শেখ হাসিনার পতনে নেতৃত্ব দেওয়া জেন-জি’রা ভোট নিয়ে কী ভাবছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
শেখ হাসিনার পতনে নেতৃত্ব দেওয়া জেন-জি’রা ভোট নিয়ে কী ভাবছে
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাজপথে আন্দোলনকারীরা। ছবি: রয়টার্স

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। জেনারেশন-জেড বা জেন-জি নামে পরিচিত এই তরুণদের অনেকেই এবারই প্রথমবারের মতো ভোট দেবে।

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের খুব বেশিদিন বাকি নেই। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কি ভাবছে দেশের তরুণ ভোটাররা? বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সাথে আলাপচারিতায় তাদের অনুভূতি উঠে এসেছে। আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন ঘিরে এই তরুণ ভোটারদের মাঝে যেমন আশা ও উদ্দীপনা কাজ করছে, তেমনি রয়েছে সংশয় এবং পরিবর্তনের জোরালো দাবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২৫ বছর বয়সী এইচ এম আমিরুল করিম (২৫) জানান, তরুণ ভোটাররা দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠতে চান। তিনি বলেন, “আমি আশা করি মানুষকে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, বরং নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।”

কয়েক মাসের অস্থিরতার পর দেশ পুনর্গঠনে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আমিরুল বলেন, “আমরা বিপ্লব পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে একটি স্থিতিশীল অবস্থার দিকে যাচ্ছি। আর এই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন।”

তবে সবাই এমনটি ভাবছে না। গত বছরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ২৩ বছর বয়সী অ্যাক্টিভিস্ট হেমা চাকমা। তিনি বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকটা ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’ প্রবাদের সাথে তুলনা করেছেন।’’

২৫ বছর বয়সী সাদমান মুজতবা রাফিদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের প্রকৃত সমস্যা সমাধান না করেই তাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, “আমরা কী ভাবছি তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই, বরং আমরা কাকে ভোট দিচ্ছি সেটিই তাদের কাছে মুখ্য। সংস্কারের যে প্রস্তাবগুলো দেওয়া হয়েছে আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই, কিন্তু আমরা এর বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই।”

অনেকের কাছেই কর্মসংস্থান এখন প্রধান অগ্রাধিকার। ২৫ বছর বয়সী প্রকৌশলী শাফতি আশারি বর্তমানে মাদরাসায় পড়ছেন। তিনি বলেন, “স্নাতকদের সংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বেকারত্ব দূর করতে রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে আমরা সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর পরিকল্পনা প্রত্যাশা করি।”

২২ বছর বয়সী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মাসুমও সরকার জবাবদিহিতার দাবি জানিয়েছেন। তিনি এমন এক দেশপ্রেমী সরকারের আশা রাখেন যারা দেশের আইন শৃংখলা ঠিক রাখবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের লাখো তরুণ এবং প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া জেন-জি ভোটাররাই একটি গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের এক স্বৈরশাসনের পতন ঘটে এবং রাজপথে ব্যাপক রক্তপাতের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

আসন্ন নির্বাচনে এই তরুণরাই ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে তাদের বক্তব্যে এটিই স্পষ্ট যে, এই প্রজন্ম গণতন্ত্রের জন্য উন্মুখ হলেও পুরনো রাজনৈতিক ধারার পুনরাবৃত্তি নিয়ে বেশ সন্দিহান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে লাখো তরুণ এক স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছিল, আসন্ন নির্বাচনে তারাই হতে পারেন ‘গেম চেঞ্জার‘। বাংলাদেশের প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫ কোটিই তরুণ। এই জেন-জি প্রজন্ম এখন সোশ্যাল মিডিয়া এবং রাজপথ—উভয় জায়গাতেই সক্রিয়। তারা কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন করতে চায় না, বরং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং পুলিশের জবাবদিহিতার মতো কাঠামোগত সংস্কারের বাস্তব বাস্তবায়ন চায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণরা যদি দলগুলোর পুরোনো প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত না হয়, তবে ভোটের ফলাফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দুই-ই নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।

সম্পর্কিত