অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব’ হামলায় ২৫৯ জন নিহত: এইচআরএসএস

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব’ হামলায় ২৫৯ জন নিহত: এইচআরএসএস
ছবি: এআই জেনারেটেড

বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর অসহিষ্ণুতার চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১৭ মাসে দেশে মব ভায়োলেন্সের অন্তত ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ভয়াবহ প্রবণতা বর্তমানে জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্ব সহিংসতার প্রতিবেদন’ প্রকাশ করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। তাতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। সেই প্রতিবেদন থেকেই ‘মব জাস্টিসের’ এসব তথ্য জানা যায়।

সংস্থাটি ১৫টি জাতীয় দৈনিক, দেড় শতাধিক স্থানীয় পত্রিকা এবং জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

এইচআরএসএস বলছে, এই সময়ের গণপিটুনির ঘটনাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামান্য সন্দেহ বা তুচ্ছ অজুহাতে সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক পোশাক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানানো। এ ছাড়া রাজধানীতে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার পর লাশে লবণ ঢেলে উল্লাস করার মতো ঘটনাও সমাজমানসের চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ১ হাজার ৪১১টি ঘটনায় ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলেই প্রাণ হারিয়েছেন ১২১ জন। নির্বাচনী সহিংসতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব সংঘাতের অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসেই ১৫৫টি সহিংস ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মব জাস্টিসের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও বন্দুকযুদ্ধের অভিযোগও বাড়ছে। ১৭ মাসে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে বা হেফাজতে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ২২ জন নির্যাতনে এবং ১২ জন হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২৭ জন কয়েদি ও হাজতির মৃত্যু হয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও নেমে এসেছে খড়গ। ১৭ মাসে ৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে এবং হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত ৮৩৪ জন। সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের অধীনে ভিন্নমত দমনে অন্তত ৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলা এবং শতাধিক মাজারে ভাঙচুরের ঘটনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে সংকটের মুখে ফেলেছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ১৭টি মন্দির ও ৬৫টি বসতবাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার চিত্রও ভয়াবহ; ২৬১৭ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১০১৬ জন ধর্ষণের শিকার। কর্মক্ষেত্রে এবং আন্দোলনে অন্তত ১৬৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে ও নির্যাতনে অন্তত ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। মিয়ানমার সীমান্তেও মাইন বিস্ফোরণ ও গুলিতে বিজিবি সদস্যসহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

এইচআরএসএস মনে করে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সংলাপ জরুরি। মব ভায়োলেন্স এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো বন্ধে সরকারকে আরও কঠোর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্পর্কিত