মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা ক্লান্তির মতো সমস্যাকে আমরা অনেক সময় সাধারণ বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এসবই হতে পারে মস্তিষ্কে টিউমারের প্রাথমিক সতর্ক সংকেত। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের কিছু পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে থাকলে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। আবার মাথাব্যথা হলেই সেটি টিউমারের লক্ষণ–এমন আশঙ্কাও ঠিক নয়।
ভারতের নয়ডার ফোর্টিস হাসপাতালের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ নেহা পন্ডিতা হিন্দুস্থান টাইমসকে বলেন, বেশির ভাগ মাথাব্যথাই গুরুতর নয়। সাধারণত মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, শরীরে পানির ঘাটতি বা চোখের অতিরিক্ত চাপের কারণে এসব মাথাব্যথা হয়।
কখন মাথাব্যথা চিন্তার কারণ?
ডা. নেহার মতে, কখনো কখনো দীর্ঘদিন ধরে না কমা বা অস্বাভাবিক ধরনের মাথাব্যথা মস্তিষ্কে টিউমারের সতর্ক সংকেত হতে পারে। সমস্যা হলো, এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুবই সূক্ষ্ম হওয়ায় সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর একটি হলো এমন মাথাব্যথা, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও ঘন ঘন হতে থাকে বা তীব্র হয়ে ওঠে। সাধারণ মাথাব্যথার মতো নয়, এটি ভোরবেলায় বেশি হতে পারে, ঘুম ভেঙে দিতে পারে অথবা এর সঙ্গে বমি বমি ভাব ও বমি হতে পারে। তবে শুধু মাথাব্যথা থাকলেই যে মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে, এমন নয়। কিন্তু মাথাব্যথার ধরনে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়।

ভারতের যশোদা হাসপাতালের স্নায়ুরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান কুনাল বাহরানিও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান জীবনে মাথাব্যথা খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। দীর্ঘ সময় কাজ করা, বেশি সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, কম ঘুম এবং দৈনন্দিন চাপের কারণে প্রায়ই মাথাব্যাথা হয়।
তবে বেশির ভাগ মাথাব্যথা ক্ষতিকর না হলেও, কিছু ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কে টিউমারের মতো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। তিনি বলেন, “মাথাব্যথা যদি আগের চেয়ে বেশি ঘন ঘন হয়, বেশি তীব্র হয় বা সাধারণ ওষুধে না কমে, তাহলে সেটি সতর্ক সংকেত হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সকালে মাথাব্যথা বেশি হয় অথবা কাশি দিলে, ঝুঁকে কাজ করলে কিংবা ব্যায়াম করলে ব্যথা আরও বেড়ে যেতে পারে।”
মস্তিষ্কে টিউমারের লক্ষণ
স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ নেহা পন্ডিতা বলেন, টিউমার মস্তিষ্কের কোন অংশে হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। তার মতে, সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ঝাপসা দেখা বা এক জিনিস দুটো দেখা
- শুনতে সমস্যা হওয়া
- ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা
- বারবার মাথা ঘোরা
- হাত বা পায়ে দুর্বলতা বা অবশভাব
- কথা বলতে সমস্যা
- স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া
- আচরণ বা ব্যক্তিত্বে স্পষ্ট পরিবর্তন
আরেক স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ কুনাল বাহরানি বলেন, এসব লক্ষণের অনেকগুলোই মানুষ সাধারণ ক্লান্তি, মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল বলে ধরে নেয়। তিনি জানান, সতর্ক সংকেতগুলোর মধ্যে আরও থাকতে পারে–দীর্ঘদিন বমি বমি ভাব থাকা, কোনো কারণ ছাড়াই বমি হওয়া, ঝাপসা দেখা, শ্রবণশক্তিতে পরিবর্তন, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা ও বারবার ভুলে যাওয়া।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হঠাৎ মেজাজের পরিবর্তন, আচরণগত পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক খিটখিটে স্বভাবও দেখা দিতে পারে।

কুনাল বাহরানি আরও বলেন, মস্তিষ্কের কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যেতে পারে বা চলাফেরা ও ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হলো খিঁচুনি। বিশেষ করে যাদের আগে কখনো খিঁচুনি হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত?
নেহা পন্ডিতা বলেন, কোনো উপসর্গ যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বা একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা আরও কার্যকর হতে পারে।
ডা. কুনাল বলেন, কোনো উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে, সময়ের সঙ্গে খারাপ হলে বা একসঙ্গে কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিলে সেগুলোকে অবহেলা করা ঠিক নয়। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, এসব লক্ষণের এক বা একাধিক থাকলেই যে কারো মস্তিষ্কে টিউমার আছে, এমন নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব লক্ষণের কারণ তুলনামূলকভাবে সাধারণ ও কম গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা।
ভয় নয়, সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “আমাদের শরীর অনেক সময় ছোট ছোট সংকেত দেয় যে কোথাও সমস্যা হচ্ছে। তাই দীর্ঘস্থায়ী কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। এতে গুরুতর রোগ দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।”
ডা. নেহা পন্ডিতা বলেন, “মাথাব্যথা হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে শরীরের পরিবর্তনগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মাথাব্যথা যদি আগের চেয়ে ভিন্ন ধরনের হয় বা এর সঙ্গে স্নায়বিক কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।”