Advertisement Banner

আসামে হিন্দুত্ব ও মুসলমান বিদ্বেষ–বিজেপির জেতার কৌশল

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আসামে হিন্দুত্ব ও মুসলমান বিদ্বেষ–বিজেপির জেতার কৌশল
আসামের চা বাগানে কর্মরত শ্রমিক। ছবি: রয়টার্স

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শাসক দল বিজেপি এক দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে–একদিকে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক অবস্থান জোরদার করা, অন্যদিকে নারীদের জন্য নগদ সহায়তাসহ কল্যাণমূলক প্রকল্প বিস্তার করা। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর এই কৌশল ভোটারদের প্রভাবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

রাজ্যের মরিগাঁও জেলায় একটি নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেওয়া বহু নারী ভোটার জানিয়েছেন, তারা সরকারের আর্থিক সহায়তা প্রকল্প থেকে সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। ‘অরুণোদই’ নামের নগদ সহায়তা প্রকল্পের আওতায় লক্ষাধিক নারী অর্থ পেয়েছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, এই সুবিধার কারণেই তারা বিজেপিকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চান। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার এই প্রকল্পগুলিকে ভোটের আগে আরও সম্প্রসারণ করেছে।

তবে এই কল্যাণমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও স্পষ্ট। আসামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম, যাদের মধ্যে বড় অংশই বাংলা ভাষাভাষী। দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ‘বিদেশি’ বা বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। এই ইস্যু ঘিরে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ডিটেনশন সেন্টার তৈরি এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ভূমি থেকে উচ্ছেদ অভিযানও জোরদার করা হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মুসলমান পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের দাবি, এসব অভিযান অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে পরিচালিত, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবে এটি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপি একটি ‘হিন্দুত্ব ও কল্যাণনীতির মিশ্রণ’ কৌশল প্রয়োগ করছে। একদিকে ধর্মীয় মেরুকরণ, অন্যদিকে আর্থিক সুবিধা– এই দুইয়ের সমন্বয়ে ভোটব্যাংক শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ আয়ের স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে এই নগদ সহায়তা অনেক নারীর মাসিক আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ভোটের প্রচারে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচনের ঠিক আগে এই অর্থ বিতরণ কার্যত ভোট কেনার শামিল। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, এসব প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অনেকেই নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের চাপ, উচ্ছেদ এবং সামাজিক বৈষম্যের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ১৯৮৩ সালের নেলি গণহত্যার স্মৃতি এখনো এই অঞ্চলে গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্যবিরোধী কমিটিও সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, আসামের বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা বৈষম্য, উচ্ছেদ এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যের শিকার হচ্ছেন। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আসামের নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং পরিচয়, অধিকার এবং টিকে থাকার লড়াই হিসেবেও দেখা দিচ্ছে। বিজেপির এই দ্বিমুখী কৌশল শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারণ করবে রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

সূত্র: আল জাজিরা

সম্পর্কিত