ভোটকেন্দ্রে না গিয়েই কি প্রতিবাদ জানাল উগান্ডার মানুষ?

ভোটকেন্দ্রে না গিয়েই কি প্রতিবাদ জানাল উগান্ডার মানুষ?
রাস্তায় উগান্ডার জনতা। ছবি: রয়টার্স

আফ্রিকার ‘মুক্ত মুক্তা’ হিসেবে পরিচিত উগান্ডা আজ এক চরম অনিশ্চয়তার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ইওয়েরি মুসেভেনি ২০২৬ সালের নির্বাচনে আবারও বিজয়ী হয়ে নিজের ক্ষমতার মেয়াদ আরও দীর্ঘায়িত করেছেন। তবে এই বিজয় উল্লাসের নয়, বরং রাজপথে রক্তপাত, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বিরোধী শিবিরের ওপর নজিরবিহীন দমন-পীড়নের এক ধূসর আখ্যান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, দেশটির অর্ধেক ভোটারই ভোট দেয়নি। এ যেন ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে নীরব প্রতিবাদ জানাল উগান্ডার মানুষ।

এবারের নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের আইকন ববি ওয়াইনের নেতৃত্বে পরিবর্তনের যে ঢেউ উঠেছিল, তা ব্যালট বাক্সে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে–তা নিয়ে খোদ আন্তর্জাতিক মহলেই উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। একদিকে বিজয়ী পক্ষের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে পরাজিত বিরোধীদের কারচুপির অভিযোগ—সব মিলিয়ে উগান্ডার আকাশ এখন বারুদের গন্ধ আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভারী।

শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা মুসেভেনির শাসনের এই নতুন অধ্যায় কি উগান্ডাকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে?

ববি ওয়াইন কী বলছেন

ববি ওয়াইন ঠিক কীভাবে তার বাড়ি ঘিরে রাখা সেনাদের নজর এড়িয়ে পালিয়েছেন–তা তিনি কোথাও বলবেন না। বর্তমানে তিনি ঠিক কোথায় আছেন–তা-ও এক রহস্য। তবে একটি ফোনকলে তিনি জানিয়েছেন, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ছিল ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ এবং তিনি ও তার সমর্থকরা এখন ‘দেশকে মুক্ত করার মিশনে’ নামবেন।

গায়ক থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া এই ব্যক্তি গত ১৫ জানুয়ারির উগান্ডার নির্বাচনে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিরোধী প্রার্থী ছিলেন। এখন তিনি নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত।

তার জীবন নিয়ে এই শঙ্কা অতিরঞ্জিত নয়। ১৯ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সেনাপ্রধান মুহুজি কাইনেরুগাবা জানান, তিনি ওয়াইনকে হত্যা করতে এবং তার অণ্ডকোষ কেটে ফেলতে চান। তার এই হুমকিগুলো আরও বেশি উদ্বেগজনক এই কারণে যে, তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুসেভেনির ছেলে। এই ঘটনাগুলো নির্বাচনে যে একটি ‘প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ ছিল, সেই ধারণাকেই স্রেফ উপহাসে পরিণত করেছে।

ববি ওয়াইন উগান্ডাবাসীকে গণতন্ত্র রক্ষায় যেকোনো বৈধ উপায়ে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
ববি ওয়াইন উগান্ডাবাসীকে গণতন্ত্র রক্ষায় যেকোনো বৈধ উপায়ে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

ওয়াইন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন, তিনি বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আদালতে যাবেন না। বিচার বিভাগের ওপর আস্থার অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি এর পরিবর্তে তার সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের নির্বাচনে মুসেভেনির কাছে হারার পর ওয়াইন ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আদালতের পক্ষপাতদুষ্টতা এবং নিরপেক্ষতার অভাবের অভিযোগ তুলে তার আবেদন প্রত্যাহার করে নেন।

গোপন ঘাঁটি থেকে বিবিসির সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, “নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রেসিডেন্ট মুসেভেনির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো অব্যাহত রাখবেন।”

তিনি আরও বলেন, “উগান্ডার বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করা হয়েছে এবং আমরা উগান্ডাবাসীকে তাদের গণতন্ত্র রক্ষায় যেকোনো বৈধ উপায়ে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”

নির্বাচনে আসলে কী হয়েছে

নির্বাচনের পর উগান্ডার পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। ওয়াইন অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক কর্মীদের লক্ষ্য করে দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে এবং একটি ‘নীরব গণহত্যা’ চলমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী সহিংসতায় ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। যদিও তিনি এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি। দৈনিক ‘ডেইলি মনিটর’ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাম্পালা জুড়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগে ১০০ জনের বেশি তরুণকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে সেনাপ্রধান কাইনেরুগাবা গর্ব করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছেন, তার সৈন্যরা গত এক সপ্তাহে ২২ জন বিরোধী সমর্থককে হত্যা করেছে এবং একে ‘অত্যন্ত নগণ্য’ সংখ্যা বলে অভিহিত করেছেন।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্ধেক ভোটার ভোট দিতেই যাননি। ছবি: রয়টার্স
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্ধেক ভোটার ভোট দিতেই যাননি। ছবি: রয়টার্স

উগান্ডার জাতীয় নির্বাচনে ৮১ বছর বয়সী মুসেভেনি বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। তিনি বিরোধীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়িয়ে নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ এনেছেন এবং তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নির্বাচনে মুসেভেনিকে প্রায় ৭২ শতাংশ ভোটে জয়ী ঘোষণা করার পর উদযাপনের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। দীর্ঘ ৪০ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে রাষ্ট্রের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ এতটাই জোরালো যে, উগান্ডার মানুষ আসলে কাকে ভোট দিয়েছে–তা নিশ্চিতভাবে জানার কোনো উপায় নেই। 

ভোট কারচুপির যে অভিযোগ ওয়াইন করেছেন, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি। তবে বিবিসিকে উগান্ডা মানবাধিকার কমিশন (ইউএইচআরসি) জানিয়েছে, নির্বাচনের দিন কিছু ‘প্রযুক্তিগত ও পদ্ধতিগত’ চ্যালেঞ্জ দেখা দিলেও তা ভোটের সামগ্রিক নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ণ করেনি।

আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ) নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, তারা ব্যালট পেপার জালিয়াতির কোনো প্রমাণ পায়নি, তবে টানা কয়েকদিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। শনিবার প্রেসিডেন্ট মুসেভেনিকে বিজয়ী ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর ইন্টারনেট সচল করা হয়েছিল।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্ধেক ভোটার ভোট দিতেই যাননি। যা আসলে উদাসীনতা নয়, বরং এক প্রকার আত্মসমর্পণের লক্ষণ। কারণ এই দেশে ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে কখনোই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেনি। ইকোনমিস্টকে উগান্ডার সাংবাদিক চার্লস ওনিয়াঙ্গো-অবোর বলেন, “ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকাটাই হলো প্রতিবাদের একমাত্র উপায়, যার জন্য পুলিশ আপনাকে অভিযুক্ত করতে পারবে না।”

রাজধানী কাম্পালায় এখনও রাস্তায় রাস্তায় সেনা ও পুলিশের টহল চলছে। মানবাধিকার কর্মীদের ধারণা, নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। তবে সঠিক হিসাব রাখা কঠিন এবং পুলিশও কোনো সংখ্যা প্রকাশ করছে না। সবচেয়ে সোচ্চার নাগরিক সমাজ গোষ্ঠীগুলোকে স্থগিত করা হয়েছে এবং অনেক সক্রিয় কর্মী এখন আত্মগোপনে আছেন।

ওয়াইনের দল ‘ন্যাশনাল ইউনিটি প্ল্যাটফর্ম’ দ্য ইকোনমিস্টকে জানিয়েছে, তাদের তিনজন ভাইস-প্রেসিডেন্টকে আটক করা হয়েছে। এমনকি একজন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যের বাড়িতে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে দলটির অন্তত সাতজন সমর্থক নিহত হয়েছেন।

উগান্ডার ভাগ্যে কী আছে

দমন-পীড়নের মূল লক্ষ্য হলো, যেকোনো প্রতিবাদকে অঙ্কুরেই বিনাশ করা। ‘প্রতিবাদী ভোট’-এর স্লোগান নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো ওয়াইন সবসময়ই জানতেন যে, পরিবর্তন আনার জন্য কেবল নির্বাচনই যথেষ্ট হবে না। কিন্তু যতদিন তিনি আত্মগোপনে থাকবেন, কাম্পালা নিস্তব্ধই থাকবে।

চারবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়া কিজা বেসিগিয়ে জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করার মতো একমাত্র বিকল্প ব্যক্তিত্ব হতে পারতেন। কিন্তু তাকেও এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দি করে রেখেছে মুসেভিনি সরকার। তার স্ত্রীর দাবি, বেসিগিয়ে গুরুতর অসুস্থ এবং তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। সব মিলিয়ে বিরোধী দলগুলো এখন চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে।

তাহলে এমন একটি নির্বাচনের সার্থকতা কী? যাকে শাসকগোষ্ঠী একটি সামরিক অভিযানের মতো বিবেচনা করে, বিরোধীরা মনে করে প্রহসন এবং যেখানে অর্ধেক ভোটারই অংশ নেন না? শুধু উগান্ডাবাসীরাই এই প্রশ্ন তুলছেন না। গত বছর প্রতিবেশী দেশ তানজানিয়াতেও রাষ্ট্রপ্রধান বিরোধী প্রার্থীকে জেলবন্দী করেছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকে ৯৮ শতাংশ ভোটে জয়ী দেখিয়েছে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং জিবুতিতে এই বসন্তেই নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানকার ভোটাররাও তাদের দেশের ভবিষ্যতের ব্যাপারে প্রকৃত কোনো ভূমিকা রাখার আশা করছেন না। এ ধরনের প্রতিযোগিতার মূল কাজ হলো শীর্ষ পর্যায়ে কোনো পরিবর্তন আনা নয়, বরং সংসদ সদস্যদের মতো অনুগত এলিটদের বারবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।

পরিতাপের বিষয়, স্বৈরশাসক হটানোর বিষয়ে একমাত্র মুসেভিনিরই ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে। ছবি: রয়টার্স
পরিতাপের বিষয়, স্বৈরশাসক হটানোর বিষয়ে একমাত্র মুসেভিনিরই ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে। ছবি: রয়টার্স

শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি এবং তার পরবর্তী গণতান্ত্রিক জোয়ারের পর থেকে আন্তর্জাতিক বৈধতা লাভের একটি মাধ্যম হিসেবেও নির্বাচন ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যদিও সেই রীতি এখন ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু। অতীতে মুসেভেনি বিরোধী নেতাদের হত্যা করার বদলে সাধারণত দমন কিংবা নিজেদের দলে টেনে নিতেন। ওয়াইনের ক্ষতি করলে খুব একটা লাভ হবে না, বরং তা হিতে বিপরীত হতে পারে। এটা শাসকগোষ্ঠীর বুদ্ধিজীবীরা নিশ্চয়ই তা বুঝতে পারছেন।

কিন্তু জেনারেল কাইনেরুগাবা যখন একজন ‘রক্তপিপাসু ত্রাস’ হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রচারে আনন্দ পান এবং প্রকাশ্যেই তার বাবার উত্তরসূরি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন, তখন ঐ যুক্তি খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারে না। ওয়াইন কেবল এটুকুই বলেন, “আমরা শুধু স্বাধীন হতে চাই।”

উগান্ডার যে পরিস্থিতি, তাতে শুধু ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’-এ দেশমুক্তির মিশন চালিয়ে খুব একটা লাভ নেই। স্বাধীনতার পর থেকে উগান্ডাবাসী এখন পর্যন্ত ক্ষমতার কোনো শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর দেখেনি। এমন ‘স্বৈরশাসককে’ হটিয়ে কিভাবে ‘স্বাধীনতা’ অর্জন সম্ভব–তা কারো জানা নেই। পরিতাপের বিষয়, এই বিষয়টি নিয়ে অভিজ্ঞতা একমাত্র মুসেভেনিরই আছে। ৪০ বছর আগে তিনিই স্বৈরশাসক ইদি আমিনকে গদি থেকে নামিয়ে দেখিয়েছিলেন। 

সম্পর্কিত