নতুন ‘পারমাণবিক অস্ত্র’ কি তবে এআই?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
নতুন ‘পারমাণবিক অস্ত্র’ কি তবে এআই?
নতুন পারমাণবিক শক্তি হতে যাচ্ছে এআই । ছবি: ফ্রিপিক

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। আর এই প্রতিযোগিতাই ভবিষ্যতে দেশগুলোর ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণ করবে। এমন মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এসবারব্যাংকের ফার্স্ট ডেপুটি সিইও আলেকজান্ডার ভেদিয়াখিন।

তিনি বলেছেন, এআই এখন পারমাণবিক প্রযুক্তির মতো শক্তিশালী এবং যারা এখন থেকেই নিজেদের স্বকীয় এআই তৈরি করতে পারছে, তারাই এই সময়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভেদিয়াখিন বলেন, পৃথিবীতে একটি নতুন পারমাণবিক ক্লাব গঠিত হচ্ছে, যার সদস্য হতে হলে একটি দেশের নিজস্ব ন্যাশনাল লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) থাকতে হবে। এই ক্লাবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও আরও কয়েকটি দেশ। কিন্তু যারা এখনো শুরুই করেনি, তাদের জন্য দৌঁড়ে যোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

বিদেশি এআই মডেল ঝুঁকিপূর্ণ

ভেদিয়াখিন স্পষ্ট বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, এবং সরকারি অনলাইন সেবার মতো সংবেদনশীল খাতে কোনোভাবেই বিদেশি এআই মডেল ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। তার বক্তব্য, ”বিদেশি কোনো মডেলে গোপন তথ্য সরাসরি আপলোড করা নিষিদ্ধ। আর এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।”

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও গত সপ্তাহে বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে অবশ্যই রাশিয়ার নিজস্ব এআই প্রযুক্তি থাকতে হবে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নত কম্পিউটিং প্রযুক্তি পাওয়া কঠিন হলেও রাশিয়া এগিয়ে যাচ্ছে এসবারব্যাংক ও ইয়ানডেক্সকে সামনে রেখে।

এআই দৌঁড়ে আমেরিকা ও চীন এগিয়ে

ভেদিয়াখিনের মতে, আমেরিকা ও চীন অন্যান্য দেশের তুলনায় কমপক্ষে ৬ থেকে ৯ মাস এগিয়ে আছে। এই দুই দেশের বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য, বিশেষজ্ঞ জনবল এবং কম্পিউটিং শক্তি তাদেরকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে।

তিনি বলেন, ‘‘এখন দৌঁড়ে নামতে চাইলে খরচ এত বেশি হবে যে, তা অনেক দেশের পক্ষেই অসম্ভব। যারা এখনো শুরুই করেনি, তাদের জন্য প্রতিযোগিতা ধরা খুব কঠিন। অর্থাৎ এআই দুনিয়ার দরজা এখন প্রায় বন্ধ।’’

রাশিয়ার প্রযুক্তি ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা

এসবারব্যাংক দাবি করছে, তাদের নতুন জিগাচ্যাট আল্ট্রা প্রিভিউ মডেল চ্যাটজিপিটির সর্বশেষ সংস্করণের সমতুল্য। তবে ভেদিয়াখিন স্বীকার করেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ছে। তার মতে, “আমরা সংখ্যায় নয়, দক্ষতায় এগোতে চাই।”

এআইতে বাড়তি বিনিয়োগে সতর্কতা

বিশ্বজুড়ে এআইতে বিনিয়োগ নিয়ে অতিরিক্ত উত্তেজনা বা হাইপ সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ভেদিয়াখিন। তার মতে, এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ এত বেশি যে, এর লাভ শিগগির পাওয়া যায় না। বরং একসময় অতিরিক্ত বিনিয়োগ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে রাশিয়া নাকি নিরাপদ অবস্থানে আছে কারণ তাদের বিনিয়োগ এখনো অতিরিক্ত হয়নি।

তিনি জানান, রাশিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিড ব্যবস্থার জন্য আগামী ১৬ বছরে ৪০ ট্রিলিয়ন রুবল (প্রায় ৫০৬ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ লাগবে। এর বড় অংশ এআই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য।

বিশ্ব রাজনীতির নতুন শক্তি এআই?

ভেদিয়াখিনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট–ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ক্ষমতা আর শুধু সামরিক বা অর্থনীতির ওপর নির্ভর করবে না, বরং এআইয়ের ওপরই নির্ধারণ হবে কোন দেশ কতটা প্রভাবশালী। যাদের নিজস্ব মডেল থাকবে, তারা হবে বিজয়ী। যাদের থাকবে না, তারা পিছিয়ে পড়বে বহু গুণ।

সার্বিকভাবে রাশিয়ার এই শীর্ষ প্রযুক্তি কর্মকর্তা মনে করেন, এআই প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে বিশ্বশক্তির নতুন মানচিত্র তৈরি করছে। যেখানে প্রযুক্তিই হয়ে উঠছে ‘নতুন পারমাণবিক অস্ত্র’।

সম্পর্কিত