারের সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকার কারণ। নিজ কর্মীর মৃত্যুকে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন কামাল খান। স্থানীয় সবাই সড়ক দুর্ঘটনার কথা শুরু থেকে জানলেও কদিন পর থেকে এই কামালই ৫ আগস্ট মধ্যরাতের ঘটনাটিকে ৪ আগস্টের বলে প্রচার করতে থাকেন। উবাইদুল ও রিপন একই স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হলেও শুরুতে দুটি আলাদা ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন–এমনটাই প্রচারের চেষ্টা করেন কামাল।
কামাল খান ফেসবুকে প্রচার করেন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলায় উবাইদুল পল্টন এলাকায় আর রিপন প্রেসক্লাব এলাকায় আহত হয়েছেন। আরেক পাস্টে তিনি লেখেন, আন্দোলন শেষে মহাখালী থেকে ফেরার পর নিজ এলাকা বেগুনবাড়িতেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলায় আহত হন উবাইদুল।

আলাদা আলাদা জায়গায় উবাইদুলের মৃত্যুর কারণ উপস্থাপন করা হয় ভিন্ন ভিন্নভাবে। ঘটনার এক বছর পর ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদদের নিয়ে ব্যানার তৈরি করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে উবাইদুলের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন কামাল খান। ছবির বর্ণনায় উবাইদুলের পরিচয় লেখা হয়, মো. উবাইদুল, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা, ঢাকা মহানগর উত্তর। যুবদল নেতা, ২৪ নং ওয়ার্ড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা। ১৯ জুলাই ২০২৪ বাংলামোটরে পুলিশের গুলিতে নিহত।
মূলত মামলার বাদিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই মামলার আসামি তালিকা তৈরি এবং ঘটনার ভিন্ন বর্ণনা এজাহারভুক্ত করেন কামাল খান। পরে এই মামলাকেই সামনে রেখে উবাইদুলকে ‘জুলাই শহীদ’ এবং রিপনকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সব প্রক্রিয়া শেষ করেন নিজেই। কামালের নিজের ছেলেও গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’।

সব তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আবার কথা হয় সাবেক যুবদল নেতা কামাল খানের সঙ্গে। এবার নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, ১ নম্বর আসামি বেগুনবাড়ি বউ বাজার ইউনিট যুবলীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদকে ধাওয়া দিতে গেলে এই দুর্ঘটনার মুখে পড়েন উবাইদুল ও রিপন।
কামাল বলেন, “আমি নিজে দেখি নাই। তবে পরে শুনছি, ৫ আগস্ট রাতের বেলা একটা হোন্ডায় কইরা সুলতান এলাকা থেকে পালাইতেছিল। তখন আরেক মোটরসাইকেল নিয়ে রিপন আর উবাইদুল ওদের ধাওয়া করে। ধাওয়া করার সময় সুলতান চেইন দিয়া উবাইদুলরে বাড়ি দেয়। তখন রিপন হোন্ডা কন্ট্রোল করতে না পাইরা রাস্তার খাম্বার সাথে লাগায় দেয়।”
মামলায় মিথ্যা তথ্য লেখার কারণ কী জানতে চাইলে কামাল বলেন, “মামলা কী হবে, কেমনে হবে–এইটা দলের সিদ্ধান্ত ছিল। দল থেইকা যেমনে বলছে, তেমনে মামলা হইছে। আগে দেহেন নাই যাত্রাবাড়ীতে কেউ মরলে ১ নম্বর আসামি হইতো খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া কি আর মার্ডার করত? তারে তো ঠিকই আসামি করা হইতো, অহন এমনই ঘটনা।”
দলের কার নির্দেশে এভাবে মামলা দায়ের করা হয়–জানতে চাইলে ক্ষেপে গিয়ে তিনি বলেন, “অই মিয়া আপনে কেডা? আপনে কীসের সাংবাদিক? সাংবাদিক কি জুলাই নিয়া কতা কইবার সাহস পায়? এইডা কি সাংবাদিকের কাজ? আপনে কেমুন সাংবাদিক হেইডা আমি দেইখ্যা লমু। আমি খবর লইছি। আপনে অলির (মামলার ৫ নম্বর আসামি) আত্মীয়। হেয় আপনেরে আমার পিছে লাগাইছে, আপনে কোনো সাংবাদিক না, আমি খবর লইছি। দেখতাছি আপনেরে,” বলে কল কেটে দেন তিনি।
মামলার এক নম্বর আসামি পলাতক সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগের সব ধরনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় চরচা। সবশেষ মামলার আরেক পলাতক আসামির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবলীগ নেতার দাবি, এই হত্যা মামলার সব অভিযোগ মিথ্যা। এমনকি নিহত উবাইদুলকে মামলা হওয়ার আগে চিনতেন না তিনি। চরচাকে তিনি বলেন, “ভাই আপনি একটু হিসাব করে দেখেন, আমরা করতাম রাজনীতি। আর যে ছেলে মারা গেছে সে কী ছিল? দারাজের পিকআপ ড্রাইভার। তার সাথে আমাদের পরিচয় থাকবে কীভাবে? ৫ আগস্ট রাতে যখন আমি এলাকাতেই পাশের একটি বাসায় লুকিয়ে ছিলাম, তখন ফেসবুকের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতির আপডেট জানার চেষ্টা করছিলাম। মধ্যরাতে আমি প্রথম এলাকার এক ছেলের স্ট্যাটাসে জানতে পারি উবাইদুল মারা গেছে। আমি সাথে সাথে ভাবলাম ইনি হয়তো আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক। পরে জানলাম এই ছেলে আমাদের এলাকার।”
সুলতান মাহমুদকে ধাওয়া করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা কি না, জানতে চাইলে ওই নেতা বলেন, “আমিও এমনটা শুনেছি। তবে পুরোপুরি সত্য কি না, সেটা বলতে পারব না। কারণ, সন্ধ্যায় সুলতানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। আমি তখনো এলাকা ছাড়তে পারিনি, পাশের বাসায় লুকিয়ে আছি। তখন সুলতান আমাকে ফোন করে বলেছিল যে, সে এলাকা থেকে বেরিয়ে গেছে এবং নিরাপদে আছে। সে আমাকে পরামর্শ দেয়, আমিও যেন এলাকায় না থাকি। মামলা হওয়ার আগ পর্যন্ত সুলতান যোগাযোগ করত। কিন্তু মামলার পর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঢাকা-১২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন সাইফুল আলম নীরব। এই অপরাধে তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। তারও আগে চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কৃত কামাল খান হলেন সাইফুল আলম নীরবের সমর্থক ও কর্মী। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট উবাইদুল মারা যাওয়ার পর ১৫ আগস্ট উবাইদুল হত্যার বিচারের দাবিতে কর্মসূচির আয়োজন করেন কামাল। সেখান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাইফুল আলম নীরব।
কামাল খানের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুয়া তথ্যে মামলার নির্দেশনা দলের পক্ষে কে দিয়েছেন–জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরবের সঙ্গে। একাধিকবার কল করে এবং মেসেজ পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
জুলাই মামলার বিষয়ে দল থেকে এমন কোনো নির্দেশনা ছিল কি না, জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, “যে যুবদল নেতা আপনাকে বলেছে, তিনিসহ তার নেতারাও অপকর্মের জন্য দল থেকে বহিষ্কার হয়েছে আগেই। তাহলে আপনাদেরই বোঝার কথা–এমন অনৈতিক নির্দেশনা বিএনপির মতো কোনো দল দেবে কি না। কোনো অন্যায়কে কখনো বিএনপি প্রশ্রয় দেয়নি, সামনেও দেবে না। যারা দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওেয়া হবে। দলের আদর্শে কোনো ছাড় নয়।”
কোনো ব্যাখ্যা নেই কর্তৃপক্ষের
‘জুলাই শহীদ’ উবাইদুল হক হত্যা মামলাটি পিবিআইয়ে আছে। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির মিডিয়া অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ চরচাকে বলেন, “আমরাও নিশ্চিত হয়েছি–এটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলছি। আমাদের তদন্তে বেশ অগ্রগতি আছে। তবে এটি যেহেতু খুব সংবেদনশীল একটি মামলা, তাই সময় নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা; কিন্তু ঠিক কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটল, সেটি এখনো তদন্তাধীন। সবকিছু নিশ্চিত হয়েই আমরা আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করব।”
দিনে নাশকতা করে রাতে কাউকে ধাওয়া করতে গিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেলে তাকে ‘জুলাই শহীদ’ বিবেচনার সুযোগ আছে কি না, তা জানতে চাইলে এই পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, “এটা আমরা নির্ধারণ করতে পারব না। এটা আমাদের তদন্তের বিষয়ও না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জবাব দিতে পারবে। আমাদের তদন্ত করতে বলা হয়েছে, হত্যার সঙ্গে আসামিরা যুক্ত আছে কি না–আমরা সেটা তদন্ত করছি। জুলাই শহীদ গেজেটের বিষয়ে আমাদের মতামত চাওয়া হয়নি।”
সব শুনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখার উপসচিব মো. মতিউর রহমান চরচাকে বলেন, “এটা তো পুরোটাই প্রতারণা। এভাবে জুলাই শহীদ বা যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এটা যারা সুপারিশ করেছে, তারা কীভাবে কী করেছে, তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে এসব অনিয়মের শেষ হওয়া দরকার। আপনাদের সাংবাদিকতার মাধ্যমে যতটা সম্ভব এসব অনিয়ম তুলে আনুন, আমরা ব্যবস্থা নেব।”
নিহত উবাইদুল হক ‘জুলাই যোদ্ধা’ শুধু নন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলাতে মৃত্যুর কারণে ‘জুলাই শহীদ’-এর মর্যাদা পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে মৃত্যু সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং অকাট্য দলিলকে এড়িয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নগদ তিন লাখ টাকা এবং সরকার ঘোষিত আর্থিক সহায়তার ৩০ লাখের মধ্যে ১০ লাখ টাকা পেয়েছে উবাইদুলের পরিবার। এমন বিতর্কিত সুপারিশ কেন করা হলো–তা জানতে যোগাযোগ করা হয় ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সঙ্গে।
জেলা প্রশাসক সাইফুর বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে হবে ইউএনও অফিস থেকে। আপনার কোয়্যারিগুলো আমি ইউএনও-কে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তিনি জানালে আমি আপনাকে রেসপন্স করব।”
ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জ উপজেলার বর্তমান ইউএনও সানজিদা রহমান চরচাকে বলেন, “আমি সে সময় দায়িত্বে ছিলাম না। তাই তদন্ত না করে হঠাৎ করে কিছু বলতে পারব না। ডিসি স্যার আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। আমরা তদন্ত করে ঈদের ছুটির পর বিস্তারিত জানাব।”
উবাইদুলকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করার সময় এখানে ইউএনও হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সারমিনা সাত্তার। তিনি বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে নড়াইলে আছেন। চরচাকে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই মনে করতে পারছি না। অনেক আগের ঘটনা। আপনারা ইশ্বরগঞ্জ ইউএনও অফিসে যোগাযোগ করেন। তারা ফাইল দেখে বলতে পারবে।”
এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেবে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়–তা জানতে যোগাযোগ করা হয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে। বিস্তারিত শুনে তিনি বলেন, “আপনারা খুবই ভালো কাজ করছেন। আমরা এ ধরনের কাজকে সম্মান করি। আপনাদের এই প্রতিবেদনগুলো আমাদেরকে হেল্প করবে। তবে আমি যেহেতু মাত্র একদিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি, তাই আগাম মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। এ বিষয়ে আমাদের করণীয় কী, তা জেনে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।”

কাভার্ড ভ্যানচালক উবাইদুল হক ছিলেন বিএনপির কর্মী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার ‘অপরাধে’ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে বলে অভিযোগ আছে। প্রায় সাত দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে মারা যান তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার তাকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। গেজেটে তার নম্বর ৬৪৩। হত্যা মামলার অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে উবাইদুলের মৃত্যুর কথা বলা হয়। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কী ছিল মূল ঘটনা? সেটা জানতে অনুসন্ধান শুরু করে চরচা। দীর্ঘ অনুসন্ধানে মেলে চমকপ্রদ তথ্য। কারো হামলা নয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মারা যান উবাইদুল। আর আহত হলেও বেঁচে যান তার সঙ্গী মোটরসাইকেল চালক মো. রিপন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ৫ আগস্ট মধ্যরাতের ওই দুর্ঘটনাকে এক দিন আগের; অর্থাৎ, ৪ আগস্টের হামলার গল্প হিসেবে প্রচার করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পরিকল্পিতভাবে ভিন্ন ঘটনা সাজিয়ে করা হয় উবাইদুল হত্যা মামলা। আবার এই মামলাকে অকাট্য প্রমাণ দেখিয়ে নিহত উবাইদুলকে বানানো হয় জুলাই শহীদ; আর আহত মোটরসাইকেল চালক মো. রিপন ‘জুলাই যোদ্ধা’। এই কাণ্ডের মূল ক্রীড়নক ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল খান। যাকে ২০২৪ সালের শেষদিকে চাঁদাবাজির ঘটনায় বহিষ্কার করে বিএনপি।
উবাইদুলের মৃত্যু সনদে সড়ক দুর্ঘটনার কথা স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও ভুয়া মামলার সূত্র ধরে একজনকে ‘জুলাই শহীদ’ আরেকজনকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ স্বীকৃতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সবই হয়েছে কামাল খানের ‘ম্যাজিকে’, যিনি এ ক্ষেত্রে বিএনপি পরিচয়কে এই ম্যাজিকে কাজে লাগিয়েছেন।
মামলার অভিযোগে বাদি লিখলেন এক, বললেন আরেক
‘জুলাই শহীদ’ উবাইদুল ছিলেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল খানের ঘনিষ্ঠ কর্মী। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায়। থাকতেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উত্তর বেগুনবাড়ি এলাকায়। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট মধ্যরাতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতলে ভর্তির পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ আগস্ট রাতে মারা যান উবাইদুল। এর ছয় দিন পর ২০ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন উবাইদুলের বড় ভাই মো. এমদাদুল হক। মামলায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের ২৫ নেতাসহ আরও ২০-২৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, “আসামিদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করিতেছি যে, আমি গ্রামের বাড়িতে কৃষিকাজ করি। আমার ছোট ভাই উবাইদুল হক ঢাকা দারাজের ড্রাইভিং করিয়া আসিতেছিল এবং বিএনপি’র উত্তর বেগুন বাড়ির ৯ নং ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছিল। গত ইং ৪-০৮- ২০২৪ তারিখ সময় আনুমান সকাল ১০ ঘটিকায় আমার ভাই ও দলীয় লোকজন নিয়ে দুইটি মোটরসাইকেল যোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে বিএনপি পার্টি অফিসে যোগদান করে। আন্দোলন শেষে বাসায় ফেরার পথে পল্টন মডেল থানাধীন নাইটিংগেল ভবনের সামনে বিকেল অনুমান ৪ ঘটিকায় পৌঁছামাত্র উক্ত আসামীরা পথরোধ করিয়া উক্ত ১ নং আসামীর নির্দেশে অন্যান্য আসামীরা আমার ভাইকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে তাহাদের হাতে থাকা লোহার রড, লোহার চেইন, হাতুড়ি দিয়ে আমার ভাই ও তাহার সহযাত্রীর মোটরসাইকেলের সামনের দিকে আঘাত করিলে আমার ভাই ও তার সহযাত্রী মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় পড়িয়া গেলে আসামীগণ এলোপাতাড়িভাবে পিটাইয়া মাথার ডানপাশে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে এবং দুই হাত ভেঙে ফেলে। অতঃপর আমার ভাইয়ের সাথে থাকা লোকজন ও পথচারী আগাইয়া আসিলে আসামীরা বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে উক্ত পথচারীরা আমার ভাই ও তার সহযাত্রীকে কাকরাইলস্থ ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল ঢাকায় নিয়ে গেলে সেখানে তাহারা রিসিভ না করিয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।”
আরও লেখা হয়, “পথচারী লোকজন আমার ভাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে বাসায় নিয়ে যায়। গত ৫-০৮-২০২৪ ইং তারিখে আমার ভাইয়ের অবস্থার অবনতি হলে আমি তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার আমার ভাইকে আইসিইউতে ভর্তি করেন। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৩-০৮-২০২৪ ইং তারিখে রাত ১২.০১ মিনিটের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার আমার ভাইকে মৃত ঘোষণা করেন। ১৩-০৮-২০২৪ ইং তারিখ পল্টন থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে এবং আমি আমার ভাইয়ের ময়নাতদন্ত শেষে গ্রামের বাড়িতে দাফন করি। উক্ত আসামীগণ পরস্পর যোগসাজসে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বিগত কয়েকদিনের আইনশৃঙ্খলার অবনতির সুযোগ নিয়ে আমার ভাইকে গুরুতর আঘাত করে হত্যা করিয়াছে। আমি আমার ভাইয়ের দাফন-কাফন শেষে আসামীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করিয়া এবং আমার পরিবারের সাহিত আলাপ-আলোচনা করিয়া থানায় আসিয়া এজাহার দায়ের করিতে বিলম্ব হইল।”
কিন্তু মামলার বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে মামলার বাদি উবাইদুলের বড় ভাই এমদাদুল চরচাকে জানান ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, সরকার পতনের পর ৫ আগস্ট বিকেলে টেলিফোনে শেষ কথা হয় উবাইদুলের সঙ্গে। এ সময় গ্রামের বাড়িতে থাকা মা এবং এমদাদুল নিজে ঢাকার পরিস্থিতি ভালো নয় বলে উবাইদুলকে বাসায় থাকার পরামর্শ দেন। এরপর রাত ১২টার পরে ফোনে জানতে পারেন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন উবাইদুল।
এমদাদুল বলেন, “রাইতে ফোন পাইছি আমার ভাই হোন্ডা এক্সিডেন্ট করছে। অত রাইতে তো আর আওন যায় না, ৬ তারিখ সকালে ঢাকা মেডিক্যালে আইয়া দেখি আমার ভাইয়ের মাথা ফাডা, কুনু হুঁশ নাই, মুখে পাইপ দেওয়া (ভেন্টিলেশন)। লগের লোকজন কইলো রাইতে হোন্ডা এক্সিডেন্ট করছে।”
মামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমদাদুল বলেন, তিনি মামলা করতেই চাননি। এমদাদুল বলেন, “মামলা তো আমি লেখি নাই, আমরা তো মামলা দিতেই চাই নাই। উবাইদুলের নেতারা মামলা লেখছে, আমারে কইছে এমনে লেখলেই ভালা বিচার হইব। আমি তো থাকি বাড়িতে। খবর পাইয়া সকালে ঢাকায় আইছি। কামাল ভাই, আলী ভাই আর আনোয়ার ভাই মামলা লেখছে।”

এই ‘কামাল ভাই’ হলেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল খান, যাকে ২০২৪ সালের শেষের দিকে চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপি বহিষ্কার করে। কামাল খানের অনুসারী ছিলেন উবাইদুল। ‘আলী ভাই’ হলেন দল থেকে বহিষ্কৃত ২৪ নং ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী। আর ‘আনোয়ার ভাই’ হলেন মির্জা আনোয়ার, যিনি ২৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। মির্জা আনোয়ার এখনো স্বপদেই আছেন।
তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কামাল খান মামলা করার পুরো দায় চাপান মির্জা আনোয়ার এবং মোহম্মদ আলীর ওপর। তিনি বলেন, “আমি মামলার দিন থানায় যাই নাই, আনোয়ার, আর আলী গেছিল। আমাকে তারা মামলার দিন সাথে রাখে নাই। মামলায় আমার একজন পরিচিত লোকের নাম দিতে মানা করছিলাম। তারা আমার কথা শুনে নাই। উল্টা আমারে অবিশ্বাস করে। কয় আমি নাকি আওয়ামী লীগকে বাঁচাইতে চাইছি। হেরা আমারে সাইড কইরা বাদিরে দিয়া নিজেদের মতো মামলা লেখায়।”
কামাল খানের এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেন আনোয়ার ও আলী। তাদের দুজনের দাবি, উবাইদুল কামাল খানের কর্মী হওয়ায় সবকিছু তার ইচ্ছা অনুযায়ী হয়েছে। তারা জানান, এক নেতার কর্মীদের ওপর অন্য নেতার অধিকার থাকে না। তাই উবাইদুল হত্যা মামলার বিষয়ে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তারা শুধু কামাল খানকে সহযোগিতা করতে থানায় গিয়েছিলেন। ২০ আগস্ট কামাল খান নিজে থানায় উপস্থিত থেকে মামলার অভিযোগ লিখিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মির্জা আনোয়ার ও মোহাম্মদ আলী।
মামলার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করলেও তারা তিনজনই দাবি করেন–বাদি ‘ভুল বলেছেন’। তাদের দাবি, ৪ আগস্টেই হামলার শিকার হন উবাইদুল। প্রত্যেকের সঙ্গে আলোচনার শুরুতেই পুরো ঘটনার বর্ণনা জানতে চাওয়া হয়। তিনজনই শুধু হামলার তারিখ, হামলার বর্ণনা, আর হামলার পর আহত উবাইদুলকে এক দিন বাসায় রেখে পরদিন ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার তথ্য ছাড়া অন্য সব বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেন। তিনজনের কেউই হামলার সঠিক সময় জানাতে পারেননি। একজন বলেন, সকালে হামলার শিকার হন উবাইদুল। আরেকজন বলেন, সন্ধ্যায়; তো অপরজন বলেন, রাতে।
হামলায় আহত হওয়ার পর উবাইদুল এবং রিপনকে হাসপাতালে নেন কারা–এমন প্রশ্নে আনোয়ার এবং আলী জানান, কামাল নিজে এবং তার লোকজন ঘটনাস্থলে ছিল। তারাই উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়েছে। কামালের নেতৃত্বেই আন্দোলনে গিয়েছিলেন উবাইদুল আর রিপন। আর এ জন্যই কামাল আসামিদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন–এমনটাই দাবি দুজনের।
একই প্রশ্নে কামাল খান জানান, সে সময় প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তিনি অনেকটা আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি এদিন উবাইদুলের সঙ্গে ছিলেন না। উবাইদুলের ওপর হামলার খবর পান ফোনে। দুজন হামলার শিকার হয়ে আহত হলে তাদের হাসপাতালে নিলেন কারা, তাও জানেন না বলে দাবি কামালের।
৪ আগস্ট শয্যাশায়ী উবাইদুল ভাঙচুর করেন ৫ আগস্ট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দেশজুড়ে শুরু হয় হামলা, জ্বালাও-পোড়াও। একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া কিছু মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও এবং সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পেয়েছে চরচা। এতে দেখা যায়, তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ি এলাকার নাশকতার চিত্র। উত্তর বেগুনবাড়ি এলাকার পদ্মা গার্মেন্টসের পেছনে একটি ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৩টার দিকে উবাইদুলসহ বেশ কয়েকজন যুবক ওই ভবনে হমলা চালান। এর মাঝে ক্যামেরাটি দৃষ্টিগোচর হলে তা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন তারা। মামলার অভিযোগে ৪ আগস্টের হামলায় আহত উবাইদুলের মাথায় আঘাতের কথা বলা হলেও ৫ আগস্টের ফুটেজে সে রকম কিছু দেখা যায়নি।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওই দিন উবাইদুলের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাসায় হামলা চলে। দলটির নেতা-কর্মীরা যেসব বাড়িতে থাকতেন, প্রতিটি বাড়িতেই গিয়েছিলেন উবাইদুল ও তার সঙ্গীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ভবনমালিক চরচাকে জানান, তার বাড়িতে যুবলীগের এক কর্মী ভাড়া থাকতেন। উবাইদুল ৫ আগস্ট বিকেলে ওই কর্মীকে ছিনিয়ে নিতে ভবনে হামলা করলে বাধা দেন তিনি নিজে। পরে বাসার গ্যারেজে রাখা ওই যুবলীগ কর্মীর মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায় উবাইদুল ও তার সঙ্গীরা।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী চরচাকে জানান, উবাইদুল এলাকার পরিচিত মুখ। তাকে এলাকার মানুষজন শান্ত ও নিরীহ হিসেবেই চিনতেন। তবে ৫ আগস্ট বিকেল থেকে তাকে দেখা গেছে ভিন্ন রূপে। এদিন উবাইদুলসহ বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাসা-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট এবং জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। পাশের রিকশা গ্যারেজ থেকে শুরু করে ঘরের আসবাব–সবই পুড়িয়েছে তারা।
৫ আগস্ট মধ্যরাতের পর; অর্থাৎ, ৬ আগস্ট শুরুর দিকেই ফেসবুকে উবাইদুলের বন্ধুদের পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় তারা উবাইদুলের দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে তাকে বাঁচাতে জরুরি রক্ত চেয়ে পোস্ট দেন। ১৩ আগস্ট অনেকেই তার মৃত্যুর খবর জানিয়ে ফেসবুকে শোক প্রকাশ করেন।

উবাইদুলের এক সহকর্মী মনির আহমেদের ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা যায়, ১৩ আগস্ট উবাইদুলের সঙ্গে নিজের শেষ কথা নিয়ে স্মৃতিচারণ করে পোস্ট দেন তিনি। সেখানে নিজের ফোনের ডায়াল লিস্টের একটি স্ক্রিনশট এবং উবাইদুলের সঙ্গে তোলা ছবি শেয়ার করেন মনির। স্ক্রিনশটে দেখা যায়, উবাইদুলের নম্বরে তিনি সবশেষ ৫ আগস্ট বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে কল করে ৪০ সেকেন্ড কথা বলেন। মনির আহমেদ চরচাকে জানান, তিনি এবং উবাইদুল অনলাইনভিত্তিক শপিং প্ল্যাটফর্ম দারাজের কর্মী ছিলেন। একটি ডেলিভারি মিনিভ্যান তারা দুজনে শিফট ভাগ করে চালাতেন। দিনের শিফটে মনির ওই গাড়ি চালাতেন, আর উবাইদুল রাতে। ৩ আগস্ট বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দারাজ তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরদিন নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে যান মনির। আর উবাইদুল থেকে যান ঢাকায়।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর এলাকার খবর নিতে উবাইদুলকে ওই ফোন কলটি করেছিলেন মনির নিজেই। কী কথা হয়, জানতে চাইলে মনির আহমেদ চরচাকে বলেন, “আমি খবর নিছিলাম–কী অবস্থা এলাকার। উবাইদুল ভাই খুব খুশি হইয়া কইলো, ‘ভাই শেখ হাসিনা পালাইছে। আপনে আসেন আপনারে নিয়া ঘুরমু। অনেক বছর অনেক অত্যাচার সইয্য করছি এলাকায়। এইবার সব শোধ লমু।’ এইটুকুই কথা কইলাম উবাইদুল ভাইয়ের লগে। এরপর রাইতে হুনি ভাই হোন্ডা এক্সিডেন্ট করছে।”

আহত জুলাই যোদ্ধা শোনালেন জিনের গল্প
৫ আগস্ট রাতে মোটরসাইকেলের পেছনে আরোহী হয়েছিলেন উবাইদুল হক। চালাচ্ছিলেন একই এলাকার মো. রিপন। উবাইদুলের মৃত্যু নিয়ে সত্য-মিথ্যার মাঝে সমান্তরাল রেখা টানতে পারেন একমাত্র তিনিই। দুর্ঘটনায় উবাইদুল মারা গেলেও প্রাণে বেঁচে যান রিপন। তার ডান হাত ভেঙে যায়। চরচাকে রিপন জানান, প্রথমে তিনি ‘গ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হলেও সম্প্রতি গুরুতর আহত ‘খ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন। মাসে ১৫ হাজার টাকা সরকারি ভাতায় আগের চেয়ে ভালো আছেন পরিবার নিয়ে।
নানা আলোচনা শেষে রিপনের কাছে জানতে চাওয়া হয়–কী ঘটেছিল সেদিন? জবাবে হুবহু মামলার এজাহারের গল্প শোনান রিপন। শুধু মনে করতে পারছিলেন না যে, ৪ আগস্ট সকাল ঠিক কয়টায় বিএনপি অফিসের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করে রিপন বলেন, অনেক সকালে সেখানে গিয়েছিলেন, মিছিল করেছিলেন। তারপর সকাল ১০টার দিকে ফিরে আসার পথে হামলার শিকার হন তারা। যেখানে মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে–বিকেল ৪টার কথা। তথ্যটি শুধরে দিতেই তিনি জানান, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলায় জ্ঞান হারিয়েছিলেন তিনি। জ্ঞান ফিরে দেখতে পান তিনি তার নিজ বাসায়। এ কারণে হামলার সময়টা ঠিকঠাক বলতে পারেননি।
কারা হামলা করেছিল জানতে চাইলে বলেন, “উবাইদুল ভাইয়ের এলাকার আওয়ামী লীগের লোক; আমি তাদের চিনি না।”

অথচ উবাইদুলের সঙ্গে একই এলাকায় দীর্ঘ দিন রাজনীতির মাঠেও আছে তিনি। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, তারা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে নিজেদের এলাকা থেকে বিএনপি পার্টি অফিসে যান একসঙ্গেই।
কিছুটা কৌশলী হয়ে জানতে চাওয়া–সেদিন তো আন্দোলন চলছিল শাহবাগে। বিএনপি পার্টি অফিসে যে কর্মসূচির কথা বলছেন, তেমন কোনো কর্মসূচি তো ছিল না। রিপন দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলেন, “আমরা শাহবাগেই গিয়েছিলাম। আমি এই এলাকা চিনি না তো, তাই প্যাঁচ লাগায় ফেলছি।”
সেদিন কত তারিখ ছিল–জানতে চাইলে রিপন বলেন, “আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওইদিন ৪ তারিখ। কারণ, ওইদিন সরকার নাই, চারিদিকে কী একটা অবস্থা!”
এটুকু বলেই কিছুক্ষণ থেমে সচেতনভাবে শুধরে নেন, “না, মানে তখন তো অনেক ঝামেলা চলতেছিল, আর রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলন, এ জন্য আমাদের হাসপাতালে ট্রিটমেন্ট দেয় নাই। উপায় নাই দেখে আমাদের বাসায় নিয়া গেছে সবাই। একদিন বাসায় থাইক্কা উবাইদুল ভাইয়ের অবস্থা খারাপ হইয়া গেল। পরদিন আমরা আবার হাসপাতালে যাই।”
তাহলে ৫ আগস্ট সিসি ক্যামেরার ফুটেজে উবাইদুলকে দেখা গেল কীভাবে? এই প্রশ্নে রিপনের সাফ জবাব–এমন কোনো ফুটেজ থাকতে পারে, সেটা তিনি বিশ্বাস করেন না। ফুটেজ দেখাতেই রিপন বলেন, “এটা কেমনে সম্ভব! আমি যা বলছি, সব সত্য বলছি। ৫ তারিখ উবাইদুল ভাই এলাকায় থাকলে ৪ তারিখে আমার হোন্ডায় পিছনে অবশ্যই জিন ছাড়া কিছু ছিল না। ওইটা তাইলে উবাইদুল ভাইয়ের বেশে জিনই ছিল।”
ওই মোটরসাইকেলটি কার ছিল–জানতে চাইলে রিপন বললেন, তিনি জানেন না। উবাইদুল কোনো এক জায়গা থেকে মোটরসাইকেলটি জোগাড় করে, তাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিলেন।
মোটরসাইকেলটি কার?
সেদিন ১৫০ সিসি ইঞ্জিনের লাল রংয়ের একটি পালসার মোটরসাইকেলের আরোহী হয়েছিলেন উবাইদুল। চালাচ্ছিলেন রিপন। এটির মালিক রিপনের আপন খালাতো ভাই মাসুদ রানা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুদ রানা চরচাকে জানান, ৫ আগস্ট রাতে বিরিয়ানি আনতে যাওয়ার কথা বলে মোটরসাইকেলের চাবি নেন রিপন। পরে মাঝরাতে খবর আসে কাকরাইল এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়েছেন দুজন। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান মাসুদ রানাসহ এলাকার কয়েকজন। মোটরসাইকেলটির কেমন ক্ষতি হয়েছিল–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার হোন্ডার সামনে কিচ্ছু আছিল না। সব ভাইঙ্গা শেষ। ২৬ হাজার ট্যাকা লাগছে ঠিক করতে, কিন্তু এরপরও ভালমতো ঠিক হয় নাই।”

কোথায় এবং কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এক্সিডেন্ট হইছিল নাইটিঙ্গেল মোড় থেইকা এট্টু সামনে গিয়া। ডাইরেক্ট আইলেন্ডে মাইরা দিছে। এর লাইগ্গা হোন্ডার সামনে সব শ্যাষ। আমার হোন্ডা তিনদিন ওইহানেই পইড়া আছিল। ওইখানে আনন্দ কমিউনিটি সেন্টার আছে না, ওই সেন্টারের গেইটের সামনে পইড়া আছিল ভাঙ্গা হোন্ডাটা। সেন্টারের দারোয়ানরা পাহারা দিয়া রাখছিল। আর ক্যামনে হইলো, তা তো দেখি নাই। রিপন কইছে, সুলতানরে (মামলার ১ নম্বর আসামি) ধাওয়া দিতে গেছিল। হ্যায় নাকি চেইন দিয়া বাড়ি দিছে, আর রিপনে কন্ট্রোল রাখতে পারে নাই আইল্যান্ডে মাইরা দিছে।”
মাসুদ রানার সঙ্গে কথা শেষে আবারও ‘জুলাই যোদ্ধা’ রিপনের সঙ্গে কথা বলে চরচা। মাসুদ রানার মোটরসাইকেল নিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে রিপন বলেন তিনি মাসুদ রানা নামে কাউকে চেনেন না। রাগ দেখিয়ে তিনি এ বিষয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে আর কোনো কথা বলতে চান না। এরপর আর সাড়া দেননি রিপন।
মামলাটির তদন্তভার এখন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে। দুর্ঘটনায় পড়া মোটরসাইকেলের তথ্য এবং এর মালিক মাসুদ রানা যে রিপনের আত্মীয়–এ বিষয়ে সব তথ্য নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
মৃত্যু সনদের তথ্যে চক্ষু চড়ক গাছ
দুর্ঘটনার পর সাতদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৩ আগস্ট মারা যান উবাইদুল হক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দেওয়া উবাইদুলের মৃত্যু সনদটি সংগ্রহ করে চরচা। সেটির তথ্য বলছে, ৬ আগস্ট রাত ২টায় উবাইদুলকে ঢামেকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের আইসিইউ-এর ১৯ নম্বর বেডে রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ১৩ আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিটে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন উবাইদুলকে।
সেখানে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বলা হয়–Refractory septic shock, Type 1 respiratory failure, ASDH e` ICH (Acute subdural hematoma with intracranial hemorrhage), Fractured Radius-Ulna.
যার বাংলা অর্থ–উবাইদুলের মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতের ফলে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। একইসঙ্গে তার ফুসফুস অকার্যকর ছিল, সেই সাথে ইনফেকশনের কারণে তিনি শকে ছিলেন। আর তার ডান হাতের হাড় ছিল ভাঙা।

যে কারণে উবাইদুলের এমন অবস্থা হয়েছে, তার উল্লেখ করতে গিয়ে মৃত্যু সনদে লেখা হয় H/O RTA on 06.08.2024 at 1.30 am, যার অর্থ হলো–‘হিস্ট্রি অব রোড ট্রাফিক এক্সিডেন্ট’। অর্থাৎ, ৬ আগস্ট রাত দেড়টায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন উবাইদুল।
মৃত্যু সনদের Manner of death-এর অংশে চিকিৎসক টিক মার্ক দেন Accident-এর ঘরে।
প্রশ্ন আসে, মামলায় যেভাবে বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট হামলার ঘটনার পর উবাইদুলকে একদিন তার নিজ বাসায় রাখা হয়, তা আদৌ সম্ভব কি না? এ বিষয়ে জানতে চরচা কথা বলে ঢামেকের আইসিইউতে দায়িত্ব পালন করা একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে। বিস্ময় প্রকাশ করে তারা সকলেই জানান, এই ধরনের রোগীকে কোনোভাবেই বাসায় রাখার সুযোগ নেই।
সে সময় বিস্ময়কে সরাসরি চিকিৎসা দিয়েছেন–এমন একজন চিকিৎসকের মতামত জানতে চায় চরচা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “সে সময় কয়েকজন আইসিইউ রোগী ছিলেন, যারা জুলাই শহীদ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন। বেড ১৯ গেজেটভুক্ত হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে তার হিস্ট্রি ছিল, রোড এক্সিডেন্ট। তাকে এমন অবস্থায় আমাদের জরুরি বিভাগ রিসিভ করে যে, তাৎক্ষনিকভাবে লাইফ সাপোর্টে নিতে হয়। আরও সহজ করে বলতে গেলে, তার ব্রেইনে ইনজুরি এত ভয়াবহ ছিল যে, একদিন বাসায় রাখা তো দূরের কথা হাসপাতালে আনার পর একমাত্র চিকিৎসাই ছিল তাকে মেশিন সাপোর্টে বাঁচিয়ে রাখা।”
ওই চিকিৎসক বলেন, “এজন্য প্রথমেই তাকে ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয় আইসিইউতে রেখে। তিনি যদি সেখান থেকে রিকভার করতেন, তাহলে আমরা পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করতে পারতাম। তার অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল যে, তার মাথার আঘাতের সার্জারির সুযোগ আমরা পাইনি। এক কথায় বলতে গেলে আমরা বাকি ৫-৬ দিন তাকে শুধু কোনোরকম বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাটাই করেছি। কিন্তু আমরা সফল হইনি।”
সে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা নেওয়া উবাইদুলের একটি ছবি পায় চরচা। তাতে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারেই ভেন্টিলেটর মেশিনের মাধ্যমে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে। পরবর্তী সময়ে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। অর্থাৎ, হাসপাতালে আনার সঙ্গে সঙ্গেই উবাইদুলের জীবন বাঁচানোর সব শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান চিকিৎসকরা।

আরও নিশ্চিত হতে মামলায় উল্লেখ করা রাজধানী কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালেও খোঁজ নেয় চরচা, যেখানে ঘটনার পরপর চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছিল উবাইদুল ও রিপনকে। অতি গুরুতর হওয়ায় এবং হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থা না থাকায় সেদিন উবাইদুল ও রিপনকে চিকিৎসা দিতে পারেননি চিকিৎসকরা। তাৎক্ষণিকভাবে উবাইদুলের প্রাণ বাঁচাতে কোনো রকমে মাথায় ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন তারা। যেহেতু তাদের কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, তাই দুজনের চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো তথ্য রেকর্ড করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
উবাইদুলকে সেদিন বাসায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল কি না, তা আরও নিশ্চিত হতে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত দুজন চিকিৎসকের মতামত জানতে চায় চরচা। তাদের বোঝার সুবিধার্থে ঢামেকের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে তোলা উবাইদুলের ছবি এবং তার মৃত্যু সনদের কপি দেখানো হয়। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা দুজন জানান, সে সময় তাদের কেউ দায়িত্বে ছিলেন না। তবে, ছবিতে রোগীর অবস্থা এবং মৃত্যু সনদের তথ্য অনুযায়ী, উবাইদুলকে বাসায় রাখার সুযোগ নেই। তাদের ভাষ্যমতে উবাইদুলের অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল যে, ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। এরপর কয়েকদিন তাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাটাই চালানো হয়েছে, চিকিৎসা নয়।
‘অবাস্তব গল্প’র কারিগর যুবদল নেতা কামাল
অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয় উবাইদুল হত্যা মামলার এজাহারের সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকার কারণ। নিজ কর্মীর মৃত্যুকে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন কামাল খান। স্থানীয় সবাই সড়ক দুর্ঘটনার কথা শুরু থেকে জানলেও কদিন পর থেকে এই কামালই ৫ আগস্ট মধ্যরাতের ঘটনাটিকে ৪ আগস্টের বলে প্রচার করতে থাকেন। উবাইদুল ও রিপন একই স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হলেও শুরুতে দুটি আলাদা ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন–এমনটাই প্রচারের চেষ্টা করেন কামাল।
কামাল খান ফেসবুকে প্রচার করেন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলায় উবাইদুল পল্টন এলাকায় আর রিপন প্রেসক্লাব এলাকায় আহত হয়েছেন। আরেক পাস্টে তিনি লেখেন, আন্দোলন শেষে মহাখালী থেকে ফেরার পর নিজ এলাকা বেগুনবাড়িতেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলায় আহত হন উবাইদুল।

আলাদা আলাদা জায়গায় উবাইদুলের মৃত্যুর কারণ উপস্থাপন করা হয় ভিন্ন ভিন্নভাবে। ঘটনার এক বছর পর ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদদের নিয়ে ব্যানার তৈরি করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে উবাইদুলের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন কামাল খান। ছবির বর্ণনায় উবাইদুলের পরিচয় লেখা হয়, মো. উবাইদুল, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা, ঢাকা মহানগর উত্তর। যুবদল নেতা, ২৪ নং ওয়ার্ড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা। ১৯ জুলাই ২০২৪ বাংলামোটরে পুলিশের গুলিতে নিহত।
মূলত মামলার বাদিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই মামলার আসামি তালিকা তৈরি এবং ঘটনার ভিন্ন বর্ণনা এজাহারভুক্ত করেন কামাল খান। পরে এই মামলাকেই সামনে রেখে উবাইদুলকে ‘জুলাই শহীদ’ এবং রিপনকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সব প্রক্রিয়া শেষ করেন নিজেই। কামালের নিজের ছেলেও গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’।

সব তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আবার কথা হয় সাবেক যুবদল নেতা কামাল খানের সঙ্গে। এবার নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, ১ নম্বর আসামি বেগুনবাড়ি বউ বাজার ইউনিট যুবলীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদকে ধাওয়া দিতে গেলে এই দুর্ঘটনার মুখে পড়েন উবাইদুল ও রিপন।
কামাল বলেন, “আমি নিজে দেখি নাই। তবে পরে শুনছি, ৫ আগস্ট রাতের বেলা একটা হোন্ডায় কইরা সুলতান এলাকা থেকে পালাইতেছিল। তখন আরেক মোটরসাইকেল নিয়ে রিপন আর উবাইদুল ওদের ধাওয়া করে। ধাওয়া করার সময় সুলতান চেইন দিয়া উবাইদুলরে বাড়ি দেয়। তখন রিপন হোন্ডা কন্ট্রোল করতে না পাইরা রাস্তার খাম্বার সাথে লাগায় দেয়।”
মামলায় মিথ্যা তথ্য লেখার কারণ কী জানতে চাইলে কামাল বলেন, “মামলা কী হবে, কেমনে হবে–এইটা দলের সিদ্ধান্ত ছিল। দল থেইকা যেমনে বলছে, তেমনে মামলা হইছে। আগে দেহেন নাই যাত্রাবাড়ীতে কেউ মরলে ১ নম্বর আসামি হইতো খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া কি আর মার্ডার করত? তারে তো ঠিকই আসামি করা হইতো, অহন এমনই ঘটনা।”
দলের কার নির্দেশে এভাবে মামলা দায়ের করা হয়–জানতে চাইলে ক্ষেপে গিয়ে তিনি বলেন, “অই মিয়া আপনে কেডা? আপনে কীসের সাংবাদিক? সাংবাদিক কি জুলাই নিয়া কতা কইবার সাহস পায়? এইডা কি সাংবাদিকের কাজ? আপনে কেমুন সাংবাদিক হেইডা আমি দেইখ্যা লমু। আমি খবর লইছি। আপনে অলির (মামলার ৫ নম্বর আসামি) আত্মীয়। হেয় আপনেরে আমার পিছে লাগাইছে, আপনে কোনো সাংবাদিক না, আমি খবর লইছি। দেখতাছি আপনেরে,” বলে কল কেটে দেন তিনি।
মামলার এক নম্বর আসামি পলাতক সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগের সব ধরনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় চরচা। সবশেষ মামলার আরেক পলাতক আসামির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবলীগ নেতার দাবি, এই হত্যা মামলার সব অভিযোগ মিথ্যা। এমনকি নিহত উবাইদুলকে মামলা হওয়ার আগে চিনতেন না তিনি। চরচাকে তিনি বলেন, “ভাই আপনি একটু হিসাব করে দেখেন, আমরা করতাম রাজনীতি। আর যে ছেলে মারা গেছে সে কী ছিল? দারাজের পিকআপ ড্রাইভার। তার সাথে আমাদের পরিচয় থাকবে কীভাবে? ৫ আগস্ট রাতে যখন আমি এলাকাতেই পাশের একটি বাসায় লুকিয়ে ছিলাম, তখন ফেসবুকের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতির আপডেট জানার চেষ্টা করছিলাম। মধ্যরাতে আমি প্রথম এলাকার এক ছেলের স্ট্যাটাসে জানতে পারি উবাইদুল মারা গেছে। আমি সাথে সাথে ভাবলাম ইনি হয়তো আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক। পরে জানলাম এই ছেলে আমাদের এলাকার।”
সুলতান মাহমুদকে ধাওয়া করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা কি না, জানতে চাইলে ওই নেতা বলেন, “আমিও এমনটা শুনেছি। তবে পুরোপুরি সত্য কি না, সেটা বলতে পারব না। কারণ, সন্ধ্যায় সুলতানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। আমি তখনো এলাকা ছাড়তে পারিনি, পাশের বাসায় লুকিয়ে আছি। তখন সুলতান আমাকে ফোন করে বলেছিল যে, সে এলাকা থেকে বেরিয়ে গেছে এবং নিরাপদে আছে। সে আমাকে পরামর্শ দেয়, আমিও যেন এলাকায় না থাকি। মামলা হওয়ার আগ পর্যন্ত সুলতান যোগাযোগ করত। কিন্তু মামলার পর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঢাকা-১২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন সাইফুল আলম নীরব। এই অপরাধে তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। তারও আগে চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কৃত কামাল খান হলেন সাইফুল আলম নীরবের সমর্থক ও কর্মী। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট উবাইদুল মারা যাওয়ার পর ১৫ আগস্ট উবাইদুল হত্যার বিচারের দাবিতে কর্মসূচির আয়োজন করেন কামাল। সেখান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাইফুল আলম নীরব।
কামাল খানের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুয়া তথ্যে মামলার নির্দেশনা দলের পক্ষে কে দিয়েছেন–জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরবের সঙ্গে। একাধিকবার কল করে এবং মেসেজ পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
জুলাই মামলার বিষয়ে দল থেকে এমন কোনো নির্দেশনা ছিল কি না, জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, “যে যুবদল নেতা আপনাকে বলেছে, তিনিসহ তার নেতারাও অপকর্মের জন্য দল থেকে বহিষ্কার হয়েছে আগেই। তাহলে আপনাদেরই বোঝার কথা–এমন অনৈতিক নির্দেশনা বিএনপির মতো কোনো দল দেবে কি না। কোনো অন্যায়কে কখনো বিএনপি প্রশ্রয় দেয়নি, সামনেও দেবে না। যারা দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওেয়া হবে। দলের আদর্শে কোনো ছাড় নয়।”
কোনো ব্যাখ্যা নেই কর্তৃপক্ষের
‘জুলাই শহীদ’ উবাইদুল হক হত্যা মামলাটি পিবিআইয়ে আছে। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির মিডিয়া অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ চরচাকে বলেন, “আমরাও নিশ্চিত হয়েছি–এটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলছি। আমাদের তদন্তে বেশ অগ্রগতি আছে। তবে এটি যেহেতু খুব সংবেদনশীল একটি মামলা, তাই সময় নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা; কিন্তু ঠিক কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটল, সেটি এখনো তদন্তাধীন। সবকিছু নিশ্চিত হয়েই আমরা আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করব।”
দিনে নাশকতা করে রাতে কাউকে ধাওয়া করতে গিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেলে তাকে ‘জুলাই শহীদ’ বিবেচনার সুযোগ আছে কি না, তা জানতে চাইলে এই পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, “এটা আমরা নির্ধারণ করতে পারব না। এটা আমাদের তদন্তের বিষয়ও না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জবাব দিতে পারবে। আমাদের তদন্ত করতে বলা হয়েছে, হত্যার সঙ্গে আসামিরা যুক্ত আছে কি না–আমরা সেটা তদন্ত করছি। জুলাই শহীদ গেজেটের বিষয়ে আমাদের মতামত চাওয়া হয়নি।”
সব শুনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখার উপসচিব মো. মতিউর রহমান চরচাকে বলেন, “এটা তো পুরোটাই প্রতারণা। এভাবে জুলাই শহীদ বা যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এটা যারা সুপারিশ করেছে, তারা কীভাবে কী করেছে, তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে এসব অনিয়মের শেষ হওয়া দরকার। আপনাদের সাংবাদিকতার মাধ্যমে যতটা সম্ভব এসব অনিয়ম তুলে আনুন, আমরা ব্যবস্থা নেব।”
নিহত উবাইদুল হক ‘জুলাই যোদ্ধা’ শুধু নন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলাতে মৃত্যুর কারণে ‘জুলাই শহীদ’-এর মর্যাদা পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে মৃত্যু সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং অকাট্য দলিলকে এড়িয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নগদ তিন লাখ টাকা এবং সরকার ঘোষিত আর্থিক সহায়তার ৩০ লাখের মধ্যে ১০ লাখ টাকা পেয়েছে উবাইদুলের পরিবার। এমন বিতর্কিত সুপারিশ কেন করা হলো–তা জানতে যোগাযোগ করা হয় ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সঙ্গে।
জেলা প্রশাসক সাইফুর বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে হবে ইউএনও অফিস থেকে। আপনার কোয়্যারিগুলো আমি ইউএনও-কে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তিনি জানালে আমি আপনাকে রেসপন্স করব।”
ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জ উপজেলার বর্তমান ইউএনও সানজিদা রহমান চরচাকে বলেন, “আমি সে সময় দায়িত্বে ছিলাম না। তাই তদন্ত না করে হঠাৎ করে কিছু বলতে পারব না। ডিসি স্যার আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। আমরা তদন্ত করে ঈদের ছুটির পর বিস্তারিত জানাব।”
উবাইদুলকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করার সময় এখানে ইউএনও হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সারমিনা সাত্তার। তিনি বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে নড়াইলে আছেন। চরচাকে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই মনে করতে পারছি না। অনেক আগের ঘটনা। আপনারা ইশ্বরগঞ্জ ইউএনও অফিসে যোগাযোগ করেন। তারা ফাইল দেখে বলতে পারবে।”
এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেবে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়–তা জানতে যোগাযোগ করা হয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে। বিস্তারিত শুনে তিনি বলেন, “আপনারা খুবই ভালো কাজ করছেন। আমরা এ ধরনের কাজকে সম্মান করি। আপনাদের এই প্রতিবেদনগুলো আমাদেরকে হেল্প করবে। তবে আমি যেহেতু মাত্র একদিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি, তাই আগাম মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। এ বিষয়ে আমাদের করণীয় কী, তা জেনে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।”

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রাকিবুল ইসলাম (২৫) নামে এক টিকটক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টার দিকের এই হত্যা নারী-সংশ্লিষ্ট বিরোধ থেকে ঘটেছে।